শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিমান ছিনতাইকারী নিহত, ৮ মিনিটে শেষ

আজাদ মঈনুদ্দীন, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার, ০৯:৩৭ পিএম

বিমান ছিনতাইকারী নিহত, ৮ মিনিটে শেষ

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিনামবন্দরে বিমান ছিনতাই নাটকের অবসান হয়েছে। সেনাবাহিনীর চৌকষ কমান্ডো টিমের মাত্র ৮ মিনিটের অভিযানে কথিত ওই বিমান ছিনতাইকারীর মৃত্যু হয়। তার নাম মাহাদি বলে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত পরিচয় নিশ্চিত করে বলতে পারেনি কোন সূত্র।

বিমানের সব যাত্রী, পাইলট ও ক্রু-দের নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে।

সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম জোনের জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমান বলেন, ঢাকা হলি আর্টিজানে দূ:সাহসিক অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কমান্ডো টিমের প্রধান লে. কর্ণেল ইমরুলের নেতৃত্বে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযান শুরু আগে বিমান বাহিনী চট্টগ্রাম  ঘাঁটির প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান প্রথমে ওই দুষ্কৃতিকারীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়ার সুযোগে যাত্রীদের নিরাপদে বের করে আনা হয়।

জিওসি বলেন, এ ধরনের যে কোন অভিযানে দুটি কৌশল থাকে। দুষ্কৃতিকারীদের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া ও জিম্মিদের নিরাপদে উদ্ধার। দু’টি কাজই সফলতার সঙ্গে করা সম্ভব হয়েছে। ছিনতাইকারীকে প্রথমে আত্মসমর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সে তাতে রাজী না হয়ে চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। যে কারণে বাধ্য হয়ে গুলি করতে হয়। গুলিতে প্রথমে সে আহত হয়। বের করে আনার পর তার মৃত্যু হয়। মাত্র ৮ মিনিটের মধ্যে পুরো অভিযান শেষ হয়।

অস্ত্রধারী সম্পর্কে মেজর জেনারেল মতিউর রহমান বলেন, প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল সে বিদেশি। কিন্তু পরে দেখা গেলে, সে বাংলাদেশি। তার হাতে একটি অস্ত্র ছিল— পিস্তল। তার বয়স ২৫ থেকে ২৬ বছর।

কেন ছিনতাই চেষ্টা 

জিওসি মেজর জেনারেল মতিউর রহমান বলেন, ছিনতাইকারীর সঙ্গে খুব বেশি কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে সে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ চেয়েছিল। এক পর্যায়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। হয়ত পরে সে স্ত্রীর মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য নাম ঠিকানা দিত। কিন্তু তার আগেই সে মারা গেছে।

বিমান বাহিনী চট্টগ্রাম  ঘাঁটির প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, তাকে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ মনে হয়েছে। হাতে একটি পিস্তল ছিল। সে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কী কথা বলতে চেয়েছিলে এ বিষয়ে কিছু জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার নাম মাহাদি বলে জানিয়েছিল।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)  চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. নাইম হাসান বলেন, বিমানবন্দরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক। চার ঘন্টা পর বিমান উঠানামা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত কারণে সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাকে মানসিক সমস্যাগ্রস্থ মনে হয়েছে। বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেল জানিয়েছে, এক নায়িকার সঙ্গে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে।

বিমানের বিজি-১৪৭ ফ্লাইটটি রোববার ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে নামার পর এটি ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি আকমল হোসেন বলেন, “ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার পর একজন যাত্রী ককপিটে ঢুকে পাইলটকে পিস্তল ধরে বলে, আমাকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলিয়ে দিতে হবে। পাইলট ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চট্রগ্রামে অবতরণ করান।”

ওই উড়োজাহাজে দেড়শ যাত্রীর সঙ্গে থাকা সংসদ সদস্য মইন উদ্দিন খান বাদল বলেন, “পাইলট আমার সঙ্গে নেমে এসেছিল। সে বলেছে, তাকে পারসু করার চেষ্টা করেছে হাইজ্যাকার, বলছে সে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে চায়।

