মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের খনন কাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বৃহস্পতিবার, ০৯:১৯ এএম

২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের খনন কাজ উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেলের মূল কাজ শুরু নিয়ে অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) এর মাধ্যমে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি নদীগর্ভে আনুষ্ঠানিকভাবে খনন কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কাজের উদ্বোধন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে সম্মতি পাওয়ার পর এর মধ্যে প্রস্তুতি শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।

টানেল প্রকল্পের পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি টিবিএম দিয়ে টানেল খনন কাজের উদ্বোধন করবেন। এ উপলক্ষে তাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। সেতু সচিব ও সেতু ভবনে ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীরা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন।

জানা যায়, নদীর তলদেশে ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরে মূল টানেলের হবে ১২ মিটার আকারের। এই টানেল নির্মাণে চীন থেকে আনা টিবিএম দিয়ে পরীক্ষামূলক খনন করা হয়েছে। তা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় পুরোদমে খনন শুরু করতে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

সেতু মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, টানেল বোরিং মেশিন দিয়ে খনন শুরুর জন্য ‘ওয়ার্কিং শাফট’ এবং প্রয়োজনীয় ‘কাট এন্ড কাভার’ অংশ নির্মাণ করা হয়েছে। চীনের জিয়াংসু প্রদেশের জিংজিয়ান শহরে টানেল সেগমেন্ট কাস্টিং প্লান্টে  সেগমেন্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। গত বছর পর্যন্ত ৪২৫০ টি সেগমেন্ট নির্মান সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে ২০৬৮ টি সেগমেন্ট চট্টগ্রাম সাইটে পৌঁছেছে।

মূল কাজ শুরু নিয়ে কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ে পতেঙ্গা ও আনোয়ারা অংশে টানেল এলাকায় এখন দারুন ব্যস্থতা। রাত-দিন একাকার। টানেল প্রকল্পে এর মধ্যে বিদ্যুতের সংযোগ হয়ে গেছে। পতেঙ্গায় ৩৩ কেভি ও দুটি ১১ কেভি ক্ষমতার লাইন স্থাপনের কাজ শেষ। আনোয়ারা প্রান্তে দুই মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোগের কাজও হয়ে গেছে।দুই প্রান্তে পাইলিং , মাটি সরানো ও মাটি শক্ত করার নানা প্রক্রিয়া। চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আড়াইশ কনসালটেন্টসহ ১ হাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।

তলদেশে খননের জন্য ভূ–পৃষ্ঠ থেকে ২৫ মিটার গভীরতা সম্পন্ন ওয়ার্কিং শেফটের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এ ওয়ার্কিং শেফটেই বোরিং মেশিন বসিয়ে খনন কাজ করা হবে। এছাড়া ভূ–গর্ভস্থ স্ট্রাকচারাল উপাদানগুলোকে ধরে রাখার স্থায়ী পদ্ধটি ১২ দশমিক ২ মিটার ডায়াফ্রাম ওয়ালের মূল অবকাঠামোর নির্মাণ কাজও সম্পন্ন । উভয় পাড়ে নির্মাণ করা হয়েছে দুটি জেটি।

বিশেষজ্ঞরা জানান, মূল বোরিং কাজ শুরু করা হলে তা বন্ধ করা যায় না। এ কারণে প্রস্তুতিতে যাতে কোন ঘাটতি না থাকে সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নদীগর্ভে খননেনর কাজ শুরু না হলেও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মিলিয়ে টানেল প্রকল্পে ৩০ শতাংশের মত কাজ হয়ে গেছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।
                        
