শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

আফসোস বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের

ক্রীড়া ডেস্ক :

প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৮ শনিবার, ১১:০১ পিএম

আফসোস বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের

কোনও এক প্যারালাল ইউনিভার্সে হয়তো এই বেলজিয়ামই ফাইনাল খেলছে ইংল্যান্ডের সঙ্গে।

সেই ইউনিভার্সে হয়তো এই ম্যাচটার প্রয়োজনই নেই! তবে রাশিয়া বিশ্বকাপে বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ড খেললো তিন নম্বর জায়গাটা নিশ্চিত করার জন্য, এই ম্যাচের কারণেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েও ঠিক ঘরে ফেরা হয়নি দুই দলের। থমাস মুনিয়ের ও এডেন হ্যাজার্ডের গোলে ম্যাচটা জিতে গেছে বেলজিয়াম, রাশিয়া বিশ্বকাপে তৃতীয় হয়েছে তারা। আর ইংল্যান্ড চতুর্থ, দেশের বাইরের বিশ্বকাপে যা তাদের যৌথ সেরা সাফল্য।

দুই দল আগেও একবার মুখোমুখি হয়েছে। সেবার নাকি ইংল্যান্ড ইচ্ছে করেই ম্যাচ হেরেছে। তবে আজ বেলজিয়াম দেখিয়ে দিল, চেষ্টা করলেও ইংল্যান্ড হয়তো পারত না। রোমাঞ্চ ছড়ায় না এমন এক স্থান নির্ধারণী ম্যাচে আজ ইংল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারাল বেলজিয়াম। তৃতীয় হয়ে বিশ্বকাপ থেকে অন্তত ২৪ মিলিয়ন ডলারের প্রাইজমানি নিয়ে যাওয়া নিশ্চিত হলো তাদের। চতুর্থ হয়ে ইংল্যান্ড পাবে ২২ মিলিয়ন ডলার।

শুধু বেলজিয়াম নয়, এই ম্যাচে জেতার ছিল রোমেলু লুকাকুরও। কিন্তু যাঁর সঙ্গে তাঁর গোল্ডেন বুটের লড়াই, সেই হ্যারি কেনও বোধ হয় ঠিক করেছেন, আর গোল-টোল দেবেন না। দুজনেরই আরও একটি গোলহীন ম্যাচে গোলের খাতায় নাম লেখালেন টমাস মুনিয়ের আর এডেন হ্যাজার্ড। ৪ মিনিটে মুনিয়েরের গোলে এগিয়ে গিয়েছিল বেলজিয়াম। ৮২ মিনিটে ২-০ করেন হ্যাজার্ড।

তৃতীয় হয়ে, আজ ইংল্যান্ডের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে আফসোসটা আরও বাড়াল সোনালি প্রজন্মের এই দলটা। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে গেরোটা এত চেষ্টার পরও খুলতে পারেনি। না হলে কালকের ফাইনালে তো তাদেরই দেখতে চেয়েছিল অনেকে। শেষ পর্যন্ত সান্ত্বনার এক পুরস্কার নিয়ে ঘরে ফিরতে হলো।

সান্ত্বনা নয়তো কী! নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই জয়ের পর বাঁধভাঙা উদ্‌যাপন ছিল নিয়মিত দৃশ্য। কিন্তু সেন্ট পিটার্সবার্গে আজ ম্যাচ শেষের পর তার ছিটেফোঁটাও ছিল কই? মুষ্টিবদ্ধ দুই হাত ঝাঁকিয়ে বেলজিয়াম কোচ রবার্তো মার্তিনেজ এক সহকারীকে জড়িয়ে ধরেছেন, এই যা! খেলোয়াড়েরা নিরুত্তাপ হাত মেলালেন, পুরো মাঠ ঘুরে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

অবয়বে স্পষ্ট অনীহাটা বলছিল, তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জেতার পর আবার উদ্‌যাপনের কী আছে! হারলেও বা হতাশায় ভেঙে পড়ার কী আছে?