“সমস্ত যাত্রীরা সেইফ এবং ওই হাইজ্যাকারকে নামানোর চেষ্টা হচ্ছে,” বলেন তিনি।

অভিযানে কমান্ডো, বিমানবাহিনী, র‌্যাব, সোয়াট

চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমান বন্দরে সন্ত্রাসীর কবল থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিমানটি উদ্ধারে অভিযানে সেনাবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো, বিমান বাহিনী, র‌্যাব ও সোয়াট অংশ নেয় বলে জানান সেনাবাহিনীর জিওসি। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২২ সদস্যের একটি সোয়াড কমান্ডো টিম কাজ করেছে। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এই টিমের সদস্যরা ঘটনার পরপরই বিমানবন্দর রানওয়েতে অবস্থান নেন ও পরে অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী ব্যক্তিটিকে আটক করেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায়  অভিযান

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সেনা কমান্ডোরা চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিযান পরিচালনা করেছে বলে জানিয়েছেন অভিযানের নেতৃত্বে থাকা এয়ার ভাইস মার্শাল মুফিদুল আলম।তিনি বলেন, অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী বিমানটিকে জিম্মি করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিষয়টি জানানো হয়। সেখান থেকেই অভিযানের নির্দেশনা আসে। সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করেছি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মফিদুল আলম বলেন, অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তি এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার দাবি জানায় আমাদের কাছে। তবে সেনা কমান্ডোদের বিশেষ অভিযানে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী পরাভূত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর স্বাভাবিক

প্রায় চার ঘন্টা বন্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্তিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে। ছিনতাইকারীর কবলে পড়া বিমানে তল্লাশির পর বিমানটি নিরাপদ বলে জানানো হয়েছে।

ছিনতাই চেষ্টা যেভাবে

রোববার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওই ফ্লাইট জরুরি অবতরণ করে শাহ আমানত বিমানবন্দরে। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্রধানী একজন উড়োজাহাজটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছেন। ওই ফ্লাইটের যাত্রীরা সবাই বেরিয়ে আসতে পারলেও দু’জন কেবিন ক্রু ভেতরে আটকা পড়েন। এসময় উড়োজাহাজটি ঘিরে রাখে পুলিশ, র‌্যাব, এপিবিএনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বিমানটি বাংলাদেশ বিমানের ৭৩৭-৮০০ মডেলের বিমান বলে জানা গেছে। ময়ূরপঙ্খী বিমানটি রোববার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে জরুরি অবতরণ করে।

অসমর্থিত সূত্রের খবর, দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের ওই ফ্লাইটটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা হয়। বিমানের এক যাত্রী পিস্তল হাতে পাইলটের ককপিটে প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় পাইলট ও কেবিন ক্রুরা ফ্লাইটটি জরুরিভাবে শাহ আমানতে অবতরণ করান।

দুবাইগামী ফ্লাইট ময়ূরপঙ্খীতে যাত্রী হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম ৮ আসনের সংসদ সদস্য মঈন উদ্দীন খান বাদল। তিনি বলেন, ভেতরে একজন হাইজ্যাকার আছে। তিনি বাঙালি। বিমান থেকে সব যাত্রীকে নামানো হয়েছে।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে ১৪৭ জন যাত্রী নিয়ে বিমানটি ছেড়ে যায়। এর মধ্যে ৮৬ জন ছিলেন দুবাইগামী যাত্রী। বাকি ৬১ জন অভ্যন্তরীণ যাত্রী, যাদের চট্টগ্রামে নামার কথা ছিল। আর চট্টগ্রাম থেকে দুবাইগামী বাকি যাত্রীদের ওঠার কথা ছিল। বিমানটির যাত্রী বহনের ক্ষমতা প্রায় আড়াইশ জন।

সারাবেলাে / এএম/ আরএইচ