২০১৬ সালেল ১৪ অক্টোবর কর্ণফুলী নদীর তলদেশে স্বপ্নের টানেল নির্মাণ  কাজের যৌথভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা রাষ্ট্রপতি শিং জিনপিং। সেই থেকে দুই বছরের বেশি সময় হয়ে গেলেও মাঝখানে বিভিন্ন কারণে কাজের গতি ছিল শ্লথ। গত জুলাই মাসে খননের মূল যন্ত্র টিবিএম বাংলাদেশে আসার পর কাজের গতি বেড়েছে কয়েকগুণ। চীনের সাংহাই বন্দর থেকে জাহাজের মাধ্যমে টিবিএম মেশিনটি দেশে পৌঁছে। এই খনন যন্ত্রটি এতটাই বিশাল যে, তা খোলা যন্ত্রাংশ আকারে আনা ছাড়া বিকল্প ছিল না। এক বছর আগে মেশিনটি আসার কথা থাকলেও বার বার তা পেছানো হয়। যে কারণে মূল খনন কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়।

গত মার্চ মাসে সেতু প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চীনের জিয়াংসু প্রদেশের চাংশু শহরে টিবিএম মেশিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে আসেন। চট্টগ্রামে এনে এর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জোড়া লাগাতে লেগেছে ৪ মাসেরও বেশি। ২৫০ ফুট বা ৯২ মিটার দৈর্ঘ্যের এ বোরিং মেশিনের ব্যাস ১২ মিটার। এটির উচ্চতা একটি চারতলা ভবনের সমান। দৈত্যকায় এই যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিদিন ছয় থেকে সর্বোচ্চ আট মিটার পর্যন্ত নদীর তলদেশে বোরিং করা যাবে।

সরেজমিন দেখা যায়, নদীর উত্তর পাড়ে পতেঙ্গার বিশাল এলাকা টিন দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রবেশাধিকারও সংরক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকল্পে চারটি খননযন্ত্রের মাধ্যমে চলছে ড্রেজিংয়ের কাজ। শেষ হয়েছে ডিএপি সার কারখানা ও কাফকোর মাঝামাঝি মাঝের চর এলাকায় প্রকল্পের সাইট অফিস, আবাসস্থল ও যন্ত্রপাতি রাখার জন্য মাটি ভরাটের কাজ।  একইভাবে নদীর উত্তরপাড়ে পতেঙ্গায় নির্মাণ সরঞ্জাম রাখা ও আবাসনের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণে চীন থেকে এসেছে দুই জাহাজ উপকরণ।  

প্রস্তাবিত টানেল চট্টগ্রাম বন্দরনগরীকে কর্ণফুলী নদীর অপর অংশের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করবে এবং পরোক্ষভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাধ্যমে সারা দেশের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। টানেলের প্রবেশ পথ হবে এয়ারপোর্ট থেকে কর্ণফুলী নদীর ২ কিলোমিটার ভাটির দিকে নেভি কলেজের সামনে। তারপর আডাই কিলোমিটার মাটির তলদেশ দিয়ে চার লেনের সড়ক যাবে। টানেলের বহির্গমন পথ হবে আনোয়ারা প্রান্তে  সারকারখানার কাছে।

এর মধ্যে আনোয়োরা প্রান্তে ৭০০ মিটারের একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে।যা আনোয়ারা চাতুরী চৌমুহনীতে এসে চট্টগ্রাম আনোয়ারা বাঁশখালী পিএবি সড়কের সাথে মিলিত হবে। টানেলের প্রবেশ প্রান্ত মিলিত হবে নগরীর পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি পয়েন্ট থেকে।

নদীর তলদেশে এর গভীরতা হবে ৩৯ ফুট (১২ মিটার) থেকে ১১৮ ফুট (৩৬ মিটার)। মোট দুটি টিউব নির্মিত হবে। এর একটি দিয়ে গাড়ি শহরপ্রান্ত থেকে প্রবেশ করবে, আরেক টিউব দিয়ে ওপার থেকে শহরের দিকে আসবে। টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার বা ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় হবে ৪ দশমিক ৮ মিটার বা প্রায় ১৬ ফুট। একটি টিউবে বসানো হবে দুটি স্কেল। এর উপর দিয়ে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। পাশে হবে আরো একটি টিউব। মাঝে ফাঁকা থাকবে ১১ মিটার। যে কোনো বড় যানবাহন দ্রুত ও খুব স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারবে এই টানেল দিয়ে।

সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, ১০ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ করতে  ৫ বছর সময় লাগতে পারে। তবে মূল কাজ ৪ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।