শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার যত রোগ

প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ০৮ অক্টোবর ২০১৮ সোমবার, ০৯:১৪ পিএম

খালেদা জিয়ার যত রোগ

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাঁ হাত বাঁকা হয়ে গেছে, তিনি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (গিঁটে গিঁটে ব্যথা বা বাত) রোগে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরী।

৮ অক্টোবর, সোমবার দুপুরে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের ৪ সদস্য তাকে দেখতে যান। পরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান আব্দুল জলিল চৌধুরী।

আব্দুল জলিল চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। তিনি ব্যথাজনিত নানা সমস্যায় ভুগছেন। খালেদা জিয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (গিঁটে গিঁটে ব্যথা বা বাত) রোগে আক্রান্ত। ওনার বাঁ হাত বাঁকা হয়ে গেছে, হাত তুলতে পারছেন না। এ ছাড়া ঘাড়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, বাঁ উরুর জয়েন্টে ব্যথা ও বাঁ হাঁটু ফুলে গেছে।’

‘তার (খালেদা) উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে নেই। তার সুষ্ঠু চিকিৎসায় যে উচ্চমাত্রার ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে, তা করার আগে হার্ট, কিডনি, লাঞ্চসহ বেশ কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কোনো ধরনের ইনফেকশন আছে কি না, তা জানতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে’, যোগ করেন জলিল।

এসময় খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের আরেক সদস্য বিএসএমএমইউয়ের রিউমেটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, খালেদা জিয়ার বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ন্ত্রণে এনে মূল চিকিৎসায় যেতে কতদিন লাগবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে সবকিছু ঠিকঠাক হলে হয়তো দুই সপ্তাহের মধ্যে খালেদা জিয়ার মূল চিকিৎসায় যাওয়া সম্ভব হবে।সংবাদ সম্মেলনে ডা. জলিল ও ডা. আতিকুল ছাড়াও খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ডের আরও দুই সদস্য কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তানজিমা পারভীন ও ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেছা আহমেদ এবং বিএসএমএমইউ পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে ডা. আব্দুল জলিল বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে ‘রিউমেটিক আর্থ্রাইটিসে’ ভুগছেন। বাংলায় একে বলে গেঁটে বাত। তিনি এর জন্য ওষুধ খাচ্ছিলেন। কিন্তু ওষুধের ডোজ হোক বা যেকোনো কারণেই হোক, তার শরীরে এ সংক্রান্ত কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। তার বাম হাত বাঁকা হয়ে গিয়েছে, হাত তুলতে পারছেন না। বাম কাঁধ নাড়াতে পারেন না, যাকে ‘ফ্রোজেন শোল্ডার’ বলা হয়। এরই ফলে তার হাত ঝিমঝিম করছে, কিছু রগে চাপ পড়ছে এবং কিছু নিউরো সিম্পটমও ডেভেলপ করেছে। আরও অনেক বয়স্ক মানুষের মতো তারও ঘাড়ে ব্যথা রয়েছে, কোমরে ব্যথা রয়েছে, লেফট হিপ জয়েন্টেও ব্যথা রয়েছে। এগুলোই তার প্রধান অসুস্থতা।

ডা. জলিল বলেন, খালেদা জিয়ার দু’টি হাঁটুই প্রতিস্থাপন করা। তিনি ভালোই ছিলেন, হাঁটতেও পারছিলেন। কিন্তু মাঝে হাঁটু ফুলে গিয়েছিল, তার চিকিৎসাও বোধহয় হয়েছিল। এছাড়া উনি কিন্তু ২০ বছর ধরে ডায়াবেটিক রোগী। এর জন্য মুখে ওষুধ খাচ্ছেন। বোধহয় ইনসুলিন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি নেননি। মাঝখানে তার রক্তে সুগারও কমে গিয়েছিল। এখন তার ডায়াবেটিসটা নিয়ন্ত্রণে কি না, তা দেখতে হবে আমাদের।

