বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

শেখ মহিউদ্দিনকে কেন নিয়ে গেল গোয়েন্দা পুলিশ ?

সারাবেলা প্রতিবেদক :

প্রকাশিত: ২৫ মে ২০১৭ বৃহস্পতিবার, ০৯:০৯ এএম

শেখ মহিউদ্দিনকে কেন নিয়ে গেল গোয়েন্দা পুলিশ ? বিএনপি নেতা শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন (ফাইল ফটো)

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তুলে নিয়ে যাওয়ার ১৪ ঘন্টা পর ছেড়ে দিয়েছে। পুলিশ ব্যক্তিগত অভিযোগের কারণে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানালেও বিএনপির এই নেতা বলছেন বিষয়টি ‘রাজনৈতিক’।

ঢাকার আরামবাগ বাস কাউন্টার থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মঙ্গলবার রাত পৌনে ১২টার দিকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ১৪ ঘণ্টা পর গতকাল বুধবার বিকেল তিনটার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গতরাতে শেখ মহিউদ্দিন চট্টগ্রামে ফিরে আসেন।
এর আগে বুধবার বিকেল তিনটায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী অভিযোগ করেন, ‘গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে রাজধানীর আরামবাগ থেকে ডিবি পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে’। পরে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে বলে জানান তার ভাই গিয়াস উদ্দিন।

এদিকে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে; এমন সংবাদে মঙ্গলবার মধ্য রাত থেকেই তার পরিবার ও বিএনপি’র স্থানীয় নেতা-নেতকর্মীরা ছিলেন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। গতকাল দিনভর এ নিয়ে চলে নানা আলোচনা। বিএনপি’র একাধিক নেতা নির্বাচনকে সামনে রেখেই শেখ মহিউদ্দিনকে তুলে নেয়া হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন। তারা মনে করছেন, বিএনপি’র সম্ভাব্য আন্দোলনকে সামনে রেখে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভীতি তৈরিও এর কারণ হতে পারে। কেউ কেউ আবার দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সাম্প্রতিক ঘটনার সাথেও এর যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করেন।
দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র একাধিক সিনিয়র নেতা এবং শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের পরিবারের লোকজনের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফেরার জন্য আরামবাগের একটি বাস কাউন্টারে যান শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। এ সময় তার সঙ্গে এনাম নামে এক বন্ধু ছিলেন। বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ আগে রাত সাড়ে ১১ টার দিকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে শেখ মহিউদ্দিনকে নিয়ে যান বলে দাবি করে তার পরিবার। সাদা পোশাকধারীরা ডিবি পরিচয় দেন বলেও এনামের উদ্ধৃতি দিয়ে মহিউদ্দিনের পরিবার দাবি করেন। শেখ মহিউদ্দিনের পরিবারের দাবি, ‘রাতেই ঢাকার মিন্টু রোডস্থ গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মহিউদ্দিনকে’।

এদিকে শেখ মহিউদ্দিনকে মুক্তির দাবিতে গতকাল বিকেল তিনটায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দক্ষিণ জেলা বিএনপি। সংবাদ সম্মেলনে দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসার জন্য বন্ধুসহ বাসে উঠেছিলেন শেখ মো. মহিউদ্দিন। সেখান থেকে ডিবি পরিচয় দিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সঙ্গে থাকা ওই বন্ধুটি এই খবর মহিউদ্দিনের পরিবারকে জানালে পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের জানান।

সংবাদ সম্মেলনে জাফরুল ইসলাম বলেন, আমাদের জানামতে শেখ মো. মহিউদ্দিনের নামে কোন মামলা নেই। আর যদি তার নামে মামলা থেকেও থাকে তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হোক। হয় মহিউদ্দিনকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিন, না হয় তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেখ মহিউদ্দিনকে ফিরিয়ে না দিলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনের পর বিএনপি নেতারা প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধনও করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবুর রহমান শামীম, নগর বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ান, বিএনপির সহ- স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মহসীন জিল্লুর, বাঁশখালীর সাবেক পৌর মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী, বোয়ালখালীর পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি গাজী সিরাজ, উত্তর জেলা বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত, উত্তর জেলা যুবদলের সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন, বিএনপি নেতা এডভোকেট কাশেম চৌধুরী, দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল নেতা মো. শহীদ, সাতকানিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মুজিবর রহমান, ছাত্রদল নেতা মো. মহসিন, চান্দগাঁও থানা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন লিপু প্রমুখ।

