সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০

আইসিইউতে গল্পের বইও পড়েন ডা. জাফরুল্লাহ !

সারাবেলা প্রতিবেদন

প্রকাশিত: ১১ জুন ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৯:২৩ পিএম

আইসিইউতে গল্পের বইও পড়েন ডা. জাফরুল্লাহ !

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ফুসফুসের নিউমোনিয়ার ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। একইসঙ্গে তাকে দেওয়া অক্সিজেনের মাত্রাও কমছে।

বৃহস্পতিবার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের চিকিৎসক ব্রিগেডিয়ার অধ্যাপক ডা. মামুন মুস্তাফি এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস, পরিমিত অ্যান্টিবায়োটিক ও বিশেষায়িত ফিজিও থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ছেন এবং সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।’

এর আগে, গত ৪ জুন যখন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কিডনি ডায়ালাইসিস শুরু হয়, সে সময় শারীরিক অবস্থার কারণে ডায়ালাইসিস সম্পন্ন করা যায়নি। যে কারণে তার শারীরিক অবস্থার ‘একটু অবনতি’ হয়। ওইদিন তার শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল।

এদিকে আইসিইউতে থাকলেও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মনোবল বেশ শক্ত আছে বলে জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সায়িদ জামান। আইসিইউতে গত মঙ্গলবার (৯জুন) রাতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লিখেন, যৌক্তিক কারণ ছাড়া উনাকে কোন ওষুধ দেয়া বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা ভীষন দুরহ একটা কাজ। আর নতুন কোন ওষুধ প্রয়োগ করতে চাইলে অবশ্যই টেক্সট বইয়ের রেফারেন্স দেখাতে হয়। উনার এই অভ্যেসটা দীর্ঘ বহু বছরের।

এই সময়ে আইসিইউতে শরীর একটিু ভালো লাগলে পড়ছেন হুমাযুন আহমেদের গল্পসমগ্র। ডা. জাফরুল্লাহ এর মধ্যে ১১৮৩ পৃষ্টার এই বইয়ের এক তৃতীয়াংশ পড়া শেষ করে ফেলেছেন বলেও জানান তিনি।

পড়ুন ডা.সায়িদ জামানের লেখা আইসিইউর অভিজ্ঞতা

আমি তখন ICU-তে...

রাত ৮টা বেজে ৪ মিনিট। জাফর ভাইকে ফলোআপ দিয়ে সিস্টারদের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছি। ফোনটা বেজে উঠলো ঠিক সেই সময়। ইদানিং ফোন বাজলেই বুকের ভিতরে ধুকধুকানি বেড়ে যায়। দেখি মেডিকেল কলেজের বন্ধু টিটুলের ফোন। ফোন ধরে পরিবেশ আর পরিস্থিতির কারণে নিচু স্বরে বললাম,

- কি রে টিটুল, খবর কি?
- এমনি ফোন দিছি। তুই কেমন আছিস?
- ভালো আছি। তুই?
- আছি মোটামুটি। তুই কই ?
- আমি আইসিইউতে...
- কেন কি হইছে? তোর গলা এমন শুনাচ্ছে কেন? আমি তোর কথা ভালো মতন বুঝতে পারছি না। তুই ঠিক আছিস তো? টিটুলের কন্ঠে উৎকন্ঠা।

ততক্ষণে আমার মনে হলো আমি ডাবল মাস্ক, সানগ্লাস আর ফেসকাভার পড়ে কথা বলছি।পরিপূর্ণ পিপিই এমন একটা পোষাক যা পড়ে হাটাচলা করা গেলেও কথা বলতে এবং কথা শুনতে খুব অসুবিধা হয়। যদিও ইশারা বা কাগজে লিখে এই অসুবিধা দূর করা যায় কিন্তু চশমায় ভ্যাপার জমার কারণে দেখতে যে সমস্যা হয় তা নিয়ে বিপদে থাকতে হয় সারাক্ষণ। আমি টিটুলের দুর্ভাবনার কারণ বুঝতে পেরে আইসিইউয়ের পাশের রূমে গিয়ে পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম। টিটুল এবার কিছুটা আশ্বস্থ হয়ে বললো,

- জাফর স্যার কেমন আছেন?

প্রশ্নটা সমগ্র দেশবাসীর জন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ। করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার আজ উনার ১৭তম দিন আর আমি গত ৫দিন স্যারের চিকিৎসায় জড়িত। এর আগের পোস্টে লিখেছিলাম ইকো করে দেখেছি হার্ট একদম খারাপ কাজ করছে না (LVEF 66%), যদিও পুরানো হার্ট এটাকের চিহ্ন আছে স্পষ্ট। উনার বুকের এক্সরে খারাপ তবে আজ সর্বশেষ এক্সরে দেখে আমাদের মুখের মেঘ কিছুটা সরে গেছে মানে এক্সরে ভালোর দিকে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে তিনি এখন বিপদমুক্ত।

গত পড়শু আগের রাতের কথা।

বাসায় ফিরেছি ১০টায় পর। ডিনার শেষ করতে করতে রাত ১২টারও বেশি। তখনই এলো হাসপাতাল থেকে কলটা। মধ্যরাতের যে কোন কল মানেই আতংক। শুনলাম জাফর ভাইয়ের হার্টরেট একবার বাড়ছে, আবার কমছে। তিনি আমাকে ডাকছেন। হার্টের এমন উপসর্গ ভয়ংকর মারাত্মক। কালবিলম্ব না করে এম্বুলেন্স পাঠাতে বলে আমি তৈরী হলাম। হাসপাতাল পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ১টা। কেবিনে গিয়ে দেখি জাফর ভাইয়ের ডায়ালাইসিস চলছে। তিনি কিছুটা অস্থির। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। হাই ফ্লো অক্সিজেন নিচ্ছেন। পরীক্ষা করে দেখি হার্টরেট ১০০-র কিছু উপর তবে ছন্দ নিয়মিত। নিউমোনিয়ায় হার্টরেট একটু বেশি থাকাটা অস্বাভাবিক না কিন্তু কমে যাওয়াটাই বিপদজনক। আমি যতক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষন করলাম হার্টরেট কমতে দেখলাম না। উনার অনুমতি সাপেক্ষে ইসিজি করলাম। সেখানে নতুন কোন পরিবর্তন নেই। শ্বাসকষ্ট কমাতে নেবুলাইজেশন দিলাম। যৌক্তিক কারণ ছাড়া উনাকে কোন ওষুধ দেয়া বা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা ভীষন দুরহ একটা কাজ। আর নতুন কোন ওষুধ প্রয়োগ করতে চাইলে অবশ্যই টেক্সট বইয়ের রেফারেন্স দেখাতে হয়। উনার এই অভ্যেসটা দীর্ঘ বহু বছরের। ঘন্টা দুই পর হার্টরেট এবং শ্বাসকষ্ট কমলো। জাফর ভাই ঘুমিয়ে পড়লেন। জুনিয়র ডাক্তারকে সব বুঝিয়ে আমি বাসায় ফিরে গোসলে ঢুকলাম। আগে গোসল করতে গিয়ে মুখে সাবান দেবার সময় চোখ বন্ধ রাখতাম। আর এখন পারলে চোখের ভিতরও সাবান মাখি। করোনা আমাদেরকে নতুন অনেক কিছুই শিখাচ্ছে। গোসল শেষ করে বের হতেই ফজরের আজান পড়লো। নামাজ পড়ে বিছানায় শুতে শুতে ভোর ৫টা।

বর্তমানে উনার প্রধান সমস্যা দুটি-
১) ফুসফুসে ইনফেকশন (Pneumonia)
২) হঠাৎ হার্টের ছন্দপতন (Arrhythmia)