খালেদা জিয়া রক্তচাপেও ভুগছেন বলে জানান তার মেডিকেল বোর্ডের প্রধান এই চিকিৎসক। আরও জানান, খালেদা জিয়ার সোডিয়াম কমে যাচ্ছিল, শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার লক্ষণও রয়েছে।
‘রিউমেটিক আর্থ্রাইটিস’জাতীয় রোগের চিকিৎসা করাতে গেলে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয় জানিয়ে ডা. জলিল বলেন, বিষয়টা এমন না যে দু’টি ওষুধ দিলেই তিনি ভালো হয়ে যাবেন। তাকে বিষদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তার কিডনি, লিভারের সমস্যা রয়েছে কি না, হার্টের সমস্যা রয়েছে কি না, এগুলোও দেখতে হবে। আবার আমরা যে আধুনিক বা উন্নত চিকিৎসা দেবো, সে ওষুধ প্রয়োগ করার আগে এটাও দেখা দরকার যে তিনি সেসব ওষুধ নিতে পারবেন কি না।

মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছে কি না— জানতে চাইলে ডা. জলিল বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা নিজেরা একসঙ্গে বসি, আলোচনা করি। বোর্ড একসঙ্গে দেখিনি তাকে। প্রথমদিন আমি তাকে দেখেছি, গতকাল রাতে ডা. সৈয়দ আতিকুল হক তাকে দেখেছেন। আমাদের পক্ষে তার ওখানে দু’জন চিকিৎসককে নিয়োগ করা হয়েছে, যারা তার পুরো হিস্ট্রি নিয়ে আমাদের রিপোর্ট তৈরি করেন। গতকাল রাতে তারা এ বিষয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু পুরোটা শেষ করতে পারেননি। আজ রাতে আবার দেখবেন।

কতদিন বেগম খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে থাকতে হতে পারে বলে মনে করছেন— জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, এটা সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তিনি তো এখন কারাবন্দি। হয়তো কিছু কিছু পরীক্ষার জন্য আমাদের কারাকর্তৃপক্ষের অনুমতিরও দরকার হবে। সবকিছু যদি স্মুথলিও ফ্লো করে, তাহলেও টাইমটা বলা মুশকিল। কারণ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না এলে হয়তো চিকিৎসাটা দেওয়া যাবে না। মূল চিকিৎসার আগে শারীরিক জটিলতাগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে কতদিন লাগবে, সেটার ওপরই আসলে নির্ভর করবে সবকিছু। আর সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে কতদিন লাগবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।

তবে  মঙ্গলবার (৯ অক্টোবর) থেকেই ফিজিওথেরাপি দেওয়ার কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন, তিনি পছন্দমতো ফিজিওথেরাপিস্ট ও গাইকোনোলজিস্ট নিতে চান। এ বিষয়ে তিনি কিছু বলেছেন কি না— এ প্রশ্নের জবাবে চাইলে ডা. আতিকুল বলেন, আমাদের সঙ্গে তো তার দেখা হয়নি এখনও। তবে এটা সেকেন্ডারি বিষয়। আগে তার আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা দিতে হবে।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার সময় তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মামুন সঙ্গে ছিলেন কি না— জানতে চাইলে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, তিনি (ডা. মামুন) আমার সঙ্গে রাতে ছিলেন।

খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিতে অনীহা দেখালে কিংবা অন্য কোথাও যেতে চাইলে কোনো সুপারিশ থাকবে কি না— এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. জলিল বলেন, এটা এখনও বলার সময় আসেনি। তিনি কী বলবেন বা বলবেন না, সেটা তো আমরা এখনও জানি না।

ব্রিফিংয়ে মেডিকেল বোর্ড জানায়, খালেদা জিয়ার কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে। এর বেশির ভাগই বহু আগে থেকেই ছিল। তারা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। রিপোর্ট পেলে চিকিৎসা দেওয়া হবে।