এদিকে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ভাই গিয়াস উদ্দিন গত রাত পৌনে আটটায় বলেন, ‘শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চট্টগ্রামে আসছেন। উনি এখন গাড়িতে।’ পরিবারের কোন সদস্যের সঙ্গে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের কথা হয়েছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না এখনো হয়নি’। তাহলে কিভাবে নিশ্চিত হলেন শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ফেরত আসছেন? এমন প্রশ্নে গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘খসরু ভাই (বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য) ফোন করে জাফর ভাইকে (দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি) জানিয়েছেন, শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে পাওয়া গেছে। তিনি গাড়িতে। খসরু ভাই যখন জাফর ভাইকে ফোন করেন তখন আমরা ওখানে ছিলাম’।

কিভাবে শেখ মোহাম্মদ নিখোঁজ হয়েছিলেন? এমন প্রশ্নে তার ভাই গিয়াস বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১ টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বন্ধু এনামসহ বাসে উঠেন। ‘রিল্যাক্স’ পরিবহনে উঠার পর ডিবি পরিচয়ে পুলিশ এসে জিজ্ঞেস করেন ‘শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন কে? পরিচয় জানার পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।’ এটা আমরা উনার বন্ধু থেকে শুনেছি।

জানতে চাইলে দক্ষিণ জেলা বিএনপি’র সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘হ্যাঁ, শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে পাওয়া গেছে। উনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। উনি গাড়িতে। ফেরত আসছেন। কোথায় নিয়ে গেছে বা কারা নিয়ে গেছে’; এসব বিষয়ে শেখ মহিউদ্দিনের সঙ্গে কোন কথা হয়েছে কী না জানতে চাইলে জাফরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এসব বিষয়ে জিজ্ঞেস করিনি। উনাকে ক্লান্ত মনে হয়েছে। সামনাসামনি কথা হলে তখন জেনে নিব। পুলিশ নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিছে। ন্যায়ের পক্ষে সবার জোর দাবির প্রেক্ষিতে ছেড়ে দিয়েছে’।

এদিকে নিখোঁজের বিষয়ে জানতে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু প্রতিবারই তার মুঠোফোন বন্ধ ছিল। গত রাত পৌনে ১১ টায় শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের ভাই গিয়াস বলেন, এখনো এসে পৌঁছেনি।

এদিকে ‘রাজনৈতিক কোন কারণে শেখ মহিউদ্দিনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নি’ বলে বেসরকারি একটি টেলিভশনের (আরটিভি) অনলাইনকে জানিয়েছেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন। আরটিভিকে তিনি বলেন, ‘শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের একটি ব্যক্তিগত অভিযোগ ছিলো মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। তারই পরিপেক্ষিতে মঙ্গলবার রাতে রাজধানী ঢাকার আরামবাগ বাস কাউন্টার থেকে তাকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। পরে অভিযোগকারী ও মহিউদ্দিনকে এক সঙ্গে তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য দীর্ঘক্ষণ কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর বুধবার দুপুর ৩ টার দিকে মহিউদ্দিনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গতকাল রাত সাড়ে ১১ টার দিকে শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেছেন। রাত পৌণে বারোটার দিকে তিনি  জানান, এইমাত্র চট্টগ্রাম এসে পৌঁছেছি। বিকেল পৌণে ৫ টার দিকে ডিবি পুলিশ তাকে বাসে তুলে দিয়ে যায় জানিয়ে রাজনৈতিক কারণেই তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, ডিবি পুলিশ সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আমাকে নিয়ে গেলে বললেও কোন অভিযোগকারীর সাথে আমাকে মুখোমুখি কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।