বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

গরমে কাহিল শিশুরা

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৮:৫৯ এএম

গরমে কাহিল শিশুরা

গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। এর মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি।  ডায়রিয়া, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশুরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৮০জন শিশু নানা রোগ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ১০০ জনের উপরে।

সূত্র জানায়, চমেক হাসপাতালে ১১৮ শয্যার বিপরীতে বুধবার ভর্তি ছিল প্রায় সাড়ে ৪শ’ শিশু রোগী। এদের বেশিরভাগই ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত।

আগ্রাবাদের বিশেষায়িত মা ও শিশু হাসপাতালেও শিশু রোগীর ঠাঁই নেই। সেখানে প্রতিদিন গড়ে শিশু রোগী ভর্তি হচ্ছে ১০০ জনের ওপরে। গতকাল ভর্তি হয়েছে ১০১ জন। ১৬০ শয্যার শিশু ওয়ার্ড ছাড়িয়ে রোগীদের হাসপাতালের মেডিসিন, নাক-কান-গলা ও শিশু সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালটির আউটডোরে প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক শিশু সেবা নিচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে এ রোগীর সংখ্যা ছিল  ৪০-৫০ জনের মতো।

চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুসারে, গত দুই দিনে এ বিভাগের একটি ওয়ার্ডে  ২২১জন শিশু শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভাগটির ইনচার্জ। তারমধ্যে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে ১৪৬ জন শিশু রোগী, ৪০ জন শিশু ডায়রিয়া এবং ১৫ জন শিশু অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে।

শিশু বিভাগের পিআইসিউতে ভর্তি রয়েছে ৬৭ জন শিশু রোগী। তাদের মধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রয়েছে পাঁচ জন, ৫১ জন শিশু শ্বাসকষ্টে এবং বাকী ১১ জন অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে। আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে, গতকাল মঙ্গলবার ২৫০ শয্যার বিপরীতে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ২৫৮ জন শিশু। এর মধ্যে ১৭৩ জন শিশু রয়েছে শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে আক্রান্ত। ৭৩টি শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন। বাকীরা অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছেন। এছাড়াও গত বহিঃ বিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছেন এমন সংখ্যাও অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের পাঁচটি ওয়ার্ডে ১১৮ শয্যার বিপরীতে রোগীর সংখ্যা বেশী হওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। আগের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এক শয্যায় দুই থেকে তিনজনকে এক সঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বহিঃবিভাগে চিকিৎসা শেষে ফিরে যাচ্ছে অনেকেই।

আনোয়ারা  থেকে ছেলের জ্বর ও ঠান্ডা নিয়ে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন দিনমজুর আবু নাঈম।  তিনি বলেন, ‘বেশ কদিন ধরে জ্বরে ভুগছে বাচ্চা। সকালে হাসপাতালের আউটডোরে দেখানোর পর ডাক্তার বলেছেন ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে। কিন’ ওয়ার্ডে বেড খালি নেই। তাই এখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।’

বুধবার  জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রানত্ম দুই বছরের মেয়েকে মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করান নগরীর হালিশহর এলাকার বাসিন্দা জমিলা খাতুন। তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ ডায়রিয়া শুরু হয় মেয়ের, সেই সাথে জ্বরও। দুই দিন ধরে স্থানীয় এক ডাক্তারের পরামর্শে ঘরে ওষুধ খাইয়েছি। তাতে না কমায় এখানে নিয়ে আসি। ডাক্তারেরা বলেছেন, গরমে কোনো খাবারের বিষক্রিয়ায় এ অবস্থা হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মধ্যে রোগের প্রকোপও বাড়ছে। তাই এসময় শিশুদের প্রতি একটু বাড়তি নজর রাখতে হবে। তবে এ রোগ থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখতে মায়েদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে বাচ্চাদের বুকের দুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি, ফ্রিজে সংরক্ষণ করা খাবার ও দূষিত পানি পান থেকে বিরত থাকতে হবে। আর গরমে বাচ্চারা অতিরিক্ত ঘামলে তা সঙ্গে সঙ্গে মুছে দিতে হবে। তাহলে এসব রোগ থেকে কিছুটা পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু স্ব্যস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, আমাদের ওয়ার্ডের যে শয্যা রয়েছে তার চেয়ে চারগুণ বেশি রোগী ভর্তি আছে। অনেকেই চিকিৎসা নিয়ে দ্রুত সুস্থ হলেও নিউমোনিয়া ও ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হওয়া শিশুদের মধ্যে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৭০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তবে এতে আতংকিত হবার কিছুই নেই। শিশুদের ঠিকমতো যত্ম নিলে তারা সুস্থ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে প্রচুর পানি পান করাতে হবে। ঘাম হলে সঙ্গে সঙ্গে তা মুছে দিতে হবে। ফ্রিজে রাখা খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। তাহালেই এসব রোগ আর হবে না।

আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের আবাসিক ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেই এসব রোগে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। যার কারণেই প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের হাসপাতালে দিনদিন শিশু ভাইরাসজনিত শ্বাসকষ্ট, এজমা বা হাঁপানি ও ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে গেছে। পাশাপাশি বেড়েছে সূর্যের তাপ। এছাড়া আকাশে নেই কোনো মেঘের বলয়। এই গরম আরো কয়েকদিন থাকবে- এমনই পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

এপ্রিলে বাংলাদেশে সাধারণত দুএকটি তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। যা সর্বোচ্চ ছয় থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। এর আগে ১৯৯৫ সালে দেশের ১২টি জেলায় ঘুরেফিরে আট দিন দাবদাহ ছিল। এরপর ২০০৭ সালে সাতটি জেলায়, ১৯৯৯ ও ২০০৯ সালে ছয়টি জেলায় পাঁচ থেকে ছয় দিন দাবদাহ বয়ে গেছে। কিন্তু এই প্রথম দাবদাহ টানা ২৩ দিন অতিক্রম করছে। এর ফলে এপ্রিলে সাধারণত যে গড় তাপমাত্রা থাকে, এখন তাপমাত্রা তার চেয়ে সারা দেশে ৫ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।