রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৯

ফেসবুক-ইমো থেকে ওদের প্রতারণা শুরু

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০১৯ রবিবার, ০৮:৩৫ এএম

ফেসবুক-ইমো থেকে ওদের প্রতারণা শুরু

ফেসবুক মেসেন্জার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপসহ নানা মাধ্যমে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ হয়ে প্রতারণা ফাঁদ তৈরি করত ওরা। তারপর দাওয়াত করতো সাজানো-গোছানো বাসায়। সাড়া দিয়ে কেউ সেই বাসায় গেলে আর রক্ষা নাই।  নানা আপত্তিকর ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হতো টাকা।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ এমনই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে, যারা গত পাঁচ বছরে অন্তত ৫০জনকে এভাবে ব্লাকমেইল করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পুলিশ পরিচয়ে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে এক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগে দুই নারীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার মেহেদী হাসান জানান, গত শুক্রবার বিকেলে নগরীর চশমা হিলের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালী থানা পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, নোয়াখালীর হাতিয়ার উত্তর রেহানিয়া গ্রামের মো. রফিকুল মাওলার ছেলে দিদারুল ইসলাম ওরফে দিদার (৩৫), ফেনীর সোনাগাজির মৃত জহিরুল ইসলামের মেয়ে ফাতেমা ইয়াছমিন নিশি (২৮) ও কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার লেমশীখালি গ্রামের মৃত আলি হোছেনের মেয়ে বিথিত মাহমুদ মোস্তফা সিফা (২৩)। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে বায়েজিদ বোস্তামীর শান্তিনগর এলাকার মৃত ফটিক মিয়ার ছেলে আনোয়ার হোসেন আনু (৪৪) ও ফেনীর পাঁচগাছিয়ার ইউনিয়নের মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে রাকিব আল ইমরান (২৬)।

নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ মো. আব্দুর রউফ জানান, নগরীর স্টেশন রোডের নুপুর মার্কেটের দোকানদার মো. ইমরান (৩২) গত ২ মার্চ রাত পৌনে ১০টার দিকে দোকান বন্ধ করে সিএনজি ট্যাক্সিতে করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাচ্ছিলেন। ট্যাক্সি কাজীর দেউড়ির মোড়ে যাবার পর রাস্তায় দাঁড়ানো তিন ব্যক্তি সেটিকে থামার সংকেত দেয়। আর থামার পর তারা পুলিশ পরিচয় দিয়ে ইমরানকে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনে। এরপর কোতোয়ালী থানায় নেওয়ার কথা বলে আরেকটি সিএনজি ট্যাক্সিতে তুলে চোখ বেঁধে নগরীর চশমাহিল এলাকায় একটি বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে নারীর সঙ্গে ইয়াবা দিয়ে আপত্তিকরভাবে তার ছবি তোলে সাংবাদিক পরিচয়ধারী একজন। সেই ছবি ফেসবুক ও ইউটিউবে আপলোডের ভয় দেখিয়ে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরে বিকাশ’র মাধ্যমে তিন দফায় ৫৫ হাজার টাকা আদায় করে ৩ মার্চ বিকেলে ছেড়ে দেয়।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন  বলেন, ‘ঘটনার ৬ দিন পর শুক্রবার দুপুরে ইমরান থানায় এসে মামলা দায়ের করে। এরপরই আমরা আসামিদের গ্রেফতারে অভিযানে নামি। পাঁচজনকে গ্রেফতার করতে পারলেও কামরুল হাসান নামে একজন এখনও পলাতক আছে।’

ওসি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছি- ইমরানকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়েছিল দিদার, কামরুল ও রাকিব। চশমা হিলের বাসায় আগে থেকে অবস্থান করছিল নিশি ও সিফা। একপর্যায়ে আসে আনোয়ারও। সিফাকে ইমরানের পাশে বসিয়ে আপত্তিকর ছবি তোলা হয়। এসময় ইমরান ছবি তুলতে না চাইলে আনোয়ার তাকে মারধর করে। পরে ইয়াবা দিয়েও ছবি তোলা হয়। কামরুল সাংবাদিক সেজে ছবি তোলে। নিশি সেই ছবি ফেসবুক ও ইউটিউবে আপলোডের ভয় দেখায়।’
ইমরানের কাছ থেকে প্রথম দফায় ১০ হাজার, দ্বিতীয় দফায় ১৫ হাজার এবং শেষ ধাপে আরও ৩০ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে জানান ওসি মোহাম্মদ মহসীন।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো.কামরুজ্জামান  বলেন, ‘কয়েকদিন আগে অপরিচিত নম্বর থেকে আসা ফোনকলের মাধ্যমে ইমরানের সঙ্গে নিশি’র পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে মাঝে মাঝে কথাবার্তা হোত। ঘটনার দিন ইমরান যখন দোকান থেকে বেরিয়ে অটোরিকশায় উঠে, তখন নিশি’র ফোন আসে এবং ইমরান তার গন্তব্যের বিস্তারিত নিশিকে জানান। এভাবে ইমরানকে বহনকারী অটোরিকশাটি টার্গেট করে অপহরণকারীরা। চশমা হিলের বাসায় নেওয়ার পর ইমরান প্রথম নিশিকে দেখেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। গত পাঁচ বছর ধরে এই ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে। এর আগে একবার পাহাড়তলী থানায় গ্রেফতার হয়েছিল এই চক্রের কয়েকজন। গত পাঁচ বছরে তারা কমপক্ষে ৫০টি অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রতিমাসে অন্ত:ত একটি অপরাধ তারা করে। চক্রের মূল হোতা হচ্ছে দিদার ও নিশি। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নেয় এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে টাকা আদায় করে। বাস্তবে তারা স্বামী-স্ত্রী নয়। আর আনোয়ার এই অপরাধী চক্রের গডফাদার হিসেবে কাজ করে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা  জানান, আনোয়ার হোসেন নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় নিজেকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচয় দেয় এবং এলাকায় সে খুবই প্রভাবশালী। নগরীতে এই ধরনের অসংখ্য অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।