মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০

মফস্বল সাংবাদিকতার বাতিঘর আহসানুল হুদা

মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ০৮:৩৮ এএম

মফস্বল সাংবাদিকতার বাতিঘর আহসানুল হুদা

আনোয়ারার সাংবাদিক সৈয়দ আহসানুল হুদা  আমাদের মাঝে নেই  আজ ১২ বছর। তাঁকে ছাড়া আনোয়ারার মফস্বল সাংবাদিকতায় যে শূন্যতা তা এই এক যুগেও পূরণ হয়নি।  ২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর (সোমবার) রাতে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।

তাঁর চলে যাবার সাথে সাথেই শেষ হলো  আমাদের মফস্বল সাংবাদিকদের গর্বের এক সোনালী অধ্যায়। আমরা তাকে নিয়ে গর্ব করতাম,  গর্ব করতো আনোয়ারার নিপীড়িত মানুষেরা। তাঁর মৃত্যুতে যেন আনোয়ারা  হারালো একজন পাহারাদার।

কেননা, তিনি সাংবাদিকতার চেয়ে মানবিক সাংবাদিকতার চর্চা করতেন বেশি।  সবসময় পাহারায় রাখতেন আনোয়ারার তৃণমূলের আপামর জনগণকে। আমার বয়সের চেয়ে আহসানুল হুদার সাংবাদিকতার বয়স।

তিনি ১৯৭৭ সালে দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় সংবাদদাতা হিসেবে সাংবাদিকতা পেশা শুরু  করেন। পরে বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে কাজ করেন। অনোয়ারাসহ প্রায় সব জায়গায় তিনি ছিলেন ‘আহসান সাহেব’ নামে পরিচিত। আর মারা যাবার দিন পর্যন্ত  চট্টগ্রামের প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক আজাদীর আনোয়ারা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে গেছেন। সূদুর ভারতে চিকিৎসা চলাকালে তার সাথে আমার নিয়মিতই যোগাযোগ হতো, আর তা আজাদীতে সংবাদপ্রেরণ নিয়ে। আজাদীতে সংবাদ ছাপানোর জন্য যোগাযোগ রক্ষা করতেন আজাদীর তৎকালীন সহসম্পাদক দেবদুলাল ভৌমিক ও শাহ আজম সাহেবদের সাথে। আর ভারত থেকে আসার পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্যাতিতদের সহায়তায় ছুটতে দেখা গেছে। অসহায়দের সাহায্য করতেন অবারিতভাবে।  মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি থাকতে পেরেছেন সৎ, নির্লোভ।

২০০০ সাল থেকে যখন আমি দৈনিক পূর্বকোণে কাজ করি তখন থেকে আহসানুল হুদার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা। তাঁর সাথে পরবর্তীতে আমার এতবেশী সখ্যতা গড়ে ওঠে যা বলে প্রকাশ করার মতো  নয়। তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি প্রতিনিয়ত। দেখে দেখে দেখে শিখতাম, জানতাম। আমি তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ নিতাম  বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন সময়ে। আর জেনে নিতাম কিভাবে তিনি আনোয়ারার সেরা মানুষে পরিণত হন।

তিনি বলতেন কাজ করতে হবে সমাজের অবহেলিত মানুষের জন্য আর কাজের মূল্যায়ন করবে তারাই। এর প্রমাণ ও পাওয়া যায়, তাঁর অসুস্থতার সময়ে। অসুস্থ অবস্থায় আমরা দেখেছি, তাঁকে দেখতে, দোয়া করতে অনেক রিকসাওয়ালা, ভিক্ষুকও তার ঘরে যান। তাঁকে স্পর্শ করিয়ে, মুরগী ছদকা করতে দেখা যায়  অনেককে। তাছাড়া, আনোয়ারার অনেক মসজিদ-মাদ্রাসায় তার রোগমুক্তির জন্য দোয়া ও খতমে কোরান দেবার খবর ও পাওয়া যায় অনেক দিন পরেও।
দেখেছি, পত্রিকায় কখনো কোন সংবাদ কিংবা ফিচারে ক্যান্সার শব্দটি পেলে কলম দিয়ে কেটে দিতেন। শব্দটি কেন কাটছেন জানতে চাইলে তিনি বলতেন তাঁর মা-ভাগ্নেসহ অনেকে প্রাণ হারান এ রোগে।  তাই এ শব্দটা কোথাও পেলে কেটে দেন! কাকতালীয় ভাবে সে ক্যান্সারেই মারা গেলেন তিনি।

তাঁর শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ার অনেক আগে থেকেই তিনি কোন ডাক্তারের কাছে গেলে কোন ধরনের পরীক্ষা দিলে করাতে চাইতেননা। যদি কোন খারাপ রিপোর্ট আসে। ২০০৮ সালের মে মাসের দিকে তাঁর শরীরে ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়লে পুরো আনোয়ারাসহ চট্টগ্রামে রব পড়ে যায়। জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেয়ার সময় ডাক্তারেরা জানান, কেমোথেরাপির মাধ্যমে এ রোগ থেকে সেরে ওঠা যাবে। তবে টাকা লাগবে ১০ লাখেরও বেশী। কিন্তু এত টাকা পাওয়া যাবে কোথায়?  সারাজীবনেতো তিনি কিছুই করতে পারেননি। থাকেন কুঁড়েঘরে। উদ্যেগ নিলেন চট্টগ্রাম শহরের সাংবাদিক, তার বন্ধু, সহকর্মী সাংবাদিক, শিক্ষক ও আনোয়ারার সর্বস্থরের মানুষ। বাচাঁতে হবে আহসানকে। রাতারাতি বাড়তে লাগলো টাকাও উন্নত চিকিৎসা ও থেরাপি দেয়ার জন্য ভারতের ভেলোরে সি এম সি হাসপাতালে পাঠানো হল তাকে। যখন তিনি প্রথমবার ভারত যাচ্ছিলেন তখন তার কণ্ঠস্বও স্বর ছোট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথম থেরাপিতেই তিনি পেলেন দারুন সফলতা। ধীরে ধীরে পরিস্কার হচ্ছিল মুখের আওয়াজ। ১ম কেমো দেয়ার পর ভারত থেকে হাসিমুখে আসার পর আবারো নতুন উৎসাহ নিয়ে আবারো পুরোদমে শুরু করলেন সাংবাদিকতা।

আর সংবাদ কিংবা লোকালয়ের ফিচার পাঠানোর জন্য আমাকে তাঁর পাশে থাকতে হতো সবসময়। কেননা, আজাদীর বেতন ছাড়া তার আর কোন আয়ের পথ ছিলনা। কারো কাছ থেকে কোন সময় কোন সুবিধাটুকুও না নেয়ার কারণে তাকে বরাবরই ভরসা করতে  হয়েছে আজাদীর বেতেনের। তাঁকে কারো কাছ থেকে কখনো কিছু নিতে (!) দেখেনি আনোয়ারাবাসি। সর্বশেষ কেমো দেবার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে তাকে নিয়ে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ডা. শরিফুল আলমের কাছে নিয়ে যাবার সময় তিনি আমাকে জানান চিকিৎসা শেষে আগামী দিনগুলোতে তিনি আনোয়ারার অবহেলিত মানুষগুলোর জন্য কি কি কাজ হাতে নেবেন।

ডা. শরিফুল আলমের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে শেষবারের মতো ভারত গিয়ে তিনি ডাক্তারের সাথে দেখা করে চলে আসবেন। কেননা, তিনি ভাল হয়ে গেছেন পুরোপুরি, ভারতের ডাক্তারের পরামর্শের জন্যই মাত্র ভারত যাওয়া। কিন্তু বিধিবাম। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, শরীরে ক্যান্সারের জীবাণু আগের চেয়ে বেড়েছে। আর পুনরায় চিকিৎসা করাতে লাগবে ন্যুনতম ১৮ লাখ। হতাশ হয়ে দেশে এসে শেষতক; ঢাকার একটি হাসপাতালে রেডিওথেরাপি দেবার সময় ১৮ নভেম্বর (সোমবার) রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি ২ মেয়ে  ও স্ত্রীকে রেখে যান।

তিনি যখন মারা যান তখন তার বড় মেয়ে ২য় শ্রেণীতে উঠার পথে। এত তাড়াতাড়ি তিনি মারা যাবেন তা তিনি ভাবেননি। বেচেঁ থাকার বেশী ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু তা হলোনা। নিয়তির কারণে ভাল হওয়ার পথ থেকে পুনরায় ছুটে গেলেন পেছনের দিকে। চলে গেলেন ইহকাল থেকে, চিরদিনের জন্য। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর পরিবার শুধু তাকেই হারায়নি, আমরা হারালাম একজন সৎ ও আদর্শবান সাংবাদিককে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত যিনি কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

তিনি ছিলেন আদতে মফস্বল সাংবাদিকতা ও সততার প্রতিকৃতি। আহসানুল হুদার নীতি, ধর্ম পরায়নতা ও আদর্শের কারণে পরকালে আল্লাহ তাকে শান্তিতে রাখবেন এ কথা বলা যায়। ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ করছি অপার শ্রদ্ধায়। [

লেখক: সাংবাদিক আহসানুল হুদার সহকর্মী ও প্রথম আলোর আনোয়ারা প্রতিনিধি