মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০

করোনার দুর্দিনে নিবেদিত তরফদার রুহুল আমিন

ইসমত মর্জিদা ইতি

প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০২০ সোমবার, ০৮:৫৬ পিএম

করোনার দুর্দিনে নিবেদিত তরফদার রুহুল আমিন

তরফদার রুহল আমিন। একজন সফল ব্যবসায়ী। ক্রীড়ানুরাগী।  জাতির দুংসময় এই করোনাকালের দূর্যোগ মহূর্তে মানুষের পাশে ছিলেন সবসময়। করোনাকালেও শ্রমিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন।  বিতরণ করছেন ত্রান সামগ্রী।

তরফদার রুহল আমিন সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব এবং বাংলাদেশ ফুটবল ক্লাবস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফসিএ) সভাপতি।

প্রিমিয়ার ফুটবল লিগের দুটি ক্লাব সাইফ স্পোর্টিং ও চট্টগ্রাম আবাহনীর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত সরাসরি সম্পৃক্ত তিনি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েও করোনাকালে ফুটবল অনুরাগীদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

সাইফ পাওয়ারটেক সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে তারা শ্রমিকদের জন্য দুই স্তরের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। এর বাইরে যশোরের সদর উপজেলার ফতেহপুরে তার নিজ গ্রাম এবং গাজীপুরে শ্বশুর বাড়িতেও মানবিক সহায়তা করেছেন তরফদার রুহুল আমিন।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দেশের ৬৪টি জেলার ২৩৯ কোচ এবং সাবেক-বর্তমান মিলিয়ে ১৮২০ জন ফুটবলারকে আর্থিক সহায়তা করেন এই ক্রীড়াপ্রেমী। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও জনকল্যাণ তহবিলে ২ কোটি টাকা প্রদান করেন তিনি। এদিকে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকেই সাইফ পাওয়ার টেক বিভিন্নভাবে করোনা মোকাবেলায় ভূমিকা পালন করে আসছেন।

গত ১৭ জুলাই শুক্রবার বন্দরের শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশকে (সিএমপি) ২৫ সেট অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম দিয়েছে। সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমানের হাতে এসব চিকিৎসা উপকরণ তুলে দেন সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার মো. রুহুল আমিন।

১৪ জুন দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের করোনা ইউনিটের জন্য ৪টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও ৪টি ভেন্টিলেটর দিয়েছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। চট্টগ্রাম  বন্দর ভবনের বোর্ড রুমে  চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম আবুল কালাম আজাদের হাতে এসব জরুরী  চিকিৎসা সরঞ্জাম তুলে দেয়া হয়।

এর আগেও করোনার ভাইরাসের মহামারি ক্রান্তিকালে  দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর কেন্দ্রীক গুরুত্বপূর্ণ  ভুমিকা পালন করছে শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটর ‘সাইফ পাওযারটেক লিমিটেড’।

মহামারী নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে গত ১৬ এপ্রিল দুই কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। ২ কোটি টাকার মধ্যে ৬৫ লাখ টাকা কোম্পানির কর্মীদের বেতন থেকে এবং বাকি টাকা কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে দেয়া হয়েছে।

গত ১২ মে চট্টগ্রাম বন্দরকে ৫০০টি তিন লেয়ারের সার্জিক্যাল মাস্ক, রাবার গ্লাভস ২০০টি, রিইউজেবল ও ওয়াশেবল পিপিই ২৫টি, মেডিক্যাল প্রটেকটিভ আই ওয়্যার গগলস ২৫টি এবং ৫টি ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দেয় প্রতিষ্ঠানটি। 

জানা গেছে, এই করোনাকালীন সময়ে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড বন্দরে কনটেইনার লোড-আনলোড স্বাভাবিক রাখা প্রায় ২ হাজার শ্রমিককে ত্রাণসামগ্রী প্রদান করেছে।

এ প্রসঙ্গে তরফদার মো. রুহুল আমিন বলেন, করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া  পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে আমাদের শ্রমিকদের খাদ্য, পরিবহন সুবিধাসহ করোনা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষার নানা উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায়  প্রশাসনের সহযোগিতায়  ত্রাণ কার্যক্রম চালু রেখেছি।  ফুটবলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোচ ও খেলোয়াড়দের অনুদান দিয়েছি।

