রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৯

মন্ত্রীর নির্দেশে টানেল প্রকল্পে উচ্ছেদ আপাতত স্থগিত

প্রতিনিধি, আনোয়ারা , চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১৫ মার্চ ২০১৯ শুক্রবার, ১০:৫৯ পিএম

মন্ত্রীর নির্দেশে টানেল প্রকল্পে উচ্ছেদ আপাতত স্থগিত বুক ভরা কান্না নিয়ে বাপ-দাদার ভিটে ছাড়ছেন অনেকে

পুনর্বাসন ও ক্ষতিগ্রস্থ সবার ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হওয়ার আগে আনোয়ারায় টানেল প্রকল্পের উচ্ছেদ কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নানা জটিলতায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর বেশিরভাগই এখনও ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে পায়নি। ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসনের আগে বসতবাড়ি উচ্ছেদ হবে না বলে জানানো হলেও বৃহস্পতিবার থেকে হঠাৎ শুরু হয় বুলড্রোজারের দাবড়ানি।

এ অবস্থায় টানেল প্রকল্পে উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়া বৈরাগ ইউনিয়নের বৈরাগ, মোহাম্মদপুর, বন্দর এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় কান্নার রোল। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নির্দেশে সবগুলো পক্ষের সমন্বয়ে মন্ত্রণালয়ে জরুরী বৈঠক ডাকা হয়েছে। আগামী বুধবার (২০ মার্চ) বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে উচ্ছেদ কার্যক্রম।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়া এলাকাটির বেশিরভাগ পরিবারই হতদরিদ্র। নানা জটিলতায় ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি অনেকে । এ অবস্থায় কোথাও বাসা ভাড়া করে থাকবে সেই সামর্থ্যও নেই তাদের। বাপ-দাদার ভিটে ছাড়ার নোটিশ পাওয়ার পর শুক্রবার মসজিদে জুমার নামাজে অনেক মুসল্লিকে অঝোরে কাঁদতে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ মালপত্র গুছিয়ে আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অভিযান কয়েক দিনের জন্য স্থগিত হওয়ার খবরটি এলাকায় জানাজানি হলে কিছুটা স্বস্থি ফিরে আসে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব প্রদীপ দাশ জানান, বঙ্গবন্ধু টানেলের ক্ষতিগ্রস্থদের পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণের নানা জঠিলতা নিরসন ও বিভিন্ন অভিযোগের সমাধানকল্পে মাননীয় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপির নির্দেশনায় আগামী ২০ মার্চ দুপুরে মন্ত্রণালয়ে জরুরী বৈঠক আহবান করা হয়েছে। বৈঠকে টানেল কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্থদের প্রতিনিধি সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা উপস্থিত থাকবেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত না আসাা পর্যন্ত উচ্ছেদ কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী।

টানেল প্রকল্পের উপ-পরিচালক ড. অনুপম সাহা বলেন, টানেল কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ সকলের টাকা জেলা প্রশাসনকে হস্তান্তর করেছে। মামলা সংক্রান্ত কারণে কারো কারো টাকা পেতে দেরি হচ্ছে। এতে আতংকিত হওয়ার কোন কারণ নাই। প্রকৃত ভূমির মালিককে ভূমি ও অবকাঠামো মূল্য পরিশোধে সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

টানেল প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুনর্বাসনের জন্য ২০ একর জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে।

পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে ক্ষুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্থরা নিজেদের রোহিঙ্গা থেকেও মূল্যহীন বলে আক্ষেপ করেন। স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, খাবার ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের বাসিন্দা হয়েও পুনর্বাসনের আগে বাপ-দাদার ভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, টানেল কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের আশ্বাসের উপর অনেকেই আস্থা রাখতে পারছে না। দালাল মুক্ত ঘোষণা দিলেও পদে পদে হয়রানি হতে হচ্ছে। এখন স্থানীয় সাংসদ  ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদই এসব অসহায় মানুষের ভরসা বলে জানান তিনি।

স্থানীয়রা জানান,  ক্ষতিগ্রস্থরা অনেকেই জীবনে জেলা প্রশাসন বা পটিয়া আদালতে যায়নি। দ্বিমুখী দৌড়াদৌড়ি ও নানা হয়রানীর কারণে দালালদের খপ্পরে পড়তে হচ্ছে।

