বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯

পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো বাস চালককে

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার, ০৮:১৩ এএম

পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো বাস চালককে

ইয়াবা উদ্ধারের নামে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পরিচয়ে বেধড়ক মারধর এবং নাকে গামছা পেঁচিয়ে পানি ঢেলে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো শ্যামলী পরিবহনের এক বাস চালককে।  সোমবার রাতে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের পটিয়ার ওয়াই জংশন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। কিন্তু ঘটনার কুলকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না।

পুলিশ বলছে, ডিবি পুলিশের কোনো দল ওই এলাকায় অভিযান চালায়নি। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

নিহত ব্যক্তির নাম জালাল উদ্দিন (৪৮)। তিনি শ্যামলী পরিবহনের বাসের চালক ছিলেন।

এদিকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালককে হত্যার প্রতিবাদে বুধবার সন্ধ্যা থেকে আগামী বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও বান্দরবানে বাস চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২৮ এপ্রিল সকাল থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্যামলী পরিবহনের সুপারভাইজার আজিম উদ্দিন বলেন, সোমবার কক্সবাজার থেকে যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। তাঁদের বাসটি পটিয়া উপজেলার শান্তিরহাট পার হয়ে শিকলবাহা (ভেল্লাপাড়া) ব্রিজ এলাকায় রাত সাড়ে ১১টায় এসে পৌঁছায়। ওই সময় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে সাত ব্যক্তি তাঁদের বাসে উঠে তল্লাশি শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা জালালকে হাতকড়া পরিয়ে বাস থেকে নামান। তাঁকে রাস্তার পাশে নিয়ে পেটানোর পর আবার বাসে নিয়ে আসা হয়। তখন ইয়াবা বড়ি বের করে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন তাঁরা। কিন্তু ইয়াবা বড়ি নেই জানালে ডিবি পুলিশের সদস্যরা আবার গাড়ি থেকে নামিয়ে তাঁকে পেটাতে থাকেন। তাঁদের হাতে লাঠি ছিল। কয়েকজন পা দিয়ে জালালকে আঘাত করেন। জালাল আহত হয়ে পড়লে তাঁকে বাসের ভেতর ফেলে চলে যান ডিবির সদস্যরা।

শ্যামলী পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং গাড়ির একাধিক যাত্রী জানিয়েছেন, সোমবার রাত আটটার দিকে ১৯ জন যাত্রী নিয়ে শ্যামলী পরিবহনের বাস (ঢাকা মেট্রো-১৪-৭৪০২) কঙবাজার টার্মিনাল থেকে যাত্রা করে। বাসটি কঙবাজার থেকে চট্টগ্রাম এবং ঢাকা হয়ে গাজীপুরের চন্দ্রা রোডে চলাচল করে।

বাসটির চালকের সহকারী রাব্বি হোসেন বলেন, জালাল আহত হয়ে পড়ায় অন্য চালক এসে গাড়িটি চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যান। জালালকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দুই ব্যক্তির দাবি, পিটুনিতে জালালের মৃত্যু হয়েছে।

জালালের বাড়ি দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায়। মৃত্যুর খবর শুনে সেখান থেকে মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মর্গে ছুটে আসেন ছোট ভাই মো. জুয়েল ও চাচা দুলা মিয়া। মো. জুয়েল বলেন, ‘আমার ভাইকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গাড়িতে ওঠা লোকজন মেরে ফেলেছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই আমরা। জড়িতদের বিচার যেন হয়।’

লাশ দাফনের পর মামলা করবেন বলে জানান জুয়েল। দিনাজপুরে লাশটি দাফনের জন্য মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিহত ব্যক্তির চাচা দুলা মিয়া জানান, জালালের তিন ছেলে রয়েছে। বড় ছেলেটি প্রতিবন্ধী।

জালালের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক এনামুল হক। তিনি বলেন, লাশের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কালো কালো দাগ।

শ্যামলী পরিবহন চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্যবস্থাপক বাবুল আহমেদ বলেন, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তাঁদের এক বাসচালককে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি তাঁরা পুলিশকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। তাঁরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান।

চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, সোমবার রাতে নগর ডিবি পুলিশের কোনো দল ওই এলাকায় অভিযান চালায়নি। এ ছাড়া এলাকাটি তাঁদের আওতাধীনও না।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরেআলম মিনা বলেন, জেলা ডিবির কেউ অভিযানে যায়নি। এরপরও পুলিশ পরিচয়ে কারা ঘটনাটি ঘটিয়েছে, তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, শ্যামলী পরিবহন কর্তৃপক্ষের কথাবার্তায় আমরা কিছুটা গোলমাল দেখছি। প্রকাশ্যে রাস্তায় এই ধরনের একটি ঘটনা ঘটানো খুবই অস্বাভাবিক। আমি পটিয়া থানা, হাইওয়ে পুলিশ এবং কর্ণফুলী থানার টিআইসহ বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়েছি। কেউ ঘটনার ব্যাপারে কিছু বলতে পারছেন না। পুলিশের নামে কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ এই ঘটনা ঘটাল কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। মামলা করলে তদন্তে সব বেরিয়ে আসবে।

বাসচালক জালালের মৃত্যুর প্রতিবাদে আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ করতে মঙ্গলবার বৈঠকে বসেন পূর্বাঞ্চলীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা।

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. মুছা বলেন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঢাকা ও বান্দরবান সড়কে চালকেরা যান চলাচল বন্ধ রাখবেন। এ ছাড়া ২৮ এপ্রিল রোববার সকাল ৬টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিহত ব্যক্তির পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।