বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

পরকীয়া : রাউজানের নাছিমার ১৪ মাসের অপহরণ-চুরি নাটক !

প্রতিনিধি, রাউজান (চট্টগ্রাম)

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সোমবার, ০৯:০২ এএম

পরকীয়া : রাউজানের নাছিমার ১৪ মাসের অপহরণ-চুরি নাটক ! আটক নাছিমা ও তার প্রেমিক ছাদেক

২০১৭ সালে পরকীয়ার টানে স্বামীর ঘর ছেড়েছিল দক্ষিণ রাউজানের চৌধুরীহাট ঘাটকূল এলাকার প্রবাসী এয়াকুব আলী প্রকাশ শেখ আহমদের স্ত্রী নাছিমা আকতার (২৮)। ঘরে দুই অবুঝ সন্তানকে রেখে নাছিমা পাড়ি জমায় সিএনজি টেক্সি ছালক আবু ছাদেকের সাথে।

সাদেকের বাড়িও একই এলাকায়। অপরদিকে নাছিমা দক্ষিণ রাউজানের গশ্চি নয়াহাট এলাকার মৃত আবদুল কাদেরের মেয়ে। 

নাছিমা পালিয়ে যাওয়ার পর তার ভাবি এ ঘটনায় অপহরণ নাটক সাজায়। ননদকে অপহরণ করে লাশ গুম করা হয়েছে-এমন অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেন তার ভাবী। মামলায় নাছিমার ভাসুর জালাল, সিএজি চালক ছাদেকসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। এদিকে নাছিমার সাবেক স্বামী এয়াকুব গত ১৬ অক্টোবর দেশে এসে আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে তার স্ত্রীর ঘর ছাড়ার বর্ণনা শুনেন। এবার তিনি ৯ লাখ টাকা ও ১৮ ভরি স্বর্ণ চুরি করে পালানো অভিযোগে স্ত্রী নাছিমা ও সিএনজি চালক ছাদেকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করেন।

এ মামলায় অন্য আসামিরা জামিন নিলেও নাছিমা ও ছাদেক আদালতে যাননি।

চুরির মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির জাবেদ মিয়া বলেন , ৯ ফেব্রুয়ারি চন্দনাইশের একটি ভাড়া বাসা থেকে নাছিমা ও ছাদেককে আটক করে রাউজান থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর বেরিয়ে আসতে থাকে নেপথ্যের কাহিনি। নাছিমা নিজেই স্বীকার করেছে কোন অপহরণ নয়, ছাদেককে ভালবেসেই সে স্বামীর ঘর ছেড়েছিল।এর মাধ্যমে দীর্ঘ ১৪ মাস পর অপহরণ-চুরি রহস্য উদঘাটন হলো।

রাউজান থানা সূত্র জানায়,  ‘গত ১৭ সালের ২১ নভেম্বর বাগোয়ান ইউনিয়নের দেওয়ানপুর গশ্চি আজিজ চেয়ারম্যানের বাড়ির সফিউল আলমের স্ত্রী নাসরিন সোলতানা পারুল (৩৫) তার ননদ ভিকটিম নাছিমা আক্তারকে অপহরণের অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুানালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৬৯৪/২০১৭ইং। মামলায় আসামি দেয়া হয় কথিত অপহৃত নাছিমার ভাসুর নোয়াপাড়া রহুল আমিন সওদাগর বাড়ির মৃত হাজী আবদুর রহমানের ছেলে জালাল আহমদ (৪৭), তার স্ত্রী নাছিমার জা রোকসানা আক্তার (৩৫), নোয়াপাড়া চৌধুরী ঘাটকূল ফুলমিয়া বাবুর্চির বাড়ির মো. হাবিবুল্লাহর ছেলে সিএনজি ট্যাক্সি চালক মো. ছাদেক (৩২) ও তার ভাই নুরুল ইসলাম (৪৭)।