স্থানীয় পশ্চিম বৈরাগের খলিফা পাড়ার বাসিন্দা মৃত সোলতান আহমদ এর স্ত্রী ইসলাম খাতুন (৭০) বলেন, স্বামীর দুই গন্ডা বসতভিটায় ছেলে মেয়ে নাতি-নাতনি সহ ১৪ জন বসবাস করি। এখন যদি টাকা পয়সা ছাড়াই এ ঘর কেড়ে নেয়া হলে যাওয়ার কোন ঠিকানা থাকবেনা।

তালুকদার বাড়ীর নুর নাহার বেগম বলেন, দুই দিন আগে ঘর ভেঙ্গে ফেলার ভয়ে মালামালগুলো আরেকজনের বাড়ীতে রেখে এসেছি। ভাড়া বাসা খুঁজে পাচ্ছিনা। ছেলে মেয়ে নিয়ে কোথায় যাব। সরকার ঘর দিবে বলেছিল। কিন্তু এখন ঘরের টাকাও দিচ্ছে না।

স্থানীয় কুলাল পাড়ার বাসিন্দা মৃত আলী হোসেন এর স্ত্রী শবে মেহেরাজ খাতুন (৬৫) কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেরা অনেক কষ্ট করে একটি পাকা ঘর করে। কিন্তু টানেল আমাদের জমি-জমা বসতভিটা সব কেড়ে নেয়। জমির টাকা পাইনি। সরকার যদি ঘর আর গাছপালা মূল্যটাও দিত তাহলে ভাড়া বাসা নিয়ে কোথাও চলে যেতাম।

দক্ষিণ বন্দরের হাজী তরফ আলীর বাড়ীর মোঃ সালাম বলেন, সার্ভেয়ার ভূমি জরিপের সময় বসতভিটা ও গাছপালার মূল্য নির্ধারণ করবে জানালেও পরবর্তীতে দেখা যায়, শুধুমাত্র ঘরের মূল্য নির্ধারণ করেছেন। এখন টাকা ছাড়াই উচ্ছেদ নোটিশ পাঠিয়েছে।

হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা মিলন গুপ্ত জানায়, এ এলাকার একটি পরিবারও এখনো বসতভিটা ঘরবাড়ির, গাছপালা, জমির ফসল কোনটার মূল্য পায় নি। জোর করে ফসলসহ জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। এখন ঘর ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বারবার ধরনা দিয়েও আমরা সঠিক ক্ষতিপূরণ পাচ্ছিনা। সর্বত্র চলছে হয়রানি আর নানা টালবাহানা।

হিন্দু পাড়ার বাসিন্দা মিশু গুপ্তা (৩৫) জানায়, বর্তমানে তার স্বামীর দুইটি কিডনিই নষ্ট। ঘরে মাথা গুজার টাই নেই, শুধুমাত্র স্বামীর বসতভিটার ছাড়া। তিনি জানান টাকা ছাড়া যদি তাদের উচ্ছেদ করা হয়। তাহলে স্বামীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি এলাকার মানুষদের বাঁচাতে ভূমিমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বৈরাগ ইউনিয়নের খলিফা পাড়া, নামাজ তালুকদার বাড়ী, কুলাল পাড়া, দক্ষিণ বন্দরের ছিদ্দিক আহমদ এর বাড়ী, তরপ আলীর বাড়ী ও হিন্দু পাড়ার ক্ষতিগ্রস্থ দেড় শতাধিক পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, কুলালপাড়ায় এক ব্যক্তি অর্ধেক ঘরের মূল্য পেয়েছেন। খলিফা পাড়ায় এক ব্যক্তি এক ঘরের মূল্য পেয়েছেন। বাকিরা কেউ এখনো জমি, বসতভিটা, ঘর, গাছপালা কোনটার ক্ষতিপূরণ পায় নি।

ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা:

পশ্চিম বৈরাগের খলিফা পাড়া শফিউল আলম, ফরিদুল আলম, মোঃ শিমুল, গোলাম রসুল, মৌলানা গোলাম কাদের, হাফেজ ফোরক আহমদ, গোলাম রহমান, আবদুল মান্নান, আবুল কালাম, মোঃ সোয়াইব, নজরুল ইসলাম, মোঃ গোফরান, মোঃ ইউনুস, নঈম উদ্দিন, মোঃ এয়াকুব, মোঃ শাহজাহান, মোঃ কায়ছার, হাফেজ মোঃ ইছহাক, মোঃ সোলাইমান, মোঃ বেলাল, মোঃ গিয়াস, মোঃ আলমগীর, জাহাঙ্গীর, রাবেয়া খাতুন, মোঃ এমরান, মোঃ রফিক, মোঃ তৌহিদ, মোঃ রাসেল, আবু তৈয়ব, মোঃ আইয়ুব, বেগম জাকারিয়া, গিয়াসুদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম, নুরুল হুদা।

