মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

পাল্টে যাচ্ছে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের নাম

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার, ১১:১৫ পিএম

পাল্টে যাচ্ছে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের নাম

এক সময় ছিল সার্কিট হাউস। পরে তা করা হয় জিয়া স্মৃতি যাদঘর। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি এলাকার পুরাতন এই সার্কিট হাউসেই খুন হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে এটি জিয়ার নামেই নামকরণ করা হয়।  শিক্ষার্থী ও পর্যটকসহ ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরতে চট্টগ্রামের পুরাতন সার্কিট হাউস ভবনের নাম পরিবর্তন চান শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

পুরনো এই সার্কিট হাউসের নতুন নাম হতে যাচ্ছে  ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর’ ।  মন্ত্রিসভায় নওফেলের প্রস্তাবটিতে সমর্থন জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীর, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ।

এদিকে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এই প্রস্তাব করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে নীতিগত সমর্থন দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এ বিষয়ে সরকারকে প্রস্তাব দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে সংসদেও প্রস্তাব আকারে উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন।

বৈঠকের পর মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমি মন্ত্রিসভায় নাম পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরেছি। প্রধানমন্ত্রীও নীতিগতভাবে সমর্থন দিয়েছেন।সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে এই বিষয়ে চিঠি দেব, যাতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয় এবং কাজটি দ্রুত শুরু করা হয়।

শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান নওফেল বলেন, এই ভবনটিকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর করার প্রস্তাব দেওয়া হবে। একাত্তরে এই সার্কিট হাউসটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এখান থেকেই তারা পুরো শহর নিয়ন্ত্রণ করত। সার্কিট হাউসের বিশেষ কয়েকটি কক্ষে মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষ ও নারীদের নির্যাতন করা হতো। ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে শক দিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন করা হত মুক্তিকামী বাঙালিদের। নির্যাতনের পর তাদের হত্যা করা হত। এখানে গণকবর রয়েছে। রয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সরঞ্জাম। এসব ইতিহাস ম্লান করে করে দিয়ে এই ভবনটিকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর করা হয়েছে। কিন্তু, জাতিকে সঠিক ইতিহাস জানাতে এটিকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি যাদুঘরে রূপান্তর করবো।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘ভবনটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত। এটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত। এক সময় সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস। এখানে মুক্তিযুদ্ধের নির্মম ঘটনার অনেক স্মৃতি থাকলেও সাধারণ জনগণের তা জানার তেমন ব্যবস্থা নেই। মানুষ কেবল জেনেছে, পরবর্তী সময়ে এখানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডটিই কেবল মানুষের সামনে আসে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাস জিয়া স্মৃতি জাদুঘর নাম দিয়ে জানানো সম্ভব নয়।এসব কারণেই ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের নাম বদলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করা হবে।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার বিষয়ে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আরও বলেন, ‘শিশু, শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের  মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার প্রস্তাব দেওয়া হবে।’

উপমন্ত্রী আরও জানান, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সরঞ্জাম রয়েছে সেখানে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই সার্কিট হাউসের একটি কক্ষে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পুরো সার্কিট হাউসজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছড়িয়ে থাকায় বৃহত্তর কারণে এটির নাম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর রাখার প্রস্তাব করা হবে।

নওফেল প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে  বলেন,  জিয়াউর রহমান সার্কিট হাউসে এসে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯১ সালে তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর সেটিকে আকস্মিকভাবে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করেন, যা চট্টগ্রামের আপামর মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা মেনে নেননি। সেখানে জিয়াউর রহমানের কোনো স্মৃতিও নেই। শুধু ১৯৭১ সালে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে যে ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে প্রচার হয়েছিল, সেটি এনে সেখানে রাখা হয়েছে। তাহলে জিয়াউর রহমানের নামে কেন জাদুঘর হবে?

এ সময় নওফেল আরও বলেন, দর্শনীয় স্থান হলেও জিয়ার নামে স্থাপনা হওয়ায় সেখানে চট্টগ্রামের মানুষ যান না। অথচ এটিকে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি জাদুঘর করে একটি সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তর করা হলে এটি দেশের সম্পদে পরিণত হবে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এটা তো এখনও একটা জাদুঘর আছেই। সেটা তো মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান জাদুঘর। এটাকে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর করার কী আছে। দেশে থেকে জিয়াউর রহমান নাম মুছে ফেলার সর্বোত চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু তারা চেষ্টা করলেও এটাকে জনগণ ভালোভাবে নেবে না। জনগণের হৃদয় থেকে জিয়াউর রহমানের নাম মোছা যাবে না। চট্টগ্রামের প্রত্যেকটা ধূলিকণায় জিয়াউর রহমানের নাম আছে। সেই চট্টগ্রামের একটি সার্কিট হাউজ থেকে জিয়াউর রহমান নাম মুছে দিয়ে জনগণের মন থেকে তার নাম মোছা যাবে না। এটা করলে সরকার ভুল করবে। এটা জনগণ গ্রহণ করবে না। যদিও এই সরকার জনগণ কোনটা গ্রহণ করলো আর কোনটা করলো না তার পরোয়াই করে না।

১৯১৩ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কাজির দেউড়ি এলাকায় তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন নির্মাণ করে। পরে এটি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য ব্যবহৃত হয়।