মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০

সিইউএফএল বাঁচবে কতদিন

জাহাঙ্গীর আলম, আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)

প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২০ শনিবার, ০৫:২৫ পিএম

সিইউএফএল বাঁচবে কতদিন

কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারা রাঙ্গাদিয়ায় পাশাপাশি দুই সার কারখানা। উৎপাদন ক্ষমতা,গ্যাসের চাহিদা ও প্রতিষ্ঠার সময়কাল প্রায় কাছাকাছি।  বিসিআইসি পরিচালিত রাষ্ট্রায়াত্ত চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকলেও বহুজাতিক মালিকানার কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে (কাফকো) উৎপাদন অনেকটাই স্বাভাবিক। গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটি বা মিঠা পানির স্বল্পতার অজুহাতে বছরের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকায় চরম সংকটকাল পার করছে সরকারি মালিকানার সিইউএফএল। এতে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও বিরাজ করছে উৎকন্ঠা।   

এমন পরিস্থিতিতে বন্ধ কারখানায় এখন চলছে সিবিএ নির্বাচনের ডামাঢোল। আগামী ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে শ্রমিকদের দাবিদাওয়াসহ সবকিছু ছাপিয়ে কারখানা নিরবিচ্ছিন্ন সচল রাখাটাই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ। 

১৯৮৭ সালে আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রায়াত্ত সার কারখানা সিইউএফএল। তখন দেশের ইউরিয়া সারের চাহিদা মেটাতে এই কারখানাটি ছিল অন্যতম ভরসা। পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন সার কারখানা হলেও সিইউএফএলের সেই অর্থে আধুনিকায়ন হয়নি। কারখানাটির নির্মাণকারী জাপানী প্রতিষ্ঠান ২০ বছর মেয়াদ বেঁধে দিলেও পার হয়ে গেছে প্রায় ৩২ বছর। স্থাপনের পর থেকে একনাগাড়ে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সিইউএফএলের  উৎপাদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক ছিল।  ১৯৯৬ থেকে গ্যাস সংকট সিইউএফএল এর জন্য বিপদ ডেকে আনে। বার বার গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসনির্ভর দেশের বৃহত্তম সার কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। এ কারণে ১৯৯৭ থেকে কারখানায় নানা ধরণের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। গত পাঁচ বছরে কারখানাটি চালু ছিল মাত্রা ১১ মাস। সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর গ্যাস পাওয়ার পরে ৯ সেপ্টেম্বর উৎপাদনে গেলেও দুই সপ্তাহ না যেতেই যান্ত্রিক সমস্যায় আবার বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি। অথচ সিইউএফএলের পাশেই অবস্থিত বাংলাদেশ, জাপান, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডের যৌথ মালিকানার সারকারখানাটি কোন রকম সমস্যা ছাড়াই উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।

কারখানা সূত্রে জানা যায়, সব কিছু সচল থাকলে এ কারখানায় দৈনিক ১৭০০ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হওয়ার কথা । কারখানাটির বার্ষিক ৫ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ও ৩ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর মিঠা পানি নির্ভর এ কারখানা চালু রাখতে হলে ঘণ্টায় ৮০০ মেট্রিক টন করে দৈনিক ১৯ হাজার ২০০ মেট্রিক টন মিঠা পানির প্রয়োজন হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কর্ণফুলী নদীতে পানির লবণাক্ততা বেড়ে গেলে চাহিদামতো পানি নেওয়া সম্ভব হয় না। তখন উৎপাদন বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া গ্যাস সংকটের বিষয়টি তো রয়েছেই।  বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহের অজুহাতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল এই কারখানার উৎপাদন। দীর্ঘদিন বন্ধের পর চলতি বছর ২৩ জানুয়ারী উৎপাদন শুরু হলেও ১৮ মার্চ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ৩ এপ্রিল শুরু হয়ে পরের দিন ৪ এপ্রিল বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ জুন আবার শুরু হলে ৭ জুলাই পুনরায় বন্ধ হয়ে পড়ে। সর্ব শেষ গত ১ সেপ্টেম্বর গ্যাস পাওয়ার পরে ৯ সেপ্টেম্বর উৎপাদন শুরু হয়। দুই সপ্তাহ না যেতেই কারখানার রিঅ্যাক্টর নষ্ট হলে আবারও বন্ধ হয়ে যায়।  সংশ্লিষ্টরা জানান, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানার পাইপলাইন, বয়লার, রিয়েক্টর ও কনভেয়ার বেল্টসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতিতে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে সারাক্ষণ মেরামতের কাজ করতে হয়।

বেসরকারি সার কারখানাগুলো ঠিকমত চললেও রাষ্ট্রায়াত্ত সিইউএফএল বার বার বন্ধ কেন এই প্রশ্নের উত্তর নেই কারো কাছে।  এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় সিবিএ নির্বাচনেও এটি হয়ে উঠেছে মূল এজেন্ডা। প্রার্থীরাও বলছেন নির্বাচিত হলে কারখানা সচল রাখাটাই হবে মূল লক্ষ্য । 

সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, সিবিএ‘র উচ্চকন্ঠ না থাকায় সিইউএফএলে বার বার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে তা অন্য জায়গায় দেওয়া হচ্ছে। সিবিএ নেতাদের অদক্ষতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাই এজন্য দায়ি।  বিভিন্ন সময় উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন-ভাতাও বন্ধ থাকে। এ কারণে শ্রমিক-কর্মচারিরা কারখানা নিরবিচ্ছিন্ন চালু রাখতে সক্ষম এমন নেতৃত্বই দেখতে চান বলে জানান ।

সিইউএফএল সিবিএ’র বর্তমান সহ-সম্পাদক মো. ইমরান খান বলেন, নিরবিচ্ছিন্ন  উৎপাদনই বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে যদি পূণরায় জয়ী হরে শ্রমিকদের দাবি দাওয়া প্রতিষ্টার পাশাপাশি কারখানা সার্বক্ষণিক সচল রাখার দাবি জোরালো করা হবে।  তিনি বলেন, সিইউএফএল কারখানায় উৎপাদিত সার দেশের কৃষি সেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।  এই সার বিসিআইসির ডিলারদের মাধ্যমে দেশের ২৫টি জেলায় সরবরাহ করা হয়। জাতীয় স্বার্থে সিইউএফএলকে রক্ষা করতে হবে।
সিবিএ’র সভাপতি পদপ্রার্থী মো.আবুল বশর জানান, নির্বাচনে জয়ী হলে বন্ধ কারখানা সচল ও কারখানার অনিয়ম প্রতিরোধে শ্রমিকদের সাথে নিয়ে কাজ করব।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীন এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রহিম জানান, বিভিন্ন সমস্যার কারণে সেপ্টেম্বরে উৎপাদনে গিয়েও আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদি সব কিছু ঠিক থাকে আগামী সোমবার থেকে আবারও উৎপাদন শুরু হবে। এতে করে দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদন করা সম্ভব হবে।