এভাবেই গতিশীল ছিল করোনা প্রতিরোধে সাইফ পাওয়ার টেকের বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিনের আরেক পরিচয় তিনি চট্টগ্রাম চেম্বারের সহ-সভাপতি।
করোনার চাহিদাকে পুঁজি করে চট্টগ্রামের কতিপয় সিন্ডিকেট অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বলে অভিযোগ রয়েছে । চট্টগ্রামে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের অক্সিজেন পেতে চরম সংকটের পড়তে হয়েছে। এ অবস্থায় নিজ উদ্যোগে ১০০ সিলিন্ডার দিয়ে প্রদান করেন তরফদার রুহুল আমিন। প্রতিটি গ্যাসভর্তি অক্সিজেন সিলিন্ডারের সঙ্গে ট্রলি, ক্যানোলা, মাস্ক, রেগুলেটর, ফ্লো মিটার ছিল।

গত ১৩ জুন শুক্রবার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদকে এই সিলিন্ডার দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক চিঠি হস্তান্তর করেন চট্টগ্রাম বন্দরের শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনুষ্ঠানে এ সময় উপস্থিত ছিলেন তথ্য মন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আজম নাছির উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন।

অনুষ্ঠানে  তরফদার রুহুল আমিন জানান, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অক্সিজেন সংকটের খবর পড়ে আমি নিজে এসে এই সিলিন্ডার তুলে দিয়েছি। এটা লোক দেখানো কোন কাজ নয়, মানবিকতা। করোনা সংকটে বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এটি অব্যাহত থাকবে। আর কিছু না হোক বিপদে পড়া মানুষগুলোর পরিবারের দোয়া তো পাবো।

দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে গত রমজানে সিসিটি ও এনসিটিতে করোনা প্রতিরোধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত ধোয়া, নিয়মিত জ্বর পরীক্ষা, মাস্ক, গ্ল্যাভস, পিপিই পরা, জীবাণুনাশক ছিটানো, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় নিজস্ব বাসের ব্যবস্থা ও অস্থায়ী কর্মীদের ত্রাণ বিতরণসহ নানা উদ্যোগের সাথে জড়িত ছিল সাইফ পাওয়ারটেক।

যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর গ্রামের ৭১০টি পরিবারকে গত মে মাসের ৪ ও ৫ তারিখে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। এছাড়াও দেশের ৬৪টি জেলার আর্থিকভাবে দুর্বল ১৯৪ জন কোচকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নগদ অর্থ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন। এর পরেও  ১৫৫ জন কোচ ও সাবেক খেলোয়াড়কে নগদ অর্থ সহায়তা  প্রদান করেছেন  ক্রীড়াপ্রেমী এই ফুটবল সংগঠক।

তরফদার রুহুল আমিন আরও বলেন. আজকে মানুষের দোয়া, আমি, আমার প্রতিষ্ঠানের  অক্লান্ত পরিশ্রমে সাইফ পাওয়ার টেক আজ বন্দরের শীর্ষ টার্মিনাল অপারেটর হিসেবে কাজ পরিচালনা করছে। সাইফ পাওয়ার টেক সবসময়ই তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এসেছে। নিশ্চিত করছে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা।

তিনি আরও বলেন, গত রমজানে করোনাভাইরাস প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় এনসিটি ও সিসিটির কর্মীদের নগরের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে আনা-নেওয়া করতে তিনটি বাসের ব্যবস্থা করেছি আমরা। একটি বাস কাঠগড়, একটি বহদ্দারহাট এবং অপরটি অলংকার থেকে আমাদের শ্রমিকদের আনা-নেওয়া করছে। আমাদের কর্মীদের হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্কসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় উপকরণাদি সরবরাহ করেছি। সবার জ্বর পরীক্ষা করে ইয়ার্ডে ঢোকাচ্ছি। নিজস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থা করেছি। সার্বক্ষণিক মনিটরিং টিম গঠন করেছি। উন্নত নাশতা সরবরাহ, শ্রমিকদের প্রণোদনাসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এর ফলে আমাদের অধীন টার্মিনালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

নিজে ঢাকা থেকে এসে বিভিন্ন সময়ে বন্দরের তার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম তিনি নিজে মনিটরিং করেছেন।

এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি ফুটবল সংগঠক হিসেবে সে জগতের চিন্তাও তার মাথায় ছিল সবসময়।  কোচ-খেলোয়াড়দের আয়ের অন্যতম বড় একটি মাধ্যম ফুটবল হওয়োয় মাঠের খেলা বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগারে প্রভাব পড়েছে। সংকটময় সময় পার করছেন তৃণমূল ফুটবল ফুটবলের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং স্বল্প বেতনের কোচরা। এমন দুর্দিনে স্বল্প আয়ের  কোচদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন তিনি। বিডিডিএফএ এবং বিএফসিএ ‘ডিজেস্টার সার্পোট ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসিসটেন্স প্রোগ্রাম’’- এর আওতায় অস্বচ্ছল কোচদের সহায়তায় কাজ করবে।

দেশের অসুস্থ ও স্বল্প আয়ের কোচদের পাশে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে ইতিপূর্বে এক ভিডিও বার্তায় তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘এই মুহূর্তে আপনারা জানেন যে ফুটবলের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ আছে এবং স্বাভাবিকভাবেই এর কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। আপনারা এও জানেন যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনাকে যেভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে এবং উনি সকলকে আহ্বান করেছেন যার যতটুকু সামর্থ্য আছে দুস্থ, অস্বচ্ছল জনগণের পাশে দাঁড়াতে। এই সমস্ত  বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে  আমরা অসচ্ছল ও অসুস্থ কোচদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছি’।

তিনি নারায়ণগঞ্জের রাজমিস্ত্রি সহকারি আরিফ হাওলাদার, ফরিদপুরের ঝাড়ুদার রিপন কুমার দাস এবং খুলনার ইজিবাইক চালক মো. হাসান আল মামুনের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।  মাস পাঁচেক আগেও আরিফ, রিপন, মামুনরা ছিলেন ফুটবলার। বল পায়ে মাঠ দাঁপিয়ে বেড়াতেন। করোনা তাদের ভাগ্যে নতুন পরিচয় লিখে দিয়েছে। আর্থিক অসচ্ছলতায় কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউবা দিনমজুরের কাজ বেছে নিয়েছেন। আরিফ, মামুন, রিপনদের দুঃখ ছুঁয়ে গেছে এ সংগঠককে। প্রত্যেককে প্রদান করেছেন ৫০ হাজার টাকা।                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                  

এভাবেই করোনা মহামারিতেও ফুটবলে বন্ধুর হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তরফদার মো. রুহুল আমিন। মানবিকতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন, মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। যে কাজটি দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা বাফুফের করার কথা, সেই কাজটিই করে যাচ্ছেন ফুটবল সংগঠক রুহুল আমিন।

নিজের কাজের প্রতি আস্থা ও এত কর্মস্পৃহ হওয়ার পিছনে কোন শক্তি কাজ করে এ প্রশ্নের জবাবে তরফদার রুহুল আমিন এটাই বলেন, এই পৃথিবীতে সবার সব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ মিলে না। পরম করুণাময়ের রহমতে তিনি সেই সুযোগটা সবসময়ই পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, একটা প্রতিষ্ঠান চালাতে বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। একজন প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে মাস শেষে সব কর্মীর বেতন প্রদানের চিন্তা তার মাথায় থাকে। করোনাকালে ব্যবসায় মন্দা থাকলেও তিনি তার প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর বেতন সুনিশ্চিত করেছেন। ঈদে বোনাস দিয়েছেন। সবসময় কর্মীদের খবর নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, আমি নিজেকে কখনোই কখনোই প্রতিষ্ঠান প্রধান মনে করে অহংবোধে ভুগি না। আমি মনে করি আমার প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মী আমার প্রতিষ্ঠানের মালিক। মনে করি আমিও এ প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী। আমি জানি কাজ শেষে সব কর্মীই রাতে নিশ্চিত ঘুমাতে যায়। কিন্তু করোনাকালে কত রাত আমাকে দুংশ্চিন্তায় কাটাতে হয়েছে তা আমি জানি। তারপরও আমি আমার সব সামর্থ্য দিয়ে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। আমি জানি টাকা পয়সাার চেয়ে বড় শক্তি মানুষের দোয়া। আর এ দোয়া আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।