বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

রিফাতের স্ত্রী লিখেছিলেন- ‘সরি জান...`

প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০১৯ শুক্রবার, ১০:০১ এএম

রিফাতের স্ত্রী লিখেছিলেন- ‘সরি জান...`

সবার সামনে দুই খুনি কোপাচ্ছেন এক যুবককে। আর একাই লড়ে যাচ্ছেন এক নারী। সম্পর্কে তিনি ওই যুবকের স্ত্রী। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালবাসা তো এমনই হওয়ার কথা।

বরগুনার আলোচিত শাহ নেয়াজ রিফাত শরীফ (২৫) হত্যাকান্ডের পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে ঘুরছে নানা কথা। কেউ কেউ তার স্ত্রীর দিকেও আঙ্গুল তুলছেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার মেয়ের জামাইয়ের মরদেহ আনতে মর্গে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন নিহত রিফাতের শ্বশুর মোজ্জাম্মেল হোসেন। এ সময় মোজ্জাম্মেল হোসেনকে হাসপাতালের মর্গ থেকে বের করে দেন রিফাতের বন্ধুরা। বেলা পৌনে ১২টার দিকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের মর্গের সামনে আসেন রিফাতের শ্বশুর মোজ্জাম্মেল হোসেন। এ সময় স্থানীয় সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন। কয়েকজন সাংবাদিক তার কাছে জামাই রিফাত হত্যার কারণ জানতে চান। তখন তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান এটি নারীঘটিত ঘটনা হলেও আমার মেয়ের সঙ্গে খুনিদের কোনো পরিচয় ছিল না। আমার মেয়েকে খুনিরা উত্ত্যক্ত করতো। জামাই এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছিল বলেই তাকে খুন করা হয়েছে। এ সময় রিফাতের কয়েকজন বন্ধু মোজ্জাম্মেল হোসেনের ওপর চড়াও হন। সেই সঙ্গে মোজ্জাম্মেল হোসেনকে মিথ্যাবাদী উল্লেখ করে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন রিফাতের বন্ধুরা। এ সময় রিফাতের কয়েকজন বন্ধু মোজ্জাম্মেল হোসেনের দিতে তেড়ে যান।

এ ঘটনার কারণ জানতে চাইলে নিহত রিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মঞ্জুরুল আলম জন, বিল্লাল হোসেন, নাজমুলসহ কয়েজনজন জানান, মিন্নির বাবা সাংবাদিকদের মিথ্যা বলছেন। তার মেয়ের সঙ্গে খুনিদের পরিচয় ছিল। বিষয়টি আমরা আগে থেকেই জানতাম। নয়নের সঙ্গে মিন্নির আগে থেকে সম্পর্ক আছে, সেটিও আড়াল করেছেন মিন্নির বাবা। এসব বিষয় তদন্ত করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। মিন্নির বাবা সবই জানেন এবং মিন্নিও অনেক বিষয় জানেন।

গলার রগ কেটে গিয়েছিল রিফাতের 

বৃহস্পতিবার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রিফাত শরীফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বেলা ১১টা থেকে ১১টা ৪০মিনিট পর্যন্ত রিফাতের মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়।

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক চিকিৎসক জামিল হোসেন বলেন, রিফাত শরীফের শরীরে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে। তার গলায়, মাথায়, বুকের ওপর তিনটি বড় ক্ষত রয়েছে। তার গলার রগ কেটে গেছে। গলার রগ কেটে প্রচুর রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ভারী অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত করা হয়েছে। তার ডান হাত এবং বাম হাতে দুটি বড় ক্ষত রয়েছে। রিফাতের শরীরে সাত থেকে আটটি বড় আঘাত রয়েছে। যেসব আঘাতে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে রিফাত মারা যায়।

আটক ৩

ভয়াবহ এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে। এরা হল- মামলার ৪ নম্বর আসামি চন্দন ও ৯ নম্বর আসামি হাসান। এছাড়া ভিডিও ফুটেজ দেখে নাজমুল হাসান নামের আরও ১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে মূল হোতা নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীসহ অন্যরা এখনও পলাতক।

চন্দনকে কখন, কোথা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তদন্তের স্বার্থে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে রাজি হয়নি পুলিশ। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে বলেও জানায় পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডে নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

এ বিষয়ে বরিশালের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, এমন একটি ঘটনা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে সেখানে পুলিশের সিসি ক্যামেরা রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে খুনিদের শনাক্ত করা গেছে। অভিযান চলছে। শিগগিরই অপরাধীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে পুলিশ।

‘সরি জান’

দুই মাস আগে রিফাতের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তিন্নির। বুধবারের মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর তিন্নির ফেসবুক আইডি ঘিরে চলছে নানা আলোচনা। সামাজিকমাধ্যমে ঘুরছে একটি স্ক্রিণ শট। তবে বৃহস্পতিবার রাত থেকে তিন্নির ফেসবুক আইডি-টি আর দেখা যাচ্ছে না। 

এদিকে ওই স্ত্রীনশটে দেখা যায়, কমেন্টে নয়ন বন্ডকে ‘সরি জান’ বলে সম্বোধন করে মিন্নি শরীফ। এরপর প্রতিউত্তরে নয়ন বন্ড মিন্নিকে বলেন, ‘নো সরি… এগুলো আমার প্রাপ্য…।’

এরপর আবারো মিন্নি বলেন, ‘( নয়ন বন্ড) সরি বললাম তো…।’ তাদের এ উভয়ের এ ধরণের যোগাযোগ থেকে তাদের সম্পর্ক অনেকটাই স্পষ্ট বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

এর আগে গত ৭ জুন নিজের ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন মিন্নি। সেখানে তিনি লেখেন, ‘তোরে ভুলে যাওয়ার লাগি আমি ভালোবাসিনি সব ভেঙ্গে যাবে এভাবে ভাবতে পারিনি তুই ছাড়া কে বন্ধু হায় বুঝে আমার মোন তুই বিহনে আর এ ভুবনে আছে কে আপন?’

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকারী দুজনের মধ্যে একজনের নাম একজন এই নয়ন বন্ড (২৫)। অন্যজনের নাম রিফাত ফরাজী।

নয়ন ও ফরাজী দু’জনই নানা অপরাধে যুক্ত

খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত নয়ন ও ফরাজী দুজনই অপরাধজগতের বেশ পরিচিত মুখ বলে জানিয়েছে বরগুনা পুলিশ।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিলেন খুনি রিফাত ফরাজী। নানা ছুঁতোয় স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর করা ছিল রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব ঘটনায় কয়েকবার গ্রেফতার করা হয় রিফাতকে।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করেন রিফাত ফরাজী।