ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮

বিশ্বাসের ঋণে অবিশ্বাস : আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী জেলে

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার, ০৯:৪২ পিএম

বিশ্বাসের ঋণে অবিশ্বাস : আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী জেলে

স্বল্প সময়ের জন্য বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেওয়া ঋণ ব্যাংকিং টার্মসে লোন অ্যাগেইনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্ট (এলটিআর) বলা হয়। এমন ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ চার বা ছয় মাস। সাউথ ইস্ট ব্যাংকে ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৪ টি এলসির মাধ্যমে ৪টি জাহাজ ক্রয়ে এমনই ১৩৫ কোটি ৮০ লাখ ৪০ হাজার ২৮৮ টাকার এলটিআর সুবিধা নিয়েছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান  রাইজিং স্টিল মিলস লিমিটেড।

কথা ছিল জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে জাহাজ কেটে ৪ মাসের মধ্যে এই ঋণ শোধ দেবেন। কিন্ত ৪ মাস নয়, ৪ বছর বা চার দুই গুণে আট বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঋণ শোধ হয়নি। সুদসহ যা দাড়িয়েছে ২৩৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা।  

নগরীর হালিশহর থানায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ মামলায় আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী জমিলা নাজনীন মাওলাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। ২০০৮ সালে দায়ের করা এই মামলায় ২ নং আসামি তিনি। এতদিন এই মামলায় জামিনে ছিলেন।
সোমবার (০৮ অক্টোবর) মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ১ এর বিচারক আকবর হোসেন মৃধার আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানো আদেশ দেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট ফখরুদ্দীন চৌধুরী বলেন, রাইজিং স্টিল মিলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান জমিলা নাজনীন মওলার বিরুদ্ধে ২০১০ সালে সাইথ ইস্ট ব্যাংকের থেকে ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন দুর্নীতি দমন কমিশন। এই মামলায় তিনি এতদিন জামিনে ছিলেন। সোমবার জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ায় আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত তার আবেদন নাকচ করে দিয়ে আসামিকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসলাম চৌধুরীসহ আসামিরা সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের হালিশহর শাখা থেকে ২০১০ ও ২০১২ সালে এলসি খুলে এলটিআর ফ্যাসিলিটি ঋণ বাবদ ১৫২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ঋণ নেন। পরবর্তীতে সুদসহ ঋণের অনাদায়ী ২৩৭ কোটি ৫২ লাখ টাকার মধ্যে ৮৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। অবশিষ্ট ১৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা পরিশোধ না করে ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করে আত্মসাৎ করেন।

এছাড়া এই মামলায় অন্য দুই আসামিকে পলাতক হিসেবে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। দুদকের পিপি কাজী সানোয়ার আহমেদ লাভলু বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় রাইজিং স্টিল মিলসের চেয়ারম্যান জমিলা নাজনীন মওলাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

মামলায় আসামিরা হলেন, আমজাদ হোসেন চৌধুরী, জামিলা নাজনীন মাওলা, মোঃ জসিম উদ্দিন চৌধুরী, আসলাম চৌধুরী, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল আলম, সাউথ ইস্ট ব্যাংক হালিশহর শাখার ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রাহমান সাব্বির।

এই মামলায় আসলাম আসলাম চৌধুরী ব্যাংকের প্রদত্ত ঋণের জিম্মাদার ছিলেন। তিনি বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে থাকলেও এই মামলায় জামিনে রয়েছেন। তার স্ত্রী রাইজিং স্টিল মিলস লি. এর চেয়ারম্যান জামিলা নাজনীন মাওলা এই মামলায় উচ্চ আদালতের জামিন লাভ করেন। উচ্চ আদালতের জামিনের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে কোর্ট তাদের ১২ সপ্তাহের জামিন দেন এবং এই সময় শেষে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।

১২ সপ্তাহ সময় শেষে তিনি নিম্ম আদালতে আত্মসমর্পণ করে চার্জশীট পর্যন্ত জামিন লাভ করেন। মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ জুলাই আদালতে চার্জশীট দেওয়া হয়। চার্জশীটে দুই ব্যাংকারকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে অন্য চার আসামিকে অভিযুক্ত করা হয়।

এদিকে  আগ্রাসী থাবায় বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া বেশিরভাগ এলটিআরেরই পাওনা অর্থ আদায় হচ্ছে না, খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের হাতে যথেষ্ট জামানতও নেই যে, তা আটকে টাকা আদায় করবে। ফলে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়া এলটিআরের মেয়াদ বার বার বাড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে বিধিবহির্ভূতভাবে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করে খেলাপি ঠেকানো হচ্ছে। এসব ঋণের বিপরীতে কোনো সুদ পরিশোধ না করায় বাস্তবে কোনো আয় হচ্ছে না। অথচ ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে ব্যাংকগুলো কাগুজে সুদ আয় দেখাচ্ছে।

গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট এলটিআর বা টিআরের (ট্রাস্ট রিসিপ্ট) পরিমাণ ৫২ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা মোট ঋণের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে বড় অঙ্কের এলটিআরের অর্ধেকেরও বেশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধিত হচ্ছে না। ফলে এগুলো মেয়াদি ঋণে রূপান্তরিত হচ্ছে। মোট এলটিআরের প্রায় ৫২ শতাংশ মেয়াদি ঋণে পরিণত হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক আগে নিয়মিত এলটিআর মনিটর করত না। কিন্তু সম্প্রতি এর পরিমাণ এবং জালিয়াতির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তদারকি শুরু করেছে। কিন্তু এর আগেই যেসব এলটিআর দেওয়া হয়েছে, সেগুলোই এখন মহামারী রূপ নিয়েছে।

উল্লেখ্য, এলটিআর বা টিআর হচ্ছে নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়ীদের স্বল্প সময়ের জন্য দ্রুত ছাড় করার জন্য ব্যাংকগুলোর এক ধরনের ঋণের উপকরণ। ব্যাংকের কাছে খুব বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীদের পণ্য আমদানি, কেনাকাটা বা ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে ৯০ থেকে ১২০ দিনের জন্য এ ঋণ দিয়ে থাকে। এর বিপরীতে উল্লেখযোগ্য কোনো জামানত দিতে হয় না। ব্যবসায়ীর সুবিধার জন্য ঋণটি ছাড় করা হয় খুব দ্রুত। এতে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিকতারও প্রয়োজন পড়ে না।

যে কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে এ ঋণের চাহিদা তুঙ্গে। ব্যবসায়ীদের ব্যক্তিগত, করপোরেট গ্যারান্টি, এফডিআর, আগাম চেক, ব্যাক টু ব্যাক এলসি, আমদানি করা পণ্য গুদামে বন্ধক রেখে এসব ঋণ দেওয়া হয়। পণ্য আমদানির পর বা পণ্য রপ্তানির পর তা বিক্রি করে ব্যাংকের দেনা শোধ করার সুযোগ রয়েছে এলটিআর বা টিআরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ সুযোগের অপব্যবহার করে কয়েকটি বড় শিল্প গ্রুপ এবং দুর্নীতিবাজ ব্যাংক কর্মকর্তা বড় ধরনের জালিয়াতি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামকেন্দ্রিক কয়েকটি শিল্পগ্রুপও রয়েছে।