শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

সেদিন টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০১৮ বুধবার, ০৮:৪৬ এএম

সেদিন টার্গেট ছিলেন শেখ হাসিনা

সেদিন ছিল শনিবার। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে সন্ত্রাস ও বোমা হামলার বিরেুদ্ধে এক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুরের পর থেকেই সমাবেশস্থলে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হতে থাকে। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে সন্ত্রাসবিরোধী একটি মিছিল হওয়ার কথা। মিছিল-পূর্ব সমাবেশের জন্য মঞ্চ করা হয় ট্রাকের ওপর।

ঘড়ির কাঁটায় তখন ৫টা বেজে ২২ মিনিট। কেন্দ্রীয় নেতাদের বক্তব্য শেষে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা বক্তব্য দিচ্ছেন। শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী ঝাঁঝালো বক্তব্যে গোটা সমাবেশ তখন উদ্দীপ্ত। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তব্যের ইতি টেনেছেন। হাতে একটি কাগজ ভাজ করতে করতে মঞ্চের সিঁড়ির কাছে এগিয়ে আসছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নিচে মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান হাত বাড়িয়ে শেখ হাসিনার জন্য অপেক্ষারত।

ঘাতকদের যেন আর তর সইল না। ঠিক তখনই বিকট শব্দ। মুহুর্মুহু গ্রেনেড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল গোটা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। মুহূর্তেই রক্তগঙ্গা বয়ে গেল পিচঢালা কালোপথ। আওয়ামী লীগ কার্যালয় চত্বর যেন এক মৃত্যুপুরী। রক্ত-মাংসের স্তূপে ঢেকে যায় সমাবেশস্থল। পরপর ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণে প্রাণ হারায় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। আহত হন শত শত মানুষ।

ওই হামলার প্রধান টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা। এ কারণে প্রথম গ্রেনেডটি মঞ্চ অর্থাৎ ট্রাকটি লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু ট্রাকের ডালায় লেগে গ্রেনেডটি নিচে বিস্ফোরিত হয়। দেহরক্ষী এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের ত্যাগের বিনিময়ে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

সেদিনের সমাবেশে ছবি তোলার এসাইনমেন্ট ছিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার প্রধান ফটোসাংবাদিক এস এম গোর্কির। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। তিনি বলেন, আমার অনুরোধে আপা (শেখ হাসিনা) দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, ‘তোদের আর ছবি তোলা শেষ হয় না। আচ্ছা, তোল।’ আপা দাঁড়ানোর ১০ সেকেন্ডের মধ্যেই প্রথম গ্রেনেডটি চার্য হয়।

গ্রেনেডগুলো কোন দিক থেকে নিক্ষেপ হলো- জবাবে গোর্কি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারিনি। আমরা মঞ্চের উপরে। প্রথম শব্দ শোনার পরপরই শেখ হাসিনাকে মানবপ্রাচীর করে নিরাপদ করা হলো। তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ভাই, মায়া ভাই, ব্যক্তিগত নিরাপত্তকর্মী মামুন ভাইসহ অনেকেই শেখ হাসিনাকে ঘিরে ফেললেন। তবে আমার মনে হয়েছে প্রথমে গ্রেনেডগুলো দক্ষিণ দিক থেকে এসেছে। এরপর কী হয়েছে, কোন দিক থেকে এসেছে, গুলি কোন দিক থেকে এলো, তা কিছুই বুঝতে পারিনি। সবাই তখন দিকহারা।’

‘আমরা কেউই বুঝতে পারিনি, এটি গ্রেনেডের শব্দ। আমরা মনে করেছিলাম, ককটেল বা পটকা জাতীয় কিছু হবে। আমার ৩০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে এরকম অনেক শব্দ বা হামলার ঘটনা দেখেছি। কিন্তু গ্রেনেড! কল্পনা করা যায় না।-যোগ করেন গোর্কি।

২০০৪ সালের ৪ আগস্ট তেমনই এক অভিশপ্ত দিন। এদিন ১৩টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেই ঘাতকরা ক্ষান্ত হয়নি। জীবিত আছেন জেনে তারা শেখ হাসিনা এবং তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনার গাড়িটি বুলেটপ্রুফ হওয়ায় এ বেলায়ও প্রাণে রক্ষা পান। ঘাতকের গুলি গ্লাস ভেদ করে শেখ হাসিনাকে আঘাত করতে পারেনি। তবে শেখ হাসিনাকে আড়াল করে ঘাতকের গুলির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেন তার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান।

বর্বর ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনা বাম কানে মারাত্মক আঘাত পান। আঘাতপ্রাপ্ত কানের শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

২০০৪ সালের ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার ঘটনায় বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ ৪৯ আসামির সাজা হবে কি না- সেই সিদ্ধান্ত  ঘোষণা করবে আদালত।
হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা আলোচিত দুই মামলায় যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন গত ১৮ সেপ্টেম্বর রায়ের এই দিন ঠিক করে দেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনা ছিল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত।

আওয়ামী লীগের অভিযোগ, বিএনপি আমলে ওই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা চেষ্টা হয়। হামলার পরপরই নষ্ট করে ফেলা হয় আলামত।

পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে ‘প্রকৃত তথ্য’ বেরিয়ে আসতে থাকে। উদঘাটিত হয় ‘জজ মিয়া নাটক’।

অন্যদিকে হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বিএনপি বলে আসছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে করা অধিকতর তদন্তে তাদের দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেককে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।

খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান ছাড়াও বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন,খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই  ও পুলিশের শীর্ষ পদে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এ মামলার আসামি।

দুই মামলায় মোট ৫২ আসামির বিচার শুরু হলেও অন্য মামলায় তিনজনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় মোট ৪৯ আসামির রায় হচ্ছে বুধবার।  হত্যা মামলায় তাদের সবার নাম থাকলেও বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাদের মধ্যে ৩৮ জন আসামি।

আসামিদের মধ্যে ২৩ জন আগে থেকেই কারাগারে ছিলেন, যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত জামিনে থাকা আটজনকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।তারেক রহমানসহ বাকি ১৮ জনকে পলাতক দেখিয়েই এ মামলার বিচার কাজ চলে।

দণ্ডবিধি এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের যেসব ধারায় দুই মামলার বিচার হয়েছে, তাতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তারেক রহমানসহ ৩৮ আসামির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ সরকারি কর্মকর্তার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ডের রায় আসতে পারে।