শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

ছাত্রলীগ নেতা দিদার হত্যা মামলায় ৩ গলদ !

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার, ১১:৩৯ পিএম

ছাত্রলীগ নেতা দিদার হত্যা মামলায় ৩ গলদ !

চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার ইস্পাহানি মোড়ে কলেজ ছাত্র দিদারুল ইসলাম খুনের ঘটনায় ৩০ জনকে আসামি করে মামলা দায়েরের পর অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। হত্যাকান্ডের পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে খুলশি থানায় যে মামলা হয়েছে তাতে অন্তত তিনটি সমীকরণে এখনও মেলাতে পারেনি পুলিশ।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ও আওয়ামীলীগের মহানগর রাজনীতি ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র বলছে, এই মামলার গোড়ায় গলদ রয়েছে। যে কারণে হত্যাকান্ডে জড়িত কারা পুলিশের সামনে তা মোটামুটি পরিষ্কার হলেও এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।

সূত্র জানায়, লালখান বাজার একটি মসজিদ , মসজিদ পরিচালিত মার্কেট ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র এই ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে। মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও মার্কেট ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে আগের কমিটির বিরুদ্ধে তৎপর ছিলেন সেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবুল হাসনাত বেলাল। সম্প্রতি নতুন মসজিদ কমিটি হয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয় দু’টি গ্রুপের মধ্যে রেষারেষি চরমে উঠেছিল।

সংঘর্ষে জড়ানো একটি পক্ষ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম এবং স্থানীয় কাউন্সিলর এএফ কবির মানিকের অনুসারী হিসাবে পরিচিত। অপর পক্ষ চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবুল হাসনাত বেলালের অনুসারী হিসাবে ধরা হচ্ছে। আবার মহানগর রাজনীতিতে এই দু’টি পক্ষের একটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনের অনুসারী ও অপর পক্ষ  প্রয়াত সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা জ্যেষ্ঠপুত্র ও কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন।

এদিকে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে লালখান বাজারে স্থানীয় দু’টি পক্ষ বার বার বিবাদ ও সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগ নেতা দিদার হত্যার ঘটনায় ৩০জনকে আসামি করে যে মামলা হয়েছে একটি পক্ষ তা প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রটি এ মামলায় অন্তত তিনটি গলদ চিহ্নিত করেছেন।

সেগুলো হলো, প্রথমত-মামলায সেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবুল হাসনাত বেলালকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।অথচ বিভিন্ন সূত্র বলছে ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এ সময় তার অবস্থান ছিল ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ১২ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকায়। তাছাড়া বর্তমানে পুলিশের তদন্তের অনেক কিছুই প্রযুক্তি নির্ভর। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আবুল হাসনাত বেলাল আদৌ ঘটনাস্থলে ছিলেন কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়া কঠিন কিছু নয়। আর সেটা প্রমাণিত হলে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে মামলার ভবিষ্যৎ।

দ্বিতীয়ত-মামলায় আসামি সংখ্যা বাড়ানো। প্রাথমিক তদন্তের পর পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে এ হত্যাকান্ডে ৮জন সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ মামলায় আসামি করা হয়েছে ৩০ জনকে। এর মধ্যে কারো কারো এই হত্যাকান্ডে সংশ্লিষ্টতা ছিল না বলে জানা গেছে।

তৃতীয়ত-ছুরিকাঘাতে কলেজ ছাত্র দিদারুল ইসলামের মৃত্যু হযেছে বলে সুরতহাল রিপোর্টে উঠে এসেছে।রিপোর্টে বলা হয়,  নিহত দিদারের মাথায় জখম ও পেটের বাম পাশে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। এছাড়া আহত সালাহউদ্দিন লাভলু বাম পাজরে ছুরিকাহত হয়েছেন।  অথচ এজহারে হত্যকোন্ডের সময় পিস্তল ব্যবহার করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। যা চূড়ান্ত বিচারে যুক্তি তর্কে আসামিদের বাড়তি সুযোগ দেবে বলে আইনজীবীরা মনে করছেন।     

জানা যায়, নিহত দিদার মতিঝর্ণা এলাকায় ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। লাভলুর বাসাও একই এলাকায়।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) বায়েজিদ জোনের সহকারী কমিশনার সোহেল রানা বলেন,  ‘একেবারে তুচ্ছ একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মতিঝর্ণা এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে দিদার ছুরিকাহত হন। হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়েছে।

লালখান বাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা এএফ কবির মানিক ঘটনার জন্য আবুল হাসনাত বেলালকে দায়ী করেন। তিনি  বলেন, ‘আমাদের ছেলেরা মতিঝর্না এলাকায় বসে খোশগল্প করছিলেন এ সময় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবুল হাসনাত বেলালের সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে দিদারের মৃত্যু হয়।’

অভিযোগ অস্বীকার করে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবুল হাসনাত বেলাল  বলেন, ‘দিদার ও লাভলুর মধ্যে যে মারামারি হয়েছে সেটা কোন গ্রুপিংয়ের জন্য নয়। তারা এক সময় এক সাথে ছিলেন কিন্তু সম্প্রতি লাভলু দিদারকে এড়িয়ে চলছিলেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং এর জের ধরে মারামারির ঘটনা ঘটে। একটি পক্ষ ইচ্ছে করেই আমাকে জড়ানোর চেষ্টা করছে।’

একটি সূত্র জানায়,  আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে লালখান বাজার এলাকায় স্থানীয় লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম ও সিটি কলেজের সাবেক জিএস ও মহানগর সেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলালের অনুসারীদের মধ্যে বিবাদ চলে আসছিল। ওই বিরোধকে কেন্দ্র করে এর আগে দুই পক্ষ বেশ কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়িয়েছে।

২৯ সেপ্টেম্বর মারামারিতে জড়িতরা সবাই এক সময়  সুদীপ্ত হত্যা মামলার আসামি জাহেদের গ্রুপ করতো। কিছুদিন আগে ধরা পড়া এই জাহেদ সুদীপ্ত হত্যার ঘটনায় পিস্তল থেকে গুলি ছুঁড়েছিল। এ মামলায় সালাউদ্দিন লাভলুও গ্রেফতার হয়ে জেলে গিয়েছিল। কোরবানের ঈদের চার দিন পর তিনি জামিনে বের হন। এরপর থেকে জাহেদের সাথে দূরত্ব বাড়িয়ে নতুন একটি উপগ্রুপ গঠন করেন এবং নিজেই নেতৃত্ব দিতেন লাভলু। এতে ক্ষিপ্ত ছিল আগের গ্রুপের ছেলেরা।

 ঘটনার দিন দুপুরে সালাউদ্দিন লাভলুসহ অন্যান্যরা মতিঝর্ণা পাহাড়ে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। এসময় দিদার, রনিসহ আরো কয়েকজন গিয়ে তাদের সাথে হাতাহাতিতে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে তারা সালাউদ্দিন লাভলুকে ছুরিকাঘাত করে। এতে সে লুটিয়ে পড়ে। এ খবর পেয়ে লাভলুর বন্ধু-বান্ধবরা সংগঠিত হয়ে হামলা চালায় দিদারের ওপর। তারা লাঠি সোঁটা নিয়ে মারধর করে ও ছুরিকাঘাত করে। এসময় দিদারের এক বন্ধুও আহত হয। খবর পেয়ে পুলিশ এলে তারা পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দিদারকে মৃত ঘোষণা করেন।