দক্ষিণ বন্দরের সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী বাড়ীর মোঃ ইছা চৌধুরী, জাহেদুল ইসলাম, ফখরুদ্দিন মুন্না, মোঃ ইউনুস, ফয়সাল, শফি আলম, দিদার আলম, বদি আলম, নুরুল আলম, মনিরুল ইসলাম, মোঃ রফিক, মোঃ জামাল, মোঃ হাশেম, কামাল, মহিউদ্দিন ও মোঃ হাসান, মহিউদ্দিন গং, মোঃ জামাল, সোলাইমান, জসিম উদ্দিন, এস.এম রফিক, মোঃ ইসমাইল, ইলিয়াছ, আবদুস ছালাম, আমিরুজ্জামান, সৈয়দ জামান গং, হাসান চৌধুরী, হাশেম চৌধুরী, দিদার, মোঃ নুরু ফয়সাল, ছাদেক, হাশেম, মনিরুল ইসলাম।

নামাজ তালুকদার বাড়ীর জয়নাল আলী, দরফ আলী, হাসান আলী, মোঃ ইছহাক, আকতার, তাহের, তাজ উদ্দিন, ছমুদা খাতুন, ছেনোয়ারা বেগম, মোঃ নাসির, আবদুর নুর, মো: হাসান, নুর নাহার বেগম।

কুলালপাড়ার শাহ নেওয়াজ, কামাল উদ্দিন, আবদুল কুদ্দুস, আবদুল মজিদ, আবদুল মান্নান, আবদুল হাফেজ, দিদার, দেলোয়ার, আশরাফুজ্জামান, সোলাইমান, হোসনে আরা, ফজলুল করিম, নুর মোহাম্মদ, আলী হোসেন, রফিক আহম্মদ, নবী হোসেন, আকতার হোসেন, মোঃ হোসেন, আবুল হোসেন, জাহেদ হোসেন, শাহাদাত হোসেন, আবুল হাশেম, আবুল কাশেম, মোঃ ফারুক, মোঃ সাব্বির, মোঃ  হারুন, মোঃ  লোকমান, মোঃ  নাসির, আবু তৈয়ব, আবু সিদ্দিক, মোঃ  সেলিম, মোঃ  আরমান, জমির হোসেন, মোঃ সৈয়দ, আবু তাহের, ছাবের আহমদ, শহিদুল্লাহ, আনোয়ার, নুরুল আবচার, ছাবের আহমদ।

দক্ষিণ বন্দর তরফ আলীর বাড়ী জয়নাব আলী গং, শাহজামাল, ওসমান আলী, হোসনে আলী, নুরুল ইসলাম, রহমত আলী, আবদুস ছালাম, আবদুল হাকিম, আবদুর রহমান, বাহার উদ্দিন, সৈয়দুর রহমান, জাহেরা খাতুন, তাহের গং, নুরুল আলম, মোঃ আলী, শাহজামাল, আইয়ুব আলী, আকতার কামাল, মোঃ সালাম, নুরুল ইসলাম।

দক্ষিণ বন্দর হিন্দুপাড়ার সুবল দত্ত, পিযুষ ভৌমিক, কালী বাড়ীর কৃষ্ণ মন্দির, প্রদিপ ভৌমিক, সঞ্জিব ভৌমিক , ত্রিবিদ ভৌমিক, রনজিত গুপ্ত, তিলিক গুপ্ত, মিলন গুপ্ত, ইদুল গুপ্ত, স্বপন গুপ্ত, রনজিত গুপ্ত, সুরেশ্বর সেন, সনজিত, অনজু রানী চৌধুরী, বিমল গুপ্ত, তপন গুপ্ত, মিলন চন্দ্র।

এদের কেউ টাকা পায়নি বলে এ প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগ করেন। তারা ভুমি সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে ভোগান্তি হলেও অবকাঠামোগত মূল্য পরিশোধের আবেদন জানান।