জাফর ভাইকে এখন সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই ডায়ালাইসিস দেয়া হচ্ছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে আছে। তিন ব্যাগ প্লাজমা দেওয়া হয়েছে। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে ফুসফুসের ইনফেকশন সামান্য কমছে যদিও করোনা ভাইরাস এখনো পজেটিভ। আগের তুলনায় খাবারের ইচ্ছা এবং পরিমান বেড়েছে। জ্বর নেই তবে বুকে যথেষ্ট কফ কাশি আছে। গলা ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট একটু কমলেও প্রায় সব সময়ই কম-বেশি অক্সিজেন নিতে হচ্ছে। অক্সিজেন ছাড়া স্যাচুরেশন কমে নেমে যায় ৮৫% পর্যন্ত। জ্ঞান আছে পূর্ণ মাত্রায়। শরীর ভীষন দুর্বল। কথা বলতে কষ্ট হয়। কথা বলার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় গত কয়েক দিন থেকে ছোট ছোট চিরকুটে নোট লিখে সবাইকে বিভিন্ন কাজের দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের জন্য ঢাকা নগর হাসপাতালের প্যাথোলজী ল্যাবে জরুরী ভিত্তিতে প্লাজমা কালেকশন মেশিন বসাতে বলেছেন। অসুস্থ এই শরীরেও শুয়ে বসে খোঁজ নিচ্ছেন নব নির্মিত রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের কাজের অগ্রগতি। টিভির সব খবর দেখছেন। গতকাল হূমায়ুন আহমেদের গল্প সামগ্রীর ইয়া মোটা একটা বই (১১৮৩ পৃষ্ঠা) শুরু করেছেন। আজ দেখলাম সেই বইয়ের এক তৃতীয়াংশ শেষ। আমার দৃষ্টিতে উনি হূমাযুন আহমেদের কল্পনারও বাহিরের একটি চরিত্র। আমি জাফর ভাইকে যত দেখি তত অবাক হই। মুগ্ধ হয়। ভাবা যায়, সাধারণ কোন এক মানুষ উনার অসুস্থতার খবর শুনে ছাগল কোরবানী করেছেন। পরদিন সেই একই ব্যক্তি যখন জেনেছেন তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয় নি তখন তিনি গরু ছদকা করেছেন!

বর্তমানে জাফর ভাইয়ের চিকিৎসা একটা মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে চলছে। সর্বক্ষণ অন লাইনে দেশী বিদেশী চিকিৎসকদের পরামর্শ নেয়া হচ্ছে। গণস্বাস্থ্যের যে সকল সিনিয়র অধ্যাপক, জুনিয়র চিকিৎসক, সিস্টার কর্মকর্তা আর কর্মচারীরা উনার চিকিৎসা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার সংগে জড়িয়ে আছেন তারা কর্তব্য আর দায়িত্বের পাশাপাশি স্যারের প্রতি চরমতম ভালোবাসা আর মায়া মমতাকেই যেন প্রাধান্য দিচ্ছেন।
সবাই দৃঢ় প্রতীক্ষাবদ্ধ, এই যুদ্ধে যে কোন মূল্যে করোনাকে পরাজিত করতেই হবে। দেশ এবং জাতির প্রয়োজনে সুস্থ করে তুলতেই হবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে অধ্যাপক ডা. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) মামুন মোস্তাফি এবং অধ্যাপক ডা. নাজিব মোহাম্মদ এর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন আছেন। কাজ করছে বাংলাদেশ, ইংল্যান্ড ও ভারতের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বিত বোর্ড।

উল্লেখ্য, গত ২৫ মে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত কিট দিয়ে পরীক্ষাতেই তার করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এরপরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) পিসিআর পরীক্ষাতেও তার করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তিনি গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর করোনা শনাক্ত হওয়ার পরেই তার স্ত্রী শিরীন হক ও ছেলে বারিশ চৌধুরীরও করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়।