শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

অনলাইনে ক্যাসিনোর লেনদেন ৩ ব্যাংকে

প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০১৯ বুধবার, ০৯:০৪ এএম

অনলাইনে ক্যাসিনোর লেনদেন ৩ ব্যাংকে

অনলাইনে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার মূলহোতা সেলিম প্রধান। তাকে সোমবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট থেকে নামিয়ে আনে র‌্যাব। পরে তাকে নিয়ে তার অফিস ও বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল নগদ টাকাসহ বিদেশি মদ ও অত্যাধুনিক ক্যাসিনো সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে ‘ক্যাসিনো’ সেলিম জানান, তার অনলাইন ক্যাসিনো থেকে আয়ের অবৈধ টাকা তিন ব্যাংকে জমা রাখতেন। পরে সে সব টাকা হুণ্ডি বা সঙ্গে করে বিদেশে পাচার করতেন। লন্ডনেও তিনি সে সব টাকা পাচার করতেন বলে তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

শ্রীলঙ্কান একটি ব্যাংকসহ মোট তিনটি ব্যাংকে বাংলাদেশের অনলাইন ক্যাসিনোর লেনদেন হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)। ‘ব্যাংক তিনটি হলো, বিদেশি ব্যাংক কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন এবং দেশের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক দি সিটি ব্যাংক ও যমুনা ব্যাংক’ ।

মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) বিকেলে র‌্যাব-১ অধিনায়ক সারোয়ার বিন কাশেম এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। এর আগে সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বাংলাদেশের অনলাইন ক্যাসিনোর মূলহোতা সেলিম প্রধানের বাড়ি ও অফিসে টানা ১৮ ঘণ্টা অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব।

সারোয়ার বিন কাশেম আরও বলেন, “অনলাইন গেটওয়ে দিয়ে এই তিন ব্যাংকে টাকা ঢুকতো। লেনদেন করতো সেলিম প্রধানের সহকারী আক্তারুজ্জামান। সেলিম প্রধানের সঙ্গে সমান অংশীদারিত্বে উত্তর কোরিয়ার নাগরিক মিস্টার তু অনলাইন ক্যাসিনোর ব্যবসা করতো। এই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হতো অথবা কোরিয়ান নাগরিক নিজে এসেও টাকা নিতেন। এখানে মানি লন্ডারিং অপরাধ হয়েছে।”

সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সেলিম প্রধানকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে আটকের পর রাত ১০টা থেকে পরবর্তী ১৮ ঘণ্টা ধরে তার গুলশানের বাসা এবং বনানীর অফিসে অভিযান চালায় র‌্যাব-১। মঙ্গলবার বিকাল ৪টায় অভিযান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন সারোয়ার বিন কাশেম।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, অনলাইনে ক্যাসিনো খেলতে হলে গ্রাহকের নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকার প্রয়োজন হয়। সে সব টাকা তিনটি গেটওয়েতে জমা হতো। খেলায় জিতলে টাকা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ফেরত যেত, আর হারলে টাকাগুলো গেটওয়েতে থেকে যেত। সেলিমের সহকারী মো. আক্তারুজ্জামান প্রতি সপ্তাহে সেই গেটওয়ের টাকা উত্তোলন করে সেলিম, যমুনা ও কমার্শিয়াল- এই তিন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করতেন। এরপর সে সব টাকা হুণ্ডির মাধ্যমে অথবা সঙ্গে করে বিদেশে পাচার করা হতো। এ ছাড়া আমরা জানতে পেরেছি, বিভিন্নভাবে লন্ডনেও টাকা পাঠিয়েছেন সেলিম।

কী পরিমাণ টাকা লন্ডনে পাচার হয়েছে? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের উত্তরে সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, একটা গেটওয়ে থেকে প্রতি মাসে ৯ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছি। এমন আরও কিছু গেটওয়ে রয়েছে, সেগুলো আমরা যাচাই-বাচাই করে দেখছি।

লন্ডনে পাচারকৃত টাকা তারেক রহমানের কাছে যেত কিনা? সাংবাদিকদের এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব-১ এর এ অধিনায়ক বলেন, বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখব।

