বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯

বন্দরে বার বার এগিয়ে সাইফ পাওয়ার

ইসমত মর্জিদা ইতি, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৭ মে ২০১৯ সোমবার, ১১:০৭ পিএম

বন্দরে বার বার এগিয়ে সাইফ পাওয়ার

আগে থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরের সিংহভাগ কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং করে আসছে বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেক বিডি লিমিটেড। ‘চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)’ পরিচালনার অপারেটর নিয়োগ হওয়ার দৌড়েও শতভাগ শর্ত পূরণ করে এগিয়ে আছে প্রতিষ্ঠানটি। 

বন্দর সংশ্লিষ্টদের মতে, সাইফ পাওয়ারের যে ধরণের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে তা অন্য অনেকের নেই। যে কারনে দরপত্রে তারা বার বার এগিয়ে থাকে। আবার অনেকের মতে, কঠিন শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা বাড়ছে না। বার বার সাইফ পাওয়ারই কাজ পাচ্ছে।

নথি সূত্রে জানা যায়, একচেটিয়া বা একচ্ছত্র ব্যবসার মাধ্যমে কেউ যাতে বন্দরকে জিম্মি করতে না পারে, সেজন্য ২০০৮ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) প্রথম  দফায় প্রাক-যোগ্যতার দলিলে (২.৩-জি অংশে) একচেটিয়াবিরোধী শর্ত রাখা হয়। বন্দরে টার্মিনাল অপারেটর হিসেবে কাজ করছে বা ১৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো টার্মিনালের দরপত্রে অংশ নিতে পারবে না বলে শর্তে উল্লেখ করা হয়।

পরে সেই শর্ত পরে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এর সুবিধা পায় সাইফ পাওয়ার। কাজ পাওয়ার পর থেকে সাফল্যের সঙ্গে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং করছে সাইফ পাওয়ারটেক।

২০০৯ সালে সিসিটিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কনটেইনারপ্রতি ১৫৫ টাকা দরে হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পায় সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। এর পর ২০১৩ সালে এ টার্মিনালের দরপত্রের শর্ত কঠোর করা হয়। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ৮ কোটি টাকার লেনদেনের শর্ত জুড়ে দেয়া হয় সে সময়। চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও পরে যোগ্য বিবেচিত হয় দুটি। কনটেইনার প্রতি ৪৯৫ টাকা দরে কাজ পায় সাইফ পাওয়ারটেক।

জানতে চাইলে সাইফ পাওয়ারটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্যাপ্টেন তানভীর হোসেন বলেন, বন্দরে কোনো দরপত্র আহ্বান করা হলে তার সঙ্গে সংসদীয় কমিটি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট অনেক পক্ষের সম্পৃক্ততা থাকে। গণখাতে ক্রয়বিধি অনুসরণ করেই সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড চট্টগ্রাম বন্দরে দক্ষতার সঙ্গে কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে আসছে।

এদিকে পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল ও ঢাকার কমলাপুর বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতেও দুটি টার্মিনালের কাজ পায় সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড।

তবে বন্দর কর্মকর্তরা বলছেন, সিংহভাগ কনটেইনার ওঠানামার কাজে যুক্ত থাকায় বন্দরের যেকোনো কাজ পাওয়া এখন সাইফ পাওয়ারটেকের জন্য সহজ হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার আধুনিক ‘চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)’ পরিচালনার অপারেটর নিয়োগ করতে যাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। উন্মুক্ত দরপত্রের বদলে ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে অপারেটর নিয়োগে প্রতিযোগিতা ছিল না। এতে পণ্য ওঠানামা ব্যয়বহুল হয়েছিল। এবার উন্মুক্ত দরপত্র ডাকা হলেও কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ৫০ হাজার টাকা দিয়ে প্রতিটি দরপত্র কিনলেও দুটি প্রতিষ্ঠান জমা দেয়নি।

দরপত্র জমা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, বর্তমান টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড, বার্থ অপারেটর ফজলি অ্যান্ড সন্স এবং বার্থ অপারেটর এম এইচ চৌধুরী লিমিটেড। জমা দেয়নি দুটি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ ও বশির আহমদ চৌধুরী। কিন্তু প্রশাসনিক কিছু জটিলতায় দরপত্র খোলার দিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। ঈদের পর দরপত্র কার্যক্রম সম্পাদন করা হবে বলে জানান  চট্টগ্রাম  বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক।

সিসিটি পরিচালনার দরপত্র নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক গোলাম সারোয়ার জানান,  যোগ্যতা হিসেবে জেটিতে বছরে গড়ে দেড় লাখ একক কনটেইনার ওঠানামার সক্ষমতা চেয়েছি এবং বিগত তিন বছরের মধ্যে গড়ে কমপক্ষে সাড়ে ১০ কোটি টাকার বার্ষিক টার্নওভার থাকতে হবে। এবং ১৫ কোটি টাকার ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল থাকতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিনের সোজাসাপটা জবাব। তিনি জানান, ‘টার্মিনাল পরিচালনার সরকারি সব নিয়ম ও আন্তর্জাতিক শর্ত মেনেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অপারেটর নিয়োগের দরপত্র ডেকেছে। সেই শর্তে যদি আমরা মনোনিত হই, টার্মিনাল পরিচালনার কাজ পাব। আমরা আমাদের সক্ষমতা তৈরি করেছি, তাই কাজ পাচ্ছি।
২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গত ছয় বছরে বন্দর দিয়ে কন্টেইনার পরিবহন হযেেছ এক কোটি ২৮ লাখ কন্টেইনার। এরমধ্যে ৫৫ শতাংশ বা ৭০ লাখ কন্টেইনার পরিবহন করেছে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠান করেছে ৫৮ লাখ কন্টেইনার।

বন্দরে বর্তমানে ১২ টি জেটিতে সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে কন্টেইনার ওঠানো-নামানো হয়। সাইফ পাওয়ারটেক ছাড়াও  বাকি ছয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি একটি করে জেটি পরিচালনা করছে। এই ছয়টি প্রতিষ্ঠান বার্থ অপারেটর হিসেবে কন্টেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ করছে। টার্মিনাল অপারেটর হিসেবে শুধু সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড সিসিটি এবং এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা করছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে ২৯ লাখ ৩ হাজার ৯৯৬ টিইইউএস (টুয়েন্টি ফিট ইকুইভিলেন্ট ইউনিটস) কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে, ২০১৭ সালে ছিল ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ২২৩ টিইইউএস। অর্থাৎ গত বছর ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৭৩ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য বেশি হ্যান্ডলিং হয়েছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ। গত বছর কনটেইনারের চেয়ে খোলা পণ্যে প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে, যা ছিল ১৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ২০১৭ সালে খোলা পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১১ দশমিক ২৬ শতাংশ। কনটেইনারজাত ও খোলা পণ্য মিলিয়ে ২০১৮ সালে আগের বছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৯৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়।