শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

চ্যাম্পিয়ন এবার ফ্রান্স

ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০১৮ সোমবার, ১২:১০ এএম

চ্যাম্পিয়ন এবার ফ্রান্স

৬ কেজি ওজনের ১৮ ক্যারেট সোনা মোড়ানো শিরোপাটা উঁচিয়ে ধরার ম্যাচ। এক দলের আজীবনের আক্ষেপ, আরেক দল ফিরবে সেই স্বপ্নপূরণ করে। ৩১ দিনশেষে আবারও সেই সমীকরণের সামনে দাঁড় দিয়েছিল বিশ্বকাপ। রোমাঞ্চ আর শিহরণ জাগানো মুহুর্তের জন্ম দিয়ে যেটা আগেই ইতিহাসে ঢুকে গিয়েছিল। রাশিয়ার বিশ্বকাপে ফাইনালটা হলো রাশিয়া বিশ্বকাপের মতোই, আর বাকি দশটা বিশ্বকাপ থেকেও যেটা আলাদা। লুঝনিকির মঞ্চে সিঁড়ি দিয়ে উঠে দিদিয়ের দেশম ফ্রান্স হাঁটল অমরত্বের পথে, বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরতে। আর ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্নযাত্রার থামল ওই সিঁড়ি দিয়ে নেমেই, রানার আপের মেডেল গলায়।

একপেশে ম্যাচ! বড্ড একপেশে! ৪-২ স্কোরলাইন তো এটাই বলে!

বিশ্বকাপের যেকোনো পরিসংখ্যান ঘাঁটতে গেলে একটি কথা যোগ করা হয় ‘১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে’। কারণ, পরিসংখ্যানের হিসাব-নিকাশের দৌড় ওখানেই থামে। কিন্তু ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া ফাইনাল আক্ষরিক অর্থেই ’৬৬-র বিশ্বকাপকে টেনে আনল। বিশ্বকাপের ফাইনালে যে ৬ গোল হতে পারে, সেটা জিওফ হার্স্টের হ্যাটট্রিকের দিনেই শেষ দেখেছিল বিশ্ব।

পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে সেই ম্যাচে তবু অনেক নাটক হয়েছিল। ৬ গোলের দেখা পেতে ম্যাচটার যোগ করা সময়ে যেতে হয়েছিল। কিন্তু আজ ৯০ মিনিটেই সব চুকে গেছে। আর এর মধ্যেই ৬ গোল। গত চারটি ফাইনালে ৮ দল মিলিয়ে ৪৫০ মিনিট ফুটবল খেলে ঠিক এ কটা গোলই করেছিল!
স্কোরলাইন যে কতটা ভুল বোঝাতে পারে, এর উদাহরণ হয়ে থাকবে এ ফাইনাল। ম্যাচটাকে একপেশে মনে হচ্ছিল শুধু ৬৫ মিনিটে। যখন পেলেকে আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৬০ বছর পর বিশ্বকাপ ফাইনাল আরেকজন কিশোর গোলদাতা পেল। ১৯ বছর ৬ মাস বয়সী এমবাপ্পে বিশ্বকাপে নিজেকে চিনিয়েছেন আগেই। ফাইনালে লুকাস হার্নান্দেজের বানিয়ে দেওয়া চমৎকার এক বলে আরও এক চমৎকার শট নিয়ে সেটা রেকর্ড বইয়েও স্থান করিয়ে নিলেন (৪-১)। পেলের পর দ্বিতীয় কনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলের রেকর্ড এখন এমবাপ্পেরই।

ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স পরেছে সোনার মুকুট। আর্জেন্টিনা আর উরুগুয়ের সঙ্গে এখন একই কাতারে তারা, সবাই দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ফ্রান্সকে সপ্তম স্বর্গে পৌঁছে দিলেন সেই দেশমই। ২০ বছর আগে অধিনায়ক হিসেবে ফ্রান্সের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিলেন, দ্বিতীয়টা ধরলেন কোচ হিসেবে। ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের পর প্রথম কেউ অধিনায়ক আর কোচ হিসেবে জিতলেন বিশ্বকাপ। খেলোয়াড় আর কোচ হয়ে বিশ্বকাপ জেতার তালিকাটা আরেকটু বড়, একজনের, সেখানে আছেন ব্রাজিলের মারিও জাগালো।

ম্যাচ শেষে ফিল ‘দ্য ম্যাজিক ইন দি এয়ার’ গানের সঙ্গে ‘লা ব্লুজদের’ উৎসব মিশে গেছে। তার আগেই প্যারিসের রাস্তায় লাখ লাখ মানুষের উৎসব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। ২০১৬ ইউরোর ফাইনালে ঘরের মাঠে এই গানটাই ছিল বাজার অপেক্ষায়। বেজেছিলও, কিন্তু তাতে উৎসবে মেতেছিল পর্তুগাল। সেই দুঃস্বপ্নও আজ ভুলেছেন দেশম, ভুলেছে পুরো ফ্রান্স। ফাইনালে ম্যাজিক বুঝতে ফ্রান্সের লেগেছে ১৮ মিনিট। দারুণ শুরুর পরও পিছিয়ে পড়েছে তারা।

সেটাও নিজেদের দোষে। আঁতোয়া গ্রিযমানের ফ্রি-কিক ডিফেন্ড করতে লাফ দিয়েছিলেন মারিও মাঞ্জুকিচ। সেমিফাইনালে ক্রোয়াটদের হিরো তাতেই বিপদ ডেকে আনলেন দলের। তার মাথায় লেগে বল ঢুকে গেল নিজের জালে। মাঞ্জুকিচ হয়ে গেলেন বিশ্বকাপের ফাইনালে আত্মঘাতী গোল করা প্রথম খেলোয়াড়।

কিন্তু এই ক্রোয়েশিয়াকে তো দমিয়ে রাখা যায় না। নক আউট পর্ব প্রতিবারই তারা পিছিয়ে পড়েছে, প্রতিবারই সেখান থেকে ফিরে এসেছে। ফাইনালেও ফিরে আসল ক্রোয়াটরা, ১০ মিনিটের ব্যবধানে। ইভান পেরিসিচের বাঁ পায়ের দারুণ শট জড়াল ফ্রান্সের জালে, খেলায় সমতা। এর আগে ১১ মিনিটে রাকিটিচের বাড়ানো বল থেকেই পেরিসিচ একটা দারুণ সুযোগ পেতে পারতেন, কিন্তু সে দফায় বাঁ পায়ে বলটা নামাতেই পারেননি ভালোমতো।

শুরু থেকেই অনুমিত কৌশলেই খেলছিল দুই দল। ফ্রান্স নিজেদের অর্ধে, আর ক্রোয়েশিয়া বল পায়ে পজেশন ধরে রেখে। ২৮ মিনিটেই আবার যখন একই বিন্দুতে ফিরে আসলো খেলা, এরপরও খুব বেশি বদলালো না খেলার ধরন। কিন্তু ৩৪ মিনিটে সবকিছু বদলে গেল আবার। একটা কর্নার থেকেই ব্লেইস মাতুইদি হেড করেছিলেন, কিন্তু সেটা লাগলো তার পেছনে থাকা পেরিসিচের হাতেই। ভিএআরের বিশ্বকাপে, ফাইনালেও দরকার হলো ভিএআর। রেফারি প্রথমে পেনাল্টি দেননি, পরে মাঠের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত বদলালেন, পেরিসিচের আজীবন মনে রাখার মতো ফাইনাল হুট করেই হয়ে গেল ভুলে যাওয়ার মত। ড্যানিয়েল সুবাসিচ হয়ে দুইবার টাইব্রেকার জিতিয়েছেন, কিন্তু আজ রঙ হারালেন। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন পেনাল্টি থেকে গোল করলেন গ্রিযমান। প্রথমার্ধ শেষের আগে আরও একবার ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছিল ক্রোয়েশিয়া, কিন্তু সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারল না আর তারা।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও আক্রমণাত্মক ক্রোয়েশিয়া।