হতাশা যা, তা সেমিফাইনালেই পাওয়া শেষ। বিশ্বকাপ ফাইনাল-স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটা খেলতে কতটা আগ্রহ থাকবে খেলোয়াড়দের, সে নিয়ে কথা তো আর কম হয়নি! প্রতি চার বছর পরপরই হয়। তবে বেলজিয়ামের জন্য ম্যাচটা ছিল ইতিহাস গড়ার। বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ সাফল্য পাওয়ার। পেয়েছে বেলজিয়াম। এর আগে বিশ্বকাপে একবারই সেমিফাইনালে খেলেছিল বেলজিয়াম, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে সেবার হয়েছিল চতুর্থ।

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল উৎসবের অপেক্ষায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অবশ্য একটু হতাশই হতে হয়েছে হয়তো। ১৯৭৪ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম যে কোনো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ দেখল তিনের কম গোল!

কার্ডের খড়গে পড়ে মুনিয়ের খেলতে পারেননি সেমিফাইনালে। আজ যেন আফসোসটা বাড়িয়ে দিলেন আরও। চার মিনিটেই নাসের চাডলির ক্রসে পা বাড়িয়ে এগিয়ে দিলেন বেলজিয়ামকে, বিশ্বকাপে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে গোল হজম করলো ইংল্যান্ড। মুনিয়ের বেলজিয়ামের হয়ে এই বিশ্বকাপে গোল করা দশম ফুটবলার, ১৯৮২ সালের ফ্রান্স ও ২০০৬ সালের ইতালির পর ঘটলো এমন।

এমন দলীয় পারফরম্যান্সের পরও আলাদা করে একটু নজর ছিল রোমেলু লুকাকুর, হ্যারি কেইনের সঙ্গে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ছিলেন তিনিও। ডি ব্রুইন তাকে সুযোগও করে দিয়েছিলেন একাধিকবার, সেটা কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত তাকে তুলেই নিয়েছেন রবার্তো মার্টিনেজ।

ছয় গোলের সংখ্যাটা আরেকটু বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন কেইনও। স্টার্লিংয়ের কাছ থেকে বল পেয়েছিলেন, তবে সেটা গেছে বাইরে দিয়েই। পরে লিনগার্ডের ক্রসেও লাগাতে পারেননি পা।

প্রথমার্ধের চেয়ে দ্বিতীয়ার্ধে বেশ গোছানো খেলেছে ইংল্যান্ড, বেশ কয়েকটি সুযোগও তৈরি করেছে। এরিক ডায়ার তো প্রায়ই গোল পেয়ে গিয়েছিলেন, রাশফোর্ডের কাছ থেকে পাওয়া বলটা কোর্তোয়ার ওপর দিয়ে চিপ করেছিলেন, তবে লাইন থেকে সেটা ফিরিয়ে দিয়েছেন তারই টটেনহাম সতীর্থ অলডারউইরেল্ড।

তবে পুরোটা সময় জুড়েই প্রতি-আক্রমণে বেলজিয়াম ছিল ভয়ঙ্কর। যে মিডফিল্ডে হাপিত্যেশ করে মরেছে ইংল্যান্ড, সেখানেই ছিলেন ডি ব্রুইন। ৮২ মিনিটে তার পাসেই বেলজিয়ামের লিড দ্বিগুণ করেছেন এডেন হ্যাজার্ড। অবশ্য তাকে মার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা ফিল জোনসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়।

ততক্ষণে অবশ্য দেরিই হয়ে গেছে বেশ। বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্যটাই এনে দিল এবার, ব্রোঞ্জ হলেও বিশ্বকাপের একটা মেডেল আছে এখন তাদের। প্যারালাল ইউনিভার্স হলে হয়তো হ্যাজার্ডের হাতে একটা ট্রফিও উঠতো। স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তেন শুধু হ্যারি কেইন।

রাশিয়ায় সেটা হয়নি।