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে সেলিমের সহযোগী আক্তারুজ্জামানের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বনানীর ২ নম্বর রোডের ২৬ নম্বর ভবন থেকে ২১ লাখ টাকা জব্দ করে র্যা ব। এর আগে সোমবার রাতে সেলিমের গুলশানের বাসা থেকে আক্তারুজ্জামানকে আটক করা হয়। সোমবার রাতে সেলিম প্রধানের গুলশানের কার্যা লয় থেকে বিপুল পরিমাণ মদ ও দেশি-বিদেশি অর্থ উদ্ধার করা হয়। রাতেই তার গুলশান-২ এর ৯৯ নম্বর সড়কে ১১/এ বাড়িতেও অভিযান শুরু করেন র্যা ব সদস্যরা।
এর আগে সোমবার দুপুরে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থাই

এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট থেকে ক্যাসিনো সেলিমকে নামিয়ে আনে র‌্যাব-১ এর একটি দল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে নিয়ে গুলশান-২ এ তার বাসা কাম অফিস ‘মমতাজ ভিশনে’ অভিযানে যায় র‌্যাব। প্রথমে সেলিমকে সঙ্গে করে ঘটনাস্থলে যায় র্যা বের তিনটি গাড়ি। পরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০টিতে। টানা ১৬ ঘণ্টা সেখানে অভিযান চলে। অভিযানের সময় সেলিম প্রধান ওই বাসার ভেতরে র‌্যাবের সঙ্গে ছিলেন। পরে সোমবার রাতে গুলশানের বাসায় অভিযানে যায় র‌্যাব।

সেলিম প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘প্রধান গ্রুপ’-এর কর্ণধার। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড, পি২৪ ল ফার্ম, এইউ এন্টারটেইনমেন্ট, পি২৪ গেমিং, প্রধান হাউস ও প্রধান ম্যাগাজিন। এর মধ্যে পি২৪ গেমিংয়ের মাধ্যমে তিনি জুয়াড়িদের ক্যাসিনোয় যুক্ত করতেন।

সেলিম প্রধান অনলাইনে ক্যাসিনো পরিচালনাকারী এবং বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রধান। তিনি ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সহসভাপতি। এ ছাড়া এর আগে গ্রেফতার হওয়া বিসিবি পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়ার ক্যাশিয়ারও।

সেলিম প্রধানের ব্যাংককের পাতায়ায় বিলাসবহুল হোটেল, ডিসকো বারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনাই নয়, সেলিম প্রধান রাজশাহীসহ সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় গবাদিপশুর সব খাটাল ও মাদক সিন্ডিকেটের হোতা। এমনকি সীমান্তে জালটাকার মূল সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে।

প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তিনি খাটাল, মাদক ও জালটাকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখান থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা নেন। দুই বছরে তিনি সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা চাঁদা নিয়েছেন।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার বলেন, অনলাইন ক্যাসিনোর বাংলাদেশ প্রধান সেলিম প্রধানকে আটক করা হয়েছে। অনলাইনের বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জুয়ার টাকা সংগ্রহ করতেন। পরে এই অর্থ তিনি বিদেশে পাচার করতেন। এসব বিষয়ে এখন তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সেলিমের কোম্পানির ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, পি২৪ গেমিং শুরুতে বিনোদনমূলক সফটওয়্যার তৈরি ও প্রকাশ করত। এখন তারা এশিয়ায় দ্রুত বড় হতে থাকা ক্যাসিনো কারবারে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। এশিয়ার লাইভ ক্যাসিনো মার্কেটে প্রতিষ্ঠানটি যেন এক নম্বরে যেতে পারে, সেই চেষ্টা আছে তাদের। ২০১৬ সালে তারা শুধু কম্পিউটার গেমস বাজারে আনত। পরে অনলাইন জুয়া ও ক্যাসিনো কারবারে জড়িয়ে পড়ে। পি২৪-এর সঙ্গে বাংলাদেশে ১৫০টি অপারেটর এবং ক্যাসিনো যুক্ত আছে। অনলাইনে বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত ক্যাসিনোর সঙ্গে যুক্ত করে দেয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। জুয়াড়িদের মুঠোফোনে লাইভ ক্যাসিনোতে যুক্ত করে দেয়ার সুবিধা তারা এনেছে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর।