শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০

শাবল দিয়ে ব্যাংকের ভল্ট ভাঙ্গতে চেয়েছিল দুর্বৃত্তরা

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার, ১০:৫১ পিএম

শাবল দিয়ে ব্যাংকের ভল্ট ভাঙ্গতে চেয়েছিল দুর্বৃত্তরা

চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকায় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) কদমতলী শাখায় চুরির ঘটনা ঘটেছে।

শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে কোন এক সময়ে কদমতলী শাখায় এই চুরির ঘটনা ঘটে। ধনিয়ালাপাড়া এলাকায় বাইতুস শরফ মাদ্রাসার পাশের বায়তুশ শরফ জিলানি মার্কেটের ছয়তলা ভবনে এই শাখাটির অবস্থান। তবে এ শাখা থেকে কোন টাকা-পয়সা চুরি হয়েছে কিনা এই পর্যন্ত জানা যায়নি।

এ ব্যাপারে শাখা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। তবে পুলিশ বলছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ভল্ট খোলার পর জানা যাবে টাকা চুরি হয়েছে কিনা।

পুলিশ দেখতে পায় ব্যাংকের মূল ফটকে যে তিনটি তালা লাগানো ছিল, সেগুলি কেটে ফেলা হয়েছে। তার বদলে

কদমতলেীতে ইউসিবিএল ব্যাংকের শাখায় ভল্ট ভাঙ্গার চেষ্টা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ। শাবল দিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা করার কারণে নির্ধারিত চাবির ঘরও নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে শাখায় চাবির যেসব সেট রয়েছে সেগুলো দিয়ে এখন আর খোলা যাচ্ছে না।

ঢাকা থেকে ইউসিবিএল’র এক্সপার্ট টিম শনিবার রাতেই চট্টগ্রাম আসবেন বলে জানা গেছে। তারাই ভল্ট খুলে টাকার হিসাব মিলিয়ে দেখবেন বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞ টিম চট্টগ্রামে পৌঁছা পর্যন্ত টাকা রুট হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে বলা যাচ্ছে না।

নগরীর ধনিয়ালা পাড়া এলাকায় বায়তুশ শরফ মাদ্রাসা ও এতিমখানার পাশে ‘বায়তুশ শরফ জিলানি মার্কেট’ নামে ভবনটিতে ইউসিবিএল কদমতরী শাখার অবস্থান। দোতলা ও তিনতলা দুই ফ্লোরে ছিল ব্যাংকের কার্যক্রম।

ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সদীপ কুমার দাশ  জানান, আব্দুল হাইয়ের মালিকানাধীন পাঁচতলা ভবনটির নিচতলায় মেশিনারিজ সামগ্রীর কয়েকটি দোকান আছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ইউসিবিএল’র শাখা অফিস। চতুর্থ তলায় আছে মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অফিস। পঞ্চম তলায় একটি এনজিও’র অফিস করার কথা বলে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তবে অফিস এখনও হয়নি। এছাড়া সেখানে বাড়ির মালিকের গাড়িচালকসহ আরও কয়েকজন ব্যাচেলর থাকতেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে দুপুরের শিফটের নিরাপত্তা কর্মী ব্যাংকে এসে দেখেন দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মী নওশাদ মিয়া (৪৩) প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। এসময় তিনি বিষয়টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক হুমায়ন মোহাম্মদ মোরশেদকে জানান। ব্যাংকের কর্মকর্তারা হটলাইনে ফোন করে জানান। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নওশাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি বারবার অসংলগ্ন কথা বলছিলেন। তাকে খুব ক্লান্ত ও দুর্বল দেখাচ্ছিল। নওশাদ কোনো তথ্য দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না। পুলিশ তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। এসময় ব্যাংকের ফটকে লাগানো তিনটি তালা কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখানে নতুন একটি তালাও লাগিয়ে দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে আসবাবপত্রসহ প্রায় সবকিছুই অক্ষত পাওয়া গেছে। তবে ভল্ট খোলার চেষ্টার প্রমাণ তারা পেয়েছেন। এজন্য ভল্টের নির্ধারিত চাবি দিয়ে সেটি খোলা যাচ্ছে না। পুলিশের পক্ষ থেকে ইউসিবিএল’র ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা এক্সপার্ট টিম পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। সেই টিম পৌঁছার পর ভল্ট খুললে সেখানে গচ্ছিত টাকা খোয়া গেছে কি না নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

দুর্বৃত্তরা ব্যাংকের ভেতরে থাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাগুলো বাঁকা করে রেখে যায়। ক্যামেরার ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডারের (ডিভিআর) হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে গেছে। এতে তাদের ধারণা, দুর্বৃত্তরা খুবই সুদক্ষ এবং পরিকল্পিতভাবেই তারা কাজটি করেছে। তাদের চেহারা যাতে শনাক্ত না হয়, সেজন্য তারা ডিভিআর খুলে নিয়ে গেছে।

সেখানে থাকা ডবলমুরিং থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অর্ণব বড়ুয়া  জানান, ভল্ট দেখে তাদের ধারণা- সেটি শাবল দিয়ে ভাঙ্গার চেষ্টা হয়েছিল। এজন্য চাবি দিয়ে খোলার অংশটি বাঁকা হয়ে গেছে। নির্ধারিত চাবি দিয়েও সেটি খোলা যাচ্ছে না। ভল্টে প্রবেশের জন্য তিনটি স্তর পার হতে হয়। ভল্টে হাত পড়লেই ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভিন্নস্থানে সিকিউরিটি অ্যালার্ম বাজে। এক্ষেত্রে ইউসিবিএল’র কর্মকর্তারা কোনো সিকিউরিটি অ্যালার্ম পাননি বলে পুলিশকে জানিয়েছে।

এদিকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের সংগ্রহ করা মার্কেটের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় সংরক্ষিত ফুটেজে দেখা গেছে, শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ৩টা ৫১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে যুবক বয়সী দু’জন বেরিয়ে আসছেন ব্যাংকের ভেতর থেকে। প্রথমজন বেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। দ্বিতীয়জন বের হয়ে তালা লাগান। রাত ৩টা ৫২ মিনিট ৭ সেকেন্ডে দু’জন বেরিয়ে যান।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগরের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার  জানান, আনুমানিক দুই সপ্তাহ আগে ভবন মালিকের কাছে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন আসে। বেলজিয়াম থেকে ফোন করেছেন জানিয়ে ওই ব্যক্তি ভবনের পাঁচতলায় একটি এনজিওর অফিস নেওয়ার প্রস্তাব দেন। মালিক সম্মত হওয়ার পর ২ ফেব্রুয়ারি দু’জন পাঁচতলায় ওঠেন। এর আগে ওই ফ্লোরটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে ভাড়া দেওয়ার উপযোগী করা হয়। দু’জন সেখানে বিছানা পেতে থাকতেন এবং খাওয়া-দাওয়া করতেন। ব্যাংকের যে নিরাপত্তা কর্মীকে অজ্ঞানের মতো করা হয়, তাকে এনজিওতে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বায়োডাটাও নেন তারা। শনিবার সকাল থেকে তাদের আর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংকে প্রবেশ করা দু’জন তারাই বলে ধারণা সন্তোষের।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) ফারুকুল হক বলেন, ‘এনজিও অফিস করার কথা বলে যে দুই জন পাঁচতলায় ওঠেছিলেন তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমরা সন্দেহ করছি তারাই ব্যাংকে অপরাধ সংঘটন করেছে। দুর্বৃত্তরা প্রথমে ব্যাংকে অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে, এটা একটা অপরাধ। ভল্ট ভাঙার চেষ্টা করেছে সেটা আরেকটা অপরাধ। ভল্ট খোলার পর গচ্ছিত টাকা যদি লুটের প্রমাণ মেলে সেটা আরেকটা অপরাধ। এসব অপরাধের সঙ্গে ব্যাংকের ভেতরে-বাইরের কেউ জড়িত কিনা, ভবনের মালিকের কোনো ত্রুটি আছে কি না সবই আমরা তদন্ত করে দেখব।’