বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

মেসি জিতলে জিতে যায় আর্জেন্টিনা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ জুন ২০১৮ মঙ্গলবার, ০৮:৫৭ এএম

মেসি জিতলে জিতে যায় আর্জেন্টিনা

প্রতিপক্ষ যখন নাইজেরিয়া, তাহলে আর আর্জেন্টিনার দুশ্চিন্তা কী! আজ তারা জিতবে। লিওনেল মেসির দলের স্বপ্নঘুড়ি ঠিকই উড়তে থাকবে বিশ্বকাপের আকাশে। বিশ্বকাপে দুই দলের আগের দ্বৈরথগুলো যে ওই ওই বিশ্বাসের জ্বালানি জোগায়!
কিন্তু সেন্ট পিটার্সবার্গে আজ যখন মুখোমুখি হবে দল দুটি, আগের ওই ইতিহাস তখন কোন দূরের ছায়াপথ!

সাম্প্রতিকতায় তাড়া করে শুধুই দুশ্চিন্তার ছায়া। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলের ড্রতে টুর্নামেন্ট শুরুর পর ক্রোয়েশিয়ার কাছে ০-৩ গোলে হেরে যে আর্জেন্টিনার স্বপ্নঘুড়ি ভোকাট্টা হওয়ার জোগাড়!

তা ঠেকানোর অভিযানে আজ হোর্হে সাম্পাওলির দল। সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারের করুণ বিদায়ের বিষাদকাব্য তৈরি হতে না দেওয়ার চ্যালেঞ্জের সামনে। তাতে ইতিহাস হতে পারে প্রেরণা উৎস, তবে আজ বিজয়ের গান গাইতে হবে তো মাঠের ফুটবলেই। আর্জেন্টাইন ফুটবলের সঙ্গে শিল্পের যোগই প্রবল সত্যি, তবে সময়ের দাবিতে আজ তাদের হয়ে উঠতে হবে যোদ্ধা। মেসি এবং বাকি ১০ জনকে। পারবেন না তাঁরা?

সর্বশেষ যে চারটি বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে নাইজেরিয়া, প্রতিবার আর্জেন্টিনার গ্রুপে। ২০০২, ২০১০, ২০১৪ এবং এই ২০১৮ আসরে। এছাড়া ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও একই গ্রুপে ছিল এ দু’দল। আফ্রিকার দলটি বিশ্বকাপ খেলছেই সাকুল্যে ছয়বার। যার মধ্যে পাঁচবার গ্রুপ পর্বে আলবিসেলেস্তেদের সঙ্গে দেখা। আজ কী হবে, তার উত্তর সময়ের হাতে। তবে আগের চার মুখোমুখিতেই জয় আর্জেন্টিনার। ১৯৯৪ সালে ২-১ গোলে, ২০০২ ও ২০১০ বিশ্বকাপে ১-০ এবং ২০১৪ আসরে ৩-২ ব্যবধানে। প্রতিবার নূন্যতম ব্যবধানে। আজ জিতলেও সেই এক গোল ব্যবধানে জয় কী আর্জেন্টিনাকে নকআউট রাউন্ডে তুলে দেবার জন্য যথেষ্ট হবে?

‘ডি’ গ্রুপে দুই খেলায় জিতে ছয় পয়েন্ট নিয়ে এরই মধ্যে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে ক্রোয়েশিয়া। প্রথম ম্যাচ হারলেও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানের জয়ে নাইজেরিয়ার পয়েন্ট তিন। আর্জেন্টিনার সেখানে মোটে ১। আজ জিততে না পারলে নকআউট পর্বে যাবার কপাট সপাটে বন্ধ হয়ে যাবে তাঁদের মুখের সামনে। জিতলে হিসেব আলাদা। তখন নাইজেরিয়াকে টপকে চার পয়েন্ট হয়ে যাবে দু’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। কিন্তু গ্রুপের আরেক ম্যাচে যদি আইসল্যান্ড হারিয়ে দেয় ক্রোয়েশিয়াকে, তখন আর্জেন্টিনা-আইসল্যান্ড দুই দলের পয়েন্ট হবে চার। গোলপার্থক্যে এগিয়ে থাকা দল যাবে পরের রাউন্ডে। এখানে আইসল্যান্ডের (-২) চেয়ে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা (-৩)।

যেহেতু আজ একই সময়ে হবে আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া-আইসল্যান্ডের ম্যাচ, সেক্ষেত্রে নিজেদের করণীয় আগে থেকে জানার উপায় নেই সাম্পাওলির দলের। বড় ব্যবধানে জয়ের জন্যই তাই নিশ্চিতভাবে ঝাঁপাবে তারা।

গেল নভেম্বরের প্রীতি ম্যাচে ওই বড় ব্যবধানে জয়ের পথেই ছিল আর্জেন্টিনা। এভার বানেগা ও সের্হিয়ো আগুয়েরোর গোলে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে যায় ২-০ ব্যবধানে। এরপর অবিশ্বাস্য এক ধসে খেয়ে বসে চার গোল। ২-৪ গোলে হারের সেই ম্যাচে অবশ্য বিশ্রামের কারণে মেসি খেলেননি। আর সেদিনের অমন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার পরই তিন ডিফেন্ডারের প্রিয় ফর্মেশন থেকে সরে আসেন সাম্পাওলি। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ৪-২-৩-১ ছকে সাফল্য না পাওয়ায় ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ফেরেন ওই ফর্মেশনে; এবার ০-৩ গোলের হার। আজ তাই আরেক দফা পরিবর্তন। ৪-৩-৩ অথবা ৪-৪-২ ছকে খেলবে তাঁরা। গোলবারের নীচে উইলি কাবাইয়েরোর বদলে ফ্রাঙ্কো আরমানি আর উপরে এভার বানেগা, আনহেল দি মারিয়া, গনসালো হিগুয়াইন ফিরবেন হয়তো।

কিন্তু আর্জেন্টিনা কী আর্জেন্টিনায় ফিরবে কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন!