মামলায় বাদি অভিযোগ করেন ৮-৯ বছর আগে নোয়াপাড়া ইউনিয়নের চৌধুরী হাট রহুল আমিন সওদাগরের বাড়ির মৃত হাজী আবদুর রহমান প্রকাশ এলাহি বক্সের ছেলে মো. এয়াকুব আলী প্রকাশ শেখ আহমদের সঙ্গে তার ননদ বাগোয়ান ইউনিয়নের গশ্চি আজিজ চেয়ারম্যান বাড়ির মৃত আবদুল কাদেরের মেয়ে নাছিমা আক্তারের বিয়ে হয়। তাদের তাদের দুটি সন্তানও রয়েছে। পারিবারিক বিরোধের জের ধরে নাছিমা আক্তারকে জোরপূর্বক অপহরণ করে অজ্ঞাতস্থানে আটকিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত কিংবা লাশ গুম করেছে।

অপরদিকে ভিকটিমের স্বামী এয়াকুব আলী প্রকাশ শেখ আহমদ (৪৫) প্রবাস থেকে এসে গত ১৮ সালের ২২ নভেম্বর রাউজান থানায় চুরির মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী নাছিমা আক্তার, তার কথিত প্রেমিক সিএনজি ট্যাক্সি চালক মো. ছাদেক, অপহরণ মামলার বাদি নাছিমার ভাবী নাসরিন সুলতানা পারুলসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে। এ মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন সিএনজি ট্যাক্সি চালক ছাদেকের ভাই নুরুল ইসলাম, মা মমতাজ বেগম, নাছিমার মো. নাছের।

শেখ আহমদ মামলায় অভিযোগ করেন প্রেম-ভালোবাসার কারণে গত ১৭ সালের ৬ অক্টোবর ভোর ৪-৭টার মধ্যে প্রেমিক ছাদেকের সিএনজি ট্যাক্সি করে তার সঙ্গে পালিয়ে গেছে। ওইসময় নাছিমা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, মূল্যেমান কাপড়চোপড় চুরি করে নিয়ে যায। এই ঘটনায় সহায়তা করে অন্যান্য আসামিরা।

একদিকে স্বামীর চুরির মামলা, অন্যদিকে কথিত ভিকটিম নাছিমা আকতারের ভাবীর অপহরণ মামলা- এমন রহস্যজনক ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদঘাটনে পুলিশ তৎপর হয়ে উঠে। দীর্ঘদিন পুলিশ নাছিমা ও তার প্রেমিক ছাদেকের খোঁজ না পাওয়ায় মামলার তদন্ত দেয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভিস্টিকেশন (পিবিআই)’কে।

অবশেষে নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ জাবেদ মিয়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে গত শনিবার রাতে চন্দনাইশ উপজেলার একটি ভাড়াবাসা থেকে ভিকটিম নাছিমাকে উদ্ধার ও প্রেমিক ছাদেককে আটক করে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শেখ জাবেদ মিয়া বলেন, অপহরণ মামলায় ভিকটিম নাছিমের উদ্ধার দেখানো হলেও তাকে তার স্বামীর চুরির মামলায় কোর্টে চালান করা হয়েছে। এছাড়া নাছিমার সঙ্গে ভাড়াবাসা থেকে ধৃত ছাদেক নাছিমাকে অপহরণ মামলার পিবিআই কর্তৃক ওয়ারেন্টভূক্ত আসামি। তাছাড়া নাছিমার স্বামীর দায়ের করা চুরি মামলার আসামিও সে। একারণে ছাদেক-নাছিমা দু’জনকে কোর্টে প্রেরণ করা হয়েছে।’

এদিকে  রবিবার দুপুরে থানা হেফাজতে নাছিমা সাংবাদিকদের বলেছেন তাকে কেউ জোরপূর্বক নেয়নি। তার সঙ্গে সিএনজি ট্যাক্সি চালক মো. ছাদেকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল, সেই সূত্রে তারা দু’জনে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে এবং দু’জনে বিয়েও করেছে। ছাদেকও দু’জন দু’জনকে বিয়ে করেছে বলে সাংবাদিকদের জানান।

কথিত অপহরণ মামলার আসামি জালাল আহমদ ও রোকসানা আকতারের স্বজনরা অভিযোগ করেন নাছিমা, ছাদেক প্রেমের সম্পর্কের কারণে পালিয়ে গেলেও অপহরণ মামলা দিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড়বছর ধরে হয়রানি করেছে নাছিমার ভাবী নাসরিন সোলতানা পারুল।