রোববার, ২৪ মার্চ ২০১৯

নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে ড. হাছান মাহমুদ

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০১৯ সোমবার, ১২:৫৪ এএম

নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে ড. হাছান মাহমুদ

পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ড. হাছান মাহমুদ । আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রশংসিত হয়েছেন। কাজ করেছেন আওয়ামীলীগের মুখপাত্র হিসাবেও। শিক্ষকতাও করেছেন কিছুদিন। এবার তিনি কাজ করতে যাচ্ছেন কিছুটা অন্যরকম দপ্তরে। ডাক পেয়েছেন নতুন সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসাবে।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থেকে পর পর তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. হাছান মাহমুদকে সরকারের তথ্যমন্ত্রী করার খবরে তাঁর নির্বাচনী এলাকা রাঙ্গুনিয়া উপজেলা ও বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরন্ধীপ ইউনিয়নের দলীয় নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে আনন্দের বন্যা ও উচ্ছ্বাস বইছে। রবিবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ খবর প্রচারিত হলে রাঙ্গুনিয়াবাসী আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে একে অপরকে মিষ্টি বিতরণ করেন।

ড. হাছান মাহমুদ এমন সময়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ,যখন তথ্য প্রযুক্তি আইনসহ আরো কিছু বিষয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে অস্বস্থি কাজ করছে। তবে সাংবাদিকদের সঙ্গে বরাবরই সু-সম্পর্ক থাকায় নতুন চ্যালেঞ্জ বেশ ভালভাবেই মোকাবেলা করবেন বলে ধারণা তার ঘনিষ্ঠজনদের।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ড. হাছান মাহমুদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও করছেন পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে। ১৯৬৩ সালের ৫ জুন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সুখবিলাস গ্রামে জন্ম নেয়া ড. হাছান মাহমুদ অনেক বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে আজকের অবস্থানে উঠে এসেছেন।

চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল থেকে ১৯৭৮ সালে এসএসসি পাশ করে তৎকালীন ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে মহসীন কলেজ) ভর্তি হয়ে ওতপ্রোতভাবে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। নির্বাচিত হন কলেজ ছাত্রলীগের সেক্রেটারি। এরপর ইন্টারমিডিয়েট কলেজ এবং ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ একীভূত হয়ে মহসীন কলেজ হলে সেই কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হন। একই সময়ে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৮০ সালে মহসীন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাশ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সালে চাকসু নির্বাচনের জন্য গঠিত সর্বদলীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত হন। রসায়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন কিছুদিন। সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের।

উত্তাল ছাত্ররাজনীতির পাঠ চুকিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য একসময় ইউরোপ চলে যান। ভর্তি হন বিশ্বের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ভ্রিজে ইউনিভার্সিটি ব্রাসেলসে। পাশাপশি বেলজিয়াম আ.লীগকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। নির্বাচিত হন বেলজিয়াম আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক। ব্রিজে ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়া ভিত্তিক স্টুডেন্ট ফোরামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এসময় ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। পড়াশোনা শেষে বেলজিয়ামের লিমবার্গ ইউনিভার্সিটি সেন্টাম-এর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ড. হাছান মাহমুদ।

পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ডাকে সাড়া দিয়ে বিদেশে শিক্ষকতার চাকরি ফেলে দেশে ফিরে আসেন। এসেই জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির (২০০১ সাল) সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর যোগ দেন আ.লীগ সভানেত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে। কিছুদিনের মাথায় আ.লীগের সম্মেলনে তিনি বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সে দায়িত্ব পালন করেন ড. হাছান মাহমুদ। আ.লীগ সভানেত্রীর বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করেন ২০০৮ সাল পর্যন্ত।

এরইমধ্যে দেশে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন খ্যাতিমান পরিবেশবিদ হিসেবে সুপরিচিত হয়ে উঠেন। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন কপ-১৫ (মেক্সিকো), কপ-১৬ (ডেনমার্ক), কপ-১৭ (ডারবান), কপ-১৮ (দোহা), কপ-১৯ (পোল্যান্ড), কপ-২০ (লিমা), কপ-২১ (প্যারিস), কপ-২২ (মরক্কো) এ বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব করেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হন। বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকিজনিত বিষয়াবলী বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরে জলবায়ু মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রতি ধনী রাষ্ট্রগুলোর সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরিবেশে অনন্য অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক গ্রিন স্টার পদকেও ভূষিত হন এ আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিজ্ঞানী।

ড. হাছান মাহমুদ ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী জরুরি অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে পরিচিতি পান। আ.লীগের বাঘা বাঘা অনেক নেতা যখন আত্মগোপনে, অথবা সংস্কারপন্থীর ভূমিকায় তখন তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেত্রীর পক্ষে গণমাধ্যমে সরব ভূমিকা পালন করেন।

২০০৮ সালে যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে প্রথমবার সাংসদ নির্বাচিত হন হাছান মাহমুদ। এরপর প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া ড. হাছান মাহমুদকে পরবর্তীতে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হয়।

গত ৫ বছর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ড. হাছান মাহমুদ। এই সময়ে দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সফলতার সঙ্গে কাজ করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন তিনি।

ড. হাছান মাহমুদ পরপর দুই কমিটিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পান। বর্তমানে প্রচার সম্পাদকের পাশাপাশি দলের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. হাছান মাহমুদ। এর আগে পরিবেশ বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ স্টাডিস বিষয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি এবং নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন

গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী আংশিক) সংসদীয় আসনে হ্যাট্রিক বিজয় অর্জন করেন ড. হাছান মাহমুদ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৩৬ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সৎ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এ রাজনীতিক।

এরপর আবারও পূর্ণ মন্ত্রী হলেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। এবার চট্টগ্রাম-৭ আসনের এই সংসদ সদস্য একাদশ জাতীয় সংসদে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।

ড. হাছান মাহমুদ চট্টগ্রামের খ্যাতিমান আইনজীবী প্রয়াত নুরুচ্ছফা তালুকদারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তার বাবা চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং দুই মেয়াদে চট্টগ্রাম আদালতের পিপি ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ড. হাছান মাহমুদ দুই কন্যা, এক ছেলের জনক।