ব্যর্থতার হতাশা আর সমালোচনার ঝড়—একসঙ্গে ধেয়ে আসা এ দুটি ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি লিওনেল মেসি। ২০১৫ সালে কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের পর জাতীয় দলকে বিদায়ই বলে দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের অনুরোধে ফিরে আসেন সেই অবসর ভেঙে। বলতে গেলে একাই আর্জেন্টিনাকে তুলেছেন বিশ্বকাপে। কিন্তু বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আরেকটা হৃদয়ভাঙা হার। এবার আর্জেন্টিনারই কেউ কেউ অবসর চাইছেন মেসির। এবার মেসি অবশ্য বলছেন অন্য কথা। বলে দিয়েছেন, বিশ্বকাপ না জিতে অবসরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই তাঁর।

নোভগোরাদে গত বৃহস্পতিবার ম্যাচ শেষ হওয়ার পর কথা বলার মতো মনের অবস্থা ছিল না মেসির। দলের সঙ্গে নীরবেই মাঠ ছেড়ে গেছেন। সবাই যখন বিশ্বকাপ থেকে আর্জেন্টিনার ছিটকে পড়ার শঙ্কার কথা বলছেন, ঠিক সেই সময়ে মুখ খুলেছেন মেসি। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে গ্রুপপর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচের আগে যেন অভয় দিলেন আর্জেন্টিনা–সমর্থকদের, ‘বিশ্বকাপ জয় আমার কাছে অনেক কিছু। কারণ, আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপটা বিশেষ একটা ব্যাপার। আসলে আমার কাছেও এটা বিশেষ।’

একটা অভিযোগ মেসির সঙ্গী সেই কবে থেকেই—মেসি যতটা বার্সেলোনার, ততটা আর্জেন্টিনার নন! বার্সেলোনার জার্সিতে সম্ভাব্য সব শিরোপাই জিতেছেন মেসি। ক্লাব ফুটবলে ব্যক্তিগত অর্জনের ডালাটাও কানায় কানায় পূর্ণ তাঁর। অথচ আর্জেন্টিনার হয়ে অলিম্পিক ফুটবলের সোনা জয় ছাড়া আর কিছুই নেই সময়ের অন্যতম সেরা তারকার। কখনো কখনো তো আর্জেন্টাইনরা দেশের প্রতি মেসির ভালোবাসা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে ছাড়েন না!

তবে আর্জেন্টিনার হয়ে একটা বিশ্বকাপ জিততে মেসি কতটা মরিয়া তা স্পষ্ট হয় তাঁর বলা কথায়, ‘বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন আমি সব সময়ই দেখে এসেছি। বিশ্বকাপ জেতার পর যে আনন্দের অনুভূতি হয়, সেটাও দেখেছি। ওই মুহূর্তটি নিয়ে ভেবে আমার মাথার চুল পর্যন্ত সোজা হয়ে যায়। আমি বিশ্বের লাখ লাখ আর্জেন্টাইনকে আনন্দে ভরিয়ে দিতে চাই। আমি এই স্বপ্নটা বিসর্জন দিতে পারি না।’

আর্জেন্টিনার মানুষ কিনা এই মেসিরই অবসর চাইছেন! কিন্তু মেসি যে তাঁর স্বপ্ন পূরণ না করে জাতীয় দলকে বিদায় বলবেন না! কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে দিয়েছেন, ‘আমি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শিরোপাই জিতেছি। কিন্তু শেষটাতে এসে আমি একটু উচ্চাভিলাষী। দেশের হয়ে বিশ্বকাপ না জিতে আমি ফুটবল থেকে অবসর নেব না।’
কে জানে মেসির এই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না। নাইজেরিয়ার কাছে হেরে গেলে রাশিয়া বিশ্বকাপে সেটা হচ্ছে না নিশ্চিত। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জিতলেও হিসাব মিলিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা না-ও হতে পারে। মেসির আরেকটা সুযোগ তো থাকছেই-চার বছর পরই কাতার বিশ্বকাপ। বয়স হয়ে গেছে ৩১ বছর, এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ কি না, তা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে বিস্তর।

অমন লেখালেখি হতেই পারে। কিন্তু আসল মেসির সিদ্ধান্ত তো মেসিই নেবেন। আর আর্জেন্টিনার ফুটবলের মহাতারকা তো বলেই দিয়েছেন, বিশ্বকাপ না জিতে অবসরে যাবেন না। যার মানে একটাই—এবার না হলে আসছে বার আবার চেষ্টা করবেন মেসি!