৪৮ মিনিটে রাকিটিচের পাস, শট করলেন রেবিচ, সেটা গোলই হত। কিন্তু হুগো লরিস বাধা হয়ে দাঁড়ালেন, তার শক্ত হাত ভেঙে আর গোল পাওয়া হলো না ক্রোয়েশিয়ার। মিনিট খানেক পর ভারান করলেন একটা ভুল, সেখান থেকে বল পেলেন মাঞ্জুকিচ, তিনিও শাপমোচন করতে পারলেন না। ক্রোয়াটদের কর্তৃত্বও শেষ ওখানেই। ফ্রান্স কেন এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে গোছানো দল সেই প্রমাণটা পেন ক্রোয়েশিয়াও।

৫১ মিনিটে ডিবক্সের বাইরে থেকে বল পেয়েছিলেন পল পগবা। বাঁ পায়ের শটে দারুণ এক গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে তখনই ম্যাচ থেকে ছিটকে দিলেন ফ্রেঞ্চ মিডফিল্ডার। এই বিশ্বকাপে জিদান হতে চেয়েছিলেন পগবা, গ্রিযমানরা- সেটা হয়েছেনও শেষ পর্যন্ত। কিন্তু ফ্রান্সের আক্রমণভাগের আরেক তরুণ খেলোয়াড় স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি। কিলিয়ান এমবাপ্পে আজও শুরু থেকে গতি আর ড্রিবলিং দিয়ে তটস্থ করে রেখেছিলেন প্রতিপক্ষের রক্ষণকে। প্রথমার্ধে একবার ডিবক্সের ভেতর ঢুকেছিলেন, ক্রস করেছিলেন কিন্তু সেটা থেকে ক্রোয়াটদের কাঁদাতে পারেননি। পরে আরেকবার ঢুকে শটও করেছিলেন, কিন্তু সুবাসিচ বঞ্চিত করেছিলেন তাকে। ৬৫ মিনিটে আর এমবাপ্পেকে আটকানো গেল না। গোল করে তিনি চলে গেলেন পেলের কাতারে। বিশ্বকাপের ফাইনালে টিনএজার হিসেবে শেষ গোল করেছিলেন পেলে, এবার করলেন এমবাপ্পে।

ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতা তখন সময়ের ব্যাপার। কিন্তু শিরোপাটা উঁচিয়ে ধরার আগে হুগো লরিসকে পার করতে হলো একটা অস্বস্তিকর মুহুর্ত। ৬৯ মিনিটে তার ভুলেই গোল খেয়ে বসে ফ্রান্স, মাঞ্জুকিচ করেন গোল। তাতে ক্ষণিকের জন্য স্বস্তি ফিরে এসেছিল ক্রোয়াটদের, কিন্তু রূপকথার মতো ফিরে আসার গল্পটা আর লেখা হয়নি তাদের।

ম্যাচ শেষে মস্কোর মাঠে আকাশ ভেঙে নেমে আসল বৃষ্টি। সেটা মিশে গেল ফরাসি উৎসবের সঙ্গে। আর ক্রোয়াট জন্য সেই বৃষ্টি মন খারাপ করা। ছল ছল চোখে মদ্রিচ, রাকিটিচরা দেখলেন ফ্রান্সের উৎসব। পাওয়া না পাওয়ার দূরত্ব অতোটুকুই, তবে এই ফাইনালে দূরত্বটা বোঝা গেল ভালোভাবেই। ফ্রান্স বিশ্বকাপটা জিতল যোগ্য চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই।