শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০

দোসরা

মারুফ শমসের যাকারিয়া

প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২০ শনিবার, ০৯:৩৬ পিএম

দোসরা

‘কি হয়েছে আমার?’
তিন দিন হাসপাতালের আইসিইউতে কমাতে অচেতন থেকে জ্ঞান ফিরে ফিদা ওর স্ত্রী নীতা আর একমাত্র ছেলে আবরারকে দেখে প্রথম প্রশ্ন করে।
চারিদিক তাঁকিয়ে দেখে তারপর জানতে চায় – ‘আমি হাসপাতালে কেন?’
‘আপনি হাসপাতালে শুধু না, হাসপাতালের আইসিইউতে। যে অবস্থায় ছিলেন, সে অবস্থা থেকে খুব কম লোকই ফিরে আসে। আপনার সবার দোওয়ায় ফিরে এসেছেন। আপনার পরিবারের সাথে কথা বলেন। কিন্তু বেশী কথা আপাতত না। কথা বলার জন্য সারাজীবন পরে আছে।’
ওদের কিছু বলার আগে নার্সই উত্তর দিয়ে দেয়।
আরো যোগ করে – ‘উফ! এত লোক সামলাতে আর আপনি কেমন আছেন, জ্ঞান ফিরেছি কিনা জানাতে জানাতে আমাদের জান শেষ!’
নার্সের কথার সুরে আপাত বিরক্তিভাবথাকলেও এর আড়ালে লুকিয়ে রাখা প্রশংসা ও ভালবাসা ঠিকই বোধগম্য হয় ওদের।
ফিদা অবাক হয়ে নীতার কাছে জানতে চায় – ‘তাই?’
‘হুম!’ নীতা কাঁদ কাঁদ গলা ঢাকতে গিয়ে এতটুকুই শব্দ বের করতে পারে। তারপর একটু সামলে নিয়ে বলে – ‘তোমাকে সবাই এত ভালবাসে তা তুমিও হয়তো জান না!’
‘তুমি বাস না? তোমার চোখ এত ফোলা ফোলা কেন? অনেক কেদেছ আমার জন্য?’ মুচকি হেসে ফিদা প্রশ্ন করে নীতাকে।
নীতা চোখে বৃষ্টি ঝরে, সাথে আবরারও। গত তিন দিন কষ্টে, আতংকে, দৌড়াদুড়িতে  কান্নারো সুযোগ হয়নি, ওদের ছেলে আবরারের।
ফিদা নিতার হাতটা ধরতে চায়। নীতা ধরে ফিদার হাত। ফিদা বলে – ‘আমি তো ঠিক হয়ে গিয়েছি তোমাদের সবার দোওয়ায়!’
তারপর কিছুটা অজানা বিস্ময় নিয়ে জানতে চায় – ‘কি হয়েছিল আমার?’
ফিদার বিস্ময় নীতাকে আশ্চর্যান্বিত করে। বলে – ‘সত্যিই তুমি মনে করতে পারছোনা কি হয়েছিল তোমার?’
‘নাহ!’
ফিদার তাৎক্ষণিক উত্তর।
নীতা হতাশ হয়ে ছেলের দিকে তাঁকায়। পরে নার্সের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে।
নার্স ওদেরকে আপাতত চলে যেতে বলে। ডাক্তার কে ডাকবে বলে। ওরা বের হয়ে আসে আইসিইউ থেকে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে!
ডাক্তার আসেন। বেশ কিছু প্রশ্ন করেন। নার্সের সাথে আলাপ করে আরো ঘনিষ্ট পরিচিত কয়েকজনকে নিয়ে আসেন ফিদার কাছে। ফিদা সবাইকেই চিনতে পারে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা বা তার আগের ঘটনা গুলো কিছুই মনে করতে পারে না।

নিশাত একাকী বসে ছিল সবার থেকে একটু দূরে। ফিদার আত্মীয় স্বজন কারো কারো সাথে কথা বলেছে। সবাই ওকে ধন্যবাদ দিয়েছে সময়মত হাসপাতালে ফিদাকে নিয়ে আসার জন্য। তবে ফিদার বন্ধুরা কেউ নিজে থেকে কথা বলেনি। বরঞ্চ আড় চোখে ওর দিকে তাঁকিয়ে কি যেন ফিসফিস করছিল। নিশাতের ভাল লাগেনি। তবেকি ফিদা ওর বন্ধুদের সব কিছু বলে দিয়েছিল?
নার্স এসে নিশাতকে ডেকে নিয়ে গেল ডাক্তারের ডাকে আইসিইউতে। কারন হাসপাতালের সবাই ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছে নিশাত কিকি করেছে আর রোজ নিকট আত্মীয়দের মত এসে বসে থাকে। খবর নেয়। অত্যন্ত কাংখিত এই ডাক নিশাতের জন্য। বাহাত্তর ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করে আছে ফিদাকে সুস্থ দেখার জন্য। দুটো কথা বলার জন্য। কিন্তু যাওয়ার পথে করিডোরে ফিদার বন্ধুদের অশোভন দৃষ্টি আর নীতার তীব্র ঘৃনা না তাকিয়েও বেশ বুঝতে পারলো নিশাত। গত তিন্ দিন ধরেই সহ্য করছে। কিছু করার নেই। ফিদার সাথে দেখা করতেই হবে।  

তরুন ডাক্তার, হয়তো ডিউটি ডক্টর হবেন। হাসি মুখে ফিদার সাথে কথা বলছেন। নিশাত আসাতে সেরকম মুখ নিয়েই ওকে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
-    আপনি তো দুর্ঘটনা স্থলে থেকে ওনাকে নিয়ে এসেছেন?’
-    জী।
-    চেনেন ওনাকে?
-    হ্যা।
-    ভাল। আছা দেখি এবার ...
বলে বিছানায় শোয়া ফিদার দিকে তাকালেন, বললেন,
-    ওনাকে চেনেন?
ফিদা ওর স্বভাবসুলভ স্মিত হাস্য মুখে নিয়ে শান্ত ভাবে বলে,
-    না।
ডাক্তার প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে নিশাতের দিকে তাঁকায়। নিশাতকে মুখে একটু অভিমানের চিহ্ন সাথে বিস্ময়! ডাক্তার নিশাতকে একটু চোখ টিপে ইশারা দেন। যেন বলতে চান, একটু ধৈর্য ধরেন, দেখছি। একটু নিম্নস্বরে নিশাতকে জিজ্ঞেস করেন,
-    কতদিনের পরিচয় আপনাদের?
নিশাত একটু মাথা নীচু করে কি যেন ভাবে। একটু পর সরাসরি ডাক্তারের দিকে তাঁকিয়ে জানায়,
-    খুব বেশীদিন হয় নি। কয়েক মাস হবে।
ফিদার দিকে তাঁকিয়ে ডাক্তার মুখের হাসির রেখা আরো একটু প্রসারিত করে বলেন,
-    কি বলেন? উনি আপনাকে এক্সিডেন্ট স্থল থেকে কত দ্রুত হাসপাতালেনিয়ে এল। জীবন বাঁচালো! আর এখন ভুলে গেলেন!
ফিদাকে একটু বিব্রত মনে হয়। অপরাধীর মত নিশাতও ডাক্তারের দিকে তাঁকিয়ে বলে – আমি একদমই চিনতে পারছিনা! কি এক্সিডেন্ট হয়েছিল আমার?
ডাক্তার আর নিশাত দুজনেই ফিদার দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু দুজনের উদ্দেশ্য ভিন্ন। ডাক্তার জানতে চাচ্ছেন রুগীর এই স্মৃতি হারিয়ে ফেলা সাময়িক না স্থায়ী। নিশাতের জানার আগ্রহ ফিদার স্মৃতি হারানোর সত্যতা নিয়ে।
কিছুক্ষণ চলে চোখে চোখে মাপামাপি। ডাক্তার নীরাবতা ভেংগে নিশাতকে মৃদুস্বরে চলে যেতে বলেন।
নিশাত যেন বিশ্বাসই করতে পারে না যে ফিদা ওকে চিনতে পারছেনা সত্যিই। আর কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে ছিল। অভিমান নিয়ে চোখে চোখ রেখে বলতে ইচ্ছে ছিল
-    তোমাকে সুস্থ দেখার জন্য তিন দিন তিন রাত অপেক্ষায় আছি! আর তুমি আমাকে চিনতেই পারছো না!
কিন্তু ডাক্তারের ইশারায় চলে আসে নিশাত। মাথা নীচু করে বেরিয়ে যায় কিছু ক্রুদ্ধ দৃষ্টি এড়িয়ে।

ফিদার সাথে নিশাতের পরিচয়ের প্রথম দিনটা মনে পড়ে। ফিদাই কতবারই মনে করিয়ে দিত। ওর কাছে কোন আলাদা গুরুত্ব ছিলনা। আর দশটা মানুষের সাথে যেভাবে কথা বলে সেভাবেই কথা বলেছিল নিশাত ওর সাথে। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল। পাগল হয়েছিল ফিদাই, পরে নিশাত ফেরাতে পারেনি। অথচ আজ ফিদা চিনতেই  পারছে না ওকে!
ইংরেজীতে টমবয় আর বাংলাতে গেছো মেয়ে বলতে যা বোঝায় নিশাত তাই। বয় কাট চুল। সার্ট প্যান্ট ওর স্বাভাবিক পরিধান। উত্তরার একটা হেলথ ক্লাবে বিকেল সন্ধ্যায় যখন পারে সাতার কাটে। এক বন্ধুর মাধ্যমে সন্ধান পেয়েছে। প্রায় দু বছর ধরে ভালই কাটছিল। নিশাত অনেক মিশুক ধরনের। ছেলে মেয়ে পরোয়া করে না। সবার সাথে সহজ ভাবে মিশে। ছেলেদের সাথেই সুইমিং করে। ওর এই বেপরোয়া জীবন যাপন কেউ খারাপ চোখে দেখলেও ও পরোয়া করে না। একদিন ফিদাকে সুইমিংপুলে আনাড়ির মত হাত পা ছোড়াছুড়ি করতে দেখে ওর সহজাত প্রবৃত্তি থেকে ফিদাকে কিছু টিপস দেয়। এরকম অনেককেই দেয় নিশাত। পরিচিত অপরিচিত বাছ বিচার করে না। ফিদার সাথে দু একবার দৃষ্টি বিনিময় হয়েছিল। মাঝ বয়সি সৌম্য ভদ্রই মনে হয়েছে।
বলে –‘আপনি করছেন কি? খামাখা সময় নষ্ট! এভাবে হাত পা ছোড়াছুড়ি করে কোন লাভ হচ্ছে?’
ফিদা একটু অবাকই হয় অপরিচিত কারো কাছ থেকে এরকম ধমকের সুরে উপদেশ পেয়ে। তবে বিরক্ত হয় না। একটু আগ্রহ জাগে মেয়েটার প্রতি। শুরুতে যখন ও পুলে ঢুকেছিল, পা থেকে কন্ঠ পর্যন্ত সুইম সুটে মোড়া স্লিম গড়ন দেখে ওকে অল্প বয়সী কোন ছেলে মনে করেছিল। একটু পরই পুলের পাশ দিয়ে হাটার সময় নারীর অবসম্ভাবী শরীরের বাঁক দেখে বুঝতে পারে যে ও মেয়ে। কিন্তু কম বয়সি। দু একবার দৃষ্টি বিনিময় হয়। ফিদা বুঝতে চাচ্ছিল ও কে? এখানে প্রায় সবাইকেই চেনে ফিদা। ওরা মেম্বার। ওকে কোন বয়জ্যাষ্ট মেম্বারের মেয়ে মনে করেছিল।
ফিদা বলে – ‘আমি খামাখা সময় নষ্ট করছিনা। আমার দরকার এনার্জী বার্ন করা। সেটাতো হচ্ছেই ... আর সাঁতার আমার কোন কালেই শেখা হয় নাই। হবেও না।’
‘কেন হবে না। চেষ্টা করলেই হবে, আমি যেভাবে বলি সেভাবে করে দেখেন।‘
ফিদা বাধ্য ছাত্রের মত হাসি মুখে তাঁকায়। কিছুই বলে না।
‘আপনি পাশাপাশি যান। হাত পা সোজা করে কিছুক্ষণ ভাসা শিখেন, পা নাড়ান এভাবে ...’
বলে নিজেই করে দেখিয়ে দেয়। ফিদা দেখে কি সুন্দর হাত পা সমান্তরাল করে রেখে মাথা ডুবিয়ে পায়ের পাতা প্যাডেল দেওয়ার মত সামান্য নাড়িয়ে ভেসে পুলের আড়াআড়ি পাশে, যেখানে দূরত্ব কম, সেটা পার হয়। দেখে মনে হয় যেন একটা মৎস কুমারী!
ফিদা চেষ্টা করে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করে বহুবার দুতিন দিন পানিতে দাপাদাপি করে যা পারেনি। তা আজ বিনা পরিশ্রমে হয়ে গে্ল! ফিদাও যেন মৎসকুমারের এর মত পুলের আড়াআড়ি পাশ পার হয়ে গেল। নিশাত প্রথমবার ওকে সাহস দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলো। একটু অবাকই হলো ওর বুক আর পেটের মাঝামাঝি হাত রেখে ভেসে থাকতে সাহায্য করার জন্য। এরপর নিশাত দেখছিল। এরকম দু তিনবার করার পর ফিদা পুলের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাম সাইন দেখালো। নিশাতকে একটু গম্ভির মনে হলো। ফিদা ভয় পেলো ও আবার থাম সাইনের কোন উলটো মানে করে কিনা! কিন্তু একটু পর নিশাতও ওকে একি সাইন দেখালো।
এরকমইকরতে বললো নিশাত ফিদাকে। ফিদাও করছিল। কিন্তু একটু রেস্ট নিতে গেলেই নিশাত পিছু লাগলো।
বললো।
- ‘বসে আছেন কেন নেমে যান, এভাবে বসে থাকলে তো হবে না, পুলে  নেমেছেন, সুইমিং করেন।’
ফিদা হেসে বলে
– ‘আরে এই বয়সে এত এনার্জি কোত্থেকে পাব। পঞ্চাশ বছর বয়েসে যা করছি তাই বেশী!’
-    ‘করেন না। আপনি পারবেন।’
পুলের ও পাশে ফিদার আরেক বন্ধু নওশাদ ছিল। ফিদার দিকে তাঁকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। নওশাদ পাকা সাতারু। ও পুলের গভীর অংশে ছিল। সাঁতার দিয়ে ফিদার কাছে এসে ফিসফিস করে বললো – ‘জিনিসটা ভালই রে, একদম টাইট শরীর! দেখ খাতির করা যায় কিনা।’
ফিদা স্মিত হেসে সম্মতি জানায়। ওপারে নওশাদ যখন যায়, নিশাতও যায়। ফিদা দেখে নিশাতকে কি যেন বলছে নওশাদ।
এভাবে কিছুক্ষণ চর্চা করার পর ফিদা নিশাতকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে,
-    ‘এতদিন কেউ যা পারেনি তা আপনি কয়েক মিনিটেই করে দেখালেন! ধন্যবাদ’
-    ‘আরে না। আপনি আসলে কুইক লার্নার।’
পুল থেকে নওশাদ বের হওয়ার সময় পুলের গাইডকে কি যেন ওষুধের কথা বলছিল। নিশাত ফিদাকে জিজ্ঞেস করলো – ‘উনি কি অর্থপেডিক সার্জন?’
ফিদা বললো – ‘হ্যা’,
সাতার শেষ করে ফিদা আর নওশাদ পুলের গেটের বাইরে সিগারেট খাচ্ছিল। তখন নিশাত চেঞ্জ করে বের হয়ে এলো।
ফিদা বললো নওশাদকে দেখিয়ে নিশাতকে– ‘এই আপনার ডাক্তার, কি সমস্যা বলেন?’
নিশাত বলে – ‘হ্যা, পরে একদিন বলবো।’
ফিদা জিজ্ঞেস করলো – ‘আপনি কি করেন?’
-    ‘আমি সাংবাদিক। আমার বয়স পয়ত্রিশ। সবাই দেখে অনেক ছোট মনে করে বলে আগেই বলে দেই আমার পরিচয়।’
বলে হাসে নিশাত। নওশাদ বলে,
– ‘ও সরি আমি আসলে অনেক ছোট মনে করে তুমি বলে ফেলেছিলাম।’
নিশাত কিছু বলে না। ফিদা নওশাদের দিকে আড় চোখে তাঁকায়। মনে মনে বলে, মামু তুমি ভালই চেষ্টা করেছিলে! শুরুতেই ‘তুমি’! নিশাতকে প্রত্যুত্তরের হাসি দিয়ে ফিদা বলে -
‘ওহ তাই! আপনাকে দেখে আসলেই যে কেউ ভুল করবে! অনেক ছোট মনে হয়!’
নিশাত হাসে। হাসিটা ধরে রেখে বলে – ‘তাই আগেই প্রফেশনটাও উল্লেখ করি। তা না হলে অনেক জায়গায় মানুষ দাম দিতে চায় না!’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটু গাম্ভীর্য এনে বলে – ‘আমি কিন্তু আরো অনেক কিছু করি।’
‘কি করেন আর?’ ফিদা জানতে চায়।
‘স্কুল থেকেই সাইক্লিস্ট, ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার হয়ে ন্যাশনাল লেভেলে খেলি। এই স্কুল থেকেই স্কাউটিং করতাম। এখন রোটারেড। অনেক সংগঠনের সাথে ভলানটিয়ার হিসেবে কাজ করি।’
‘কি ধরণের কাজ?’
‘এই ধরেন ফায়ার ফাইটিং, যে কম ন্যাচারাল ডিজাস্টারের সময় দুর্গম এলাকায় কাজ করা ...।’
‘ওয়াও!’ ফিদা প্রশংসা সূচক বিস্ময় প্রকাশ। এরপর জানতে চায় -‘আপনি কি কখনো টিভিতে এসেছিলেন?’
‘হ্যা দুটো চ্যানেলে আমার ইন্টারভিউ নিয়েছে ...’
‘হ্যা তাই হবে। কোথায় যেন দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছিল! এখন বুঝলাম!’
একটু বিরতি দিয়ে হেসে বলে – ‘আপনি তো সেলিব্রিটি তাহলে!’
নিশাত গম্ভীর, নিশ্চুপ। যেন মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। একটু পর বলে -
‘শরীর ফিট রাখতে সকালে সাইক্লিং করি। সন্ধ্যায় সুইমিং।’
‘বাহ!’ ফিদা মুদ্ধতার সাথে বলে।
‘আপনাদের এখানে বাসার কাছে, অনেক সস্তায় করা যায়। তাই প্রায় দুই বছর ধরে করছি।’
‘কোথায় থাকেন?’ নওশাদ জানতে চায়।
‘দিয়া বাড়ি’
‘ও তাই, আমিও তো কাছেই থাকি, চলেন নামিয়ে দিব।’
ফিদার প্রস্তাব। কেন জানি সহজভাবেই বলে ফেলে। মনে হয় ও কিছু মনে করবে না। তবে নিশাতের উত্তরে চমক অপেক্ষা করছিল। নিশাত খুব হেসে পকেট থেকে গাড়ির চাবি বের করে। ফিদা একটু চমকে এমনি বলে দুষ্টুমি করে –
‘ডোন্ট টেল মি দ্যাট ইউ রাইড স্কুটি!’
নিশাত উচ্চস্বরে হেসে বলে ‘স্কুটি হুন্ডা দুটোই চালাই, এখন সাথে আছে স্কুটি।’
ফিদা আর নওশাদ দুজনেই প্রশংসার দৃষ্টিতে তাঁকায়।‘হুন্ডা’ শব্দটি ফিদার কানে লাগে। মনে করে ‘স্লিপ অফ টাঙ্গ!’কিন্তু নিশাতের শিশুসুলভ তৃপ্ত হাসির দিকে তাঁকিয়ে খটকা লাগাটা মুগ্ধটায় পরিণত হয়।
ওরা বের হয়ে আসে। ফিদা গাড়ির জন্য অপেক্ষায় থাকে নওশাদকে নিয়ে। নিশাত ওর স্কুটির কাছে যায়। আবার ফেরত আসে ওদের দিকে। নওশাদের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে। ফিদা সিগারেট খেতে খেতে একটু আনমনে ছিল। যা কানে এলো নওশাদ নিশাতের ক্যারিয়ার, পোস্টিং, ক্যারিয়ার লেখাপড়া ওসব নিয়ে আলোচনা করছিল।
ফিদার গড়ি চলে আসলো। ক্লাবের ড্রাইভাররা নিয়ে আসে। নওশাদ আর ফিদা উঠলোনিশাতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে। নিশাত বললো ও রোজ আসে সুইমিং করতে। ফিদা আর নওশাদও বললো ওরা রোজ আসবে। নিশাত বললো দেখা হবে।
নওশাদ নিকুঞ্জে থাকে। গাড়ি চলছে এয়ারপোর্ট ধরে। নওশাদের গাড়ি না থাকলে ফিদার দায়িত্ব পড়ে ওকে নামিয়ে দেয়ার। নওশাদের গাড়ি প্রায়ই থাকে না। ফিদাও আনন্দের সাথে লিফট দেয়। নওশাদ সেটা জানে বলেই নির্দ্বিধায় ফিদার সফর সংগী হয়।
‘মালটা ভালই। কেমন টাইট শরীর দেখসিস!’
নওশাদের কথায় ফিদা মৃদু হাসে। বলে – ‘পেটের দিকটা একটু উত্তল মনে হলো।’
‘নাহ! একদম ফ্ল্যাট।’
‘তবে কথাবার্তায় একদম ফ্রী, দেখলিনা নিজেই এসে আবার গল্প জুড়ে দিল!’
‘পটকানো যাবে মনে হয়।’
‘হা হা ...’ ফিদা হাসে নওশাদের কথায়।

পরদিন ফিদার কি এক ব্যস্ততায় যাওয়া হয় না ক্লাবে। তার পরদিন যেয়ে নওশাদের কথায় একটু রোমাঞ্চিত বোধ করলো ফিদা। নিশাত নাকি ওর কথা জিজ্ঞেস করে নওশাদের কান ঝালাপালা করে দিয়েছে। - ‘ফিদা ভাই আসবে না? কেন আসেন নি? কি করেন উনি?’
ফিদার পেশা শুনেও নাকি খুব প্রশংসা করেছে। যত কথা সব নাকি ফিদাকে নিয়েই বলেছে।
ফিদার একটু অবাকই লাগলো। প্রথমে আর দশটা মেয়েকে যেভাবে নেয় সেভাবেই নিয়েছিল। নওশাদের কথায় ফিদার একটু যেন আগ্রহ জাগে। এত টুকুই।
পুলে যেয়ে দেখে নিশাত আগে থেকেই আছে। ফিদাকে দেখে বেশ আক্রমনাত্মক ঢঙ্গে বলে – ‘আপনি যে এত নামকরা প্রতিষ্ঠানের অর্থনীতিবিদ বলেন নি তো!’
ফিদা উত্তরে বলে – ‘প্রসংগ ওঠেনি তাই!’
তারপর বলে – ‘কিভাবে জানলেন?’
নিশাত বেশ রহস্য করে বলে – ‘বলবো কেন? আমার অনেক সোর্স আছে।’
ফিদা হাসে। কিছু বলে না। বেশ বুঝতে পারে ওর সোর্স আর কেউ না, নওশাদ। কিন্তু বুঝতে দেয় না। ভাবে থাকুক মেয়েটা এই সামান্য রহস্য নিয়ে সুখে।
দুজনেই আলাদা ভাবে সুইমিং করে। ফিদা চেষ্টা করে যায় আগের দিনে নিশাতের সেখানো বিদ্যা দিয়ে একই ভাবে। নিশাত যেখানেই থাকে চোখ রাখে ফিদার দিকে। মাঝে মাঝে তাড়া দেয় ফিদাকে থেমে থাকতে দেখলে। একসময় সুইমিং শেষ করে ড্রেসিং রুমে যায় ফিদা। শাওয়ার নিয়ে কাপড় চেঞ্জ করতে। পুলে শুধু মেয়েদের জন্য আলাদা সময় আছে।কিন্তু কোন মেয়ে চাইলে ছেলেদের সাথেও করতে পারে। নিশাতের এ ব্যপারে কোনই আপত্তি নেই বোঝা যায়।
শাওয়ার নেওয়ার সময় পাশের বাথরুম থেকে গানের সুরেলা আওয়াজ পায়। পরে বের হয়ে কথায় কথায় যখন বলে যে নিশাত ভাল গানও গায়। নিশাত একটু মুখ শক্ত করে শুনতে চায়– ‘আপনি কোথায় শুনলেন?’
ফিদা একটু অবাক হয়, ঘাবড়েও যায়। বলে – ‘আমি তো পাশের বাথরুমেই শাওয়ার নিচ্ছিলাম!’
নিশাত একটু পর বলে – ‘না আমি ভাল গাইতে পারি না’।
ফিদা ধরে নেয় এটা ওর বিনয়।
একথা সে কথার মাঝে ফিদা বলে – ‘আপনি তো অনেক সাহসী মেয়ে!’
নিশাত বলে – ‘সাহসী মেয়েদের অনেক কিছু মোকাবেলা করতে হয়!’
ফিদা বলে – ‘তা তো ঠিক।’
‘প্রতি পদে পদে বাঁধা আর হেনস্থার স্বীকার হতে হয়! ঘরে বাইরে ...’
‘আপনি ম্যারেড?’
‘হ্যা ... কিন্তু একরুমে থাকি না। কারন আমি এসি সহ্য করতে পারি না।‘
ফিদা একটু ধাঁধায় পড়ে। এটাকি কোন ইংগিত। যে ওর হাজবেন্ডের সাথে সম্পর্ক ভাল না। বুঝতে পারে না। নীরব থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করে।
আরও টুক টাক কথা বার্তার পর চলে যাওয়ার সময় বলে কাল একটু আগে আসবে। ফিদা ও বলে – ‘ঠিক আছে আমিও আগে আসবো। আপনার ইনস্ট্রাকশন না পেলে সুইমিং শিখবো কিভাবে!’
নিশাত হেসে চলে যায়।

পরদিন নিশাত আসে না। তার পরদিন ফিদা সুইমিং করে চলে যাবার পর নওশাদের কাছে খবর পায় নিশাত নেমেছে পুলে। আর ওর নাকি খোঁজ করেছে। ফিদা একসময় নেমে আসে। দেখে নিশাত সুইমিং করছে। ফিদাকে দেখে কাছে এসে দাঁড়ায় পানিতেই। ফিদা অভিযোগ করে – ‘কি কাল আগে আসবেন বলে আর এলেনই না, আমি তাড়াতাড়ি এসে দেখি আপনার খবর নাই!’
‘আসলে অফিসের কাজে এত ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম!’
‘তা অবশ্য ঠিক। আপনার প্রফেশন টাইপই তো এমন! আমাদের মত নটা পাচটা তো না! আজও তো পুলে পেলাম না! কাল কি আসবেন? আসলে কখন?’
‘এক কাজ করেন না, আমার নাম্বারটা নিয়ে নেন। তাহলে তো আর সমস্যা থাকে না।’
ফিদা একটু চমকালেও ধরে নেয় মেয়েটা এমন সহজই। আর ও নিশাতের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে।
‘কালকে অবশ্য সাইক্লিং ফেডারেশনে একটা মিটিং আছে।’
‘ও আপনি তো আবার সাইক্লিং ও করেন’
‘না এখন তো আর করি না, সংগঠক হিসেবে কাজ করি।’
‘আপনি পারেন না কি বলেন তো?’
কিছুটা মুগ্ধতা আর বাকিটা স্বতস্ফূর্ত তৈল মর্দন থেকেবলে ফেলে ফিদা।
‘রান্না করতে পারিনা। পছন্দও করি না’
সাথে সাথে উত্তর দেয় নিশাত। ফিদা একটু থমকে যেয়ে হেসে ফেলে। তারপর হেসে বলে – ‘যাক একটা কিছু তো পাওয়া গেলো যা পারেন না! সব কিছু পারলে কেমন হয়!’
ফিদা চলে যাওয়ার কথা বললে নিশাত জানায় – ‘আমিও উঠে যাচ্ছি। এক ঘন্টা হয়ে গিয়েছে। আপনারা মেম্বার রা তো যতক্ষণ ইচ্ছা ততক্ষণ করতে পারেন। আমরা পারি না!’
‘আচ্ছা আপনি চেঞ্জ করে নেন আমি আছি।’
হঠাৎই বলে ফিদা ফেলে – ‘আপনাকে একদিন উপরে দাওয়াত দিব’
‘উপরে কি আছে?’
‘বার। যদি অভ্যাস থাকে ড্রিংক করার।’
নিশাত মুখটা একটু গম্ভীর করে ফেলে। ফিদা কিঞ্চিত ঘাবড়ে যায়। ভাবে বলাটাকি অভদ্রতা হয়ে গেল! শত হোক বাংগালী মেয়ে তো। কিন্তু একটু পর নিশাতের উত্তরে ভয় কাটে। নিশাত বলে – ‘আমি তো ড্রিংক করি না ... তবে মাঝে মাঝে রেড ওয়াইন খাই ... যেতে পারি ... তবে আজ না। আজ তো সময় নিয়ে আসি নি।’
‘না আমি আজকের কথা বলিনি। সে কোন দিন। আমি প্রায়ই বসি।’
‘আচ্ছা।’ নিশাত সম্মতি দেয়।
ফিদা নিজেও একটু অবাক হয় নিজের উপরই, নিশাতকে মদ্যপানের দাওয়াত দেয়াতে। সেটাকি নিশাতের সহজ অকপট আচরণের কারনে না অন্য কিছু? ঠিক বুঝতে পারে না।
পরদিন নিশাতের সুইমিং আগে শেষ হয়ে যায়। ফিদা একটু দেরীতে এসেছিল। নিশাত বলে ও ফিদার জন্য অপেক্ষা করবে বাইরে। ফিদা সুইমিং শেষ করে বাইরে এসে দেখে নিশাত বসে আছে রিসেপশনে। গম্ভীরভাবে বলে - ‘আপনি বলেছিলেন না ওপরে যাওয়ার কথা। আজ সময় আছে আমার।’
ফিদা একটু চমকে যায়। অনেক কারনেই। এত সহজে নিজেই যেতে চাবে ভাবেনি। বলে – অবশ্যই চলুন। একটু বসুন, আসচি।’
ফিদা দ্রুত নওশাদকে খোঁজে। পেয়ে যায় লবিতে। বলে নিশাতের কথা। রোজই নওশাদ হালনাগাদ নেয় ওদের সম্পর্কের। যদিও কেউই জানে না কি হতে যাচ্ছে। ফিদা নিশাতকে একটা প্রগতিশীল মেয়ে হিসেবেই ধরে নিয়েছে, সেভাবেই ওর সঙ্গ উপভোগ করে। তবে কোন মেয়ের সাথে একা ড্রিংক করেনি কখনো। তাও এত অল্প পরিচয়ে। ক্লাবের অন্যরা কি ভাববে সেটাও মনে উঁকি ঝুকি দেয়। তাই নওশাদকে থাকতে বলে। নওশাদ বলে – ‘সরি দোস্ত আজকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে। বস না তুই, ভালই এগিয়েছিস মনে হচ্ছে!’
ফেরত আসে নিশাতের কাছে। নিশাত বলে ‘আপনার কোন অসুবিধা হবে না তো!’
‘না কি অসুবিধা? চলেন।’ বলে নিজেই শক্তি পায়, নিশাতকে বিব্রত হতে দিতে চায় না।
ওরা উঠে দোতালায় বারে। বুঝতে পারে পরিচিত সবাই তাঁকিয়ে আছে ওদের দিকে। ফিদা কারো দিকে না তাঁকিয়ে কোনার দিকে কাঁচে ঘেরা রুমে চলে যায়। সেখানে কিছু মেয়েদের দেখতে পায়। সবার থেকে আড়ালো হয় আবার আরো কিছু মেয়ে থাকায় শালীনও মনে হয়। ফিদা বলে – ‘এখানে অবশ্য সিগারেট খেতে পারবো না’
‘এখানেই বসি। আমি সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারি না।’
‘তাই নাকি! আমি তো সিগারেট ছাড়া পাচ মিনিটও পার করতে পারি না!’
‘আমার জন্য একটু সহ্য করেন।’
‘অবশ্যই। ইউ আর মাই গেস্ট! করলাম না হয় সহ্য।’
ওয়েটার দৌড়ে আসে। ফিদা কমন এই বারে। ভাল ব্যবহার করে। ভাল টিপস দেয়। নিজের জন্য বিয়ার চায়। আর নিশাতের জন্য রেড ওয়াইন। এখানে রেড ওয়াইন পুরো বোতল নিতে হয়। নিশাত বলে – ‘আমি তো এত খেতে পারবো না, আপনাকে হেল্প করতে হবে।’
‘আচ্ছা দেখা যাক। শুরু করেন।’
নিশাত কয়েক সিপ নিতে নিতে ফিদার ওয়াইনের গ্লাস শেষ। ভাবলো বাকিটা ও খাক। ও বিয়ারে মনোনিবেশ করলো। নিশাত ক্ষুধার্ত ছিল। ওর জন্য ক্লাব স্যান্ডুইচ ওর্ডার করলো। ফিদা ড্রিংকিং এর সময় ফুড তেমন নেয় না। নিশাতকে দিয়েই শেষ করালো ফুড। এক গ্লাস ওয়াইন শেষ করতে করতে দুটো বিয়ারও শেষ করে ফেললো ফিদা। নিশাতের গ্লাসে তাঁকাতে নিশাত বললো – ‘আমি একেবারেই অভ্যস্ত না। হার্ডলি চার পাচ বার খেয়েছি। খেয়ে কয়েকবারই আউট হয়ে গিয়েছি, সব বারই আমার হাজবেন্ডের সাথে খেয়েছি। আমাকে ধরে টরে নিতে হয়েছে ওকে।’
‘থাক আপনি আস্তে আস্তে খান।’
আর ফিদা ভাবে ও তো কোন মেয়ের সাথে একাকী কখন ড্রিংক করেনি। কিছুটা সংকোচ ঠিকই লাগছে। এভাবে একটা আলাদা মেয়ের সাথে বসার কথা চিন্তাও করেনি কখনো। মাথায় নীতা চলে আসতো। এখনো আসেনি তা না। কিন্তু সেটা সরিয়ে দিচ্ছে কিছু। মোহ? অনেক বিবাহিত বন্ধুদের মেয়ে বন্ধু দেখতে দেখতে আর গল্প শুনতে শুনতে ওরও কি শখ জেগেছে? সরিয়ে দেয় মাথা থেকে কুট তর্ক, আপাত মনে হওয়া। মনোনিবেশ করে লেডী গেস্টের দিকে।
গল্প চলছিল আস্তে ধীরে। নিশাত দ্বিতীয় গ্লাস পান করতে করতে কথা ফুটে। সব নিজের জীবনের কথা। প্রধাণত শশুর বাড়ীর কথা। হাজবেন্ডের সাথে ভাল চললেও শাশুরী, ননদ, ভাসুর সবাই ওর চালচলনের বিরুদ্ধে। ওর স্কুটি চালানোর বিরুদ্ধে। স্কুটিটা ওদের বাসায়ও রাখার বিরুদ্ধে। মাঝে মাঝে খাবারও থাকে না ওর। পানি একটু বেশী খায় বলে ওর শাশুরী ফ্রিজ লক করে রাখে রাতে। ও সব কিছু ওর হাজবেন্ডকে বলে না। বললেও লাভ হয় না। ওর হাজবেন্ড বনি সবার ছোট হওয়ায় কাউকে কিছু বলে না বা বলতে পারে না। ওরা দুজন একা থাকলে খুব কাছাকাছি জড়াজড়ি করে থাকে। কিন্তু পরিবারের কেউ এসে পড়লেই ওদের চক্ষু শূল হয়। ওকে ডেকে নিয়ে কি বলে। সাথে সাথে বনির ব্যবহার পরিবর্তন হয়ে যায়।
ফিদা মনযোগী স্রোতা হিসেবে শুনে যায়। এক পর্যায়ে নিশাত বেশ আবেগ প্রবণ হয়ে যায়। চোখে পানি চলে আসে। বলে – ‘আমি সুন্দর না, ফেমেনিন না, সেক্সি না’
ফিদার খারাপ লাগে। বলে – ‘কে বলেছে? আপনি যথেষ্ঠ সুন্দর, সেক্সিও!’
‘আমি কালো!’
‘কালো মেয়ে সুন্দর হতে পারে না?’ ফিদা আপত্তি করে।
নিশাত কিছু বলে না। নিশাতকে ফিদার একটু বেসামাল মনে হয়। বলতে যাচ্ছিল বাকি বোতল শেষ করতে। কিন্তু বলে-
‘আপনি মনে হয় আর খেতে পারবেন না?’
‘হ্যা তাই মনে হয়।’ সোফায় হেলান দিয়ে আধ শোয়া হয়ে বলে।
‘ভালই ধরেছে বলে মনে হয়।’
‘জী, আসলে তো একদম অভ্যাস নেই। যতবারই খেয়েছি কোন না কোন কান্ড করে ফেলেছি।‘
‘বাকি বোতলটা নিয়ে যান।’
‘তাই নিয়ে যাওয়া যাবে?’
‘হ্যা ব্রাউন পেপারে মুড়িয়ে দিবে।’
‘কিছু যদি মনে না করেন এটার দাম জানতে পারি?’
‘না জানার দরকার নেই।’ হেসে উত্তর দেয় ফিদা।
‘কেনো?’
‘এটা আমার ট্রিট আর একসাথে বিল দিয়েছি আলাদা করে দাম জানি না!’
‘আপনি ঠিক আছেন?’
‘মনে তো হয়। তবে ওয়াশ রুম যেতে হবে।’
‘নিজে যেতে পারবেন?’
‘পারবো শুধু দেখিয়ে দিন?’
ফিদা দেখায়। নিশাত এলোমেলো ভাবে গেলেও যেতে পারে। ফিরে এসে বলে – ‘আসলে ঠিক নেই।’
‘বাইক চালিয়ে কিভাবে বাসায় যাবেন?’
‘মনে হয় পারবো না। বাইকটা কি আজ এখানে রেখে যাওয়া যাবে? কাল নিয়ে যাব?’
‘যাবে নিশ্চয়ই। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি ... চলেন তাহলে।’
‘চলেন।’
নিশাত আস্তে আস্তে উঠে দুর্বল ভাবে হেটে যায়। ফিদা কাছাকাছি থাকে। কিন্তু স্পর্শ করে না। বের হওয়ার সময় না তাঁকিয়ে বুঝতে পারে কয়েক জোড়া চোখ ওদের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। ফিদা পুরোপুরি উপেক্ষা করে নিশাতকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। ক্লাবের সিকিউরিটিদের বলায় ওরা সানন্দে নিশাতের স্কুটি রাখার ব্যবস্থা করে দেয়। গড়ি ডেকে দেয় ফিদার। নিশাত বসে পাশের সিটে। ফিদা জানতে চায় – ‘দিয়া বাড়ি যাবেন তো?’
‘না আজকে বাবার বাসায় যাব, এক নম্বর সেকটরে।’
‘ওদিকে রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া আছে?’
‘যান দেখিয়ে দেব।’
‘আপনি ঠিক থাকলেই হয়!’
‘আমি ঠিক আছি।’
এয়ারপোর্টের মোড়ের কাছে এসে ফিদা জানতে চায় কোথায় যাবে। নিশাত বলে – ‘এখানেই নামিয়ে দেন। আমি চলে যেতে পারবো।’
‘মাথা খারাপ! আপনাকে এরকম অবস্থায় এত রাতে রাস্তায় নামিয়ে দেব?’
‘এমনি তো অনেক করলেন! স্কুটি রাখার ব্যবস্থা করে দিলেন, লিফট দিলেন, আমি খুব দুঃখিত আপনাকে ঝামেলায় ফেলার জন্য!’
‘আরে না, আমি লজ্জিত, আপনাকে খেয়াল করা উচিত ছিল, ড্রিংক করার প্রস্তাব তো আমার ছিল। আমারই খারাপ লাগছে!’
‘বায়ে যান।’
বায়ের একটা রাস্তায় ঢোকে ফিদা। এয়ারপোর্টের ঠিক উলটো দিকে। দেখেছে কিন্তু কখন যাওয়া হয়নি ফিদার। কখনো সরু কখনো প্রশ্বস্ত। যেতেই থাকে।
‘বলেন কিন্তু ডানে বাঁয়ে।’
‘যেতে থাকেন।’
যেতেই থাকে। বেশ ভেতরে। পুরো অচেনা জগত ফিদার জন্য। ফিদা জিজ্ঞেস করে – ‘জায়গাটার নাম কি?’
‘আশকোনা।’
‘ওহ! শুনেছি নাম। চিনতাম না কোথায়।’ ফিদার শুধু খটকা লাগে উত্তরা সেকটর ওয়ান বলেছিল কেন নিশাত। আশকোনা কি উত্তরার মধ্যে পড়ে? জানে না ফিদা।
‘এই পার হয়ে গেল গলি।’ নিশাত বলে।
ফিদা ব্রেক করে। দেখে চিকন এক গলি। বলে – ‘গাড়ি যাবে?’
‘যাবে কিন্তু উলটো ব্যাক করে আসতে হবে। আপনি এখানেই নামিয়ে দেন।’
ফিদা পাশে পার্ক করে। পশ্চিমা ভদ্রতায় ওকে দরজা খুলে নামিয়ে দেয়। ওর সাথে নিরাপদ দূরত্ব রেখে পাশাপাশি যায়। যদি পড়ে যায়। নিশাত টলতে টলতে এগোয়। একসময় দুজন বয়জ্যেষ্ঠ নর নারী দেখতে পায় উদবিগ্ন চেহারা নিয়ে এগিয়ে আসছে। নিশাত ফিদার পরিচয় দেয় ওঁদের কাছে। পরিচয়টা ওদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কোন আজে বাজে লোকের সাথে এত রাতে আসেনি এটা বোঝানোর জন্য, বোঝে ফিদা।আরো বুঝতে পারে নিশাত আগেই টেক্সট করে রেখেছিল যে ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ওকে যেন ওঁরা এগিয়ে এসে নিয়ে যায়। ফিদা চলে আসে। নিজের কাছে একটু খারাপ লাগে বেচারীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য। তবে আজকে সন্ধ্যা থেকে এই মধ্যরাত পর্যন্ত প্রতিক্ষণেই নিশাতকে নতুন ভাবে চিনে। বাসায় ফিরে যায় ফিদা।
রাতে নিশাতের জন্য দুশ্চিন্তা হলেও সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। শুক্রবার, ছুটির দিন। দেরীতে উঠে ফিদা। উঠেই টেক্সট করে নিশাতকে – ‘ঠিক আছেন তো? বাইক নিয়েছেন ক্লাব থেকে?’
উত্তর আসে – ‘ঠিক আছি, বাইক অলরেডি আমার কাছে, ধন্যবাদ!’
শুক্র শনিবার ছুটির দিনে সুইমিং করতে যাওয়া হয় না। নওশাদ যেতে চায় না। তাই ফিদাও যায় না। আর একা একা পুলে নামতে ভয় পায়। যদিও অনেক জায়গাই বুক পানি। তবুও ভয় পায় ফিদা।
শনিবার সন্ধ্যায় বাসায় ছিল। ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছিল। হঠাৎ ফোন বেজে উঠে, নিশাতের! একটু বিচলিত হয়েই ফোনটা ধরে। পাশে ডাইনিং রুমে নীতা কি যেন করছিল।
‘হ্যালো’
‘কি করছেন, চা খাবেন, জমজম টাওয়ারের কাছে চলে আসেন।’
খুব সহজভাবে বলে নিশাত।
‘জমজম টাওয়ার? আচ্ছা!’ একটু দ্বিধান্বিত ভাবে বলে।
নীতাযে শুনছিল ভাবতেই পারেনি ফিদা। সাথে সাথে বলে ‘ওখানে যাবে? চল আমারো কাজ আছে।’
ফিদা পড়ে মহা ফাঁপড়ে! বউ সাথে গেলে তো আর নিশাতের সাথে দেখা করতে পারবে না। আবার নিশাতকে কি বলবে? বউ এর জন্য যেতে পারছেনা বললে কি ভাববে? বউ এর কাছে লুকাচ্ছে? তারমানে ফিদা নিশাতের সাথে গোপন সম্পর্ক করছে? কি ভাববে নিশাত। ও তো খুব মুক্তমনা আর অকপট চরিত্রের মেয়ে! শেষে টেক্সট করে – ‘সরি, আমার বউও আমার সাথে আসতে চাচ্ছে। মিস করলাম আড্ডা আপনার সাথে।’
‘কোন সমস্যা নেই। সরি আপনার ফ্যামিলি টাইমে ইন্টারফেয়ার করার জন্য।’
‘না না, ইট’স ওকে।’
নীতা বলে – ‘কে ছিল?’
‘এই এক ছোট ভাই।’
‘কি নাম?’
‘তুমি চিনবে না।’
‘না চিনি, নাম বলতে অসুবিধা আছে?’
‘নাহ! ওর নাম সাব্বির, ক্লাবে পরিচয়, এদিকেই থাকে। ও হঠাত কল পেয়েছে, অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। চল তাহলে।’
‘ইলেক্ট্রিক মিস্তিরি আসবে না? থাক যাব না।’
কিন্তু ফিদার দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি মেলে রাখে। যেন বলে সব বুঝি আমি।
ফিদা মনে মনে ফুসে। ভাবে যাবাই না যখন খামাখা আমার যাওয়াটা মাটি করলা কেন? নিশাতের সাথে কিছুই নাই, তবুও জানে নীতা এতটুকুও সহ্য করবে না। কি দরকার নিরাপদ পুকুরে পিরানহোর পোনা ছাড়ার!

রবিবার সকালে অফিসে যেয়ে টেক্সট করে নিশাতকে। ভেজিটেবল টেক্সট – ‘শুভ সকাল। আজ আসছেন তো সন্ধ্যায় সুইমিং এ?’
কোন উত্তর আসে না। একটু বিব্রত বোধ করে দোমনায়। টেক্সট করাটাকি পছন্দ করলো না নিশাত। নাকি মাইন্ড করলো গত রাতে না আসাতে। পরে ভুলে যায়। তেমন গুরুত্ব পায় না ওর কাছে।
বিকেলে টেক্সট আসে নিশাতের – ‘কই আপনি, আসবো একটু পর আপনাদের ক্লাবে।‘
‘বের হচ্ছি অফিস থেকে। দেখা হবে পুলে।’

সুইমিং করে অনেকের সাথে দুজন। ফিদা এখনো শিক্ষানবীশ। নিশাত নিজের সাতারের ফাঁকে ফাঁকে ফিদার খেয়াল রাখে। নওশাদ আর অন্যরা মিলে ফিদার নাম দিয়েছে ব্রজেন দাস। আড়াআড়ি পুলের দশ মিটার নাকি ওর জন্য ইংলিশ চ্যানেল। নিশাত অবশ্য হাসলেও ওকে উৎসাহ দিয়ে যায়।
সুইমিং এর পর হালকা স্ন্যাক্স খেতে বসে ওরা ক্লাবের লনে। সাথে আরো একজন গেস্ট সুইমার কিবরিয়া বসে। নিশাত আর কিবরিয়া অনেক দিন থেকে একসাথে সুইমিং করে। কিবরিয়া জিম করে, দৌড়ায়, তারপর সুইমিং করে। ফিদা দৌড়ানো বা হাটে না কেন কিবরিয়া জানতে চাইলে নিশাত উত্তর দেয় – ‘উনি এসি ছাড়া থাকতে পারে না। ঘামলে নাকি ওনার অসুবিধা হয়, গাড়ি ছাড়া চলতে পারে না!’
ফিদা একটু অসহায় ভাবে দুজনের দিকে তাঁকায়। কিবরিয়ার কোন ভাবান্তর নেই। ফিদাকে বড় হিসেবে শ্রদ্ধা করে। নিশাত টিটকারী মারছে কিনা বুঝতে পারে না। জুস স্যান্ডুইচ খাচ্ছিল ওরা। কিবরিয়াকেও অফার করে নিশাত। এক সময় কিবরিয়া চলে যায়। ওরা অনেক্ষণ গল্প করে। ফিদা আগের দিন চা খেতে আসতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে গেলে নিশাত বলে –
‘আরে নাহ! আপনি না আসাতে বরঞ্চ ভালই হয়েছে। বাড়ি থেকে ঝগড়া করে বের হয়েছিলাম। কত কি বলে ফেলতাম। এমন একজনকে পেয়েছি, যে সব জানে। তাই মন পরিস্কার করেছি সেই ভাইয়াকে বলে।’
‘আচ্ছা আমাকে গাড়ি চালানো শেখাবেন?’
ফিদা একটু অবাক হলেও অখুশী হয়না। মনে করে ফিদাকে অনেক কাছের মানুষ হিসেবে নিয়েছে, নাহলে একাকী ওর সাথে ড্রাইভিং করতে যাবে কেন? বলে –
‘শিখাবো সমস্যা নেই। কিন্তু আপনাকে ব্র্যাক বা কোথাও পড়ে ভর্তি হতে হবে। কারন গাড়ি চালানো শিখাটাই জরুরী না, দরকার হল রেগুলার ড্রাইভ করা। তার জন্য আপনাকে প্রয়োজনে এসব ট্রেনিং সেন্টারের গাড়ি ঘন্টা হিসেবে ভাড়া করতে হবে। আমি কিন্তু আমার ছেলেকে ব্র্যাকে ভর্তি করে দিয়েছি। ওর লাইসেন্স ও হয়ে গেছে। ওরাই ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’
‘আমার লাইসেন্স আছে।’
‘হা হা হা ...’
ফিদা উচ্চ স্বরে হেসে ফেলে। নিশাত যেন একটু লজ্জা পায়। এই প্রথম ওকে লজ্জা পেতে দেখে।
‘আপনি বোধহয় আগে করেছেন। এখন জেনুইন পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেয় না।’
‘হ্যা অনেক আগে করেছি।’
‘আপনাকে একটা গল্প বলি। বহুদিন আগে আমার প্রথম গাড়ি চালাচ্ছিলাম আমার এক কলিগের সাথে। আমার কিন্তু লাইসেন্স ছিল না। আমার কলিগের ছিল। ও হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে ভাই ব্রেক কোনটা? আমি হাসতে হাসতে শেষ ...!’
বলে ফিদা আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। এবার অবশ্য নিশাত ওর সাথে হাসিতে শরীক হয়।
‘সব সম্ভবের দেশ এই বাংলাদেশ!’
ফিদা স্বাগক্তি করে।
‘আমার ব্র্যাকে শেখাতে একটু সমস্যা আছে।’
ফিদা কিছু জানতে চায় না কি সমস্যা। অপেক্ষা করে কি বলে নিশাত।
‘আর গাড়ি চালানোটা আমার একটা জিদ! আমার হাজবেন্ড ওর গাড়ি ধরতে দেয় না। আমি গাড়ি চালানো শিখে ওর সামনে চালিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই।’
ফিদা মৃদু হেসে বলে – ‘ভাল। শেখাব আপনাকে। কিন্তু সময় দিতে হবে অনেক!’
‘দিব।’

একসময় দেখে সাড়ে দশটা বাজে। নিশাত বলে –
‘চলেন উঠি। আপনার সাথে কথা বলতে বসলে সময় কোন দিক দিয়ে পার হয় খেয়ালই থাকে না।’
‘আপনি তো স্কুটিতে যাবেন?’
‘হ্যা। আপনি আসেন পিছু পিছু যতক্ষণ পথ এক থাকে।’ বলে শিশুর মত সরল হাসি হাসে নিশাত।
ফিদাও রাজী হয়।
নিশাত যায় সামনে। বাইক চিপাচাপি দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে। গাড়ি আটকে যায় যে কোন জায়গায়। নিশাত আবার দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। বেশ খেলা খেলা মনে হয় ফিদার। একসময় টা টা দিয়ে আলাদা হয়ে যায় দুজন। ছেলেমানুষী আচরণ। তবুও ভালই লাগে ফিদার। নিশাত কখন কি করে অনুমান করা যায় না। সব কিছুতেই একটা চমক থাকে।

পরদিন নিশাত দেরীতে আসে। ফিদা সাঁতার কেটে বারে সময় কাটাচ্ছিল। নিশাত বলেছিল ওর সুইমিং শেষ হলে জানাবে। জানায় তবে বেশ দেরী করে। ততক্ষণে ফিদা বেশ কয়েকটা বিয়ার গলধঃকরন করে ফেলেছে। ফিদা অনিয়মিত মদ্যপ ছিল। মাঝে মধ্য বন্ধুদের সাথে একত্র হলে পান করতো। খুব বেশী হলে সপ্তাহান্তিক অবকাশে। তবে প্রায় বছর খানেক ধরে বেড়ে গিয়েছিল কোন কারন ছাড়াই। নীতা বলতো – ‘বৃহস্পতিবার তো তুমি যাওই।‘
ফিদা নীতার কথায় জানলো যে ও প্রায় রোজ বৃহস্পতিবারে বারে যায়। ধরে নিল আবশ্যকীয়। শুক্রবার বার বন্ধ থাকে। তাই শনিবার একটা অযথাই তাড়না তৈরী হয়। নীতা দেখে বললো – ‘তুমি তো এখন শনিবারও রেগুলার বানিয়ে দিলে!’
ফিদা শনিবারকে জরুরত বানিয়ে নিল। এরপরও মনে মনে বন্ধুদের কোন গেট টুগেদারের অপেক্ষায় থাকতো কাজের দিনেও। সেটাকে বোনাস হিসেবে ধরে নিল। এভাবে রীতিমত অভ্যাসে পরিণত হল। আর এখন সুইমিং করতে এসে অবধারিত উপরে ওঠা হয়েই যায়।
তাই একটু বেশী খাওয়াতে নিশাতের সাথে কি নিয়ে আলাপ হল এত লম্বা তেমন কিছু মনে করতে পারলোনা। শুধু মনে ছিল ওকে কোথায় ড্রাইভিং শিখতে নিয়ে যাবে। দিয়াবাড়ির খালি রাস্তায়ই শিক্ষার প্রথম পর্বগুলো অনুষ্ঠিত হবে। দুজনের অফিসের পরে, দিন থাকতে থাকতে।
সাঁতার আর মদ্যপান দুটোই হলে রাতে বাসায় যেয়ে গভীর ঘুমে পড়ে যায়। মাঝে মাঝে রাতের খাওয়াও হয় না। সেরাতেও তাই হল। সকালে অফিস যাওয়ার সময় নিশাতকে ‘গুড মর্নিং’ টেক্সট  করতে যেয়ে একটা খটমটে টেক্সট দেখলো নিশাতের।
বুঝতে একটু সময় লাগলো। লেখা –
‘I am too conservative, it is too tough for me to go to long drive with you!’
টেক্সটা পড়ে ফিদা টাস্কি খেয়ে গেল। ও কখন ওকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাওয়ার কথা বললো?
সাথে সাথে টেক্সট করলো – ‘আমি কি আপনাকে লং ড্রাইভে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছি?’
একটু পর উত্তর আসলো – ‘হ্যা আপনি আমাকে নিয়ে কুমিল্লা যাওয়ার কথা বলেছিলেন।’
ফিদার মনে পরলো ওরা বন্ধুরা একবার চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে কুমিল্লা ক্লাবে থেমেছিল। খুব সুন্দর রুম,ভাল খানাপিনা। সুন্দর ফাইভ স্টার টাইপের বেড দেখে দুষ্টামি করে ওরা বলাবলি করছিল –
‘কি গে পার্টি করতে আসচি। গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে আসলে কতই না এনজয় করা যেত!’
নিছক দুষ্টুমি ছিল। ফিদার মনে সেটা কি গেঁথে ছিল আর অনুরুপ অবস্থা পেয়ে নিশাতকে কি অফারও করে ফেলছে! ছি ছি! ওকি ভাববে। অথচ ফিদা ওকে নিয়ে এরকম চিন্তাও করেনি!
ফিদা বেশ কয়েকটা টেক্সট করলো ক্ষমা চেয়ে। জানালো যে সে সজ্ঞানে এরকম কিছু বল নি। মনেও নেই। একজন ডিসেন্ট লেডীকে এরকম ইন্ডিসেন্ট প্রোপজাল দেওয়া জঘন্য অন্যায় হয়েছে। আর কি দিয়েছে তাও জানে না। কারন টেক্সট গুলো মুছে ফেলে।
নিশাতের কোন উত্তর আসে না। ফিদা একটু স্নায়বিক চাপে ভুগে। খুবকি খারাপ কিছু লিখেছে? জবাব দিচ্ছে না কেন? কি করলো ফিদা একটা ভদ্র সম্পর্ককে কলংকিত করে। আবারো দুঃখ প্রকাশ করে টেক্সট করলো।
এবার উত্তর এলো।
‘আরে না! আপনি এত সিরিয়াসলি নিচ্ছেন কেন? আমি কিছু মনে করিনি। বুঝেছিলাম যে আপনি নরমাল ছিলেন না। ব্যস্ত ছিলাম তাই উত্তর দেই নি।’
‘যাক বাঁচালেন।’
‘আসেন না আমার অফিসের কাছে, কফি খাই।’
‘তাই, কোথায়?’
‘পেয়ালা, চিনেন? আগে বেস্ত্রো ছিল যেখানে।’
‘হ্যা বেস্ত্রো তো চিনতাম। চিনবো তাহলে।’

পেয়ালায় মুখোমুখি দুজন বসে আছে। ফুড কফি আগে পে করে অর্ডার করতে হয়। পে করা নিয়ে প্রায় হাতাহাতি। নিশাতের দাবী ও দাওয়াত দিয়েছে। ফিদা তা মানতে রজী না।
এলোমেলো অনেক গল্প হলো। ওদের গল্প কখনই থেমে থাকে না। এর মধ্যে নিশাতের হাজবেন্ডের এক বন্ধুকেও দেখা গেল পেয়ালায়। নিশাত নিজেই পরিচয় করিয়ে দিল। যাতে অন্য কিছু মনে না করে।
‘চলেন আমরা একদিন একটা মুভি দেখি।’
‘দেখা যায়।’
‘কি ধরনের মুভি পছন্দ করেন?’
‘আর যাই হোক একশন, সাইন্সফিকশন এসব না’
‘তাহলে কি দেখা যায় ...’
বলে নিশাত সেল ফোনে নেটে সার্চ দেয় কি কি মুভি চলছে।
‘এগুলো দেখি না তা না, ছেলেকে নিয়ে দেখতে হয় মাঝে মাঝে।’
‘তাহলে আপনার ছেলে আর ভাবীকেও নিয়ে আসেন। আমরা চারটা টিকেট কেটে রাখি। দেখাবো কেউ কাউকে চিনি না ......হা হা হা ... অথবা দেখাব চিনি কিন্ত কোইন্সিডেন্টালী একসাথে সীট পড়েছে ...’
বলে খুব হাসে নিশাত। ফিদাও হাসে। বলে –
‘আমার বউ ঠিকই বুঝে ফেলবে’
‘ওহ! তাহলে তো হবে না।’
‘মেয়েদের অনেক গুলো চোখ থাকে।’
‘ঠিক! তবে আপনার বউ নিশ্চয়ই আপনাকে খুব ভালবাসে?’
‘হ্যা।’
‘আপনি?’
‘আমিও প্রচন্ড ভালবাসি।’
‘ভাল। আমি আর বনিও তাই।’


পরদিন সুইমিং করে নওশাদ, ফিদা আর নিশাত ক্লাবের রেস্টরেন্টে বসে ছিল। হালকা স্ন্যাক্স আর চা খাচ্ছিল। নিশাত পুডিং নিতে চাইলে ফিদা জোড় করেই ওর পুডিং কিনে দিল। ফিদাকে কথাচ্ছলে নিশাত বলছিল –
‘এত ড্রিংক করেন কেন? স্মোকও করেন এত বেশী! নিজের জন্য চিন্তা হয় না?’
‘নাহ! বেশীদিন বাঁচার কোন ইচ্ছেই নেই। যত বাঁচবো ততবেশী পাপ করবো।’
‘নিজের চিন্তা না করেন, ভাবী আর ছেলের জন্য চিন্তা করেন?’
‘আমি মরলেতো ওদের অর্থনৈতিক কোন ক্ষতি হবে না। যা আছে থাকবে। আমি যত বাঁচবো তত যা আছে সব খরচ করে ফেলবো!’
‘তাহলে আমার জন্য বাঁচেন!’
সোফায় মাথা হেলান দিয়ে আধ শোয়া অবস্থায় ফিদার দিকে তাঁকিয়ে থাকে নিশাত এটা বলে। ফিদা একটু চমকে যায়। ও কি বুঝে বললো? ঠিক ধরতে পারেনা নিশাতের মতিগতি।
যাওয়ার সময় রোজকার মত নিশাত আগে আগে স্কুটিতে যায় আর ফিদা ওর গাড়ি নিয়ে অনুসরন করে। অনেকটা ছেলে খেলা যেন। দুজনেই উপভোগ করে।

ওদের সারাদিনই টেক্সট চালাচালি চলে হোয়াটসএপে। এক বৃহস্পতিবার বিকেলে ফিদাকে আসতে বলে ওর অফিসে, ছুটির পরে। ফিদা যায়। নিশাত স্কুটি ওর অফিসে রেখে ফিদার গাড়িতে ওঠে।
‘কোথায় যাবেন?’
‘যেখানে নিয়ে যান।’
‘ক্লাবে তো আজ অনলি মেম্বারস ডে, সেদিন স্পেশিয়ালি বলে আপনাকে নিয়ে ঢুকেছিলাম।’
‘তাই! থাক ক্লাবে না যাওয়াই ভাল। আপনার জন্যই খারাপ হবে। কে কিবলে।’
‘ক্লাবে গেলে ড্রিংক করা যেত। থাক আপনার জন্য না হয় কোন ভাল রেস্টরেন্টেই যাই।’
‘আমি তো অ্যাজকে ড্রিংক করতেই চাচ্ছিলাম!’
‘ও! তাই! আমি তো ভাবলাম আপনি আর আমার সাথে ড্রিংকই করবেন না!’
‘কেন? আপনি কি করেছেন? আপনি কি কিছু করেছিলেন যে আপনার সাথে আর ড্রিংক করবো না?’
‘কিছু করিনি। তবুও আমার একটা দায়িত্ব ছিল আপনাকে চেক দেওয়ার। তাই অপরাধী অপরাধী লাগছিল নিজেকে।’
‘আপনি কোন অপরাধ করেননি।’
‘আচ্ছা তাহলে কোথায় যাওয়া যায় ... সাধারণ বার গুলোতে আপনাকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। আমিই যাই না।’
‘তাহলে কোথায় যাবেন?’
‘দেখি সোনারগাও এর পুল সাইডে বসা যায়।’
‘ওখানে তো অনেক টাকা লাগবে!’
‘হ্যা। অসুবিধা নেই।’
‘কোন দরকার নেই।’
‘একদিন না হয় গেলাম। রোজ তো আর যাব না!’

সোনার গা হোটেলে সুইমিং পুলের পাশের রেস্টরেন্টে ওরা বসে আছে। পরিবেশটা আসলেই সুন্দর। খোলা মেলা। আধো আলো আধো অন্ধকার। পাশে নীল রঙের সচ্ছ পানি ভরা সুইমিং পুল। ছাদ সহ রেস্তোরার একটা অংশ থাকলেও আলাদা ছাতার মত ছায়া দেয়া ছাতার মত গঠনের নীচে বসার ব্যবস্থা। কোনটা একেবারে পুলের পাড়ে। ফিদা বন্ধু বান্ধবের সাথে মাঝে মাঝে আসে। গল্প করে, একটা দুইটা বিয়ার খায়। পরিবেশে পয়সা উসুল হয় বলেই মনে করে।
নিশাত রেড ওয়াইন নেয়। ফিদা কার্লসবার্গ বিয়ার। নিশাতের জন্য ফুড অর্ডার করে। ফিদা ড্রিংক করার সময় ফুড নিতে চায় না।
গল্প চলে অনবরত। নিশাত নিজের জীবনের, বিশেষ করে বিবাহিত জীবনেরই গল্প করে – ‘বনিকে সে খুউব ভালবাসি। জীবনে কটা পুরুষের সাথেই সব কিছু শেয়ার করেছি। প্রথম আলিংগন, চুম্বন সব। ড্রইং রুমের সোফায় যতক্ষণ থাকই, জড়াজড়ি করে থাকি। বিছানায়ও তাই। বনিও আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেনা। কিন্তু ভাসুর শাশুরী আমাদের এই মাখামাখি সহ্য করতে পারে না।’
‘বনি আপনার হয়ে কিছু বলে না?’
‘বনিকে এমন কিছু বলে যে বনিও আমার বিরুদ্ধে চলে যায়। এবার রাগ করে বের হয়ে এসেছি।’
‘আলাদা থাকলেই পারেন?’
‘বনি রাজী না। ওর মা যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন একসাথে থাকবে।’
‘বনির মাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান!’
‘টাকায় নাকি কুলোতে পারবে না।’
‘মুশকিল!’
‘এবার একটা এসপার ওসপার করেই ছাড়বো। হয় বনি আমার মত মেনে নিবে না হয় ডিভোর্স দিতে বলবো, বিদেশে চলে যাব ...... এখানে থাকলে ওর ভূত আমাকে তাড়া করে বেড়াবে।’
‘আপনাদের বিয়ে হয়েছে কত বছর?’
‘পাঁচ বছর।’
‘বাচ্চা নেন নি কেন?’
‘বাচ্চা নিব কখন? একসাথে থাকারই সুযোগ হয় নাই!’
‘কেন?’
‘সে অনেক কথা ...এখন তো আলাদা রূমে থাকি ......হিসেব করে বলে দিতে পারি কয় রাত আমরা একসাথে কাটিয়েছই!’
‘তাই!’
‘হুমম।’
‘এর একটা ফয়সালা হওয়া দরকার।’
‘তাই তো চাচ্ছি।’
‘হচ্ছে না কেন?’
‘ও ঝুলাচ্ছে।’
‘ঝুলাতে দিবেন না। শক্ত করে ধরেন। হয় একসাথে থকেন না হয় বের হয়ে চলে আসেন। এক সাথে হলে প্রথমেই একটা বাচ্চা নিয়ে নিবেন।‘
‘কেন?’
‘নিজের একটা অংশ রেখে যাবেন না পৃথিবীতে। মরে গেলেন তো হারিয়ে গেলেন!’
‘সম্পর্ক টিকে কি না টিকে?’
‘আপনি একা মানুষ করবেন?’
‘একা কেন কষ্ট করবো আমি?’
‘এখনো বয়স আছে, কদিন পর চাইলেও পাবেন না।’
নিশাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে – ‘লাইফে স্ট্যাবিলিটি প্রয়োজন। এমন ছন্নছাড়া জীবনে বাচ্চা নিলে মানুষ করতে পারবো না!’
‘অবশ্য আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যপার। আমার যা ভাল মনে হলো তাই বললাম।’

কিছুক্ষণ চুপচাপ। নিশাত নীরাবতা ভাংগে।
‘আমাকে গাড়ি চালানো শিখাবেন কবে?’
‘যেদিন সময় দিবেন।’
‘আমার এটা একটা চ্যালেঞ্জ!’
‘হ্যা বলেছেন।’
‘কেউ আমাকে ছোট করলে বা অপমান করলে মুখে কিছ বলি না। পরে নিজে পেরে, করে দেখিয়ে দেই!’
তারপর হাসতে হাসতে বলে – ‘একদিন বনি দেখুক, ওর সামনে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছি! কি যে অবাক হবে!’
বলে আবারো শিশুর মতই হেসে উঠে।
কিছুক্ষণ পর শান্ত হয়ে বলে – ‘আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’
‘আগেই দিয়ে দিলেন? এখনো তো শেখানোই শুরু করিনি!’
‘সে জন্য না। আজকে এত সুন্দর জায়গায় নিয়ে আসার জন্য। এত টাকা খরচ করার জন্য!’
‘আপনি খুশী হলেই আমি খুশী!’
‘চলুন কাল থেকেই শুরু করি।’
‘আচ্ছা।’

বিকেল বেলা কারওয়ানবাজারে নিশাতের অফিস থেকে ওকে তুলে নেয় ফিদা। আজ ও স্কুটি আনেনি। ঠিক হয় দিয়াবাড়ির ওখানেই প্রাথমিক তালিম চলবে। সন্ধ্যার আগে দিয়ে, মোটামুটি ফাঁকা রাস্তা। প্রারম্ভিক ও মৌলিক তাত্ত্বিক জ্ঞান দান করে নিশাতকে ড্রাইভিং সিটে বসায়। নিশাত বেশ উচ্ছসিত হয়ে বলে -
‘আপনি আমাকে আপনার গাড়ি দিয়ে দিলেন?’
ফিদা কিছু বলে না। স্মিত হেসে তাঁকায় নিশাতের দিকে। নিশাত আবার বলে -
‘আমার হাজবেন্ড কিন্তু দেয়নি! আপনি তো আপনার ছেলেকেও দেন নি!’
‘ছেলেকে দেয়নি ঠিক না। ব্র্যাকে শিখলে ও তাড়াতাড়ি শিখতে পারবে নিদ্রিষ্ট নিয়মের মধ্যে, প্লাস লাইসেন্স ও পেয়ে যাবে, এই জন্য। ও তো শেখার মাঝে মাঝে যখন চেয়েছে দিয়েছি। আর ওর সাথে আমার টাইমিং ও মিলে না!’
‘আমার উপর আপনি আস্থা রাখলেন কিভাবে? আপনার নতুন গাড়ি যদি নষ্ট করে ফেলি!’
‘কত টুকু আর নষ্ট করবেন? আমি তো আছি পাশে। আর আপনার উপর আমার আস্থা আছে। আপনি একিজন স্কিল্ড পারসন। স্পোর্টসওমেন!’
‘তাই!’

ফিদা সূচনা করে ব্যাবহারিক প্রশিক্ষণ। ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়া থেকে আস্তে আস্তে ব্রেক ছাড়তে বলে। সাবধানে ধীরে ধীরে নিশাত করতে পারে। গাড়ি আস্তে আস্তে এগুতে থাকে। ব্রেক আরেকটু ছাড়তে বলে। নিশাত ছাড়ে, গাড়ি একটু জোড়ে ছুটতে যেয়ে লাইনচ্যূত হতে যায়। ফিদা গাড়ি সোজা রাখায় মনোনিবেশ করতে বলে। এভাবে চলতে থাকে প্রশিক্ষণের পুনরাবৃত্তি। সোজা করতে হিমশিম খায় নিশাত। তবে এমনি ভালই চালায়।
‘কেমন করছি?’
মাঝখানে জানতে চায় নিশাত।
‘নতুন হিসেবে খুব ভাল! আগেই জানতাম, আপনি কুইক লার্নার!’
‘তাই! ...আপনার ছেলের সাথে তুলনা করলে কেমন?’
‘ও তো এখন অনেক এগিয়ে গিয়েছে। আপনি যাবেন। খালি সময় দিতে হবে। এখানে কোন শর্টকাট নেই।’
‘হ্যা জানি।’

পরদিন ও চলে প্রশিক্ষন অফিসের পর একই জায়গায়। গাড়ি ডানে বাঁয়ে নেওয়া, ব্যাক করাও একটু করে শিখে নিশাত। প্রতিটা অংশ করতে যেয়ে শিশুর মত হেসে ওঠে নিশাত। ফিদার ভাল লাগে। গাড়ি ডানে বাঁয়ে ঘোরাতে যেয়ে আবার যে সোজা করতে হয় সেটা করতে ভুল হয় নিশাতের আর সবার মতই। সেটা ঠিক করার জন্য ফিদা বকা দিলে নিশাত শিশুদের মত প্রায় লাফিয়ে লাফিয়ে যেভাবে স্টিয়ারিং উলটো ঘোরানোর চেষ্টা করে, দেখে ফিদা হেসে ফেলে। নিশাত অনুযোগ করে –
‘হাসেন কেন?’
ফিদা আরো হাসে। এভাবেই চলে ওদের গাড়ি চালানোর খেলা।
সন্ধ্যা হয়ে আসে। নিশাত বলে –
‘আজকে আমার সাথে একটা জায়গায় যাবেন? মজা হবে।’
‘কোথায়?’
‘এই উত্তরাতেই, চার নাম্বার সেকটরে।’
‘কেন? কি কাজ ওখানে?’
‘আমি একটা বাড়ি দেখবো’
‘ভাড়া নিবেন?’
‘না কেনার জন্য। একটা ট্রিপ্লেক্স তিন্ তালা বাড়ি।’
‘কত দাম?’
‘সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা চাচ্ছে।’
‘আপনি তো টাইকুন! জানতাম না তো!’
‘আরে না। আব্বার বাড়িটা বিক্রী করে, আমার একটা প্লট আছে ওটাও বিক্রি করে আর কিছু লোন নিয়ে কেনার একটা প্ল্যান আরকি। কিনতে পারবো কিনা জানি না। দেখে আসি অন্তত।’
‘আমি কিন্তু এসব জায়গা জমি, বাড়ি দেখার ব্যপারে একেবারেই ইন্টারেস্টেড না। কেবল আপনি বলছেন বলে যেতে পারি।’
‘আপনাকে কেন বলছি জানেন? আমাকে না সবাই খব ছোট মনে করে। আমার গলার স্বরও ভাল না। তাই সামনে থেকে হোক, টেলিফোনে হোক, কেউ পাত্তা দেয় না।’
‘তাই নাকি! কেন?’
ফিসা হেসে কিছুটা অবাক হয়েই বলে –
‘আপনার ধারনা আমাকে পাত্তা দিবে?’
‘হ্যা অবশ্যই দিবে। আপনি আপনার পরিচয়টা আরেকটু বাড়িয়ে টাড়িয়ে বলবেন।’
‘আমি এসব করতে পারি না। আমি যা তাই বলবো।’
‘ঠিক আছে চলবে।’

ওরা চার নাম্বার সেকটরের গন্তব্যে এসে পৌছালো। বাড়ির নাম্বার খোঁজার জন্য গাড়ি থেকে নেমে হেটে খোঁজা টা বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলো। গাড়ি থেকে নেমে হাঁটছে দুজন পাশাপাশি। নিশাত হঠাত হেসে বললো –
‘আপনি আপনার পরিচয় দিবেন আর বলবেন আমি আপনার মেয়ে।’
ফিদা খুব অবাক হলো। বললো –
‘মেয়ে কেন? আমাকে কি অত বুড়ো মনে হয়?’
‘না, আপনিই বললেন না যে আমাকে অনেক ইয়াং লাগে। মেয়ের বয়সি মনে হয়। বাড়ির মালিক তো এখানে থাকে না। আপনি ফোন করে আপনার পরিচয় দিয়ে কথা বলেন।’
‘আর তারপর সে আমাকে বারবার ফোন করে বিরক্ত করে ছাড়বে!’
‘ওঁকে ফোন করে প্রাথমিক আলাপ সেড়ে আমার নাম্বার দিয়ে দিবেন। বলবেন আমার মেয়েই ডিল করবে। তখন বাকী কথা আমিই বলবো। আপনি ঝামেলা মুক্ত।’
‘না। সরি আমি এরকম বলবো না।’
‘কি অসুবিধা!’
খুব মজা পেয়েছে যেন এরকম একটা হাসি দিয়ে প্রশ্ন করে। নিশাতের মজা করাটা বেশ অস্বস্তিতে ফেলে ফিদা কে। ঠিক বুঝতে পারে না, কোন জিনিসটা ওকে আহত করেছে। শুধু বুঝতে পারে বেশ আহত হয়েছে সে।
‘আপনার বাড়ি দেখা দরকার দেখিয়ে দিচ্ছি চলেন। পরিচয় দেয়া দরকার না হলে কিছুই দিব না।’
নিশাত ওর মুখের দিকে তাঁকিয়ে বোঝার ফিদার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করে যেন। বলে - ‘আচ্ছা।’
ওরা বাড়িটা খুঁজে পায়। ওখানে বর্তমান ভাড়াটিয়ার সিকিউরিটির লোক ছিল। ফিদাকে ওরা বাড়ি ওয়ালার নাম্বার দেয়। বাড়ি ওয়ালার সাথে কথা বলে ফিদা। বাড়ি ওয়ালা পরিচয় টরিচয় কিছু জানতে চায় না। ফিদা ঝামেলা এড়ানোর জন্য আগেই বলে রাখে। পছন্দ হলে বা আরো কথা বলতে চাইলে ও নিজেই ফোন করবে।
ওরা বাড়িটা সময় নিয়ে দেখে। দেখে নিশাতই। ফিদা যেহেতু ঢুকেছে তাই বাড়িটার নকশা, উপযোগিতা, ফিটিংস এর মান এগুলো বোঝার চেষ্টা করে। আসছে যখন কোন না কোন কাজে আসুক।
ওরা বেরিয়ে আসে। যখন এসেছিল বাড়ির খোঁজে তখন একটা সন্ধ্যার আধো আলোতে রাস্তার নিয়ন বাতিতে আশপাশ কত উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল। অথচ কিছুক্ষণ পরই মনে হয়েছিল চারপাশ কেমন অন্ধকার হয়ে গেল! এখনও ট্রিপলেক্স বাড়ি থেকে বেড়িয়ে মনে হল রাস্তা, লাইটপোস্ট, বাড়ি ঘর সব ওরই মত তমসাচ্ছন্ন, বিষন্ন!
নিশাত জানতে চায় – ‘কেমন দেখলেন?’
‘আছে কোন রকম। খুব একটা খরচ করে বানায় নি। তাই দামটা একটু বেশী মনে হয়েছে।’
‘জায়গার দাম আছে না!’
‘তা আছে। তবে এটা অফিসের ইউজের জন্য ভাল মনে হয়েছে।’
‘হ্যা আমারও তাই মনে হয়েছে। কমার্শিয়াল পারপাসে ভাড়া দিলে বেশী ভাড়াও পাওয়া যাবে।’
‘হ্যা।’
নিশাতকে আসকোনাতে ওর বাসায় নামিয়ে দেয়। তেমন কোন কথা ফিদা নিজে থেকে বলতে পারে না, বা বলে না। নিশাতের বাড়ি নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা শুনে শুধু হু হা করে উত্তরের কাজ সারে। ফিদার নির্লিপ্ততায় নিশাতের তেমন কোন ভাবান্তর দেখে না। ওর অনেক বড় স্বপ্ন। বাড়ির ছাদে ছোট্ট করে হলেও একটা সুইমিং পুল থাকবে। বাগানো থাকবে। সারা বাড়িতে সাউন্ড সিস্টেম থাকবে। যে কোন জায়গা থেকেই যেন গান শোনা যায়।
‘বাহ! খুব সুন্দর স্বপ্ন! এত রুচীশীল আর সৌখিন চিন্তা ভাবনা আছে আপনার ধারনা করিনি আমি। আপনি আসলেই অনেক গুনী মানুষ!’
‘তাই!’
আবারো উচ্ছসিত হাসি দেয় নিশাত। ফিদার নিরন্তর কলকল ধ্বনির মাঝে নিজের মধ্যে ডুবে নিজের ক্ষতেরউৎস খোঁজার চেষ্টা করছিল। এতক্ষণ নিজের সাথে নিজেই যুদ্ধ করছিল খুঁজেপাওয়া কারন টা বলবে কিনা নিশাতকে। ঠিক নামানোর আগে ফিদা বলে – ‘কাল আপনাকে একটা কথা বলবো। সুইমিং এর টাইমিং না মিললেও আমাকে কল করেন আপনার সুইমিং শেষ হলে।’
‘এখন বলেন?’
‘না। সময় লাগবে।’
‘বাসা থেকে টেক্সট করেন।’
‘না। সামনা সামনিই বলবো। কাল।’
নিশাত কিছুক্ষণ ফিদাকে বোঝার চেষ্টা করে ওর দিকে তাঁকিয়ে। তারপর স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বিদায় নেয়। ফিদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছুটা যেন সস্তির নিঃশ্বাস। মনের ঈশান কোনে কালো মেঘ জমছিল, সেই মেঘ কে আরো গভীর কৃষ্ণকায় রঙ ধারন করে কৃষ্ণগহবরে পরিণত হতে না দিয়ে বৃষ্টি ঝরাতে না পারলে যে সমূহ বিপদ আসন্ন। বৃষ্টি হওয়ার পূর্বাভাসটি অন্তত দিতে পেরে সহজ বোধ করছে ফিদা।

যথারীতি ফোন দেয় নিশাত সুইমিং শেষে। ফিদা আগেই করে ফেলেছিল। দুজনে নীচে রেস্তোরার খোলা জায়গায় বসে। ফিদা সিদ্ধ ছোলা, ফ্রেশ জুস অর্ডার দেয়। এটাই নিশাতের প্রিয় খাবার। নিশাত কিছু জিজ্ঞেস করছেনা দেখে ফিদাই বলে –
‘কাল বলেছিলাম আমি আজকে আপনাকে কিছু বলবো।’
‘হ্যা’
হাসি মুখ নিয়েই উত্তর দেয়। তেমন কোন ভাবান্তর নেই নিশাতের মুখে।
‘কাল যে আপনি আমাকে নিজের বাবা হিসেবে পরিচয় দিতে চাইলেন সেটা আমার একদম পছন্দ হয় নি।’
‘তাই নাকি!’
বলে উচ্চ স্বরে হেসে ফেলে। দূরের টেবিলে কিবরিয়া বসেছিল। নিশাত কিবরিয়াকে প্রায় চিৎকার করে ডেকে বলে –
‘শুনেন কিবরিয়া ভাই ... উনি আমার বাবা’
কিবরিয়া শুনতে পায় কি পায় না বোঝা যায় না। ফিদা একটু মুখ শক্ত করে ফেলে। বলে –
‘প্লিজ ডোন্ট মেইক ফান, আই এম সিরিয়াস!’
কিছুক্ষণ সময় নেয় হাসি থামাতে নিশাত। তারপর বলে – ‘আচ্ছা, বলেন।’
‘আপনার সাথে বন্ধুর মত মিশেছি। আপনিও মিশেছেন। আমরা অনেক দ্রুত অনেক কাছাকাছি চলে গিয়েছি। আপনার প্রতি নিজের অজান্তেই একটা আগ্রহ জন্মেছে। আমি হ্যাপিলি ম্যারেড। কখনো বউ এর সাথে চিট করিনি। বা কোন মেয়ের সাথে ফ্লার্ট করারও চেষ্টা করিনি। কারো সাথে ক্লোজলি মেশার চেষ্টাও করিনি। কিন্তু আপনি যখনই ডেকেছেন চলে এসেছি। নিজেও বুঝিনি আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। কিন্তু কাল যখন আপনি আমাকে আপনার বাবা বলে পরিচয় দিতে চাইলেন, তখন একটা হোচট খেলাম। আমরা যখন হাটছিলাম চার নাম্বার সেকটরের রাস্তা দিয়ে, আমার মাথায় ভিতর তখন চলছিল কতগুলো প্রশ্নের ত্বরিত ছোটাছুটি। আমি কি বাবা বা মুরুব্বী হিসেবে আপনার সাথে মিশছি। আমাদের অল্প কদিনে এত মেলেমেশা শুধুই আপনার একজন বড় ভাই বা আংকেল টাইপ সম্পর্ক তৈরী করেছি? কাল সারারাত ভেবেছি। আজ সারাদিনও। উত্তর পেয়েছি ‘না’। আপনি কি ভেবেছেন জানি না। আমার আপনার সব আচরনে মনে হয়েছিল, আপনি আমার সাথে কোন স্পেশাল রিলেশন করছেন। আর আমি সত্যি আপনার প্রেমে পড়েছি।’
শেষের কথাগুলো সরাসরি নিশাতের চোখের দিকে তাঁকিয়ে বলে। বলে একটু দিরতি দেয়। তারপর বলে –
‘আমার বউ আছে, ছেলে আছে। আমি ওদেরকে প্রচন্ড ভালবাসি। ওদের কোনদিন ছেড়ে যাব না। আমি আমার স্ত্রীকে এত ভালবেসেছি, ভাবতেই পারিনি কখন কারো প্রেমে পড়বো। কিন্ত আজ আমি পরিস্কার জানি অন্যায় হলেও আমি আপনার সত্যিকারের প্রেমে পড়েছি।’
এবারো নিশাতের চোখের দিকে সরাসরি তাঁকিয়ে বলে এবং উত্তরের অপেক্ষায় ওর দিকে তাঁকিয়ে থাকে।
নিশাতের শ্যামল অবয়বে কালো মেঘের ঘনঘটা। ফিদা ঘাবড়ায় না। ও শুধু একটা উত্তরের অপেক্ষায় নেই। দুটোর একটা। হ্যা অথবা না। এভাবে মনস্থির করেই সরাসরি বলেছে। পরিপক্ক বয়সে এটা অন্তত বোঝে জোড় করে এততরফা ভালবাসা হয় না। ফিদা বিভিন্ন মেয়েদের সাথে অবাধ মেলামেশা না করলেও অনেক ধরনের মেয়েদের সাথে চলতে ফিরতে জানাশুনা হয়েছে। বন্ধুদের প্রেম পরকীয়ার দীর্ঘ গল্প শুনেছে। দেখেছে সামনা সামনি। তাই একটা মেয়ে কাছে এলেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার মত অবস্থায় ফিদা কখনই ছিল না। থাকলে অনেক আগেই অনেক গুলো প্রেম হয়ে যেত। নিশাতের ওর সাথে মেলামেশা শুধুই বন্ধুত্ব মনে হয় নি। অন্তত ফিদার কাছে।

নিশাতের চুপ করে থাকা আর মুখের ভাবে তপনের জনপ্রিয় গানটির চরণ গুলো মনে আসে - ‘তোমার কাছে যেয়ে ভালবাসি আমি বলতেই কেমন অচেনা মনে হয়েছিল!’

আজ যেমন নিশাতকে ওর অচেনা লাগছে তেমনই লেগেছিল বহু বছর আগে নীতাকে। সেদিন অবশ্য অবস্থা ছিল পুরো উলটো। সেদিন ফিদার কোন আশা ছিল না ‘হ্যা’ শোনার। কিন্তু অবধারিত ‘না’ জেনেও মরণের জন্য প্রস্তুত ছিল। নীতা ওকে চমকে দিয়ে ওর জীবন বাঁচিয়েছে। ফিদা নিজেকে চেনে। মিথ্যে ভালবাসায় জড়িয়ে সহজে আবার ভুলে যেতে পারে না। তাই জড়ানোর আগেই পরিস্কার হতে চায়।

ফিদা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। নিশাতকে সময় দেয়। ও ছেলেখেলার মত কিছু বলেনি। যে নিশাত সাথে সাথে একটা কিছু বলে দিবে।
একসময় নিশাত বলে। অনেক কিছু বলে ওর জীবন সম্পর্কে। বলতে বলতে আল্লাহ কিভাবে ওকে সময়মত ঠিক পথ দেখিয়েছে। ও ফিরে এসেছে, এসব। কিন্তু ফিদা এত কথা মনযোগ দিয়ে শুনেও ওর কাংখিত কোন উত্তর খুঁজে পায় না! একসময় নিশাত বলে – ‘আমি জীবনে অনেক ছেলের সাথেই মিশেছি। অনেকেই দুর্বল হতে দেখেছি। আমি বুঝিয়ে সুঝিয়ে দূর করেছি ওদের দুর্বলতা। কিন্তু কেউ আমাকে সরাসরি ভালবাসি বলতে সাহস পায়নি। কেবল দুজন পেরেছে। একজন বনি, আমার হাজবেন্ড আর আপনি!’
এটাকি অভিযোগ নাকি প্রশংসা বুঝতে পারে না ফিদা। একসময় নিশাত বলে – ‘চলুন রাত হয়েছে।’
‘আপনি হ্যা বা না কিছুই তো বললেন না।’
‘পরে কথা বলবো? দিন তো শেষ হয়ে যায় নি। এরকম পরিস্থিতিতে আমি অনেকবার পরেছি। এটা হচ্ছে এফেকশন। কেটে যাবে। আমি কাটিয়ে দিব। এমন আমার বন্ধু আছে যাঁদের সাথে বারো বছর পর সম্পর্ক আছে। শুধু বন্ধুত্বের।’
‘সবার সাথে আমাকে মেলালে ভুল করবেন।’
‘পরে কথা বলবো। চলুন এখন।’
দুজন দুজনের বাহনে কিছুক্ষণ একসাথে পরে আলাদা হয়ে যায় রোজকার মত।
বাসায় যেয়ে ফিদা বেশ অস্থির বোধ করে সরাসরি কোন উত্তর না পেয়ে। টেক্সট করে হোয়াটসএপে – ‘আই লাভ ইউ’
সাথে সাথে নিশাতের উত্তর আসে – ‘নেভার এভার সে ইট এগইন!’
ফিদাও সাথে সাথে উত্তর দেয় – ‘আই লাভ ইউ, লাভ ইউ এন্ড লাভ ইউ, নো বডি ক্যান স্টপ মি টেলিং দিস!’
একটু বিলম্বে উত্তর আসে –‘আই এম স্টিল ওয়েটিং ফর মাই ম্যান!’
উত্তরে পুরো মাথা খারাপ হয়ে যায় ফিদার। ফিদা এর অনুবাদে ভাবে নিশাত বলতে চাচ্ছে এখনো ও ওর পছন্দের ছেলেকে খুঁজে পায়নি। তারমানে এতদিন এত আগ্রহ দেখিয়ে সারাদিন চ্যাট, টেলিফোনে কথা বলে, দেখা করেও ফিদাকে ওর যোগ্য পুরুষ মনে করেনি! এর থেকে অপমান আর কি হতে পারে? ফিদা অত্যন্ত রাগের সাথে উত্তর দেয় –
‘ওকে ওয়েট ফর ইউর ম্যান এন্ড ফর গেট মি হোয়াট আই হ্যাভ টোল্ড ইউ টুডে। বাই ফর এভার!’

আর কোন উত্তর আসে না রাতে। পরদিন সকালে রোজকার মত ‘গুড মর্নিং’ ম্যাসেজ পায় হোয়াটসএপে। ফিদা কোন উত্তর দেয় না। বিকেলে আবারো টেক্সট করে নিশাত। জানায় সন্ধ্যায় আগে আগে আসবে সুইমিং এ। কথা হবে।ফিদা সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় ‘ওকে’। কিন্তু মনে মনে কিছুটা অভিমান কিছুটা আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।

নিশাত যখন আসে ফিদা তখন পুলে সাতার কাটছে। নিশাতের পিছনে ঘটনাক্রমে নওশাদও আসে। হাসি মুখে তাঁকায় ফিদা দুজনের দিকে। দুজনেরই আরো আগে আসার কথা ছিল। তাই দুষ্টমি করে ফিদা বলে –
‘সবাই এত টাইমলি চলে আসলেন! আমি তো আপনাদের সময় জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম!’
নওশাদ ওর ভারী গলায় হুম হুম করে হাসে আর নিশাত খিলখিল কাজী হয়ে যায়। বুক পানিতে ডুবন্ত অবস্থায় কথা বলে ফিদা নিশাতের সাথে। নিশাত জানায় –
‘আমার একজন কলিগ নিয়ে এসেছি। নীচে রেস্তোরাতে বসিয়েছি। আমি ওঁর সাথে আছি। আপনার সুইমিং শেষ হলে আপাকে আপনার জিম্মায় দিয়ে আমি সুইমিং করবো। তারপর তিনজন একসাথে বসবো। উনি আবার ...’
ইশারায় বোঝালো যে পান করার অভ্যাস আছে।
ফিদা অগত্যা সম্মতি দেয়। আরেকজনকে আবার কেন নিয়ে আসলো বুঝতে পারে না। সুইমিং শেষ করে যায় রেস্তোরাতে। নিশাত পরিচয় করিয়ে দেয় ওর কলিগের সাথে। লম্বা, ফর্সা মোটামুটি দেখতে একজন মহিলা। নাম রাইসা। রাইসা কে নিয়ে উপরে বারে যায়। যাওয়ার আগে নিশাত বেশ ইংগিত পূর্ন দৃষ্টি দিয়ে বলে – ‘এনজয়!’
‘আপনি আসছেন তো? নাকি সুইমিং করে পালিয়ে যাবেন।’
‘আশ্চর্য! কেন? রাইসা আপাকে নিতে হবে না?’

ফিদার ঠিক কিছুই পছন্দ হয় না। নিশাতকি ওদের সম্পর্কটা নিছক বন্ধুত্ব সেটা দেখানোর জন্য আরেকজনকে নিয়ে এসেছে। অথবা অন্য কাউকে গছিয়ে দিচ্ছে নাতো নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। নিশাত ফিদাকে এমন মনে করেনি তো যে ফিদা যে কোন মেয়ের জন্য পাগল!
একজন অপরিচিত মহিলাকে নিয়ে বারে ওঠা। কোন মেয়েকে নিয়ে ক্লাবের বারে গেলে পরিচিত বড় ভাই ছোট ভাই কোন না কোন কমেন্ট করে। নিশাতকে নিয়ে যেদিন এসেছিল, পরে এক শফিক ভাই তো বলেই ফেললেন – ‘আমার শেয়ার কই?’
ফিদা যথা সম্ভব ঠান্ডা মাথায় বলার চেষ্টা করে বলে –
‘ভাই ও খারাপ মেয়ে না। খারাপ মেয়ে হলে আমি আনতাম না।’
টাল অবস্থায় শফিক ভাই থেমে যাবার পাত্র না। ওঁ বলে –
‘আরে যে রাত বারটার সময় তোমার সাথে ঘুরতে পারে যে যে কারো সাথে যেতে পারে!’
ফিদা আর কথা বাড়ায় না। কি দরকার খামাখা তর্ক করে। কথাটা কানে বাজলেও নিশাতকে ওরকম ভাবতে ইচ্ছে হয় না। নিশাতের জন্য কথা শুনতে বা শোনাতে কোন আপত্তি নেই ওর। কিন্তু অচেনা আরেকটা মেয়েকে নিয়ে যেখানে ওর বসারই ইচ্ছে নেই সেখানে যদি কেউ কিছু বলে বড়ই বিরক্ত লাগবে।
ভাগ্য ভাল ফিদা বারে কিশোরকে পেয়ে যায়। কিশোরের বর্তমান বৈবাহিক অবস্থান সিংগেল। বউ এর সাথে ছাড়াছাড়ি। তাই ওর সাথে বসলে আলাদা বসতেও হল না একটা অপরিচিত মেয়ের সাথে। সেই সাথে কিশোরও হয়তো বিরক্ত হবে না রাইসাকে নিয়ে বসলে।
তাইই হয়। গল্প জমে যায়। রাইসা হুইস্কি খায় তাও আবার সিংগেল মল্ট। বুঝতে পারে ভালই মদ্যপানের অভ্যাস আছে। তাই হয়তো নিশাতের কাছ থকে শুনে চলে এসেছে। এটা ভেবে একটু সস্তি পায়।
ঘন্টাখানেক পরে নিশাত আসে। ওরা একসাথে আরো কিছুক্ষণ থাকে। নিশাতের জন্য রেড ওয়াইন নেয় ফিদা। গল্পগুলো এলোমেলো সাধারন কথাই হয়। যেহেতু সবাই সবার পরিচিত নয়। তবে নিশাত আসার পর ফিদা বেশ খোশ মেজাজেই থাকে। এক সময় নিশাত আর রাইসা উঠে যেতে চায়। ফিদাও ওঠে। নিশাত ইংগিত করে রাইসাকে নিকেতনে নামিয়ে দেওয়ার জন্যে। ফিদাও তাই চাচ্ছিল। অন্তত ফেরার পথে নিশাতকে পাওয়া যাবে।
গাড়িতে নিশাত সামনে আর পিছনে রাইসা বসে। উত্তরা থেকে নিকেতন বেশ লম্বা রাস্তা গল্পগুজব করে পার হয়ে যায়। সময়টা চোখে পড়ে না। রাইসা ওর বাসায় আসার আমন্ত্রন জানিয়ে বিদেয় নেয়।
‘আমি আসাতে আপনি খুশী হয়েছেন?’
‘হ্যা! কেন আপনি বোঝেন নি?’
‘ভালই বুঝেছি। পুলে আপনার মুখটা আমাকে দেখে এত ব্রাইট হয়ে গিয়েছিল!’
‘তাই! আমি অবশ্য আমার মুখটাতো দেখতে পাইনি। আপনি দেখেছেন।’
দুজনেই হাসে।
‘যা হয়েছে স্বতর্স্ফুর্ত ভাবে হয়েছে। তাই টের পাই নি।’
‘আমি পেয়েছি।’
‘আপনি খুশী হয়েছেন আমাকে খুশী হতে দেখে?’
‘হ্যা।’
‘কেন? আপনি তো আমাকে পছন্দই করেন না!’
‘কখন বললাম আপনাকে পছন্দ করি না। পছন্দ না করলে এতদিন মিশতাম। আজ আবার আসতাম?’
‘ঐ যে টেক্সট করলেন ইউ আর স্টিল ওয়েটিং ফর ইয়োর ম্যান!’
‘সেটা তো আমি বনির কথা বলেছি। আমাদের তো ডিভোর্স হয় নি। আমি চাই ওর কাছে ফিরে যেতে। সেটাই বলেছি।’
‘ওহ! বাঁচালেন।’
‘কিভাবে?’
‘আমি ভেবেছিলাম আপনি আপনার যোগ্য পছন্দের মানুষ এখনো পাননি। এতদিন মিশার পর একথা শুনে নিজের গায়ে লেগেছে বৈকি!’
‘ওহ! নানা আমি ওরকম কিছু মীন করিনি।’
‘আমি তো আমার গল্প বলেছি, আপনি তো কাঁদলেনও না হাসলেনও না! আমি কি বুঝবো?’
‘বুঝবেন, আস্তে আস্তে।’
‘মানে?’
‘দেখুন আমার জীবনে এরকম বেশ কয়েকবার হয়েছে। তার মধ্যে ম্যারিড লোকও আছে।’
‘ওদের সাথে কি করেছেন?’
‘বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওদের মোহ কাটিয়েছি। ওদের অনেকে এখনো আমার বন্ধু। একজন আছে বারো বছর ধরে বন্ধু।’
‘এখন আর আপনার প্রতি দুর্বলতা নেই?’
‘আরে এরপর আরো তিন চারটা প্রেম করেছে।’
‘আপনি কি আমাকে ওরকম মনে করেছেন?’
‘আপনি ভাল মানুষ। ভাল মানুষ বলেই আপনাকে কাছে আসতে দিয়েছি। আপনার যেটা হয়েছে সেটা এফেকশন, প্রেম ভালবাসা অন্য জিনিষ।’
‘আমার কি হয়েছে সেটা আমি জানি। আর যাই হোক আমাকে আপনার বুঝিয়ে সুঝিয়ে অন্য কারো সাথে আরো কয়েকটা প্রেম করাতে হবে না। আমি ওরকম না।’
নিশাত হেসে ফেলে বলে -
‘আমি আপনাকে ওরকম বলিনি বা মনে করিনি।’
‘আমি অনেক মেয়ের সাথে চলা ফেরা না করলেও, মেয়েদের সাথে মিশলেই প্রেমে পড়ে যাব এমন কখনই ছিলাম না। কারো সাথে ইচ্ছে করেই ক্লোজ হই নি। কিন্তু আপনার সাথে নিজের অজান্তেই অনেক ক্লোজ হয়েছি ......... জীবনে একটাই প্রেম করেছি। প্রেমে ব্যর্থ হলে হয়তো জীবনই দিয়ে দিতাম। তখন এরকমই মনে হয়েছিল। আজও আমি আমার ভালবাসার মানুষের সাথে আছি। তাকে কোনদিনই ছেড়ে যাব না। ও ও আমাকে ছেড়ে যাবে না। ওর জন্য এত ভালবাসা দিয়েছি যে আর কারো জন্য রোমান্স জন্মাবে কখনো বিশ্বাস করিনি। আর দুইজনকে একসাথে ভালবাসা যায় এটাও বিশ্বাস করতাম না। এখন তো দেখছি আমি নিজেই পারছি!’
‘তবুও আপনি যেটাকে ভালবাসা মনে করছেন সেটা ভালবাসা না এফেক্সন!’
‘আপনার হয়তো অনেক অভিজ্ঞতা আছে। আমার নেই। তাই এসব তত্ত্বতে বিশ্বাস করি না। আমার মাঝে কি হয় আমি জানি।’
‘আচ্ছা থাক। রাইসা আপাকে কেমন দেখলেন?’
‘আপনি কি মেয়ে দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন?’
‘মানে?’
বলে সশব্দে হেসে ফেলে নিশাত।
‘কেন এনেছেন? আমার তো মনে হয়েছিল একবার আমাদের উপরে পাঠিয়ে আপনি সুইমিং করে গায়েব হয়ে যাবেন। আরেকজন নিয়ে আসচেন যেন আমি একটা মেয়ের সাথে প্রেম করার জন্য বসে আছি। আপনি করবেন না তাই আরেকজনের সাথে লাগিয়ে দিলেন।’
মৃদু হেসে বলে ফিদা।
আবারো হাসে নিশাত।
‘কি আশ্চর্য! রাইসা আপা খুব ভাল মানুষ। ক্লাবে ড্রিংক করার আলাপ হওয়াতে উনি আসতে ইন্টারেস্টেড হলো। আমিও একা আসতে চাচ্ছিলাম না।’
‘আমার ভয়ে?’
‘জানি না।’
‘রাইসা আপাকে আপনার সম্বন্ধে কিছু বলিনি। কিন্তু উনি নামার পর বলে গেল আপনি আমার উপর ইন্টারেস্টেড।’
‘তাই! আমি তো কিছুই আলাদাভাবে দেখাইনি!’
‘বোঝা যায়। আপনার মুখ অনেক উজ্জ্বল থাকে আমার দিকে তাঁকালে।’
‘বাব বাহ! কত কিছু খেয়াল করেন মেয়েরা!’
‘হ্যা আমাদের অনেক গুলো চোখ আছে।’
‘পিছনে যে একটা চোখ আছে সেটা ফর শিওর।’
‘কেন?’
‘কোন মেয়ের পিছনে তঁকালে সাথে সাথে ধরা পড়ে যেতে হয়। হঠাৎ পিছন ফিরে তাঁকায়!’
ফিদা হাসতে হাসতে বলে। নিশাতও ওর হাসিতে যোগ দেয়।
‘আচ্ছা আমার গাড়ি চালানো শিখার কি হবে?’
‘শিখাব যখন বলেছি, শিখিয়েই ছাড়বো। এর সাথে অন্য কিছুর সম্পর্ক থাকবে না।’
‘আমি আপনাকে সাঁতার শিখবো আর আপনি আমাকে গাড়ি চালানো শিখাবেন। শোধ বোধ!’
ফিদার একটু খটকা লাগে। সাতার আর গাড়ি চালানো শেখাকে একই পাল্লায় ফেলাতে। তবে গুরুত্ব দেয় না। ভাবে দুষ্টুমি করে বলেছে। বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায় ফিদা।

পরবর্তী দিনে অফিসের পর গাড়ি চালানোর জন্য জায়গা পরিবর্তন করে নিশাত। বলে – ‘আমি যতটুকু শিখেছি সেটা এখানে আর করে লাভ নেই। আমার দরকার আরো বড় রাস্তা, কিন্তু খালি।’
‘চেনেন এরকম কোন রাস্তা?’
‘আপনি তিনশ ফিটে চলেন।’
তিনশ ফিট শুনে একটু চমকাইয় ফিদা। তিনশ ফিট ঢাকার মধ্যে একমাত্র রাস্তা যেখানে আরামে ড্রাইভ করা যায় দ্রুত গতিতে, নিরুদ্রপ ভাবে। জ্যামহীন একেবারে ফাঁকা প্রশস্ত রাস্তা। সংগীনিকে অনেকেরই লং ড্রাইভে যাওয়ার গল্প শুনেছে ফিদা বন্ধুদের কাছে থেকে। আবার ধরা খাওয়ারও ঘটনা কম নেই। চিন্তা করে মুচকি হাসি চলে আসে ফিদার ঠোঁটে। তা দেখে নিশাত জানতে চায় -
‘হাসছেন কেন?’
ফিদা সেদিকে যায় না। বলে -
‘তিনশ ফিটে? সে তো হাইওয়ে! আপনি এখন সরাসরি হাইওয়েতে ড্রাইভ করবেন?’
‘আপনি চলুন না!’
নিশাতের কথা মত এয়ারপোর্ট রোডের রাস্তা থেকে ফ্লাইওভার এ উঠে তিনশ ফিটের রাস্তা ধরে। এদিক ফিদার ভালই চেনা। ঢাকার বাইরে কোথাও যেতে হলে এই তিনশ ফিট দিয়েই যায়।
বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ব্রীজ পার হলে নিশাত বায়ে যেতে বলে। বায়ে দেখে পূর্বাচল রাজউকের প্লটের এলাকা। বেশ ওয়াইড রাস্তা। রাস্তার দুপাশে ঝোপ ঝার, কাশবন। বড় রাস্তার সাথে সংযোগ কিঞ্চিত ছোট পরিসরের রাস্তা বেরিয়েছে অনেক গুলো। ওরা এলোমেলো ঘুরতে থাকে। এর মধ্যে নিশাতের একটা ফোন আসে। নিশাত ওকে মান্নাদা বলে সম্বধন করে। কথার পিঠে কথা চলতে থাকে। ফিদা ভেবেছিল ওকে নিয়ে টেস্ট ড্রাইভে বেরিয়েছে তাই নিশাত ভদ্রতা বশত কথা সংক্কিপ্ত করবে। কথা তো খাটো করেই না। বরঞ্চ অপ্রয়োজনীয় প্রেমের ভান করা কথাবার্তা বলেই চলে। যেমন –
‘আবার আসলে অবশ্যই চা খেয়ে যাবেন, ডেট করবেন আমার সাথে।’
ফিদা মনে মনে বিরক্ত হলেও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে। কেন জানি কিছু বলতে বা বিরক্তি প্রকাশ করতে খারাপ লাগে। কোন আঘাত দিতে চায় না নিজের যতই খারাপ লাগুক। নিশাতের জন্য সময় নিয়ে সবকিছু বাদ দিয়ে এসেছে ওকে ড্রাইভিং শেখাতে। সেখানে ও কিভাবে কার না কার সাথে ওর সামনেই ফ্লার্ট করে যাচ্ছে সমানে টেলিফোনে। ফোন রাখার পর ফিদা শুধু ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে – ‘কে ছিল।’
‘মান্নদা আমার সাথে মাস্টারস করেছে।’
‘ওহ!’
ওরা মোটামুটি একটা চক্কর দিয়ে একটা চায়ের দোকানে থামে। নিশাত বলে – ‘দেখেন তো এখানে খাটি দুধের মালাই চা পাওয়া যায় নাকি?’
‘হ্যা খাটি দুধের চা আমারো প্রিয়।’
ফিদা নামে। দোকানদার খুব আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়ন করে। এক কাপ বিশ টাকা করে। তবুও পয়সা উসুল। নিশাত বেশী করে সর দিতে বলে। দোকানদার দেয় ও। ওরা বেঞ্চে বসে তৃপ্তি সহকারে চা পান করে। ফিদা সিগারেট ধরায়। চারপাশের পরিবেশ খুবই নয়নাভিরাম। বাড়ি ঘর ছাড়া পুরো কাঠামো তৈরী হয়ে গেছে। প্লট গুলোতে বাড়ির জায়গায় নিয়ন্ত্রিত জঙ্গল। লাইট পোস্ট, রাস্তার মোড় সব আছে। এ যেন কোথায় আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা ধরনের মানসিকতা উদ্রেক করা স্থান। ওরা চা শেষ করে দ্রুত রেডি হয় টেস্ট ড্রাইভে। নিশাত ভালই চালায়। ফিদা খালি রাস্তায় স্পিড বাড়াতে বলে। নিশাতও সাহস করে আস্তে আস্তে গতি বাড়াতে থাকে। এই রাস্তা থেকে ঐ রাস্তা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলে। এখানে আরো দু একটা গাড়িকে টেস্ট ড্রাইভে দেখা যায়। সব গাড়িরই শিক্ষানবিস মহিলা। হয়তো স্বামী প্রশিক্ষক। রাস্তাগুলো এমন, আর একদম নিরিবিলি। এর থেকে ভাল টেস্ট ড্রাইভের জায়গা আর কিছু হতে পারে না।
‘কেমন চালাচ্ছি আমি?’
নিশাত জানতে চায়।
‘ভাল। অনেক বেটার। কনফিডেন্স আসছে।’
‘আপনার ছেলের মত?’
‘না ও আরেকটু এগিয়ে। আপনার তো সবে শুরু ডানে বায়ে ঘুরিয়ে আবার সোজা করাটা এখন পাকা হতে পারেন নি। ও ভাল শিখে ফেলেছে। অনেক দিন তো করেছে, তাই। আপনারো হয়ে যাবে।’
‘আমি আপনার মত সহজভাবে অনায়াসে ড্রাইভ করতে চাই।’
‘পারবেন, নিশ্চয়ই পারবেন। তবে এখানে কোন শর্টকাট নেই। রোজ চালাতে হবে অন্তত এক বছর।’
‘সে তো নিজের গাড়ি চাই।’
‘কিনে ফেলেন আপাতত একটা সেকেন্ড হ্যান্ড। পরে হাত পাকা হলে নতুন গাড়ি কিনবেন।’
‘আমি আপনার গাড়িটা যখন বিক্রী করবেন তখন আমি কিনে নেব।’
‘আমি কি আপনার স্কুটি চালাবো?’
নিশাত হেসে ফেলে। বলে – ‘কেন আপনি তখন এস ইউ ভি কিনবেন। বড় গাড়ী!’
‘টাকাটা কে দেবে, আপনি?’
‘আপনি পারবেন দিতে।’
‘ভুল ধারনা। আমার কোন টাকা নেই। আমি খুবই দেওলিয়া টাইপের মানুষ।’
‘যেভাবে টাকা খরচ করেন তাতে তো মনে হয় বিরাট বড়লোক।’
‘আসলে মোটেও না’
‘তাহলে বড় লোক বড় লোক ভাব!’
ফিদা একটু চমকায়। ও কি ওকে ব্যংগ করে বললো। উদার হাতে খরচ কি ও লোক দেখানোর জন্য করে? তবে মুখে বলে – ‘হ্যা হয়তো তাই আমি।’
‘না না, মোটেই তা না। মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে।’
নিশাত শুধরে নেয়। কিন্তু গুলি তো ছোড়া হয়ে গিয়েছে ও লক্ষবস্তু ভেদ করেছে।

ঘুরতে ঘুরতে এমন এমন জায়গায় যায় বা পায়, যেখানে জন মানুষের কোন চিহ্ন নেই। লাইট ও নেই। আর রাস্তার পাশে পুরো ঘন জঙ্গল। শরৎ কাল বলে সাদা সাদা কাশ ফুলে ভরা। কখনো স্মোকিং ব্রেক দিতে কখনো বা প্রকিতির ছোট ডাকে সাড়া দিতে বাধ্য হয়েই সম্পুর্ন নির্জন জায়গায় থামে ওরা। অনেক সময় বিপরীত দিক থেকে কতগুলো মটর সাইকেলের বহর দেখা যায়। স্থির অবস্থানে। নিশাত গাড়ির ভিতরের লাইট জ্বালিয়ে দিতে বলে। নাহলে নাকি ওরা এসে ঝামালে বাঁধাতে পারে। ফিদা লাইট জ্বালায়। কিন্তু মুখে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে আমার সাথে থাকলে ভয় নেই। আমি এসব পরোয়া করিনা। ওরা বেরিয়ে আসে। মটর বাইকের বহর চলে যায়। ফিদার একবার মনে হয় নিশাত এত কিছু জানে কিভাবে। পরে মনে হয় মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সব সময়ই সজাগ থাকে। জন্ম থেকে পারিপার্শিক অবস্থা ওদের কে সতর্ক করে দেয়। তবে নিশাতযে দিব্যি ওর সাথে এসব জনমানব শুন্য জায়গায় ওর সাথে কাটাচ্ছে, দেখে ভাল লাগে। এতটুকু বুঝতে পারে ফিদার প্রতি ওর যথেষ্ঠ আস্থা আছে। কথায় কথায় একবার বলেও ছিল যে রাইসা কে নিয়ে এসছিল ফিদাকে দেখানোর জন্যও। ফিদা কেমন। রাইসাও বলেছে ফিদার সাথে বাইরে যেতে পারে নিশ্চিন্তে।
ওরা একটা মোড়ের মত জায়গায় আসে তিন রাস্তার মোড় যায়। ওখানে চায়ের দোকান থেকে হাস মুরগী সবজি অনেক কিছু পাওয়া যায়। নিশাতের তাজা ফর্মালিন মুক্ত সব্জির খুব শখ। ও অনেক কিছু কিনে ফেলে। ওত টাকা হয়তো ওর কাছে ছিলা না, ফিদা দিয়ে দেয় দাম। যদিও নিশাত আপত্তি করে। সব দোকানদারের উষ্ণ অভ্যর্থনায় ফিদা অন্তত মুগধ হয়। সবাই ওদেরকে কাপল ভাবে। ওখানটায় সময় টা ভালই কাটে।  
সন্ধ্যা পার হয়ে রাত ঘনিয়ে এসেছে। তিনশ ফিটের বড় রাস্তায় উঠে ইউ টার্ন নেওয়ার আগে নিশাত বলে –
‘একটু সামনে থেকে ঘুরে এলে হয় না। আমার লং ড্রাইভ খুব ভাল লাগে।’
‘জো হুকুম ম্যাডাম।’
ফিদা কাঞ্চন ব্রিজ পার হয়ে গাওসিয়ার দিকে যেতে থাকে। গাওসিয়ার মোড় একটা গোলক ধাঁধাঁ। কোন রাস্তা গিয়েছে চট্টগ্রাম, কোনটা সিলেট, কোন টা ব্রাম্মন্নাড়ীয়া। ভুল মোড় নিলে সারা রাত পার। সিলেটের পথ নিল নিশাতের আগ্রহে। নিশাত নাকি বনির সাথে এপথে সিলেটে গিয়েছে। ও সেই স্মৃতিচারণ করতে চায়।
‘এত জোড়ে চালাচ্ছেন কেন? আপনার কি। ট্রেন ধরতে হবে?’
ফিদার কোন একসময় দেয়া টিটকারি ফিদাকেই ফিরিয়ে দেয় নিশাত। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর ফিদা জানতে চায় আর কতদূর যেতে চায়? নিশাতের উওর –
‘চলুন না আরেকটু, কোন অসুবিধা আছে?’
‘নাহ! খালি কখন ব্যাক করতে চান জানিয়েন।’
‘আচ্ছা আপনি যেতে থাকেন।‘
ফিদা যেতে থাকে। নিশাত বলে – ‘লং ড্রাইভ আমার খুব ভাল লাগে।
ফিদাও সম্মতি দেয় – ‘আমারও!’
‘এখানে কেউ নেই মাঝখানে। ইচ্ছে মত কথা বলা যায়। আবার হাইওয়ে দিয়ে যেতে যেতে কত নতুন অচেনা বস্তু, মানুষের দেখা মিলে।’
‘ঠিক।’
‘আমার ইচ্ছে আমি যখন গাড়ি কিনতে পারবো। তখন এরকম লং ড্রাইভে বেরিয়ে যাব। যখন তখন।’
‘সঙ্গী থাকবে?’
‘নাহ! শুধু আমি একা। এটা আমার বহু দিনের শখ।’
‘ভাল। আপনার একটা ক্রিয়েটিভ মন আছে ... এবার ফিরি’
‘এত তাড়া কিসের?’
‘সত্যিই কথা বলতে কি সারারাত আপনাকে নিয়ে ঘুরলেও আমার সাধ মিটতো না। কিন্তু আমার তো পরিবার আছে। ওরা চিন্তা করবে। প্রশ্ন করবে।’
‘তা ঠিক। চলুন ব্যাক করি।’
ওরা ব্যাক করতে যেয়ে গাওসিয়ার ওখানে ফ্লাইওভারের নীচে দিয়ে যেতে বিভ্রান্তিতে পড়ে, অনেক ঘুরে টুরে তিনশ ফিটের দিকে রাস্তায় ওঠে। তিনশ ফিটে চলে আসায় নিশাত আবার খোঁচা দেয় –
‘আপনার কি ট্রেন ধরতে হবে নাকি। এত জোড়ে চলাচ্ছেন ক্যান?’
‘আমি আসলে আস্তে গাড়ি চালাতে পারিনা।’
‘আস্তে চালালে আমরা একটু সময় বেশী পাব! পৌছে গেলেই তো শেষ!’
‘আমি তো কখনই শেষ করতে চাই না। আমি তো একটা এভার লাস্টিং সম্পর্ক চাই।’
‘আমিও তো চাই।’
‘কিন্তু আপনার সেই অমুক ভাইয়া, মান্নদার মত না। আমি যা চাই স্পষ্ট করে বলেছি।’
‘সেটা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি ম্যারিড।’
‘আমি কি ম্যারিড না। বরঞ্চ আমার ম্যারিড লাইফে আপনি ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আপনার ম্যারিড লাইফ?’
‘এটা অন্যায়। পাপ।’
‘আপনি আমার সাথে এতদিন যেভাবে মিশেছেন সেটা কি?’
‘কিভাবে মিশেছি? আমি কি আপনাকে কোন সিগনাল দিয়েছি?’
‘দিয়েছেন?’
‘কি সিগনাল দিলাম? কতজনকে সাতার শিখালাম। গত দু বছর ধরে আপনাদের ক্লাবে সাঁতার কাটছি। কোন সমস্যা তো হয়নি? এই কিবরিয়া ভাইয়ের সাথে কত সম্পর্ক ভাল, এই নিয়ে তো কোন সমস্যা হয় নি? আপনার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই যত সমস্যা।’
‘কিবরিয়ার কথা বললেন। কিবরিয়াকে আর আপনাকে নিয়েও কথা আছে ক্লাবে।’
‘কি কথা? আমি তো শুনিনি কখনো?’
‘সেটা থাক এখন, আপনি যে বললেন কতজনকে সাতার শিখিয়েছেন, সবার সাথে কি আমার মত একক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আমরা যেভাবে প্রতিদিন ঘুরে বেরিয়েছি। রেস্তোরা, বার বা কফি শপে কাপল হিসেবে গিয়েছি, সেরকম কি আপনি সবার সাথে গিয়েছেন? গেলে আমার আপনাকে চিনতে ভুল হয়েছে। আর না গেলে অবশ্যই একটা সিগনাল আমাকে আপনি দিয়েছেন।’
‘না সবার সাথে তো যাই না।’
‘আমার সাথে কেন গেলেন তাহলে। আমি কি আপনাকে জোড় করে নিয়ে গেয়েছি?’
‘আসলে আমার একটা খারাপ সময় চলছিল। সেই সময় আমার একটা উইনডো প্রয়োজন ছিল তাই আপনাকে পেয়ে নিজের অজান্তেই মিশে গিয়েছি। যতবার যেখানে আপনার সাথে গিয়েছি, আমি আপনার মাঝে বনিকে খঁজেছি।’
‘আমি বনি না। কারো প্রক্সি দেওয়ার জন্য বসে নেই। আপনার প্রতিটি ডাকে সাড়া দেওয়া ও আপনার যখন তখন আমাকে চাওয়ার আচরণটাই আমার কাছে সিগনাল ...আর আরো পরিস্কার একটা ঘটনা বলি, যেদিন নওশাদ, আমি আর আপনি রেস্তোরাতে বসে ছিলাম। আপনি আমাকে আপনার জন্য মদ, সিগারেট ছাড়তে বলেছিলেন, এটা যদি কোন ইঙ্গিত না হয়, তাহলে আপনার চিন্তা ভাবনা বা চলা ফেরার সাথে একটা বিরাট বৈপরত্য আছে।’
‘আরে ওটা তো আপনাকে বাঁচানোর জন্য বলেছিলাম’
‘এটা কি ফ্লার্ট করা না?’
‘আসলে আপনার সাথে আমার একটা বিশাল জেনারেশন গ্যাপ আছে।’
‘তাতো আছেই। কিন্তু আমি কি মনে করেন আপনার থেকেও অনেক ছোট অনেক ফাস্ট মেয়েদের সাথে মিশি না? এটা যে কোন স্ট্যান্ডার্ডে ফ্লার্ট করা, ইভেন ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডেও!’
‘আরে আমি তো মেয়দের সাথেও ফ্লার্ট করি।’
‘দুঃখিত তাহলে হয় আপনি লেসবিয়ান অথবা ফ্লার্ট মানে বোঝেন না। ফ্লার্ট করা মানে প্রেমাভিনয় করা।’
নিশাত কিছু বলতে পারে না।
‘আমি একটা কথা পরিস্কার বলে দিতে চাই। আমি আপনার প্রেমে পড়েছি, এর জন্য আপনি বা আপনার আচরন অর্ধেক দায়ী। আপনি যদি না পড়ে থাকেন। তবে আপনার সাথে কোন রকম সম্পর্ক আমি রাখতে পারবো না। আমার কষ্ট বাড়বে। আপনাকে পাকা ড্রাইভার বানিয়ে তারপর সম্পর্কের ইতি টানবো। এরপর যদি আমার সাথে কোন রকম যোগাযোগ করেন আমি ধরে নেব আপনি আমার প্রস্তাবে রাজী হয়েছেন।’
‘কি আশ্চর্য! কত রকম প্রয়োজন হতে পারে আপনাকে। কোন কাজেও যোগাযোগ করতে পারবো না?’
‘পারবেন। পারলে ধরে নেব আপনি আমার হয়েছেন।’
‘কখনই আপনার সাথে যোগাযোগ করবো না।’
খুবই কঠিন স্বরে প্রায় চিৎকার করে বলে নিশাত। ফিদা একটু থমকালেও সামলে নেয়। কিছু  বলে না। বাকী রাস্তা চুপচাপ। নিশাত আসকোনার মোড়ে এলে বলে – ‘আপনি তো বাসায়ই যাবেন। আমাকে এখানেই নামিয়ে দেন।’
‘না এখানে নামাবো না, বাসায়ই নামাবো। আর আমি ক্লাবে যাব।’
‘আবার ড্রিংক করবেন।’
‘ড্রিংক তো করতেই হবে।’
‘এগুলো আপনার একটা উচ্ছিলা।’
‘সেটা আমার ব্যপার। আপনি আমার কে? এ বিষয়ে নাক না গলানোই শ্রেয়। বাই!’
নিশাত মাথা নীচু করে আস্তে আস্তে হেটে চলে যায়। হাতে একগাদা বাজার। পূর্বাচল থেকে কেনা। ওদের বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি যায় না। ফিদার খুব ইচ্ছে হয় ওকে সাহায্য করতে। কিন্তু ও নিরুপায়।
ক্লাবে চলে যায় ফিদা। সোজা বারে। ওর বিয়ার খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আছে ক্লাবের পরিচিত সবার। কারন হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ভুড়ি। এক বড় ভাই তো রীতিমত গালি গালাজ করে – ননসেন্স, দেখতে পারনা কি বিচ্ছিরি লাগে, স্টপ ড্রিংকিং বিয়ার!’
তাই ও একটা দুটা বিয়ার খায়। বাকি ব্লাডিমেরী বা টাকিলা বা ওয়াইন দিয়ে কাভার করে। আজ তো ও মাতাল হতেই এসেছে।
কিশোরকে পেয়ে যায়। ওর সাথে বসে। কিশোর ওকে জিজ্ঞেস করে –
‘তোকে আজকাল একটু বেশী অস্থির অস্থির মনে হয়। বিষয় কি?
‘তাই! অনেকেই বলছে এরকম।’
‘তাহলে তো ব্যপার কিছু একটা আছে।’
‘হয়তো। কিছুদিনের মধ্যেই এসপার ওসপার কিছু একটা হয়ে যাবে। এটা সাময়িক।’
‘সাময়িক হলেই ভাল। এই বয়সে বেশী চাপ নেওয়া হেলথের জন্য খারাপ।’

রাতে বাসায় ফিরে নিশাতের টেক্সট দেখে –
‘বাড়ি ফিরেছেন?’
‘হ্যা। কিন্তু ফুললি লোডেড’
‘তাত করবেনই। বসেই থাকেন একটা ছুতার জন্য!’
‘ইউ মেইড মি ড্রাংক টুনাইট!’
‘নো, নেভার!’
‘কাল কি ড্রাইভিং লেসন নিবেন?’
‘আচ্ছা’
‘জানিয়েন কালকে কখন। শুভ রাত্রি।’
‘শুভ রাত্রি।’

নিশাতকে কারওয়ান বাজার অফিস থেকে পিক করে ফিদা। চলে যায় পূর্বাচলে রাজউকের এলাকায়। নিশাত বেশ কিছুক্ষণ ড্রাইভ করে। ওরা আগের দিনের সেই চা ওয়ালার দোকান খঁজতে থাকে। সব মোড় দোকান একই রকম লাগে। কিন্তআগের সেই লোক বা দোকান কিছুতেই খূঁজে পায় না। ক্যান যেন দুজনেরই ঐ দোকানটা খুঁজে পেতে জিদ চাপে। কিন্তু সাধ পূর্ণ হয় না।
তবে ঐ তিন রাস্তার মোড়ের বাজার ঠিকই খুঁজে পায়। সব দোকানদারও ওদের চিনে। এক দোকানে খাটি গরুর দুধের মালাই চা খায়। নিশাত বাজার করে। শাক সবজি, পেপে। নিশাতের কিছু কম পড়ছিল টাকায়। ফিদা পুরোটাই দিয়ে দেয়। নিশাত আপত্তি করাতে দোকানদার বলে আরে সাবেই তো দিব। নিশাত বলতে যায় ওরা দম্পতি না। ফিদা ইংরেজীতে বলে, কিছু বলার দরকার নেই। আমরা রোজ আসবো। ওরা যা ভাবে ভাবুক। কাপল না বললেই বরঞ্চ অন্য চোখে দেখবে। কিছুই নিজে থেকে বলার দরকার নেই। নিশাতও বোঝে আর একমত হয়। ওদের আন্তরিকতা ফিদার খুব ভাল লাগে। আশপাশের গ্রামের লোক। সহজ সরল। শহরের বাজারের লোকদের মত চালবাজ না।

ফেরত আসার সময় হাইওয়েতে ওঠার আগে গাড়ি থামায় সিট বদল করার জন্য। ফিদা সিগারেট ধরায়। নিশাত সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য করতে পারে না। তাই গাড়িতে নিশাত ফিদাকে একদম সিগারেট খেতে দেয় না। ফিদা তাই প্রায়ই নিশাতকে খোঁচা দিয়ে বলে – ‘দেখেন আপনাকে আমি কত ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দেই, নীতাও সহ্য করতে পারে না, তবুও আমি খাই। অথচ আপনাকে স্পেশাল খাতির করি।’
‘ভাবীর সামনে খান কেন? সেটা কি আমার দোষ? সব দোষ আমার!’
ওরা দুজন রাস্তায় গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিশাতকে একটু আনমোনা মনে হল। সে নিজের গল্প শুরু করে।
‘একদিন আপনাকে বলেছিলাম না? আমার আগের পত্রিকা অফিসে একটা ছেলে এসে বলে সে নাকি আমার হাজবেন্ড!’
‘হ্যা মনে আছে।’
‘আসলেই ওর সাথে আমার বিয়ে হয়েছিল। জোড় করে বিয়ে।’
‘তাই নাকি! আশ্চর্য তো! কিভাবে হলো?’
‘ও কলেজ থেকেই আমার পিছে লেগেছিল। আমি আসলে প্রেম রোমান্স এসব নিয়ে কখনই ভাবিনি। আমি ছিলাম আমার ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তায়। গেমস, স্পোর্টস এসব নিয়ে ব্যস্ত। ও ভ্যাগাবন্ড টাইপের ছিল। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিল। আমি ওকে আমাদের কলেজে ভর্তি করাতে চাই। পড়ে দেখি ও আসলে ইন্টারমিডিয়েটও পাস করেনি। সার্টিফিকেট আনতে পারে না।’
‘তখনই বাদ দিয়ে দিতেন?’
‘আসলে আমার এসব বিষয় নিয়ে ভাবতাম না একদম। বিয়ে তো একজনকে করতেই হবে। তাই মনে করেছিলাম আছে যখন পাশে থাকুক। ভেবেছিলাম এইচ, এস, সি পরীক্ষা দেওয়ায় নিব। পরে অনার্সে ভর্তি করাব।‘
‘পড়েনি আর?’
‘না। কিন্তু ও আমার সামনে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরী করতো। কার সাথে মিশি। কোন ছেলের সাথে কথা বলি। আমাকে বন্দী করে ফেলতে চাইতো ...... হঠাৎ একদিন আমাকে মিরপুরে ডাকলো। ওটা একটা ট্র্যাপ ছিল। ওর কিছু পাওয়ার ফুল বন্ধুদের নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমাকে বলে – ‘আমাকে ভালবাস?’
বলি – ‘বাসি’
‘বিয়ে করবে’
‘করবো’
ভেবেছিলাম এভাবে কাটিয়ে পরে আড় ধরা দেবনা। কিন্তু এরপর যা বলে তাতে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। আমি একবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। বয়সও কম ছিল।
‘কি বলে?’
‘বলে এখনই বিয়ে করবো। কাজী সাক্ষী সব রেডি আছে।’
‘আমি ওর বন্ধু বান্ধবদের দিকে তাঁকিয়ে বুঝতে পারি ওরা ডেস্পারেট! আমি খুবই আতংকে পরে যাই। না করতে পারি না।’
‘বিয়ে হয়?’
‘হয়। এরপর আমাকে ওর এক বন্ধুর বাসায় নিয়ে যায়। একটা রুমে আমাদের রাখে।’
কিছুক্ষণ থেমে তারপর বলে –
‘ও আমাকে জোড় করে পশুর মত রেইপ করে।’
বলতে বলতে নিশাতের চোখে পানি এসে যায়। আমার কোন ধারনাই ছিল না ও আমাকে ভালবাসে বলে অথচ এমন কিভাবে করতে পারে!’
‘খুবই দুঃখজনক আর পাশবিক! তারপর কি আপনাকে আটকে রাখে?’
‘না ওখান থেকে চলে আসি। আর ওকে ধরা দেই না। কিন্তু একমাস পরে জানতে পারি আমি প্রেগনেন্ট!’
‘ইয়া আল্লাহ! বাচ্চা?’
‘আমি এবরোশন করাই। কিন্তু এতে কি কি কমপ্লিকেশন দেখা দেয়। আমার শরীর ফুলে যায়। চার মাস আমি হাস্পাতালে থাকি। মরেই যাচ্ছিলাম প্রায়। পরে আমার আব্বা আমাকে বাসা থেকে বের করে দেয়। আমি চার বছর রাজশাহীতে এক আপার কাছে থাকি। পরিবারের কারো সাথে যোগাযোগ ছিল না! খেয়ে না খেয়ে চারটা বছর পার করি। কিন্তু নিজেকে গড়ে তুলি আত্মনির্ভরশীল করে।’
‘ফ্যামিলির সাথে রিইউনাইটেড হলেন কিভাবে?’
‘এক সময় বাবার কাছে এসে মাফ চাই। বাবা আমাকে খুব আদর করতেন। আমাকে ভুল বুঝে কষ্ট পেয়েছিলেন।’
‘ওহ! ভাবাই যায় না! আমি অনেক হাসি খুশী মানুষ দেখেছি যাঁদের দেখে ভাবাই যায় না ওদের জীবনে কত ভয়ংকর নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটে গেছে!’
একটু থেমে ফিদা বলে – ‘আপনাকে সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার নেই। আমার মনটা সত্যিই খুউব খারাপ হয়ে গেছে।’
ওরা কিছুক্ষণ হাইওয়ের ঠিক নীচে গাড়ির পাশে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। ফিদা বলে চলুন এবার তাহলে। নিশাত চুপচাপ গাড়িতে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে। ফিদা একটু ভাংগা গলায় আস্তে আস্তে বলে – ‘আমি চাই না আপনি এর কোন এডভান্টেজ নেন। আমি কি চেয়েছি আপনার কাছে তা এখনো চাই। তবে আজকের ঘটনা শোনার পর আপনি যদি আমার নাও হন, আমি আপনার একজন শুভাকাংখী এবং ভাল বন্ধু হয়ে চিরদিন থাকবো।’
‘যাক বাঁচলাম!’
নিশাত হেসে বলে। ফিদাও হেসে ফেলে। বলে – ‘আগেই বলেছি এর সুযোগ না নিতে!’
তারপর বলে – ‘আজ থেকে আমি আপনাকে অনেক বেশী ভালবাসবো আর সম্মান করবো।’
নিশাত কিছু বলে না। গাড়ি চলতে থাকে তিনশ ফিটের রাস্তায় দ্রুত গতিতে।

এভাবেই চলতে থাকে ওদের মেলামেশা। ক্লাবের সুইমিং পুলে, রেস্তোরাতে। পূর্বাচলে। গাওসিয়ার মোড়ের বিভিন্ন দেকে হাইওয়েতে লং ড্রাইভে হারিয়ে যেয়ে। দুজনেই দুজনের অজান্তে সারাদিনই যুক্ত থাকে হয়, হোয়াটসএপে, না হয় ফোনে। আর সরাসরি দেখা তো আছেই। প্রায়ই কোন না কোন কফি শপে নিশাতই ডেকে নিয়ে যায়। ঢাকার উত্তরা, গুলশানে এমন কোন কফি শপ নাই যেখানে ওরা বসে নাই। একদিন ইউনাইটেড হস্পিটালের কাছে গ্লোরিয়া জিন্সে নিশাত বনির সাথে সম্পর্কের গল্প শোনায়। ওর অফিসে কোন এক কাজে এসেছিল। বনির ছবি দেখিয়েছে নিশাত আগেই। খুব হ্যান্ডসাম। অফিসে আলাপ হয়। অফিস থেকে বের হয়ে দেখে যে বনি পরিবহনের জন্য অপেক্ষা করছে। দুজনের গন্তব্যই উত্তরা। ওরা কিছু না পেয়ে হাটতে থাকে। হাটতে হাটতে গল্প করতে করতে ওরা প্রায় পনেরো ষোল কিলোমিটার পথ পার হয়ে বাসায় পৌছায়। তার কদিন পরই বনি নিশাতের কলিগকে ফোন করে নিশাতকে পছন্দ করেছে বলে। নিশাতো রাজী হয়ে যায়। কয়েক মাস পর বিয়ে হয়।
‘আপনার সব কিছুই নাটকীয়। প্রেমটাও তাই।’
‘আমরা কিন্তু বিয়ের আগে প্রেম করিনি। যা করেছি বিয়ের পর।’
‘আপনি আবার রক্ষণশীলও বটে!’
‘কিছু কিছু ব্যপারে তো অবশ্যই!’
‘আমার ব্যপারে উদার হবেন কবে?’
‘কখনই না। এটা পাপ। জানাজানি হয়ে গেলে আপনি আমি দুজনেই অনেক সমস্যায় পড়বো। চিন্তাই করতে পারবেন না কি হতে পারে।’
ফিদা কিছু বলে না। উঠে আসে। গুলশান এভেনিউ ফাঁকা। নিশাতকে গুলশানের রাস্তায় চালাতে বলে। নিশাত প্রথমে আপত্তি করে। ফিদা বলে –
‘আপনাকে প্রথম দিনই বলেছি সাহস রাখতে হবে। জোড় করে ভয় দূর করতে হবে। আর আমি তো আছি। আমার কনফিডেন্স গ্রো করেছে বলেই আপনাকে বলছি।’
নিশাত গুলশানে চালায় ভালই। দু নম্বরের মোড়ে এসে ছেড়ে দেয়। ফিদা ড্রাইভিং সিটে বসে। রাস্তা ফাঁকা। গাড়ি চলে হাওয়ার বেগে উড়ে উড়ে। নিশাত বলে –
‘ইশ! কবে যে আমি আপনার মত চালাতে পারবো!’
‘পারবেন অবশ্যই, কিন্তু সময় লাগবে।’
‘কত সময়?’
‘কম পক্ষে এক বছর, কিন্তু অলমোস্ট রেগুলার, কোন ফাঁকি দেওয়ার চান্স নেই।’
‘যাক তাহলে এক বছর তো আপনাকে পাচ্ছি।’
দুষ্টুমিভরা হাসি নেয়ে বলে নিশাত।
‘জী না ম্যাডাম, আপনাকে রাস্তায় চালানোর অবস্থায় এনেই ছেড়ে দেব। আমার পক্ষে আর এভাবে মেশা সম্ভব না।’
নিশাত কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।তারপর বলে –
‘জানেন, আপনার সাথে যতক্ষণ থাকি, যা করি, সারাক্ষণ বনির কথা মনে হয়, যেন বনির সাথে আছি। যেই আপনার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যাই, তখন আর বনি আমার মনে আসেনা। আপনাকে মিস করি!’
ফিদা আড় চোখে তাঁকায় নিশাতের দিকে। নিশাত সামনের দিকে তাঁকিয়ে। মুখের ভাবে মানসিক দ্বন্দ পরিস্কার। ফিদা বুঝতে পারেনা এতে পাওয়ার কিছু আছে কি না। নিজেকে অন্য কারো প্রক্সি হতে মোটেও ভাল লাগে না। আবার ওরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর নিশাত ওর কথাই ভাবে, মিস করে এটা একটা প্রাপ্তি বলে মনে হয়। তবে যত দিন যায় নিশাতকে ততই অচেনা মনে হয়। নিশাতকে আশকোনায় নামিয়ে দিয়ে ফিদা উত্তরায় চলে যায় বাসায়।
নীতা রোজই সন্দেহের চোখে দেখে বেশী রাত করে ফেরাতে। আর সুইমিং করতে রোজ যাওয়াতে। আজও ভ্রু কুচকে জানতে চায় – ‘এত দেরী?’
‘এই সুইমিং এর পর উপরে গিয়েছিলাম, আড্ডা জমে যায়।’
‘বন্ধুদের কে ছিল তোমার সাথে?’
‘কোন বন্ধু ছিল না। কমন ক্লাব মেট, যাঁদের সাথে আড্ডা দেই সবসময়।’
ফিদা কথা বাড়াতে চায়না।
‘খেয়ে এসেছ?’
‘নাহ।’
‘টেবিলে খাবার দেওয়া আছে। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। ঘুম পেয়েছে। তোমার খাওয়া হলে আবার আমার ফ্রিজে ঢুকাতে হবে।’
‘আচ্ছা।’
ফিদা আর কথা বলে না সুবোধ বালকের মত বসে যায় খেতে।
পরদিন শুক্রবার ছিল। ছুটির দিনে বাসায়ই থাকে ফিদা। পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ফিদাও চায়। আড় নীতা খুবই রেগে যায় ছুটির দিনে ফিদা একা বাইরে গেলে।
বিকেলের দিকে নিশাতের টেক্সট পায় –
‘আধ ঘন্টার জন্য হলেও একটু জমজম টাওয়ারের মোড়ে আসবেন?’
ফিদা কি করবে ভেবে পায় না। পরে ওষুধ কেনার নাম করে বের হয়। নিশাত মোড়েই ছিল। বললো –
‘বনির সাথে কথা হবে। বনির বন্ধুর একটা রেস্টরেন্ট আছে সেখানে। আমার আসলে একটু সাপোর্ট দরকার। আপনি থাকলে আমার হেল্প হবে।’
‘আমাকে নিয়ে যাবেন ওখানে?’
‘না। সেটানা। এই দেখা করতে ইচ্ছে হচ্ছিল আপনার সাথে। তাই একটু আগে ডেকেছি আপনাকে। এই সময় টুকু আপনার সাথে কাটানোর জন্য। মনে একটু জোড় পাব।’
‘ভাল। সাহস রাখেন মনে। কি হবে আজ।’
‘ওই একই প্যচাল ঘুরে ফিরে। বনির শর্ত মেনে নিতে বলে জোড় করে। চাকরী ছাড়া আর কিছু করা যাবে না। সব সংগঠন ত্যাগ করতে হবে। ওকে সময় দিতে হবে...এই সব আর কি।’
‘আপনি তো পারবেন না মেনে নিতে।’
‘তাতো পারবোই না। ও কি করে সেগুলো তো কাউকে বলিনি। বলবো আজ ওর বন্ধুদের সামনে।’
‘আচ্ছা।’
পাঁচটায় সময় দিয়েছিল বনি। ওর গন্তব্যের কাছে নামিয়ে দেয় নিশাতকে। ণিশাত বলে – ‘মিটিং শেষ হলে আমি কিন্তু আপনার সাথে কিছু সময় কাটাবো।’
‘আমি তো বাসায় বলে এসেছি ওষুধ কিনতে যাচ্ছি। আর এখন বাসায় ঢুকলে আবার কোন অজুহাতে বের হবো?’
‘তাহলে বাসায় যেয়েন না। আমাদের বেশী সময় লাগবেনা। মিটিং শেষ হলে ফোন দিব।’
বিপাকে পড়ে ফিদা। বুঝতে পারে ভালই ঝারি খাবে বাসায়। আবার নিশাতের এমন দুর্বল মূহুর্তে ওর সঙ্গ চাওয়াকে ফেরাতেও পারেনা। রাজী হয়ে যায়। ফিদা একটা কফি শপে ঢুকে সময়য় কাটায়। ঠিক চল্লিশ মিনিট পর নিশাতের টেক্সট আসে – ‘কই?’
এই‘কই’ প্রশ্নটা নিশাতের জন্য ফিদার একটা প্রতীক হয়ে গিয়েছে। দিনের মধ্যে কতবার যে এই টেক্সট করে নিশাত ফিদাকে। নিশাতকে তুলে নেয়। জানতে চায় কি হলো মিটিং এ।
‘ঐ নতুন কিছু না। একই কথা, শর্ত। আমি আজকে বলে দিয়েছি ও আর বাড়ির লোক কিকি করে আমার সাথে। এতে ও খুব ক্ষিপ্ত হয়ে চলে গিয়েছে।’
‘ওহ! কিন্তু একটা ফয়সালা তো জরুরী। কতদিন এভাবে ঝুলিয়ে রাখবে।’
‘সেটাই আমি ওর বন্ধুদের বললাম। যাক বাদ দেন, চলেন না দূরে কোথাও।’
‘সেরেছে। আজকে বাসায় গেলে কিল একটাও মাটিতে পড়বে না!’
‘কিছু একটা বানিয়ে বলেন।’
‘আমি মিথ্যা বললে আমার বউ বুঝে যায়। আমি খুবই মিথ্যা কম বলি। যাও বলি আমার বউ কিন্তু ঠিকই ধরে ফেলে।’
‘একদিন না হয় আমার জন্য একটু বকা খান।’
‘চলেন, কোথায় যেতে চান?’
‘আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন।’
‘তাই! সত্যিই?’
দুষ্টুমিভরা চোখে নিশাতের দিকে তাঁকিয়ে বলে। নিশাতও হেসে বলে –
‘নাহ! আমার বিশ্বাস আছে আপনি ওরকম কোথাও নিবেন না।’
‘কি রকম?’
‘অত প্যাচাল দরকার নেই, তিনশ ফিটে চলেন।’
‘আচ্ছা, সেটা বললেই হত!’
ওরা তিনশ ফিট ধরে কাঞ্চন ব্রীজ পার হয়ে গাউসিয়ার মোড়ে এসে সিলেটের পথ ধরে। ওর নাকি বনির সাথে যাওয়ার সময় এই পথের কোন একটা জায়গা খুউব পছন্দ হয়েছিল। সেখানে যেতে চায়। ফিদার গাড়িও ছুটতে থাকে সিলেটের পথে। ফিদার গাড়ি জোড়ে চালানোর অভ্যাস। একটু পরপরই নিশাত অনুযোগ করে – ‘আপনার কি ট্রেন মিস হয়ে যাবে?’
ফিদা হাসে। গাড়ির গতি কমায়। একটু পরই আবার নিজের অজান্তেই গতি বাড়িয়ে দেয়। নিশাত আবারো একই কথা বলে। ফিদাও হেসে গতি কমায়।
‘আর কত দূর?’
‘এত অস্থির হচ্ছেন কেন? আমার সাথে থাকতে ভাল লাগছে না?’
‘ভাল না লাগলে বউ এর রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে চলে আসতাম?’
‘তাহলে এত তাড়াহুরা করছেন কেন?’
‘আছেন তো সিংগেল হয়ে। তাই বুঝছেন না কি অবস্থা হয় লাইফ পার্টনারকে ফাঁকি দিলে!’
‘ভাবী আপনাকে খুব ভালবাসে।’
‘আমিও খুব ভালবাসি। কখনও চিন্তা করিনি এমন করতে পারবো!’
‘আমিও চাই আপনি ভাবীর সাথে সুখে থাকেন। আমাকে ভুলে যান।’
‘বাহ! যার জন্য চুরি করি সেই বলে চোর!’
ফিদা কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলে। নিশাত হাসতে হাসতে কুটিকুটি।
নিশাত ওর প্রিয় জায়গাটা খুঁজে পায় না। তাই এক সময় বলে থামতে। ফিদা হাইওয়েতে সাবধানে বাঁ পাশ ঘেষে পার্ক করে। সিগারেট বিরতি দেয়। দুজন গাড়ির অপর পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করে। গল্প আর শেষ হয় না।
সাবধানে হাইওয়েতে দ্রুত ধাবমান সব বাস ট্রাক নজর রেখে ইউ টার্ন নিয়ে রওনা হয় ঢাকার পথে। অন্য সবাই এরকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বিভিন্ন সাবধান বানী উচ্চারণ করে চালককে একটু হলেও স্নায়ুচাপে ফেলে। নিশাত নিশ্চিন্তে বসে থাকে। ফিদার গাড়ি চালানোর ব্যপারে নিশাতের অগাধ বিশ্বাস, ফিদার ভাল লাগে। এই সময় ওর পাশে নীতা বা কিছু বন্ধু বসে থাকলে চিৎকার চেচামেচি করে ফিদার মাথাটা বিগড়ে দিত।
যতবারই সিলেটের রাস্তা থেকে ফেরে ততবারই গাউসিয়ার মোড়ের কাছে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে যাবে না নীচ দিয়ে যাবে, এই বিভ্রান্তিতে পড়ে। নীচ দিয়েই যাওয়ার রাস্তা। কিন্তু কেমন যেন আড়ালে। সহজে চোখে পড়েনা। কিন্তু উড়ালসেতুর নীচে দিয়ে অপ্রশস্ত রাস্তাটা দিয়ে যেতে নিশাতের সাথে কেমন যেন রোমান্টিক লাগে। নিশাতকে একটু ঘুরিয়ে বলে –
‘এই জায়গাটা কেমন রোমান্টিক মনে হয় না? মনে হয় সিনেমার নায়ক নায়িকাদের প্রেমের সিনে ভাল যেত।’
নিশাত কিছু বলে না। সেখান থেকে বের হয়ে দুই তিন দিকে রাস্তা গিয়েছে। এখানে এসেও ওরা সংশয়ে পরে ওদের গন্তব্য কোনটা? নিশাত জোড় দিয়ে যে রাস্তা দেখায়। ফিদা সেই রাস্তা নেয়। একটু যেয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করাতে বুঝতে পারে ভুল রাস্তায় এসেছে। নিশাতকে ইচ্ছে মত পচায়। নিশাতও হাসতে হাসতে যেন খিলখিল কাজী হয়ে যায়।

বাসায় এসে বিরাট ঝামেলায় পড়ে ফিদা। দরজা খুলেই জেরা করা শুরু করে নীতা – ‘ওষুধ আনতে তোমার এত সময় লাগলো? ফার্মেসী তো কাছেই। গাড়ি নিয়ে গেলা কেন? তুমি কি নিশাতের সাথে ছিলে?’
‘নিশাতের কথা কোত্থেকে পেলে।’
‘পেয়েছি। সেটা বলবো কেন?’
‘আমি এক পরিচিতের সাথে দেখা হলো। তার সাথে ছিলাম’
‘কে সে?’
‘তুমি চিন না। আমাদের ক্লাবের।’
‘কি নাম?’
‘যা বলার বলেছি। আর কিছু বলবো না।’
‘বুঝেছি তো। নিশাতের সাথে ছিলে। না হলে গাড়ি নিয়ে বের হলে কেন?’
ফিদা আর কথা বাড়ায় না। খুবই অবাক হয় নীতা নিশাতের কথা জানলো কিভাবে? এত ধরাধরি একদম সহ্য হয় না। তবে নিজের কাছেই অবাক লাগে নিজের এত বড় দোষটাকে নিয়ে কোন অপরাধ বোধ হচ্ছে না দেখে। কিছু দিন আগেও এরকম ফিদা করতে পারে ভাবতেই পারতো না! অন্য কোন মেয়ে মাথায় এলেই সাথে সাথে নিশাত এর মুখটা ভেসে আসতো। এখন কেন আসছে না? কি অনুপস্থিত ওদের মাঝে এখন?
নীতাকে তো এখনো প্রচন্ড ভালবাসে! তাই অনুভব করে ফিদা। তাহলে কি এটা ভালবাসা না মায়া? সেটাও মানতে কষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের সম্পর্কে মায়ার সাথে তিক্ততাও জমা হয় স্মৃতির পটে। আর বাংগালী মেয়েরা সন্তান হয়ে গেলে বাচ্চার প্রতি মনযোগ চলে যায় বেশী। স্বামী তখন হয়ে যায় দায়িত্ব। স্বামীরও কি পরিবারকে দায়িত্ব বা মায়ার বন্ধন হিসেবে ধরে নিয়ে মন অন্য কিছু খোঁজে। ফিদার এগুলো ভাবতে ভাল লাগে না। মিড লাইফ ক্রাইসিস হিসেবেও মেনে নিতে চায় না।

পরদিন অফিসে যাওয়ার পথে ‘শুভ সকাল’ কামনা করে টেক্সটের মাধ্যমে। কিন্তু উত্তরে বেশ অদ্ভুত অদ্ভুত টেক্সট করতে থাকে নিশাত। ফিদা খুবঅবাক ও বিরক্তও হয়। গতকাল রাত পর্যন্ত তো ভালই ছিল। কি হয়ে গেল আজ সকালে।
‘আমাদের রিলেশনটা ঠিক না।‘
‘এরকম সম্পর্ক্ কে আমি থোরাই কেয়ার করি, আই হেইট দিস রিলেশনশিপ’
এরকম একটার পর একটা আসতেই থাকে। ফিদা গাড়ি চালাচ্ছিল বলে উত্তর দিতে পারছিল না। এক নজর দেখে নিচ্চিল টেক্সট গাড়ি থামলে জ্যামে বা সিগনালে। ওআর দেখাও বাদ দিল। চিন্তা করছিল অফিসে যেয়ে ফোন দিবে বা টেক্সট করবে। অফিসে যাওয়ার পরও ওর এরকম টেক্সট চলছিল। সব যে ওদেরকে নিয়ে তা নয়। ওর নিজের কিছু হতাশা নিয়েও। ফিদা কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করলো। নিশাতের কারনে ওর কাজের অনেক ক্ষতি হয়। যখন তখন ফোন করে হঠাৎ কেটে দেয়। আবার দশ মিনিট পর ফোন করে। বলে কেউ এসে পড়েছিল ওর রুমে। কিন্তু ফিদা রুমে চার জনের সাথে বসে। ওর ফোন এলে উঠে যেতে হয়। ফোন কেটে দিলে ফেরত এসে সিটে বসতে বসতে আবার ওর ফোন আসে। আর আজকের মত এমন এমন টেক্সট করে যে ফিদার মাথা খারাপ হয়ে যায়। অফিসের সবাই ওর অস্থিরতা লক্ষ করে। সাঁতার শেখার প্রথম দিনের গল্পটা শুধু কলিগদের সাথে করেছিল। আর কিছু কোন দিন বলে নি। কিন্তু সবাই সুযোগ পেলেই বলতে ছাড়েনা –
‘ফিদা ভাই সাঁতার শুরু করার পর থেকেই কেমন যেন অস্থির হয়ে গিয়েছেন!’
কেউ বলে, অন্যরা মুখ টিপে হাসে। ফিদা মুচকি হেসে চুপ করে থাকে। পুরো ঘটনা শুনলে ওদের কি প্রতিক্রিয়া হত এটা চিন্তা করে মনে মনে হাসে। কিন্তু আসলেই বুঝতে পারে নিজের বেসামাল অবস্থা। নিশাতের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই ওর জীবন্ টা পুরো পাল্টে গিয়েছে। এর আগে সব কিছুতে সুখী ছিল ফিদা। ‘অল ইজ ওয়েল, নো কমপ্লেইন’ টাইপের জীবন ছিল ওর। কিন্তু এখন প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় ওর মনের হাল পরিবর্তিত হয়। এই ভাল, এই বিচলিত, আবার হঠাৎ খুব খারাপ। বয়স পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। মনের চাপ শরীরকেও প্রভাবিত করে।
হঠাৎ একটা টেক্সটে ফিদা প্রতিক্রিয়া না দেখে পারলো না। নিশাত লিখেছে –
‘বনি আমাকে ডিভোর্স দিবে বলেছে, খুশী হয়েছেন?’
‘ভেরী সরি টু হিয়ার দ্যাট, কিন্তু এতে খুশী হওয়ার কি আছে আমার!’
‘আমি ইচ্ছে মত গালি দিয়েছি! ...... মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার!’
‘শান্ত হন, হওয়ার চেষ্টা করেন।’
একের পর এক হতাশা আর দুঃখের বার্তা পাঠাতে থাকে নিশাত। ফিদার ওর জন্য খারাপ লাগে খুব। বুঝতে পারে ওর মনের অবস্থা। সকাল থেকে বিনা কারনে যে ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করছিল নিশাত, ফিদা সেটা ভুলে যায়। টেক্সট করে বাপ্পা মজুমদারের গানের কলি দিয়ে –
‘আজ তোমার মন খারাপ মেয়ে
তুমি আনমনে বসে আছ
আকাশ পানে দৃষ্টি উদাস
আমি তোমার জন্য এনে দেব
মেঘ থেকে বৃষ্টির ঝিরিঝিরি হাওয়া
পরী তুমি ভাসবে মেঘের ভাজে ...’
কিছুক্ষণ পর একটা টেক্সট আসে নিশাতের কাছ থেকে –
‘ক্যান ইউ কাম আফটার অফিস জাস্ট টু হাগ মি, আই নিড এ হাগ’
ফিদা একটু ঘাবড়ে যায়। বলে – ‘আজ নীতাকে কথা দিয়েছি অফিস থেকে আরলি বাসায় যেয়ে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। না গেলে খুব রেগে যাবে।’
‘আপনি কিভাবে ভাবীকে ম্যানেজ করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু আপনাকে আমার চাই আজ বিকেলে।’
ফিদা বাধ্য হয়ে রাজী হয়। ন্যায় অন্যায় মন জানে না, জানতে চায় না। মনে হয় নিশাতকে আজ অন্তত সঙ্গ দেওয়া উচিত।
ফিদা যখন কারওয়ান বাজারের কাছে আসে তখন নিশাত ফোন করে –
‘কই?’
‘এইতো আপনার অফিসের কাছে।’।
‘আমি একটু আগে বের হয়ে গিয়েছি। আমি উত্তরাই আসচি। এখানে একটু জরুরী কাজ আছে।’
‘আমি কি আপনাকে যেখানে আসচেন সেখান থেকে পিক করবো?’
‘না। আমার সাথে তো স্কুটি আছে। আপনি আপনাদের ক্লাবে যান। আমি চলে আসবো আপনি যেতে যেতে।’
‘নাকি আমি বাসায়ই চলে যাব।’
‘না না থাকেন আপনি ক্লাবে।’
ফিদা একটু দ্বন্দে পড়ে। ওকে এতকরে বললো আসতে অথচ ও আগেই চলে গেল! এদিকে নীতাকে ফোন করে বলে দিয়েছে অফিসের জরুরী কাজে ওর দেরী হবে। কাল ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। নীতা কিছু বলে নি। এখন এত আগে বাসায় যেয়ে পৌছালে নীতার হাজারটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। তাই ক্লাবে গেল। ঘ্ন্টাখানেক পার হওয়ার পরও নিশাতের কোন খবর নাই। তখন ফোন দিল।
‘আপনি কি আসছেন? দেরী হলে চলে যাই। আমি তো আসলে আপনার জন্যই আসচিলাম!’
‘আপনি থাকেন। আমি পনের মিনিটের মধ্যে আসচি।’
আসে নিশাত সময়মত। ফিদা বারে ছিল। বেশ কয়েকটা বিয়ার গলধকরন করে ফেলেছে। নিশাত উপরে উঠতে চায় না বলে ফিদা নীচে নামে। নিশাতকে দেখে একটু অবাকই হয়। ওকে যেমন আশংকা করেছিল তা একদম না। ভেবেছিল ভগ্ন, বিষণ্ণ রূপে দেখতে পাবে নিশাতকে। পেলো তার উলটো। বেশ উৎফুল্ল, খোশ মেজাজে আছে যেন। হাগ করার আর প্রয়োজন নেই বুঝতে পারে। ফিদা জিজ্ঞেস করে –
‘কোথায় গিয়েছিলেন’
‘এক ভাইয়ার কাছে। বেশ আড্ডা হলো। ভাইয়াকে কাজ দিতে বললাম, বললো আমার সাথে প্রেম কর।’
বলে খিলখিল করে হাসলো নিশাত। আবার বললো –
‘সাজু ভাইয়া আবার হুইস্কি খাওয়ালো। তাই দুই কাজ হয়ে গেল। ড্রিংক দরকার ছিল।’
ফিদা খুবই অবাক হলো। আস্তে করে বললো – ‘ও আচ্ছা।’
তারপর একটু গ্যাপ দিয়ে বললো – আপনি তো ঠিকই আছেন। আমার তো না আসলেও চলতো। আমি তো মনে করেছিলাম জরুরী দরকার আপনার আমাকে। খামাখা বউকে রাগালাম!’
নিশাত কোন সদুত্তর দিতে পারলো না। আমতা আমতা করে বললো –
‘না ... আপনি আমাকে টেক্সট করে অনেক সাহস জুগিয়েছিলেন, তখন খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আপনাকে দেখতে, পরে হঠাৎ আগে বের হোয়ার সুযোগ পেয়ে সাজু ভাইয়ের ওখানে চলে গেলাম।’
‘যাক, আপনার মন ভাল এটাই আসল কথা। খুশী হলাম দেখে। চলুন যাই।’
কিন্তু ফিদার মনটা আসলে ভারী হলো। নিশাত একটু বিব্রত মনে হলো কি? বুঝতে পারলোনা এই মেয়ের প্রতিক্রিয়া। চুপচাপ ওর পিছন পিছন বেরিয়ে এলো।

পরদিন দুপুরে ওকে ফোন করে জানালো -
‘হোটেল সোনারগায়ে আমাদের একটা কনফারেন্স চলবে। সাড়ে পাচটা ছটার দিকে শেষ হবে। আপনি কি সোনারগাঁয়ে আসবেন? সেখান থেকে আমরা ক্লাবে চলে যাব একসাথে। আমি আজ স্কুটি আনিনি। একটু ভাল ড্রেস আপ করে এসেছি তো!’
বলে হাসলো নিশাত।
ফিদা বললো – ‘ঠিক আছে আমি সরাসরি অফিস থেকে চলে আসবো সোনারগাঁয়ে।’
পাচটার অফিস থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই নিশাতের ফোন -
‘আমাদের কনফারেন্স তো শেষ! কই আপনি?’
‘আমি পথে আরো আধ ঘন্টার মত লাগতে পারে।’
‘আমি কি করবো তাহলে?’
ফিদাও চিন্তায় পরে বেচারী এতক্ষণ কি করবে। তখন বলে –
‘আপনি পুল সাইডে বসেন, ফুড ড্রিংক নেন, আমি আসছি।’
‘না না কিছু নেওয়া লাগবে না, আমি বসছি পুল সাইডে।’
ফিদা পৌছোয় পনের বিশ মিনিট পরে।
নিশাত সুইমিং পুলের একদম পাড়ে দাঁড়িয়ে সুইমিং দেখছিল এক বিদেশী ছেলের। মনে হচ্ছিল সুযোগ পেলেই কথা বলবে ওর সাথে। পিছন থেকে ডাক দেয়াতে একটু চমকালো যেন মনে হয়। নিজেই বলে –
‘লোকটা কি অদ্ভুত ভাবে সুইমিং করছিল! সেটাই শিখার চেষ্টা করছিলাম!’
ফিদাও একটু চমকালো নিশাতের রূপ দেখে। কালো জ্যাকেট, কালো প্যান্টআর পিংক সার্টে বেশ টকটকে, ঝলমলে লাগছিল নিশাতকে। ফিদা বলে –
‘ওয়াও! লুকিং রিয়েলি গরজিয়াস!’
‘আমি যখন সাজি তখন সবার নজরে পড়ি। আজকে তো আমার বস ডেকে ডেকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল। তাও মেকআপের মধ্যে শুধু লিপিসটিক দিয়েছি। আর কিছু না।’
ফিদা বুঝতে পারে অন্যসব মেয়ের মত্ ওর ও রূপ সচেতনতা যথেষ্ট আছে। যতই ভাব দেখাক টম বয় টাইপ, এসব মেয়েলী ব্যপারে কোন আগ্রহ নেই।
‘লিপিসটিক’ শব্দটা কানে বাজে। নিশাতের ইংরেজী শব্দের উচ্চারনে কিছু সমস্যা আছে। যেমন স্টুপিড কে বলবে ইস্টুপিড। প্রোজেক্ট কে বোলবে প্রোযেক্ট। মানে ইংরেজী জে লেটার কে যেড উচ্চারণ করবে। ফিদা মনে মনে ভাবে নীতা যদি কখনো ওর সাথে কথা বলতো আর এগুলো শুনতো, কি যে বলতো! নীতা রক্ষণশীল হলেও যঠেষ্ট স্মার্ট। ফিদাও যে আনস্মার্ট বা উচ্চারণ ত্রুটি ওয়ালা কোন মেয়ে পছন্দ করে না সেটা ভালভাবেই জানে। ক্লাবে যারা অনেক দিন ধরে নিয়মিত সুইমিং করে, নিশাতকে ফিদার অনেক আগে থেকে চেনে তারাও বলেছে –
‘ভাই এই মেয়ে থেকে দশ হাত দূরে থাকেন। যেগুলা তেমন সুন্দর না, ওগুলা ওরমত ডেস্পারেট হয়। বুঝেন ডেস্পারেট কেমন? সব জায়গায় নিজেকে আগ বাড়ায় মিশতে চায়। ও হলো এই রকম।’
নওশাদও ওকে দু একবার সাবধান করেছে। অনেকটা অন্যদের মতই সুরে। ওর নাকি স্ট্যান্ডার্ড খুব লো। যেচে পড়ে সব ছেলেদের সাথে খাতির করতে চায়। উপরে উঠতে চায়। আগবাড়িয়ে ছেলেদের পিছনে ঘুরঘুর করা ফিদার অনেক পরে চোখে পড়েছে। ততদিনে সে প্রেমে পড়ে গিয়েছে। এই সব বৈশিষ্ট গুলো ফিদা খুব নেতিবাচক হিসেবেই নেয়। তারপরও কি এক নেশায় মেয়েটার প্রেমে পড়ে আছে বুঝতে পারে না ফিদা। কিছু একটা যাদু ওর ব্যক্তিত্বে আছে অবশ্যই। তা না হলে ফিদা ওর প্রতি আকৃষ্ট হত না।
ফিদা ড্রিংক অর্ডার করে। নিজের জন্য কার্লসবার্গ বিয়ার আর নিশাতের জন্য রেড ওয়াইন। ফুড খেতে চায় না নিশাত যেহেতু পার্টিতে খেয়ে এসেছে। নিশাত বলে -
‘শীতের সময় আমি সব সময় সুট পড়ি।’
‘হ্যা আপনাকে সুটে ভাল মানায়’
গল্পে গল্পে অনেক সময় পার হয়ে যায়। সেই সাথে অনেক বিয়ার আর রেড ওয়াইন। মোটামুটি মোটা অংকের বিল দিয়ে ওঠে ফিদা। নিশাত বলে –
‘আজ আর সুইমিং এ যাব না। চলেন পূর্বাচলে যাই।’
‘চলেন।’
যাওয়ার পথে একটু বাচসা হয় ওদের। ক্লাব নিয়ে কি কথা বলতে যেয়ে কিবরিয়ার কথা আসে। সুইমিং পুলের পরিচারক নজরুল নিশাতকে নিয়ে নওশাদকে অভিযোগ করেছিল। নিশাত নাকি এক ঘন্টার টাইম মানে না। বিভিন্ন ছেলেদের পিছনে লাগে। কিবরিয়ার পিছনে লেগেছিল। কিবরিয়া নাকি পাত্তা দেয় নি এসব। নিশাত শুনে খুব রেগে যায়। বলে – ‘এতদিন সুইমিং করলাম আপনাদের ক্লাবে, কোন সমস্যা হলো না, আপনার সাথে পরিচয় হওয়ার পরই যত সমস্যা।’
‘কিবরিয়াকে তো আমার আগে থেকে চেনেন। তখন তো আমি ছিলাম না!’
‘তখন তো কেউ কিছু বলে নি!’
‘বলেনি কিভাবে জানেন। এটা আমার কানে আসলো বলে আপনি জানলেন।’
‘আপনি প্রতিবাদ করেন নি কেন?’
‘নজরুল তো আমাকে কিছু বলে নি! নওশাদকে বলেছে।’
‘এতজনকে সুইমিং শিখালাম কিছু হলো না। আর আপনি মিস রিড করে কোথায় নিয়ে গেলেন। আমি এতদিন ধরে এখানে আসি। আমার একটা সম্মান আছে। আপনার জন্য এখন এসব কথা শুনতে হচ্ছে। কেউ আমাকে ডেস্পারেট বলেছে?’
ফিদা ‘মিস রিড’ কথা টা শুনে বেশ ক্ষেপতে যাচ্ছিল। কিন্তু ‘ডেস্পারেট’ শব্দটা নিশাতের মুখ থেকে শুনে খুউব অবাক হলো। নিশাত জানলো কিভাবে? ওর মাথায়ই আসলো না হয়তো নিশাত নিজের কানেই কারো মন্তব্য শুনেছে ওর সম্বন্ধে। ফিদা বলে – ‘হ্যা ডেস্পারেট বলেছে।’
‘কে বলেছে, নাম বলেন?’
‘না নাম আমি বলবো না, তবে সে অনেক আগে থেকে সুইমিং করে। তখন তো আমি ছিলাম না। সব দোষতো আমার ঘাড়ে চাপাচ্ছেন!’
‘না, সব দোষ আমার। আপনাকে সুইমিং শেখানোই ভুল হয়েছে, ভুল হয়েছে আপনার সাথে মিশা। আপনি সহজ আচরণ গুলোকে মিস রিড করেছেন।’
‘দেখেন আমি মেয়েদের সাথে এত মেশামেশি না করলেও এমন না যে একটামেয়ের সাথে কথা বললেই প্রেমে পড়ে যাব। আপনি কোনটাকে মিস রিড বলছেন? আপনি যা করেন সেটা ফ্লার্ট। আগে জানতাম না।’
‘কোনটা ফ্লার্ট? আমি তো মেয়েদের সাথেও এভাবেই ফ্লার্ট করি।’
‘আগেও বলেছি এখনো বলছি ফ্লার্ট করাটা গে লেসবিয়ান ছাড়া অপজিট সেক্সের সাথেই বোঝায়। আপনি আমার সাথে একা একা ঘুরেছেন। আলাদা ভাবে মিশেছেন। তখন আমি শিওর ছিলাম না বা কোন সিগনাল মনে করিনি। কিন্তু যেদিন আপনি আমাকে বললেন আপনার জন্য বাঁচতে, এটা কিন্তু সরাসরি সিগনাল যে কোন স্ট্যান্ডারডেই!’
‘ওটা তো আমি আপনার ভালর জন্য বলেছি।’
‘হ্যা ঠিক। কিন্তু একটা মেয়ে এভাবে বলার মানে অবশ্যই কেউ আমার মতই বুঝবে, আপনি যেটাকে স্বাভাবিক মনে করেন সেই কার সাথে ফোনে ডেটের কথা বললেন, কোন সাজু ভাই আপনাকে প্রেমের প্রস্তাব দিল, আমার মত সবাইকে আপনি আগ বাড়িয়ে শেখান বা কথা বলেন, এগুলো তো আমি পরে দেখলাম। আমি এরকম মেয়ের সাথে মিশিনি। যারা করে তাদেরকে ফ্লার্ট করা টাইপ মনে করি। অন্তত প্রেমে পড়ি না।’
‘আসলে আপনার সাথে আমার একটা বয়সের, জেনারেশনের বিরাট গ্যাপ আছে।’
‘আমি কিন্তু ইংলিশ মিডিয়ামের অনেক ফাস্ট মেয়ে আশেপাশেই দেখি। আমার সামনে বড় হচ্ছে। আমার সাথে আপনি যে ভাবে মিশেছেন সেটা ওদের স্টান্ডার্ডেও সিগনাল!’
‘আপনি ভুল করছেন। মিসরিড করছেন। আমাকে যদি আপনার এতই খারাপ মনে হয় তবে রিলেশন করতে চাচ্ছেন কেন?’
মোটামুটি চিতকার করে বলে নিশাত।
‘আগে জানলে আমি উইকই হতাম না। এমন মেয়ে আমি পছন্দ করি না!’
‘ওকে! খতম, কোন বন্ধুত্বেরও দরকার নেই!’
আরো জোড়ে চিৎকার করে বলে নিশাত। ততক্ষণে ওরা পূর্বাচলের রাজউকের এরিয়ায় ঢুকে গিয়েছে।
‘ঠিক আছে।’
বলে ফিদা গাড়ি পার্ক করে রাস্তার পাশে যেখানে রোজ পার্ক করতো জায়গা বদল করার জন্য। গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। সিগারেট ধরায়। নিশাতকে বসে থাকতে দেখে বলে – ‘নামবেন না?’
নিশাত ধীরে সময় নিয়ে বের হয়ে আসে। কিন্তু সোজা হয়ে দাঁড়াতে যেয়ে পড়ে যেতে যায়। ফিদা তাড়াতাড়ি দু হাতের মাঝখান দিয়ে খাত ঢুকিয়ে সোজা করে তুলে। নিশাত সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ফিদা ছেড়ে দিতেই আবার পড়ে যেতে যায়। আবার ফিদা ধরে ওঠায়। সোজা করে দাঁড়াতে সাহায্য করে। বলে –
‘থাক আপনাকে গাড়িতেই বসিয়ে দেই।’
‘না এখন পারবো। হেলান দিয়ে দাঁড়াই।’
‘অ্যাজকে তো আর গাড়ি চালাতে পারবেন না।’
‘নাহ। দরকার নেই।’
‘তাহলে চলে যাই?’
‘চলেন।’
‘হাইওয়েতে উঠার পর নিশাত বলে কিছু দূর ঘুরে আসবেন।’
‘আচ্ছা।’
কাঞ্চন ব্রিজ পার হয়ে আরো কিছু দূর যাওয়ার পর নিশাত বলে গাড়ি ঘোরাতে। ফিদা তাই করে। আশকোনার মোড়ে এলে নিশাত বলে এ্খানেইনামিয়ে দিতে। ফিদা রাজী হয় না। বলে -
‘আপনি একদম ঠিক নাই। আজো মনে হয় ড্রিংক বেশী হয়ে গিয়েছে। এতরাতে এভাবে রাস্তায় নামিয়ে যাব না আমি।’
ওর বাড়ির কাছেই নামায়। মুখ কালো করেই নিশাত চলে যায়।ফিদাকে নিয়ত অস্থিরতায় ফেলে।
পরদিন কোন যোগাযোগ হয় না ফোন বা টেক্সটে। সন্ধ্যায় সুইমিং করতে এসে টের পায় নিশাত সুইমিং করে চলে গিয়েছে। ও পুলে ঢোকার সময় ক্লাবের এক ছোটভাই অপু বলে – ‘আপনার ইন্সট্রাক্টর তো সুইমিং করে উঠে গেছে, ওয়েট করছে, রেস্টরেন্টে।’
ফিদা বোঝে অনেকেই ওদের ব্যপারটা আঁচ করতে পেরেছে। ফিদা শুধু সৌজন্যমূলক হাসে। কিছু বলে না।
সুইমিং করে যখন বের হচ্ছে তখন চোখে পড়ে নিশাত খুব ব্যস্তভাবে চলে আসছে। ফিদা তাঁকায় না। পাশে কিশোর ছিল। কিশোরকে সালাম দেয় নিশাত। কিশোরও উত্তর দেয় সালামের। নিশাত চলে যাবার পর জানতে চায় কিশোর –
‘কিরে তোকে কিছু বললো না যে?’
‘আরে ওর কথা আর বলিস না।’
‘কেন কি হয়েছে?’
‘রোজই কিছু না কিছু হয়। আর ভাল্লাগে না!’
‘বাদ দিয়ে দে?’
‘তাই দিচ্ছি।’
উপরে যায় ফিদা আর কিশোর। ড্রিংক চলতে থাকে একের পর এক। অপুর সাথে ওয়াশ রুমে যাওয়ার পথে আবার দেখা হয়। তখন ফিদা বেশ খানিকটা নেশাগ্রস্ত। অপুকে বলে – ‘তোমাকে আমি কিছু কথা বলবো।’
‘বইলেন ভাই সমস্যা নাই। ওই মেয়েটা সম্বন্ধে বলবেন তো! আপনাকে আগেই বলেছি ডেস্পাপারেট টাইপের মেয়ে। সবার সাথে আগ বাড়ায়ে নিজেকে জাহির করতে চায়। একদম বাদ দিয়ে দেন। আপনার তো বয়স হইসে, খামাখা প্রেসার বাড়িয়ে লাভ আছে? ড্রিংকোতো অনেক বেশী করেন আজকাল!’
‘হ্যা ঠিক বলেছ। বাদ দিয়ে দিব।’
ফিদা অপুর কথা শুনে একটু যেন শান্তি পায়। ওকে মন থেকে তাড়ানোর জন্য একটা অবলম্বন খুঁজে পায়। কিশোরো ওকে একই কথা বলে –
‘তুই আজকাল অনেক বেশী ড্রিংক করিস। রোজই কোন না কোন কান্ড ঘটাস। এই মেয়ে পিছু ছাড়। এ তোকে ভালবাসে না।’
‘হ্যা ছেড়ে দিব।’
ফিদা যেন নিজেকে নিজেই বোঝানোর চেষ্টা করে।

পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার পথে টেক্সট পায় নিশাতের। সকালের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে। ফিদা উওর দেয় না।
দুপুরে ফোন করে। ফিদা ধরবে না ধরবে না করেও ধরে ফেলে।
‘আসসালামু অলাইকুম’
‘অলাইকুম সালাম’
‘খুউব রাগ?’
‘রাগের কিছু নাই। আপনি বললেন খতম। বন্ধুত্বও চান না। তাই ফলো করছি।’
‘ওটাতো রাগ করে বলেছি।’
‘আমি ভাই সোজা বাংলা বুঝি। খুবই অবাক হই আপনার সাথে এতদিন মেলেমেশার পর তুচ্ছ কারনে আপনি শেষ করে দেন!’
‘আমার সমস্যার কথা তো বলেছি। আমার হাজবেন্ড আছে। আমি ওরকম কোন সম্পর্কে যেতে পারি না যতক্ষণ ওর সাথে কিছু একটা সেটল না হয়।’
‘ওটা আপনার কোনদিনই সেটল হবে না। আর আমিও শুধু বন্ধত্বের সম্পর্ক রাখতে চাই না। আমারও তো বউ আছে। ওর সাথে তো আমার কোন সমস্যা নেই! আমি কি ওর সাথে চিট করছি না!’
‘তাতো করছেনই। তাইতো বলছি এরকম সম্পর্কে না যাওয়াই ভাল।’
‘দেখেন এ নিয়ে আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একই প্যাচাল রোজ রোজ ভাল লাগে না। আমি আপনাকে আমাদের দুজনের অবস্থা জেনেই পরিস্কার বলেছি আমার মধ্যে কি হয়েছে। আমি হয় ওরকম সম্পর্ক যাব। না হলে কোন বন্ধুত্বের দরকার নাই। আপনার এরকম হাজারটা ছেলে বন্ধু আছে। যাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে আরো কয়েকটা প্রেমে পড়িয়ে দিয়েছেন। আমাকে ওরকম মনে করলে ভুল করবেন। আমার যা হয়েছে সেটা জেনুইন। ভালবাসার ব্যপারে জোড়াজুড়ির কিছু নাই। আমি তো আপনাকে জোড় করি নাই একবারো। আপনি তো জানেন কি চাই আমি। জেনেও মেশেন কেন আমার সাথে? রোজ রোজ এত প্রেসার আমি নিতে পারিনা আর!’
‘আপনি আমাকে ব্ল্যাক্ মেইল করছেন।’
‘ব্ল্যাক মেইল কেন হবে? আমার প্রোপোজাল ফিরিয়ে দেন। আমি তো বলনি না মানলে এই করবো সেই করবো। আমি শুধু নীতাকে ব্ল্যাক মেইল করেছিলাম। আসলেই ওকে না পেলে কি হত জানি না!’
‘আপনি ভাবীকে খুব ভালবাসেন। আমি এর মধ্যে আসতে চাচ্ছি না।’
‘উত্তম প্রস্তাব। ঠিক আছে এসেন না। কেন খামাখা ফোন করে কষ্ট দিচ্ছেন?’
‘আবারো ব্ল্যাক মেইল!’
‘কি আশ্চর্য কিভাবে ব্ল্যাক মেইল হলো বুঝলাম না!’
‘আমি আপনাকে মিস করতে চাই না।’
‘সে তো আমিও চাই না।’
‘কিন্তু আপনি তো শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন।’
‘আপনার কাছে এটা কিছু না। কিন্তু আমি এভাবে কারো সাথে মিশিনাই নীতা ছাড়া। আমি তো ইচ্ছে করে প্রেমে পড়িনি। এটা আমার অজান্তেই হয়ে গিয়েছে। বুঝি নীতার সাথে চিট করা হচ্ছে। তবুও আমি এই ফিলিংস সরাতে পারবো না। আগে বিশ্বাস করতে পারতাম না দুজন কে ভালবাসা যায়। এখন মনে হয় যায়। আমি তো নীতাকে সবচেয়ে ভালবাসি!’
‘আমিও বনিকে।’
‘সেটাই বাস্তব। এটা তো আমি মেনে নিয়েই বলেছি। আমার পক্ষে এত কিছুর পর শুধু বন্ধু হিসেবে আপনাকে মেনে নিতে পারবো না।’
‘ব্ল্যাক মেইল’
‘কি দিয়ে ব্ল্যাক মেইল। আমার মত আপনার অনেক বন্ধু আছে।’
‘আপনার সাথে আমি যত ফ্রী হয়েছি, কারো সাথে হইনি। কেন জানি না!’
‘আপনি জানেন সেটা। আমি আমারটা জানি।’
কিছুক্ষণ নীরব থাকে দুজন। কিছু পর নীরাবতা ভাংগে নিশাত। বলে –
‘আজ অফিস থেকে একটু আগে বের হতে পারবেন?’
‘কেন?’
‘পারবেন কিনা বলেন?’
‘আগে জানতে হবে কেন। আপনি যদি ড্রাইভিং শিখতে চান। আমি ব্ল্যাক মেইল করবো না। শেখাবো ফরমালি মিশবো। কোন সুযোগ নিব না। আর যদি বন্ধু হিসেবে ডাকেন, তাহলে না।’
‘বন্ধু হিসেবে না।’
‘ড্রাইভিং?’
‘আরে বাবা আসতে বলছি আসেন?’
‘আমি কি ডেট ভাববো?’
‘হ্যা ডেট।’
ফিদার মাথা খারাপ হয়ে যায়। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আবার দ্বিতীয় বার জিজ্ঞেস করতেও ভয় পায়। যদি মত পাল্টে ফেলে! বলে -
‘কটার দিকে বের হব?’
‘চারটার দিকে পৌছেন আমার অফিসে।’
‘আচ্ছা চলে আসবো। ধন্যবাদ। এখন রাখি তাহলে।’
ফিদা অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ফোনে। লাফ দিল একটা উপর দিকে দু হাত উপর নীচ করে। ঠিক কৃকেটে বোলার উইকেট পেলে যেমন করে। অবশ্য মনে মনে। নিজের রুমে ফেরত আসে। বসকে জানাতে হবে। এই মূহুর্তে কোন জরুরী কাজ নেই। বস না করবে না। যদিও নিশাতের কারনে প্রায়ই আগে চলে গিয়েছে অফিস থেকে। দীর্ঘক্ষণ ফোনে কথা বলে নিশাতের সাথে সিগারেট খাওয়ার নাম করে বারান্দায় যেয়ে।

নিশাতের অফিসের নীচে গাড়ি পার্ক করে অপেক্ষায় থাকে ফিদা। নিশাত নামতে বেশী দেরী করে না। ফিদা গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। নিশাত কাছে এলে পশ্চিমা ভদ্রতায় গাড়ির দরজা খুলে দেয়। বলে –
‘ডেট তো? আমি কিন্তু মোরশেদকে বলে এসেছি যে আমরা ডেটে যাচ্ছি। এখন যদি স্ট্যাটাস চেঞ্জ হয়ে যায়, তাহলে ওর কাছে খুব লজ্জা পাব!’
খিলখিল করে হেসে বলে – ‘হ্যা ডেট।’
তারপর বলে – ‘আপনি সবকথা মোরশেদ ভাইয়ের সাথে শেয়ার করেন?’
‘হ্যা’
‘এটা ঠিক না। আমার সাথে যা হয় সব কি শেয়ার করা ঠিক?’
‘একেবারে ইন্টিমেট কিছু নিশ্চয়ই শেয়ার করি না বা করবো না!’
‘আচ্ছা। মোরশেদ ভাই কি বললো?’
‘মোরশেদ আমার খুশীতে খুশী। ও আমাকে হ্যাপী দেখতে চায় ... কোথায় যেতে চান বলেন?’
‘চলেন তিনশ ফিটে। পরে দেখা যায় কোথায় যাই। আগে বের হলাম যাতে সুইমিং টা করতে পারি।’
‘ওকে ম্যাডাম’
নিশাত পাশ ফিরে চোখ ছোট করে দুষ্টুমিভরা হাসি দেয়।
রওনা হ্য় ওরা কারওয়ান বাজার থেকে। ফিদার খুশী লাগছে, সুখী মনে হচ্ছে আরও কত কি হচ্ছে ভেতরে ভেতরে! কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ব্যপারটা যেন খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে! যেন এটা হবারই ছিল।
পূর্বাচলে এলে নিশাত বলে –
‘চলেন আজ বহুদূর যাই। এখানে ঢোকার দরকার নেই।’
‘যে দিকে দু চোখ যায়?’
‘হুম।’
সেই সিলেটের পথ ধরলো গাওসিয়া মোড় পার হয়ে। নিশাতকে খুব প্রফুল্ল মনে হচ্ছে। ফিদা তো বসেই আছে আহলাদে আটখানা হওয়ার জন্য। কিন্তু মুখের ভাবে বোঝা যাচ্ছে না। ওরা পছন্দের গান বাজায় সেল ফোন থেকে ব্লুট্রুথের মাধ্যমে। ইউটিউব থেকে। ফিদা যেহেতু গাড়ি চালায়, তাই নিশাতই গান বেছে নেয় কখনো নিজের ইচ্ছায়, কখনো ফিদার ইচ্ছায়। ফিদা বলে জয় সরকারের – ‘খবব্র দিও হঠাৎ কান্না পেলে’ গানটা দিতে। গানটা নিশাতই শুনিয়েছিল ফিদাকে। তারপর থেকে এটা যেন ‘থিম সং’ হয়ে যায় ফিদার জন্য নিশাতের সাথে সম্পর্কের। অনেক বার বাজানো হয় ওরা একসাথে থাকলে। অথবা ফিদা যখন একা থেকে তখনও। আজ অন্যরকম ভাবে শুনতে চাচ্ছে যেন। এতদিন এই গানের কথার সাথে নিশাতকে না পাওয়ার বেদনাকে অনুভব করতো, পরাজিতের। কিন্তু এখন শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে বিজিত হিসেবে। তবে অপেক্ষা করে এই চরণটির সময় নিশাত বেসুরো গলায় গেয়ে ওঠে। এমন বেসুরো গলায় অন্য কেউ গেলে ফিদা হাসি চাপতে পারতো না। কিন্তু ফিদা ওটাই শোনার জন্য অপেক্ষা করে। যাকে ভাল লাগে তার সবই ভাল লাগে। ভালবাসা এমনই অন্ধ। নিশাত হঠাৎ বলে – ‘একদিন এই গান গুলো আমাদের কান্নার কারন হবে!’
‘কেন?’
‘যখন সম্পর্ক থাকবেনা তখন এই গান গুলো শুনতে খুউব কষ্ট হবে।’
‘শুরু হতে না হতেই শেষের কথা আসছে কেন?’
‘কারন জানি তো এরকম সম্পর্ক বেশীদিন টিকে না।’
‘আপনি খুব পেসিমিস্ট’
‘অনেক তো দেখলাম, সম্পর্ক গড়তে সময় লাগে, কিন্তু ভেংগে যেতে এক মূহুর্ত যথেষ্ঠ!’
‘নেগেটিভ কথা শুনতে চাই না।’
নিশাত কিছু বলে না। দুজনেই চুপচাপ কিছু সময়। নিশাত নীরাবতা ভাঙ্গে। বলে –
‘জানেন আগে আপনার সাথে থাকলে বনিকে মনে পড়তো। আর চলে গেলে আপনাকে, কিন্তু কিছুদিন থেকে আর এমনটা হয় না। আপনি আপনি হয়েই থাকেন এখন।’
‘জেনে প্রীত হলাম। কারো প্রক্সি দিতে নিশ্চয়ই ভাল লাগে না!’
ফিদা নিশাতের প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। কিন্তু নিশাত বাঁদিকে জানালায় তাঁকিয়ে।
‘বাইরে কি দেখেন?’
‘কিছু না’
‘প্রায়ই দেখি আপনি অন্য দিকে মাথা ঘুরিয়ে রাখেন! আমি কি দেখতে এতই খারাপ?’
‘আপনি তো দেখতে ভাল।’
‘তাই নাকি! কেউ কখনো বলে নি তো!’
‘কেন ভাবী বলে নি।’
‘নাহ। এতে আমার কোন দুঃখ নেই।’
বলে হাসে ফিদা। নিশাত বলে –
‘আমার কাছে তো আপনাকে ভালই লাগে দেখতে! কিন্তু আপনি আমার মাঝে কি পেলেন? আমি তো একদম সুন্দর না। কালো। একদম ফেমিনিন না। যেমন ছেলেরা পছন্দ করে!’
বলে ফিদার দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে ধরে।
‘কে বলেছে আপনি ফেমিনিন না। আপনি যতই ছেলেদের মত চলেন, ড্রেস আপ করেন, আপনি আসলে আগা গোড়া একটা মেয়ে।’
‘তাই!’
‘আপনি সাহসি হতে পারেন কিন্তু আপনার নারীত্ব খুবই সুন্দরভাবে লুকায়িত থাকে। আপনি হয়তো জানেনই না।’
নিশাত ফিদার দিকে তাঁকিয়েই থাকে। কিছু বলে না। ফিদা আবার বলে –
‘কে বলেছে আপনি সুন্দর না। আপনাকে নিয়ে যেখানেই যাই, সবাই তাঁকিয়ে থাকে।’
‘সেটা আমার বয় কাট চুল আর ড্রেস আপের জন্য।’
‘শুধু এজন্য না। আর আপনার চোখ গুলো আমাকে প্রচন্ড আকর্ষণ করে।’
ফিদার চোখে চোখ রেখে নিশাত জানতে চায় – ‘আমার চোখে আবার কি আছে!’
‘যাদু আছে! আপনার এই দু চোখেই তো আমি ধরা খেলাম!’
আবারো সেই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে ধরে ফিদার চোখে। ফিদাও নিশাতের চোখে চোখ স্থির করে থাকে। নিশাত যেন ফিদার কথার সত্যতা উদ্ধার করতে চায়।
হাইওয়েতে দ্রুত গাড়ি চলছে। জোড়ে হর্নের শব্দে ফিদা সামনে তাঁকায়। স্টিয়ারিং আয়ত্তে নেয়। তারপর বলে –
‘আপনার এই দু চোখে আমার মরণ লেখা আছে।’
‘কেনো?’
‘এই মাত্র মরতে যাচ্ছিলাম আপনি সহ।’
‘ওহ!’
বলে সজোড়ে হেসে ওঠে নিশাত। ফিদা আড় চোখে দেখে। ভাল লাগে। নিশাত বলে – ‘আপনার উপর আমার আস্থা আছে। যেভাবেই হোক স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করে ফেলবেন।’
‘সেরকম যদি আমার ভালবাসার উপর থাকতো!’
‘কেন ভালবাসেন আমাকে?’
‘রে বাবা আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে? ইন্টারভিউ নিবেন নাকি?’
‘হ্যা দিতে হবে তো!’
‘আর কিচ্ছু দিব না, শুধু নিব।’
‘কি?’
প্রায় আঁতকে উঠে বলে নিশাত।
‘ভালবাসা’
‘ওহ!’
নিশাত হেসে ফেলে। প্রসংগ পালটে বলে –
‘বনি না আমাকে নিয়ে যেখানে যেত সবাইকে জিজ্ঞেস করতো – আই আমার বউ সুন্দর না? সবাই হাসতো আর বলতো – হ্যা তোমার বউ তো অনেক সুন্দর ...আমরা যেখানে যেতাম সেখানেই সবাই তাঁকিয়ে থাকতো আমাদের দিকে!’
‘বুঝলাম। আসলেই তো আপনারা দুজনেই খুব সুন্দর আর মানানসই ও বটে! আর এও বুঝি আপনি বনিকে খুউব ভালবাসেন।’
‘বনিও বাসে। আমাকে ছাড়া কাউকে ও কোনদিন চিন্তাও করতে পারবে না।’
‘নীতা ও তাই। আমিও নীতাকে এখনো অনেক ভালবাসি।’
‘আমরা আসলে এক জন আরেক জনের উইনডো হতে পারি!’
‘তাইতো! দেখেছেন আমরা যতক্ষণ একসাথে থাকি, সেটা এক ঘন্টা হোক আর সারাদিন হোক, কখনো আমারা চুপ থাকিনা। আমাদের কথা যেন শেষ হয় না!’
‘সে জন্যই তো আপনাকে ফেরাতে পারলাম না। আসলে আমাদের দুজনের ভালবাসা জমা ছিল অনেক। দুজনেই ভালবাসার কাঙ্গাল ছিলাম।’

ফিদা ভাবে নিশাতের একটা খারাপ সময় যাছে বনির সাথে। দেখা হচ্ছে না, কথা হচ্ছে না। ও নিজেই বলেছে। ওর একটা শুণ্যস্থান তৈরী হয়েছিল। ঠিক তখনই ফিদার সাথে ওর ঘনিষ্ঠতা হয়। তাই ফিদাকে ফেরাতে পারে না নিশাত। কিন্তু ফিদার তো কোন শুন্যস্থান ছিল না। ওর তো ভালবাসার মানুষ পুরোই ছিল ওর জন্য? তাহলে ফিদা কেন কাঙ্গাল ছিল ভালাবাসার? উত্তরটা ওকে মোরশেদ দিয়েছিল। মোরশেদ বলেছিল –
‘ভাবীকে তুই ঠিকই ভালবাসিস। কিন্তু সেটা একটা অন্যরকম মায়ার বন্ধন। সেখানে রোমান্স টা চলে গেছে। তুই বিরাট রোমান্স নিয়ে নিজের অজান্তেই দিন গুনছিলি। শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যিই।’
ফিদার শুনতে ভাল লাগেনি। কিন্তু পুরো অবিশ্বাসও করতে পারেনি। নিশাতের কথার উত্তরে বলে -
‘হয়তো তাই!’
তারপর জানতে চায় -
‘চা খাবেন? সামনে চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে।’
‘হ্য ভাল হয় যদি মালাই চা পাওয়া যায়।’
ফিদা গাড়ি পার্ক করে। নিশাতকে গাড়িতে বসিয়েই এদিক ওদিক ঘুরে খোঁজ নেয় কোথায় খাঁটি গরুর দুধের চা পাওয়া যায়। রাস্তার উল্টোদিকের দোকানে পাওয়া যায় জানে। দুজনে মিলে যায় সেখানে। মালাই চা খায়। হাইওয়ের পাশে শেষ বিকেলে অন্যরকম লাগে সময়টাকে। রাস্তায় তেমন ট্রাফিক নেই। মাঝে মাঝে বাস বা ট্রাক শো করে উড়ে যায় যেন ওদের পাশ দিয়ে এক পশলা বাতাসের ধাক্কা দিয়ে। নিশাত বসে আছে চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চে। ফিদা দাঁড়িয়ে। এক হাতে চায়ের কাপ। আরেক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। শেষ বিকেলের কমলা রোদের আলোয় নিশাতের কৃষ্ণ অবয়বটা কেমন রহস্যময়ী লাস্যময়ী হয়ে ধরা দিল ফিদার চোখে। মনে হলো এই সময়টা আটকে গেল ওর মনের চিলে কোঠায়।
ফেরার পথে সন্ধ্যা হয়ে গেল তিনশ ফিটে গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে। ফিদার হাতটা রাখা ছিল দুই সিটের মাঝে। হঠাৎ নিশাত ওর হাতটা আস্তে করে স্পর্শ করলো। তারপর আংগুলের ফাঁকে আঙ্গুল ঢুকিয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিল ফিদার বাঁ হাত। ফিদা চমকে তাঁকালো নিশাতের দিকে। কিন্তু নিশাতের মুখ ওর পাশের জানালার দিকে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে রেখে নিজেই হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ফিদা কিছুটা আদ্র স্বরে জানতে চাইলো – ‘সরিয়ে নিলেন যে?’
নিশাত কিছু বললো না। আগের মতই জানালার দিকে তাঁকিয়ে থাকলো। একটু পর বললো – ‘আমি যখন প্রথম বনির হাত ধরেছিলাম তখন ওর হাতটা কেঁপে উঠেছিল’
ফিদা একটু ঘাবড়ে গেল। ভাবলো এটা কোন পরীক্ষা ছিল না তো। ফিদার হাত কাঁপেনি নিশ্চুয়ই। ফিদাকি এই পরীক্ষায় ফেল করে গেল? কিন্তু নিশাত বললো –
‘আশ্চর্য! আপনার হাতটাও একই ভাবে কেঁপেছিল!’
ফিদা হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তবে সত্যি কথাই বললো – ‘আমি অবশ্য বুঝিনি। ইমোশনাল হয়েছি মনের মধ্যে বিশাল নাড়াচাড়া হয়েছে সেটা বুঝেছি।’
‘আমি টের পেয়েছি।’
কিছুক্ষণ পর ফিদা বলে – ‘আমরা পরস্পরকে তুমি বলে বলতে পারি না?’
‘না বলাই ভাল, অন্যদের চোখে পড়বে।’
‘আড়ালে বলবো, যখন শুধু আমরা দুজন আছি!’
‘কিন্তু ভুল করে অন্যের সামনেও আমরা বলে ফেলতে পারি।’
‘ওহ!’
ফিদা আর কিছু বলার খুঁজে পায় না।

পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় ফিদাদের এক উচ্চপদস্থ বন্ধুর বাসায় দাওয়াত ছিল বিকেলে। গাজীপুর অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরিতে। কথা ছিল পাঁচটার মধ্যে কিশোরের বাসায় ফিদা যাবে। নওশাদও কিশোরের উত্তরার বাসায় আসবে। তারপর একসাথে তিনজন কিশোরের গাড়িতে রওনা হবে। ফিদা যখন রওনা দিচ্ছে ঠিক তখন নিশাতের টেক্সট আসে – ‘কই?’
ফিদা বলে যে যাচ্ছে কিশোরের বাসায়। নিশাত বলে –
‘আমার সাথে আধা ঘন্টা সময় দিয়ে যান।’
‘একদম সম্ভব না যে! আমি অলরেডী লেইট! আমরা এক সঙ্গে তিন জন যাচ্ছি।’
‘আধা ঘন্টা পরে গেলে এমন কোন ক্ষতি হবে না!’
‘আমি আমার জন্য অন্যদের বসিয়ে রাখতে পারি না। আর যেখানে যাচ্ছি সেখানে সময় একটা বিরাট ফ্যাক্টর!’
‘তবুও আসেন। বেশী সময় নিব না।’
‘সত্যিই খুব ঝামেলা হবে। আরেকটু আগে বলতে?’
‘আমার যে এখনই মনে হলো আপনাকে দেখবো। আমার জন্য এতটুকু করতে পারবেন না! বন্ধুরা আপনার কাছে বড় হলো?’
ফিদা প্রচন্ড ধাঁধায় পড়লো। দেরী হলে বন্ধুদের গালি গজম করতে হবে। নিজের বিবেকের কাছেও খারাপ লাগবে কথা দিয়ে কথা না রাখতে পারলে। এদিকে আবার নিশাতের ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল। কি করবে? নিশাতের জেদের কাছে হেরে যায় প্রতিবারের মত। জিজ্ঞেস করে –
‘কোথায় আসতে হবে?’
‘জমজম টাওয়ারের কাছে আসেন। আপনাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব, কাছেই। ভয় নেই। বেশী সময় নিব না।’
‘আচ্ছা আসচি।’
নিশাত ওকে আশুলিয়ার রাস্তায় নিয়ে যায়। যেখানে সারিসারি কাশফুলে ভরা। খুবই মনোরম পরিবেশ। শত শত যুবক যুবতির জোড়ার ভীড়।
‘কি কেমন লাগছে?’
ফিদা বলতে চাচ্ছিল খুব টেনশন হচ্ছে। অন্য সময় হলে অবশ্যই খুব ভাল লাগতো শত শত জোড়ার মাঝে হারিয়ে যেতে। কিন্তু মুখে বললো – ‘ভাল।’
‘শুধু ভাল?’
‘অনেক রোমান্টিক!’
নিশাতের মুখে বিজয়ীর হাসি। বলে –
‘যান! আপনাকে ছুট্টি দিলাম। ধন্যবাদ আসার জন্য।’

নিশাতকে জমজম টাওয়ারের ওখানে নামিয়ে দিয়ে ফিদা ছোটে কিশোরের বাসায়। কিশোরের ফোন। কিশোর একবার ফোন করেছিল আগে। ধরেনি ফিদা, কি বলবে ভেবে। পোনে ছটা বেজে গিয়েছে। এবার ধরতেই হবে।
‘সরি দোস্ত, আসছি। অনেক দেরী করে ফেললাম!’
‘তুই না বললি বাসা থেকে রওনা হয়ে গিয়েছিস? তো এতক্ষণ লাগছে কেন?’
বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেই কিশোরকে ফোন করে জানিয়েছিল যে ও রওনা হচ্ছে। ফিদা বলে –
‘দোস্ত একটা ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম। এসে বলছি আর পনের মিনিট।’
‘আচ্ছা আয়। এদিকে নওশাদ তো অনেক আগে চলে আসচে, তোর জন্য বিশেষ উপহার নিয়ে অপেক্ষা করছে।’
বেশ বুঝতে পারে মিষ্টভাষী নওশাদ কি উপহার দিতে পারে। একরাশ অশ্রাব্য গালি। ফিদা কিশোরের চার নাম্বার সেক্টরের বাসায় যেয়ে ফোন দেয়। ভাবছিল ওরা নীচে আসবে। কিশোর বলে –
‘উপরে আয়। তোর এত দেরী দেখে আমরা চা খাচ্ছি।’
‘তথাস্তু!’
উপরে যেয়েই নওশাদের আক্রমেনের স্বীকার হয়।
‘নে তোর উপহার’
বলে পশ্চাৎদেশে একটা প্রতীকি লাথি! আবার বলে –
‘তুমি এত আগে বাইর হইলা মাঝ খানে কই গেসিলা সেটা কও এখন? নিশ্চয়ই ঐ ছেমড়ির লগে দেখা করতে গেসিলা?’
ফিদা মাথা নীচু করে কৃত্রিম অপরাধী সেজে বলে – ‘কথা সত্য!’
নওশাদের গালী আর থামে না। শেষে বলে –
‘দাঁড়া গজীপুর যাই আগে। তারপর তোর কোর্ট মার্শাল হবে!’

ওরা নিজের গাড়ি রেখে কিশোরের পাজেরো তে চড়ে রওনা হয় গাজীপুরের উদ্দেশ্যে। ওখানে ওদের বন্ধু বৃগেডিয়ার শাহজাহানের বাসায় যাচ্ছে। শাহজাহান খুবই রসিক মানুষ। জমজমাট আড্ডার মাঝে নওশাদ ফিদার বিচার সভা ডাকে। ফিদা আর নিশাতের সমাচার তুলে ধরে জুড়ি বোর্ডের সামনে, ও যতটুকু জানে। রসিক শাহজানের প্রশ্নে টাসকি খেয়ে যায় নওশাদ। শাহিজাহান বলে –
‘যা হলো না হলো এতে নওশাদ এত ক্ষেপলি ক্যান?
সবাই হেসে ফেলে। ফিদাও এই সুযোগে হাসতে হাসতে টিপ্পনি কাটে নওশাদকে –
‘আসলে দুজনে একসাথেই শুরু করেছিলাম। মাঝখানে আমার সাথে হয়ে গেল বলে ওর এত রাগ!’
সবাই আবারো হাসে। ফিদার চাপা মারায় নওশাদ কিছু বলতে পারে নে। শাহজাহান জানতে চায় – ‘কি নওশাদ, কথা কি সত্য?’
নওশাদ ওর স্বভাব সুলভ গুমগুম গলায় শুধু বলে – ‘হা-লা-আ’

প্রসংগ পালটে যায়। চলতে থাকে জমজমাট আড্ডা। ওরা সবাই ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পড়াশুনা করেছে। তাই বান্দ্রামিতে কেউ কারো থেকে কম না।

শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ফিদার মাঝে মাঝে অফিসে কাজ থাকে। সাংবাদিক হওয়ায় নিশাতেরওতাই। অফিস থেকে নিশাতকে ফোন করে ফিদা -
‘কোথায়? অফিসে?’
‘না বাসায়।’
‘গুড। তাহলে বিকেলে মিট করা যাবে?’
‘না-আ। আমাকে একটা কাজে বেরুতে হবে।’
‘কি কাজ?’
‘আছে একটা কাজ। রাত হবে ফিরতে ফিরতে।’
‘কি কাজ সেটা বলা যাবে না?’
‘কৈফিয়ত চাচ্ছেন?’
‘কি আশ্চর্য! কৈফিয়ত কেন চাব? বয়ফ্রেন্ড হিসেবে জানতে চাইতে পারিনা?’
‘আপনি আমার বয়ফ্রেন্ড হলেন কবে?’
ফিদা খুউব অবাক হয়ে প্রশ্ন করে –
‘কাল যে বললে আমারা ডেট করলাম!’
‘ডেট করলেই বয়ফ্রেন্ড হয়ে যায় নাকি!’
‘হয় না?’
‘না।’
‘আসলে তুমি অনেক ফাস্ট। হয়তো অনেক ছেলের সাথে ডেট করো। এটা তোমার ছেলেখেলা। আমি বোকা মনে করে বসে আছি যে আমরা রিলেশনশীপ ডেভেলাপ করেছি।’
‘আমাকে যদি এমনই মনে করেন তাহলে আমার সাথে মিশেন কেন? আমি কি বলেছি আমার পিছনে লাগতে?’
‘এমন মনে করতাম না। এখন তুমিই তো বললে ডেট করলেই রিলেশন হয় না?’
‘আমি কি বলেছি আমি অনেকের সাথে ডেট করি?’
‘বলনি। তবে তোমার সব আচরনে আমার মনে হয়েছিল আমাদের পারমানেন্ট একটা রিলেশন গড়েউঠেছে। যেটা আমি চেয়েছিলাম। তুমি যখন বলেছ শত অসুবিধা সত্ত্বেও দৌড়ে এসেছি। আজ তোমাকে আসতে বললাম। আসছো তো নাই। এদিকে কি করবে তাও বলছো না।’
‘আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।’
‘ঠিক আছে দিও না। আমিও চাচ্ছি না। তোমার যেখানে খুশী যাও। তোমার পিছে আর বান্দর নাচ নাচবো না।’
‘আমি কোথায় নাচালাম আমাকে।’
‘নাচিয়েছ। এত কথা বলার আর ইচ্ছে নেই। আগেও বলেছি, শেষ বারের মত বলছি। তুমি যদি আমার গার্ল ফ্রেন্ড না হতে পার, আমি তোমার সাথে কোন রকম সম্পর্ক চাই না।’
‘হতে চাই না।’
‘খুব ভাল। আগেও বলে পরে আবার যোগাযোগ করেছ। এইবার যদি একটা টেক্সট কর বা ফোন কর বা দেখা কর আমি ধরে নেব তুমি গার্ল ফ্রেন্ড হিসেবে করছো, পারমানেন্ট। একটা দুইটা ডেট না। সুতরাং বাই। আর আমাকে যোগাযোগ করো না। আই এম সিরিয়াস। একই খেলা অনেকবার খেলেছ।’
বলে লাইন কেটে দেয়। পুরো মাথাটা যেন ফুটন্ত কড়াই হয়ে যায়। অস্থিরতায় বাকী সময় পার করে অফিসে। নিশাত কোন ফোন বা টেক্সট করে না। নিশাতের এই দুমুখো আচরনে পুরো বিভ্রান্ত হয়ে যায়। মেয়েটা আসলে কি? আজকে একরকম কালকে একদম উলটো রকম। অফিস পার করে সুইমিং করে। নিশাতও আসে একসময়। ফিদা নিশাতের দিকে তাঁকায়ই না। পরে উপরে চলে যায়। অনেক বেশী ড্রিংক করে। ছোটখাট গন্ডগোলও করে ফেলে। অন্যরা এসে থামায়। বাড়ি চলে আসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু মনে করতে পারে না রাতে কি হয়েছিল বারে। কোন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বাসায় এসেছে। নীতার কাছে জানতে পারে যে ও এসে ভাত না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
অফিসে যাওয়ার পথে ফিদা সেলফোন থেকে ইউটিউবে গান বাজাচ্ছিল ব্লু ট্রুথের মাধ্যমে। ইউটিউব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা গান ভেসে এলো জেকব লির যেটা আগে কখনও শুনেন নি। ‘আই বিলং টু ইউ’। মাঝখানে একবার আসে ‘এন্ড আই উইল হুইস্পার টু মাই ওয়াইফ আই বিলং টু ইউ’। গানটার সুর এত মর্মস্পর্শী ছিল যে প্রথম বারেই ওর মনকে স্পর্শ করে ফেলে। আবার বাজায়। এটাই ওর স্বভাব। যেই গান বেশী ভাল লাগে সেটা বারবার শোনা। এবং হঠাৎ করে এই গানটা শুনে নীতা চলে আসে ওর মনের পর্দায়। যে নীতার রোমান্টিক উপস্থিতি কিছু দিন অনুপস্থিত ছিল। ইচ্ছে করে গানের লিংকটা নীতাকে পাঠায়। কিন্তু গানের কথা মানে প্রতিটি শব্দ বা বাক্যের মানে বুঝতে পারলেও সব মিলিয়ে কি বলছে তা বুঝতে পারে না। শেষে হীতে বিপরীত হয় সেই ভেবে আর পাঠায় না। কিন্তু বাকি পথ এই গানটাই বাজাতে থাকে। প্রেমিকা নীতা ফিরে আসে ওর হৃদয়ে। খুউব শান্তি পায় নিশাতকে মন থেকে সরিয়ে দিতে পেরে।
সারা দিন অফিস করে। নিশাতের থেকে কোন টেক্সট বা ফোন কল আসে না। ফিদাও নিজেকে মোটামুটি শক্ত করে। আর যাই হোক কাউকে জোড় করে ভালবাসতে চায় না। শুরুতেই সমাপ্তি ঘটলে শান্তি। কষ্টটা সহনীয় হবে।
বিকেলে ক্লাবে যেয়ে সুইমিং করে। নিশাতকে দেখে না। সুইমিং শেষ করে উপরে বারে বসে। গোটা দুয়েক বিয়ার শেষ করেছে কেবল এমন সময় ফোন আসে। কলারের নাম দেখে একতু অবাকই হয়, রাইসা। হঠাৎ এমন সময় রাইসা ওকে কেন ফোন করতে পারে একটু সন্দেহ হলেও ব্যপারটাকে কাকতলীয় ধরে নেয়। ফোন ধরে।
‘হ্যালো, সালাম, কেমন আছেন?’
‘হ্যা ভাল আছি। আপনি কেমন আছেন?’
‘ভালই।‘
‘কোথায়, ক্লাবে?’
‘হ্যা, বারে।’
‘সেদিন গেলাম, আর তো কথা হয়নি, আমার সাথে আপনার পরিচিত একজন আছে, বাসায় ইলিশ পোলাও রাঁধবো, আপনাকে দাওয়াত দিলাম।’
‘অনেক ধন্যবাদ, আমাকে মনে করার জন্য, কিন্তু সমস্যা কি আমি ইলিশ পোলাও একদমই পছন্দ করি না।’
‘এত মজার জিনিষ, পছন্দ করেন না! মাছের রাজা ইলিশ!’
‘ইলিশ পছন্দ করি কিন্তু ইলিশ পোলাও না।’
‘তাহলে আর কি করা, নেন কথা বলেন আপনার পরিচিত একজনের সাথে।’
একবার নিশাত হতে পারে মনে হলেও ঠিক বিশ্বাস হয় না। অপেক্ষা করে। শুনে নিশাতই বলছে –
‘হ্যালো, আসসালামু অলাইকুম’
ফিদা একটু বিরক্ত হয়।
‘অলাইকুম সালাম, আপনাকে না বলেছিলাম আর কোন যোগাযোগ না করতে?’
‘আমি ইচ্ছে করে করিনি। রাইসা আপা তো কিছু জানে না তাই। দুঃখিত। আমার কিছু করার ছিল না।’
‘আপনি ইলিশ পোলাও খেতে আসবেন না?’
‘নাহ। আচ্ছা রাখি তাহলে।’
বলে ফোন রেখে দেয় ফিদা। খুব বেশী রাগ করতে পারে না। ওর কন্ঠস্বর শুনতে যে ইচ্ছে করে না, তা তো না। তবু রাগ হয় এই ভেবে যখন নিজেকে শক্ত করে সরে আসে ওর থেকে। তখনই নিশাত আবার ফিরে আসে। আসতে না আসতেই আবার গন্ডগোল পাকায়।
বিয়ারে মন দেয়। আজ ও একাই টেবিলে। কারো সাথে বসতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। আরো একটা বিয়ার শেষ করে। হয়তো আধা ঘন্টা পার হয়েছে। আবার ফোন বাজে। কলারের নাম দেখে রীতিমত চমকে যায়। নিশাত কল করেছে। ফোন ধরে স্নায়বিক চাপ সামলাতে গিয়ে একটু ভাংগা গলায় বলে – ‘হ্যালো।’
‘আসসালামু অলাইকুম’
ভাল অভ্যাস। এটা প্রতিবারই ফোন করে বা ধরে নিশাত শুদ্ধ ভাবে উচ্চারণ করে। সালামের উত্তর দেয় ফিদা। অপেক্ষা করে ও কি বলে নিজে থেকে। নিশাতও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ। তারপর আস্তে আস্তে বলে –
‘তখন তো রাইসা আপার বাসায় ছিলাম। তাই কথা বলতে পারিনি ঠিকভাবে। এখন আমি উত্তরার পথে আসছি। ঐ কফি শপে আসবেন?’
‘কেন?’
‘আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।’
‘আমি কিন্তু শর্ত দিয়েছিলাম। আমি কি মনে করবো আপনি আমার শর্তে রাজী?’
‘আসুন না সামনা সামনি কথা বলি?’
‘না একই চক্রে আমি বারবার ঘুরতে রাজী না।’
‘আমি রাজী ...... কিন্তু নো ফিজিকাল রিলেশন!’
শেষ বাক্যটা খুব দ্রুত বললো নিশাত। ফিদা কিছুক্ষণ থমকে থাকে। ফিদা ধরেই নিয়েছিল ও রাজী হবে না। নিজেকে সেই ভাবেই দৃঢ় করে ফেলেছিল। নিশাত তো ওর কংক্রিটের পোক্ত দেওয়ালকে বালির বাঁধ বানিয়ে গুড়িয়ে দিল! তবে হাসিও পেল ওর শেষ কথায়। মাথাটা তো বটেই শরীরটাও যেন অনেক হাল্কা বোধ করে। মনে হয় যেন কোন স্পেইস ক্রাফটে আছে মধ্যাকর্ষণ শক্তির বাইরে। হেসে বলে -
‘তাহলে কোন ছেলের বয় ফ্রেন্ড হই। ছেলেদের সাথে তো সব শেয়ার করা যায়। সেক্সটা মূখ্য না হলেও আমি কোন প্ল্যাটনিক প্রেমের মধ্যে নাই।’
‘আপমি কি আসবেন?’
‘আচ্ছা আসচি। কোথায়?’
একটা কফি শপের নাম বলে নিশাত, উত্তরায়। ফিদা যেয়ে পৌছে দেখে নিশাত ওখানে বসে আছে। দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হয়। ফিদার মুখে স্মিত হাসি। নিশাতের মুখেও তাই কিন্তু চোখে অনুসন্ধানী দৃষ্টি। ফিদা বলে –
‘অবশেষে রাজী হলে ... আমি কিন্তু তুমি করেই বলবো’
‘কিন্তু অন্যদের সামনে না।’
‘আচ্ছা।’
‘কি মনে করে রাজী হলে।’
‘আপনাকে ছাড়া থাকতে পারছি না এটা বুঝে।’
‘দুদিন পর আবার মনে হবে না তো যে এমনি কদিনের বন্ধুত্ব?’
‘এর ভবিষ্যৎ কি? আর মানুষকেই বা কি বলে পরিচয় দিব?’
‘ভবিষৎ অন্ধকার!’
ফিদার কথায় নিশাত অবাক হয়ে তাঁকায়। ফিদা হেসে ফেলে। বলে –
‘মানুষের কাছে জাস্ট ফ্রেন্ড, আদতে নিঃস্বার্থ ভালবাসা। আমরা কোনদিন বিয়ে করবো না বা করতে পারবো না। আমি নীতাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। তুমিও বনিকে ভালবাস। বনির সাথে যদি বনিবনা না হয়, ইউ আর ফ্রী তো চুজ আ নিউ হাজবেন্ড। যেহেতু আমি তোমাকে কোনদিনই বিয়ে করতে পারবো না।’
‘বনির সাথে ঠিক হয়ে গেলে?’
‘যেমন চলছে তেমন চলবে। আমার সাথে তো নীতার কোন অসুবিধা নেই। তারপরও আমি তোমার ডাকে যখন তখন সাড়া দিচ্ছি না?’
‘ছেলেদের যা সম্ভব, মেয়েদের তা সম্ভব না। আর বনি আমার মোবাইল চেক করে।’
‘চেক তো নীতাও করে আমারটা। আমি মুছে ফেলি।’
‘তবুও আমি বনিকে চিট করতে পারবো না।’
‘তুমি কি সত্যিই ভালবাসচো আমাকে?’
‘হ্যা।’
‘আজীবন ভালবাসবে?’
‘হ্যা।’
‘তাহলেই হলো। যদি এতটুকু জানি তুমি আমারই আছ আর যখন সুযোগ পাবে তখনই আমার সাথে যোগাযোগ করবে, সেটা সাতদিনে হোক আর দুই তিন মাস পর হোক। আমি শুধু নিঃস্বার্থ। নিঃশর্ত ভালবাসা চাই। আর কিছু না।’
‘আমিও না। আপনাকে আমি ভুলতে পারবো না কখনো।’
‘আমি একবারই প্রেমে পড়েছিলাম। ভাবিনি কখনও আবার প্রেমে পড়তে পারি। কিন্তু আমার অজান্তে আমি গভীর প্রেমে পড়েছি। তুমি হ্যা না যাই বলতে আমি তোমাকে সারাজীবন মনের গহীনে পুষে রাখতাম।’
‘আমিও তাই।’
‘আমি ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারবে?’
‘না। কিন্তু বনির সাথে যদি ডিভোর্স হয়ে যায়?’
‘আমি তো বলেছি, আমি তোমাকে যতই ভালবাসি তবুও কখনো বিয়ে করতে পারবো না। তাই ইউ আর এট ইয়োর লিবার্টি টু চুজ ইউর নিউ হাজবেন্ড।’
‘ওকে।’
‘তাই বলে কাল থেকেই আরেকজন বয় ফ্রেন্ড খোঁজা শুরু করবে তা নয় কিন্তু। সেটা বনির সাথে ডিভোর্স হলেই কেবল। আর বনি সাথে সেটলমেন্ট হতে অনেক দেরী আছে। তাই এখন আমি তোমাকে পূর্ণ ভাবে চাই!’
‘বাট নো সেক্স!’
‘আমি সেক্সের কথা বলিইনি। কিন্তু তুমি যখন বলেই দিলে তখন বলছি গার্ল ফ্রেন্ডের সাথে সেক্স হবে না এমন প্ল্যাটনিক রিলেসনশিপে আমি নেই।’
‘প্ল্যাটনিক কি?’
‘জান না? গুগলে সার্চ দিয়ে বের করে নিও। জাস্ট বলছি একটা কাল্পনিক কিছু যার বাস্তবে অস্তিত্ব নাই।’
‘আপনাকেও আমার দরকার ছিল। প্রতি দিন প্রতি মূহুর্তে আপনি আমার সাথে এমন ভাবে মিশে গেছেন! ভেবে দেখলাম একদিন না দেখলে বা কথা না বললে আমিও অস্থির হয়ে যাচ্ছি। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম। খারাপ কাজ করলাম। আমি নিরুপায়।’
‘আমিও জানি খুব খারাপ। কিন্তু আমি কোনভাবে নিজেকে সামলাতে পারিনি। তাই বলেছি।’
‘কি দেখলেন আমার মধ্যে?’
বলে আবারো সেই অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে ধরে ফিদার চোখে। ফিদাও নিশাতের চোখে চোখ রেখে মেলে ধরে ওর পুরো হৃদয়। বলে –
‘তোমার সব কিছুই আমার ভাল লাগে, সব। কিন্তু চোখ দুটো আমাকে প্রচন্ড আকর্ষণ করে!’
‘আমার চোখে কি আছে?’
‘ভালবাসা, আমার জন্য। আসলেই তোমার চোখ দুটো খুব সুন্দর!’
‘জানি না। বিশ্বাস হয় না।’
‘কি আমাকে?’
‘না চোখের কথা। আমি কিন্তু কখনই মেক আপ করি না। সাজগোজ করি না। শাড়ি তো পড়তেই পারি না। খুব বেশী হলে, পার্টি টার্টি থাকলে লিপিস্টিক দেই।’
‘লিপিস্টিক’ শব্দটা কানে বাজে ফিদার। মনে মনে ভাবে এটাই ভালবাসা। কিছু করার নেই ওর। মুখে বলে –
‘যার অরিজিনাল রূপ আছে তার মেকাপের দরকার পড়ে না।’
‘আপনার চোখ নষ্ট!’
‘নষ্ট হলে তোমার জন্য নষ্ট। সবচেয়ে ভাল লাগে কখন জান?’
‘কখন?’
‘যখন তুমি সুইম সুটে থাক। তোমার সারা শরীর ঢাকা। এমন কি চুলও! হ্যা তোমার ফিগার খুব ভাল, সেক্সিও ...’
নিশাত ফিদার হাতে ছোট্ট একটা চাপড় মারে। মুখে দুষ্টু হাসি। ফিদাও ওরা হাতের দিকে তাঁকায়। বলে যায় –
‘কিন্তু জান আমি কখন সুইমিং পুলে তোমার শরীরের দিকে তাঁকাই না। ইভেন তুমি যখন এক্সেরসাইজ কর তখনো না। আমি তোমার মুখটা দেখি। কেমন দেবীর মত লাগে!’
নিশাত খুব অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে থাকে ফিদার দিকে। তারপর বলে –
‘তাই! আপনার চোখে আসলেই শুধু সমস্যা আছে।’
‘হ্যা এই জন্যই চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বললো আমার চোখ নাকি ঠিকই আছে। কিন্তু কোন বিশেষ মানুষকে দেখলে আপনার চোখ খারাপ হয়ে যেতে পারে।’
ফিদা খুব গম্ভীর মুখে নিশাতের দিকে সরল দৃষ্টি জ্ঞাপন করলো। নিশাত খিলখিল করে হেসে দিল। আবার মারলো ফিদার হাত চড়। হাসতে হাসতেই বললো – ‘আর আপনি ঐ বিশেষ মানুষের কথাও ডাক্তারকে বলেছেন?’
‘নাতো! ডাক্তার নিজেই বের করলো!’
আবারো কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে বললো ফিদা।
‘ডাক্তার টা কি আমার বন্ধু?’
‘ডাক্তার ডাক্তারই, বন্ধু হতেও পারে নাও পারে।’
‘নওশাদ ভাই।’
‘হা হা হা ... নওশাদের সাথে আমার এ নিয়ে কোন কথাই হয় নি।’
‘নওশাদ ভাই দেখি ইদানিং আমাকে এভয়েড করে। কেন জানেন কি? আপনি কি আমাদের সম্বন্ধে কিছু বলেছেন ওনাকে?’
‘কিছু তো জানে। দেখছে না প্রতিদিন। ওর কাছ থেকে লুকাবো কিভাবে। হয়তো আমাকে একদিন অস্থির দেখে কারনটা বুঝে তোমার উপর রাগ করেছে। বন্ধুর কষ্ট দেখে। অথবা আমি তোমাকে ছিনিয়ে নিয়েছি এটা দেখে।’
শেষের কথাটা হাসতে হাস্তে বললো ফিদা। নিশাতও হেসে দিল। বললো –
‘আর কিছু বলবেন না। কাউকে না। এসব জিনিষ পরে সমস্যা করে। আপনার আমার দুজনেরই সমস্যা হবে। আর ক্লাব তো আপনার জায়গা। আপনার সমস্যা বেশী। তাই আমরা ক্লাবে নরমাল থাকবো। বাইরে কোথাও বসবো।’
‘তথাস্তু!’

এরপর ওদের হানিমুন পিরিয়ড চলতে থাকে বেশ কদিন। হোয়াটসএপ, ফোনের টেক্সটে, সরাসরি ফোন কলে আর দেখা করাতে চব্বিশ ঘন্টাই যুক্ত থাকে দুজন দুজনের সাথে। সুইমিংপুলেও একসাথে আসার চেষ্টা করে। খুব একটা কথা বলে না ক্লাবে। কিন্তু সুইমিং শেষ করে দুজন আলাদা বের হলেও কোথাও যেয়ে মিট করে। নিশাত আশকোনাতে ওর বাসায় যেয়ে স্কুটি রেখে আসে। ফিদা ওর পিছন পিছন যায়। পথে অনেক স্কুটিকে দেখেই নিশাত মনে করে। কিন্তু চিকন কোমর দেখে নিশাতকে চিনতে পারে। হেলমেট দেখে চেনার উপায় নেই। যেহেতু নিশাতের বয় কাট চুল। নিশাত কিছু দূর যেয়ে রাস্তার পাশে থামে। ফিদার গাড়ি দেখতে পেলেই আবার চালায় স্কুটি। কখনো কফি শপে। কখনো পূর্বাচলের রাজউক এলাকায়। কখনও একেবারে হাইওয়ে ধরে নিরুদ্দেশের উদ্দেশ্য। প্রায়ি গাওসিয়ার মোড়ে এসে যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে চলে যায়। যেন কোথাও ওদের হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। অনেক দূর যাওয়ার পর একে ওকে জিজ্ঞেস করে ফিরে আসে। প্রতিবারই এতে ওরা টিন এজারদের মত শিহরণ অনুভব করে হারিয়ে যেয়ে। গাওসিয়া মোড়ে ফ্লাইওভারের নীচে ঢোকা আর বের হওয়া দুটোই ওদের কাছে গোলক ধঁধার মত লাগে। দুজন দুরকম মত দেয়। যে জিতে সে শিশুর মত উৎফুল্ল হয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। এই পয়েন্টটা ওদের একটা রোমানটিক পয়েন্ট হিসেবে তৈরী হয়ে যায়। তিনশ ফিটে এলেই নিশাত গারি আস্তে চালাতে বলে। আর একই ঠাট্টা করে বলে –
‘কি ট্রেন মিস হয়ে যাচ্ছে?’
ফিদা গানের সুরে বলে – ‘এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বলতো?...বাস্তব বড় কঠিন! আমার বউ নিশ্চয়ই ঘড়ি ধরে বসে আছে! তোমার তো চিন্তা নেই।’
‘হ্যা বাস্তব আসলেই কঠিন। কোন্ দিন যদি আমাদের সম্পর্ক না থাকে তখন এই পথ, ঢাকার অনেক রাস্তা, হাতির ঝিল, উত্তরার সমস্ত কফি শপ আমাদের বড়ই কষ্ট দেবে।’
‘কি মুশকিল! তোমার শুরুতেই কেন এরকম নেগেটিভ চিন্তা!’
‘বলেছি না? সম্পর্ক গড়তে আনেক সময় লাগে কিন্তু ভাঙ্গতে এক মূহুর্তই যথেষ্ট!’
ফিদা অবাক হয়ে তাঁকায় নিশাতের দিকে। বোঝার চেষ্টা করে ওকে। নিশাতের রহস্যময়ী দৃষ্টি থেকে কিছুইউদ্ধার করতে পারে না। বলে –
‘আর কোন নেগেটিভ কথা না। ওরকম হলে আমি মরেই যাব।’
‘মরেতো আমিও যাব।’
‘তাহলে ওসব ব্রেক আপের কথা বাদ দাও, বর্তমানকে উপভোগ করি।’
‘সত্যিই কথা বলতে বনির সাথে যখন খুব খারাপ সময় যাচ্ছিল তখন আমার একটা সাপোর্ট দরকার ছিল। তখন আপনার সাথে পরিচয় হলো। আমিই সুযোগ দিলাম কাছে আসার। যখন আপনি সরাসরি রিলেশনের কথা বললেন তখন আমি আপনাকে লুজ করতে চাই নি। কিন্তু পরে আপনার সাথে এমন কতগুলো রোমান্টিক সময় কাটিয়েছি যা বনির সাথেও হয়নি!’
‘তাই! যাক বাবা বনির ভূত আমার থেকে সরেছে!’
‘অনেক আগেই সরেছে। তাই তো আমি বাধ্য হয়েছি আপনাকে মেনে নিতে।’
একটু থেমে বলে – ‘আর আপনি আমাকে গাড়ির প্রতি একটা প্যাসন তৈরী করেছেন। কবে যে আপনার মত ড্রাইভ করতে পারবো?’
‘ওটা সময় লাগবে। কিন্তু আমি তোমাকে রাস্তায় একা গাড়ি চালানো শিখিয়ে ছাড়বো।’
‘এখনই না।’
‘তা তো অনশ্যই সময় লাগবে।’

হাইওয়েতে ছোটখাট কোন দোকানে থেমে চা পানি খেতো। কখনো কখনো একই দোকানদারকে পেয়ে যেত। দুজনেই বাচ্চাদের মত পুলকিত হত ওদের পেয়ে। দোকানদারাও খুব আন্তরিকতা দেখাতো। পরিচিতের মত। ওদের খুব ভাল লাগতো। সবচেয়ে বেশী দোকানদারদের সাথে খাতির হয়েছিল পূর্বাচলের রাজউকের প্লটের ভিতরের দোকান গুলোতে। কিন্ত অদ্ভুত একটা ব্যাপার সারা এলাকা ঘুরে প্রথমদিনের সেট চা ওয়ালাকে আর খুঁজে পায় নি। ওদের একটা জেদের মত হয়ে গিয়েছিল ওকে খুঁজে বের করার জন্য। বাড়ি ঘর ছাড়া সব রাস্তা, মোড়, দোকান একই রকম লাগতো। শুধু তিন রাস্তার একটা মোড় ছিল। অনেক গুলো মোড় মিলে অনেকটা ছোটখাট বাজারের মত। সেই জায়গা খুঁজে পেতে কষ্ট হত না ওদের। ওখান থেকে তাজা ফরমালিন মুক্ত শাক, সব্জি নিত নিশাত। ওরা মালাই চা খেত। মাঝে মঝে পিঠা, সিংগারা যা কিছু বানাত তাই খেত। এগুলো চলতো ড্রাইভিং লেসনের বিরতিতে। নিশাত গাড়ি চালানোকে মোটামুটি ভালই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলেছে। ফিদা নিশাত যখন ওদের সম্পর্ক নিয়ে নেতিবাচক কথা বলতো তখন ফিদা বলতো –
‘আর কিছু যদি মনে নাও থাকে, ভবিষ্যতে যখন নিজের গাড়ি চালাবে তখন নিশ্চয়ই আমার কথা একটু হলেও মনে আসবে।’
‘আপনার কথা কখনই ভুলবো না।’
‘আর নিজের গাড়ি কেন? এই গাড়িই তো আমি চালাবো।’
‘তাই!’
‘আপনি যখন একটা এস ইউ ভি কিনবেন তখন আমি আপনার গাড়িটা কিনে নিব।’
‘এস ইউ ভি’র দামটা কি তুমি দেবে?
‘আমি কেন, আপনিই দিবেন। আপনি পারবেন কিনতে। এই গাড়িটার প্রতি আমার এক বিশেষ মায়া জন্মে গেছে।’
‘তাই! আমার প্রতি জন্মায় নি?’
‘আপনার প্রতি জন্মেছে বলেই তো! ...... আপনি আমাকে নির্ভয়ে আমার উপর আস্থা
রেখে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন! খুব সহজ করে শিখিয়েছেন। সাহস জুগিয়েছেন। তাই এই গাড়িটা আপনার পর মনে হয় আমার। কি বলেন?’
‘ঠিক!’
দুষ্টোমির হাসি দিয়ে বলে ফিদা। নিশাত বলে –
‘এই গাড়িতে চড়লে মনে হয় নিজের গাড়ি। অন্য কোন গাড়িতে এমন হয় নি। বনির গাড়িতেও না! আপনি ক্লাবে আছেন না নাই আমি গাড়ি দেখেই বুঝে যাই।’
‘এত গাড়ির মধ্যে খুঁজে পাও কিভাবে?’
‘আমি পাই! খবরদার আমাকে ছাড়া কারো কাছে এই গাড়ি বিক্রি করতে পারবেন না!’
‘গাড়িই বিক্রিই করবো না হয়তো। আরেকটা গাড়ি কিনার টাকা থাকতে হবে তো!’
‘হবে!’
গম্ভীর মুখে বাচ্চাদের মত জেদ করে বলে যেন নিশাত। ফিদার খুউব মজা লাগে ওকে দেখতে তখন।
বাজার এলাকা ছাড়াও কাশবনের পাশে অনেক সময় নীরব জনমানব শুন্য জায়গায় ওরা পার্ক করে। ফিদার ধূমপান বিরতি একটা কারন। আর প্রকিতির ডাকেরও একটা ব্যপার আছে। ঝোপ ঝারে সেরে আসে। নিশাতের কাছে ওর কোন লজ্জা এখন আর লাগে না। এরকমই একদিন ওরা একটা নিরালায় গাড়ি থামিয়ে গল্প করছিল। দুজনে সামনা সামনিই ছিল। ফিদা সিগারেট খাচ্ছিল। সিগারেটেরর ধুয়ায় হঠাৎ নিশাতের কাশি চলে আসায় ফিদা গাড়ির আরেক পাশে চলে যায়। সরু রাস্তা। দুপাশে কাশবন একেবারেই সুনসান। প্রথমে অনেক দূরে রাস্তার মোড়ের দিকে একটা লোককে দেখতে পায়। কেমন যেন সন্দেহ জনক দৃষ্টি! নিশাত একটু ভয় পেয়ে বলে –
‘চলেন চলে যাই, লোকটা কেমন করে যেন তাঁকাচ্ছে!’
লোকটা হঠাৎই যেমন এসেছিল। তেমনই আকস্মিক ভাবে উধাও হয়ে যায়। নিশাতের ভয় কাটে না। বলে –
‘চলেন গাড়িতে উঠি!’
ফিদা বলে –
‘ও তো চলে গেল!’
‘এসব জায়গার কোন বিশ্বাস নাই। যদি আরো লোকজন নিয়ে আসে!’
‘আমরা তো কিছু করছিনা!’
‘সেটা বলি নাই। অন্য কোন উদ্দেশ্য হতে পারে না?’
ফিদা এতক্ষণে বোঝে নিশাতের ভয়ের কারন। যদিও ও ভয় পায় না। তবুও নিশাতের ভয় দূর করার জন্য রাজী হয় যেতে। বলে –
‘এই উঠছি গাড়িতে। সিগারেটটা শেষ করি?’
এমন সময় সেই মোড়ে কোন যানবাহনের হেড লাইট জ্বলে উঠে। কিছু দূর আগানোর পর বাহনটিকে ইজি বাইক মনে হয়। যা এখানে চলাচল করে। ফিদা নিশ্চিন্ত হয়। তাঁকিয়ে দেখে ওর গাড়ির পাশ দিয়ে যথেষ্ট জায়গা আছে কিনা ইজি বাইকটি পার হওয়ার। দেখে মনে হয় আছে। তাই নিজে আরেকটু সরে দাঁড়ায় বাহনটির পার হওয়ার জায়গা করে দেওয়ার জন্য। ইজি বাইক টি পার হয়। যখন ভাবছে ঝামেলা শেষ ঠিক তখনই ইজি বাইকটি থেমে যায়। আর সাথে সাথে বাইক থেকে পাঁচ ছয় জন লোক নেমে আসে। প্রথমে একটু দুশ্চিন্তায় পড়লেও সাহস হারায় না ফিদা। আরো ভয় দূর হয় যখন দেখে সাথে কয়েক জন পুলিশের ইউনিফর্ম পড়া।
একজন সিভিল ড্রেসের লোক এগিয়ে এসে বলে –
‘আপনাদের পরিচয়?’
ফিদা ওর ওর এন জি ও’র নাম বলে।
লোকটা বলে – ‘হ্যা এটা তো বেশ পরিচিত। আপনার আইডি আছে?’
ফিদা আইডি দেখায়। নিশাতের পরিচয় জানতে চায়। নিশাত বলে ও সাংবাদিক। ওর পরিচয় পত্রে আর চায় না। কিন্তু ফিদাকে জিজ্ঞেস করে –
‘এই অন্ধকারের মধ্য কি করছেন?’
‘আমি ওনাকে গাড়ি চালানো শেখাই। কাজের সুত্রে আমাদের পরিচয়।’
‘দিনের বেলায় না এসে রাতের বেলায় কেন আসেন?’
‘আমরা দুজনেই চাকরী করি। অফিস থেকে বের হয়ে এখানে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।’
‘ও আপনি গাড়ি চালাতে পারেন?’
নিশাতকে হেসে জিজ্ঞেস করে পুলিশটা। যেন খুব মজা পেয়েছে।
নিশাত সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় - ‘জী।’
ফিদা বলে – ‘এর থেকে ভাল জায়গা আর আমাদের জানা নাই যেখানে গাড়ি চালানো শেখানো যায়। আমরা কিন্তু রোজ আসি এখানে। সিগারেট খেতে থেমেছিলাম। জায়গাটা যে এত নিরালা খেয়াল করিনি।’
‘আসবেন, অবশ্যই আসবেন, আমরাও রোজ আসি। কিন্তু এরকম নির্জন এলাকা এভয়েড করবেন। দুদিন আগেই এখানে একটা লাশ পাওয়া যায়। আর কেউ যদি ঝামেলা করে বলবেন আমাদের।’
‘অনেক ধন্যবাদ, দেখা হবে ইন শা আল্লাহ!’
যাওয়ার সময় নিশাতকে বলে –
‘কাছে আসেন ম্যাডাম, ভয়ের কিছু নাই। লুকাতে হবে না!’
ফিদা খেয়াল করেনি নিশাত কোথায় ছিল। নিশাত কি যেন বললো পুলিশদের ফিদা ঠিক বুঝতে পারলো না। পুলিশরা ফিদার সাথে করমর্দন করে চলে গেল। পুলিশের এই ভদ্র ব্যবহারে মুগ্ধ হলো ফিদা। ও একদম ভয় পায় নি। কখনো পুলিশের সাথে সংস্পর্শে এলে আত্মবিশ্বাসের সাথেই কথা বলে। পুলিশও ভালই ব্যবহার করে। আর ওর পরিচয়ও পুলিশ ভালভাবে নিয়েছে। কত রকম গল্প শুনে। খারাপ হলে খমাখা ওদের নাজেহাল করতে পারতো। ফিদা বলে –
‘যাক পুলিশ ছিল। আমি তো মনে করেছিলাম এরা গুন্ডা। মনে মনে তৈরী হচ্ছিলাম ঢাল তলোয়ার ছাড়াই ফাইট করতে।’
‘পুলিশ ও ঝামেলা করতে পারতো!’
‘আমরা তো কিছুই করছিলাম না। পুলিশ ঠিকই বোঝে কাকে প্যাচে ফেলা যাবে, কাকে যাবে না।’
‘হ্যা আপনার সাহস আছে।’
‘ধন্যবাদ।’
‘তবে আর এরকম জায়গায় থামা যাবে না।’
‘তা ঠিক।’
‘চলেন আজ চলে যাই। মালাই চা খেয়ে বাজার করে তারপর যাই।’
‘জো আপকা মর্জি!’
ওরা মালাই চা খায়। নিশাত অনেক বেশী করে মালাই চায়। চা ওয়ালা পুরো পরিবার নিয়ে দোকান চালায়। উতসাহের সাথে চা দেয়। নিশাত পাশে সবজি দেখতে গিয়েছিল। চা ওয়ালার বউ নিশাতের হাতে চা টা দিয়ে আসে। চা খাওয়া শেষ হলে সব সব্জি সমেত ফিদা গাড়িতে উঠে। ফিদা জোড় করে দাম দিয়ে দেয়। নিশাত বলে – ‘হিসাব রাখলাম শোধ করে দিব।’
‘দান করে দিও কাউকে, এ কটা সামান্য সবজি আমি কিনে দিতে পারিনা আমার জিএফ কে?’
নিশাত হাসে। কিন্তু আপত্তি করে বলে – ‘কিন্তু আপনি কেন সব সময় দিবেন?’
‘এটাই নিয়ম। বিএফকেই দিতে হয়।’
‘এই নিয়ম আমি মানি না।’
‘আচ্ছা বাবা পরে না হয় তুমিই দিও।’
‘তবে গার্ল ফ্রেন্ড হিসেবে আমি সব সময় চেষ্টা করি আপনাকে কম খসাতে।’
ফিদা একটু অবাক হয়। কারন ওরা প্রায় রোজই দেখা করে। মাঝে মাঝে কফি শপে বসে। নিশাত ওনেক ডায়েট করে বলে সন্ধ্যায় ওর খিদা লাগে। তাই কিছু খেতেই হয়। আর এসব কফি শপে খরচ নেহাত কম না। এখানে মালাই চা সিঙ্গারা দাম বেশী না হলেও প্রায়ই বাজার করার খরচ ফিদাই দিয়ে দেয় জোড় করে। নিশাত কখনই নিতে চায় না যদিও। তাছাড়া লং ড্রাইভে গেলে রোজই দেড় দুই হাজার টাকার অক্টেন পুড়ে। ফিদা যেহেতু নিজে চালায় তাই অকটেনে গাড়ি চালায়।
সবই ফিদা করে সেচ্ছায়। নিশাতযে সব কিছু খসানোর নিয়তে করে তা মনে করে না ফিদা। তবে অল্প খরচ বলায় একটু অবাক হলো। আর কত খরচ করলে বেশী হত। এর মধ্যে নিশাতের ইচ্ছার কারনেই আরেক দিন সোনারগায়ে গিয়েছে। তবে নিশাতকে মনে হয় বেচারী বোঝে না, কোথায় ফিদার কত খরচ হয়। তাই মুখে বলে – ‘হ্যা তুমি খসানো টাইপ মেয়েই না!’
নিশাতের মুখে সরল বিজিতের হাসি দেখতে পায়। ফিদার ভাল লাগে, কেমন যেন একটু মায়াও লাগ! একটা মানুষের সাথে গভীরভাবে না মিশলে তাকে চেনা যায়। বাইরের খোলস আর ভিতরের অবস্থা সম্পুর্ন বিপরীত মুখী হতে পারে। সদা হাস্যময় তেজী এই মেয়েকে দেখে কে বলবে ওর আছে অনেক দুঃখ ভরা অতীত! পাঁচ ভাই বোনের ওরা দু বোন তিন ভাই। নিশাত তিন নাম্বারে। ওর পরে এক ভাই আর এক বোন আছে। ওর বাবা নাকি ওর স্কুল কলেজের বেতনও ঠিক মত দিতেন না। ও অনেক কষ্ট করে এদিক ওদিক থেকে পয়সা বাঁচিয়ে অথবা মায়ের থেকে চেয়ে বেতনের টাকা জোগাড় করতো। টিউশনি, সেলাইয়ের কাজ করেও নিজের খরচ চালাতো। হয়তো পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনায় বাবার ধারনা ছিল ছেলেরা বাবা মা বুড়ো হলে সংসারের হাল ধরবে। অথচ তিন ভাইই বিয়ে করে আলাদা সংসার চালাচ্ছে। বাবা মা আর ছোট বোনের পড়ার খরচ চালাচ্ছে নিশাত। ওর সমস্ত ব্যক্তিগত খরচও ও নিজেই বহন করে। বনির কাছ থেকে কিছুই নেয় না। তার উপর ওর প্রথম বিয়ের ঝড় তো গিয়েছেই। চার বছর কেউ ওর খোঁজ খবরই রাখেনি। ওর অপারগতা কেউ বুঝতে চায়নি। সবাই ওকে দোষী ভেবেছে। এখন বাবা মা ওর উপর আস্থা রেখেছে। পাই পাই হিসেব করে চলে নিশাত। মেয়ে হয়েও জীবন যুদ্ধ ভালই চালিয়ে যাচ্ছে। আছে আরো বড় হওয়ার স্বপ্ন। এদিক থেকে শ্রদ্ধা করে নিশাতকে ফিদা। নিশাতও মনের কষ্ট গুলো ওকে বলে, সেটা বাবার বাড়ির হোক বা স্বামীর বাড়ির।
একদিন অফিসে নিশাতের টেক্সট পেয়ে বেশ বিরক্ত হয় ফিদা। মনে হয় এই মেয়েটা একদিনও ঠিক থাকতে পারে না। একদিন প্রেমে গদগদ। পরদিন উল্টো বাঁক! আজ লিখেছে – ‘জানেন আমরা যা করছি তার শাস্তি কি ইসলামে?’
‘জানি। তুমি জানতে না?’
‘না!’
‘তুমি কি কচি খুকী? যে জান না?’
‘এভাবে কথা বলছেন কেন?’
‘কিভাবে?’
‘কচি খুকী! খুব খারাপ শব্দ!’
‘আশ্চর্য! আমি তো একটা কমন শব্দ বা ফ্রেজ ব্যবহার করেছি। এত খারাপ লাগলো কেন? এর আগে কি কেউ তোমাকে টিটকারী মেরে বলেছে এই শব্দ?’
‘হ্যা। কিন্তু আপনিও বলেছেন আগে রেগে। ঠাট্টা করে না।’
‘সরি আমার মনে নেই। এবার কিন্তু একদম দুষ্টামি করেই বলেছিলাম!’
‘এরকম শব্দ আর ব্যাবহার করবেন না!’
‘আচ্ছা।’
‘আমার এমনি নিজে থেকেই খারাপ লাগতো কি করছি ভেবে। কিন্তু ধর্মে এটাকে এত কঠোর ভাবে নিষেধ করা আছে জানতাম না!’
‘এটা জানতে না? আজব!’
‘না।’
‘তাহলে তো তুমি কিছুই জানতে না। আশ্চর্য! ধর্ম নিয়ে এমন অর্ধ শিক্ষিত হয়ে আছ একজন শিক্ষিত মেয়ে হয়ে!’
‘সত্যিই জানতাম না, পড়ে অনেক ভয় পেয়েছি।’
‘তাহলে শুধু একটা জিনিষই চোখে পড়লো। আর কিছু চোখে পড়েনি?’
‘আর কি?’
‘তুমি যা করো?’
‘আমি কি করি?’
‘তোমার পুরো চলা ফেরাই তো ধর্মে নিষিদ্ধ! বোরখা পড়া বাদই দিলাম। এমন টাইটফিট কাপড় পড়া, ছেলেদের সাথে দিনে রাত বিরাতে একা একা ঘোরাফেরা করা। যেখানে পর পুরুষের সাথে মেলামেশাই নিষেধ করা আছে।’
‘আপনি তো পুরো হুজুরদের মত কথা শুরু করলেন।’
‘হুজুরদের মত বলছি না। বলছি তোমার ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের কথা। আমি ধর্মে কোনটা নিষেধ, সেটা আমি ভাল করেই জানি। আমি মোটেও দাবী করি না আমি ধার্মিক লোক। অনেক কিছুই পালন করি না। কিন্তু জানি আমার পাপ হচ্ছে। আর তুমি এমন একটা লাইফ লিড করে শুধু তোমার এটাই চোখে পড়লো? এত পাপা চিন্তা করলে তো তোমার সাথে কথা বলাও হারাম! এটা বোঝ না?’
‘আপনি রাগ করছেন কেন? আমি সত্যিই আজকে প্রথম জানলাম। পড়ে ভয় পেলাম। তাই আপনার সাথে শেয়ার করলাম।’
‘আচ্ছা বুঝলাম। তবে এও বুঝলাম তোমার ধর্ম সম্বন্ধে একদমই কোন পড়াশুনা নেই!’
উত্তরে নিশাত কিছু বললো না। ফিদার রাগটা কিছু কমলেও এও বুঝলো নিশাত আবার কোন বিতর্ক নিয়ে এসে খাড়া করে দিবে। এই ভাল তো হঠাৎ বিনা কারনেই একটা বাঁধা হিসেবে কিছু নিয়ে আসবে। রাগারাগি হলেই এক কথা – ‘খতম!’ অথবা ‘বাই ফর এভার!’ ফিদাও যখন মনে মনে ঠিক করে ঠিক আছে। ও অনেক করেছে। তারপরও যদি নিশাত সম্পর্ক না চায়, ফিদা চাবে কেন। তখনই নিশাত আবার ফেরৎ আসে। হয় টেক্সট করে, না হলে ফোন করে। করে আবার বলে এটা নাকি অভ্যাস বশত করে ফেলেছে! ফিদার হাসিও পায় আবার এও বোঝে মেয়েটা ওকে বেশ ভালই ভোগাচ্ছে, ভোগাবেও। ওর বন্ধুরা যারা জানে, বিশেষ করে নওশাদ আর কিশোর। ওকে বারে বারেই বলে –
‘এরে আর ফেরৎ নিস না। চির বিদায় দিয়ে দে। ও তোকে ভালবাসে না। জাস্ট টাইম পাস!’
ফিদার মাঝে মাঝে মনে হয় ওরা ঠিক বলছে। কিন্তু আবার কতগুলো ঘটনায়, নিশাতের কিছু কথায় ওর ওদের কথা ঠিক মনে হয় না। কিন্তু নিশাতের সাথে সম্পর্কের পর ফিদার অতিরিক্ত মদ্যপান আর রোজই বারে কারো না কারো সাথে গন্ডগোলে জড়িয়ে যাওয়াতে ওরা খুবই ক্ষিপ্ত ফিদার উপর। নওশাদ তো বলেই দিয়েছে – ‘ঐ মাইয়ার সাথে আর দেখলে তুই বাদ আমাদের থেকে। দেখ আমাদের চাস না ঐ মেয়েকে?’
ফিদা কিছু বলে নি উত্তরে। বরঞ্চ পরে কোন এক সময় নিশাতকে বলেছে ওদের ব্যপারে ওর বন্ধুরা কি বলে। নিশাত বলেছে –
‘আপনাকে সবাই বাঁধা দিচ্ছে তো শুনছেন না কেন?’
‘ওরা তো জানে না তোমার মধ্যে কি যাদু আছে! আমি জানি।’
‘কি যাদু?’
‘আছে একটা কিছু না হলে আমি এত দিওয়ানা হলাম কেন?’
‘কচু!’
চোখ দুটোর মধ্যে সমস্ত হাস্যরস জড় করে বুড়ো আংগুল উচিয়ে এই ‘কচু’ বলার ঢং এ ফিদা দ্বিতীয়বার শিহরিত হয়। প্রথমবার হয়েছিল পরিচয়ের প্রথম দিকে পুলে। ফিদা পাঁচ ফিট পানিতে ডুবে যাচ্ছিল বলাতে নিশাত পানি ভেংগে একেবারে কাছে এসে বলেছিল কচু ঠিক একই ভংগিতে। সেদিন ফিদার মনে হয়েছিল নিশাত আসলে ওর অনেক কাছে চলে আসছে। নাহলে এমনভাবে ঠাট্টা করবে কেন? পরে অবশ্য দেখেছে একই ভংগি অনেকের সাথেই করে। তখন অবশ্য ওরা অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। মনকে সান্তনা বা প্রবোধ দিয়েছে এটা ভেবে যে ওর সাথে যা করে তা তো সবার সাথে করে না নিশ্চয়ই। যদিও ‘নিশ্চয়ই’ এর মধ্যে একটা ‘কিন্তু’ কিন্তু রয়ে গিয়েছে!

এক শনিবার সকালে আগে থেকেই কথা ছিল নিশাতকে নিয়ে যাবে ফিদা ওর বাসা থেকে। ফিদার অফিস আর নিশাতের কি যেন ট্রেনিং। শনিবার বলে একটু আস্তে ধীরেই বের হয় ফিদা। নিশাতের বাসার কাছে এসে ফোন দেয় ফিদা। নিশাত বেরিয়ে আসে। গাড়িতে উঠেই হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে –
‘হাত দিলেন না যে?’
‘ওহ! আসলে ভয় লাগে নিজে থেকে কিছু করতে। কোনটা আবার অপরাধ হয়ে যায়! সব কিছু তো তোমার নিয়মে চলে।’
নিশাত সজোড়ে হেসে বলে –
‘হ্যা, সব তো আমার দোষ!’
ফিদা ওর আংগুলের ফাঁকে আংগুল ঢুকিয়ে দেয়। নিশাতকে খুব খুশী খুশী মনে হয়। ফিদার দিকে তাঁকিয়ে বলে – ‘আপনাকে আজকে খুব গ্রেসফুল লাগছে!’
‘তাই নাকি। আসলে সকালে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছি তো! সকালে তো তোমার সাথে দেখা হয় না সাধারনতো।’
সকালে গোসল করে শেভ করে কমলা রঙের একটা পোলো সার্ট আর বটল গ্রীন কালারের গেবাটিনের প্যান্ট পড়ে আছে। নিশাত ওর দিকে তাঁকিয়েই আছে মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে। এই মেয়েকে বোঝা বড় দায়! এই খরা আর এই বন্যা!
গুলশানে যেখানে নামবে নিশাত সেটা ছিল ডেড এন্ড। তাই ফিদা গাড়িটাকে ইউ টার্ন নিতে যায়। একবারেই নির্জন এলাকা। নিশাত হঠাৎ করে এগিয়ে এসে ফিদার বাঁ গালে চুমু দেয়। ফিদাও একটু চমকে যায়। আর নিশাত একটা ফেটে বেরিয়ে যাওয়ার মত হাসিকে চেপে চেপে বলে –
‘হায় হায়! কি হলো!’
‘কি হলো?’
‘পিছনে মিররে দেখেন একটা বুয়া বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাঁকিয়ে আছে!’
ফিদা মিররে দেখতে পায়। ফিদাও হেসে ফেলে। হাসি থামাতে দেরী হয় নামতে গাড়ি থেকে। নিশাত নেমে গেলে ঠোটে মুচকি হাসি নিয়ে চলে যায় ফিদা ওর গন্তব্যে।

পূর্বাচলে একদিন গাড়ি চালাতে চালাতে একদম নিভৃত কোন জায়গায় চলে গিয়েছিল ওরা। কি কারনে যেন নিশাতের মন খারাপ ছিল। ওরা গাড়ি থেকে নেমে মুখোমুখি দাঁড়ায়। কিছক্ষণ এমন স্থির থাকার পর ফিদা হঠাৎ নিশাতকে জড়িয়ে ধরে। নিশাতও জড়িয়ে ধরে ফিদাকে। তারপর ফিদার বুকে মাথা রেখে ঘষতে থাকে মুখ। ফিদারও ঘটনার আকস্মিকতায় কি হয় ওর হাত নিশাতের পিঠ থেকে নীচের দিকে চলে যায়। সাথে সাথে ফিদাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় নিশাত। ফিদা হতভম্ব হয়ে যায়। কিছুটা অপরাধ বোধেও ভোগে শরীরের অন্যত্র হাত দেওয়ায়। ফিদাকে শুধু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় না। নিশাত উলটো হেটে অনেক দূরে চলে যায়। ফিদা কিছুক্ষণ পিছু নেয়। বারবার সরি বলে। কিন্তু নিশাত থামে না। এক মোড়ে এসে ডানের রাস্তায় চলে যায়। ঐ পর্যন্ত পৌছে আর নিশাতকে দেখতে পায় না। জোড়ে জোড়ে ডাকে। কোনই সাড়া শব্দ পায় না। খুব ঘাবড়ে যায় ফিদা। এরকম সুনসান জায়গায় একটা মেয়ে কত রকম বিপদেই না পড়তে পারে। অথচ ওর ভয়ে ওর থেকেই দূরে সরে যাচ্ছে নিশাত! কি করবে ভেবে পায় না। আস্তে আস্তে গাড়ির কাছে ফেরত আসে। সিগারেট ধরিয়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে যায়। এমন অস্বস্তিকর পরিবেশে সিগারেটই ভরসা। সময় টা অন্তত কাটুক। সিগারেট শেষের দিকে সেই মোড়ে নিশাতের ছায়া দেখতে পায়। আস্তে আস্তে হেটে আসছে। একটু সস্তি পায় ফিদা। যাক হারিয়ে যায় নি। কাছে আসলে ওর মুখ দেখে তপনের গানের দুটো চরন মনে আসে
– ‘মেঘ কেটে গেছে বহুদূর, ঝড় তবু থামেনি।’
চোখে মুখে অভিব্যক্তি যেন জ্বলন্ত উনুন! গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে। ফিদা কিছুটা ভয় কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে জানতে চায় –
‘তুমি আর চালাবে না?’
‘না!’
প্রায় চিৎকার করে বলে নিশাত। ফিদা ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে আবার। কি বলবেভেবে পায় না। শেষে আবারও দুঃখ প্রকাশ করে।
‘হঠাৎ করে এভাবে জড়িয়ে ধরলেন কেন?’
কিছুটা চাপা ক্রোধ দিয়ে নিম্ন স্বরে জিজ্ঞেস করে নিশাত।
‘আমিও জানি না কেন! হঠাৎ করেই হয়ে গেছে! আর তুমিও তো যেভাবে মুখ ঘষছিলে আমার বুকে, গালে ......’
‘তাই বলে ......’
আবারো চাপা রোষটা পরিস্কার কন্ঠস্বরে। কিন্তু শেষ করেন না বাক্য। ফিদা বুঝে কিসের কথা বলছে। বলে –
‘সেটাও তো ইচ্ছে করে করিনি! হয়ে গেছে হঠাৎ!’
‘আমার সুন্দর ফিলিংসটা নষ্ট করে দিলেন!’
‘বললাম তো ইচ্ছে করে করিনি!’
‘চেনা আছে আমার ছেলেদের, একটা জিনিষই চেনেন আপনারা!’
‘কি মুশকিল। তোমার সাথে কে কি রকম করেছে তুমি বলেছ। আমি যদি ওরকমই হতাম, তাহলে এতদিন এরকম নির্জন, অন্ধকার এলাকায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছি। সব কিছুই তো করতে পারতাম!’
‘আমি জানি না কিছু। আমার মুডটাই নষ্ট করে দিলেন!’
কি করবে বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে। একটু বেশী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে নিশাত। এক চায়ের দোকানের কাছে এলে বলে – ‘চা খাবে?’
‘আনেন। আমি গাড়িতেই বসে থাকবো।’
ফিদা মালাই চা এনে দেয়। নিশাত বলে সিগারেট দেন একটা। ফিদা অবাক হয়ে সিগারেট দেয়। লাইটার দিয়ে ধরিয়েও দেয়। কিন্তু বুঝতে পারে রাগ দেখানোর জন্য এসব করছে। যেখানে নিশাত সিগারেটের গন্ধই সহ্য করতে পারে না! কিছুক্ষণ টেনে ফেলে দেয়।
‘এখন কি করবো?’
‘চলেন ফিরে যাই।’
ফিদা গাড়িতে উঠে রওনা হয় পূর্বাচল ছেড়ে। নিশাত বলে –
‘সিগারেট কেন খেয়েছি জানেন?’
‘হ্যা। রাগ দেখানোর জন্য।’
‘দেখানোর জন্য না। রাগের চোটে সব কিছু উল্টো করতে ইচ্ছে হচ্ছে। মুখটা প্রচন্ড তেতো হয়ে আছে। সেজন্য চা টাও ভাল লাগলো না।’
‘এখন আমি বাসায় যেয়ে সাইকেল নিয়ে বের হব। যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে চলে যাব।’
‘এত রাতে সাইকেল নিয়ে বের হবে কেন? কি দরকার?’
‘বাসায় যেয়ে কি করবো!’
আবারো প্রায় চেঁচিয়ে বলে নিশাত। ফিদা এবার একটু বিরক্ত হয়। কিছুক্ষণ চুপ করে গাড়ি চালায়। একটু পর বলে –
‘আমাকে অসহ্য মনে হচ্ছে?’
‘না।’
‘তাহলে আমি সাথে থাকলে রাগ কমবে?’
‘থাকতে পারেন। আমি এখন বাসায় যাব না। বাস! ...... কফি খাওয়া যেতে পারে।’
‘আচ্ছা উত্তরার কফি শপে থামবো।’
কফি শপে থামে। প্রায়ই আসে এখানে। কখনো ভাল মুডে কখনো বা এমন! আজব একটা মেয়ে ভাবে ফিদা। কিন্তু তবুও ছাড়তে বা ছাড়াতে পারে না নিশাতকে। ফিদা মনে করে বরফ বোধহয় গলেছে। একটু আকটু কথা বলে। যদিও গম্ভীরই থাকে সারাক্ষণ। এক সময় কফি শপ থেকে বেরিয়ে নিশাতের বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসে। চুপচাপ নেমে চলে যায়। মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হয়। এমন সময় টেক্সট আসে নিশাতের – ‘বাই, বাই ফর এভার।’
মেজাজটা প্রচন্ড বিগড়ে যায়। উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না। দেয় ও না। ঘড়ি দেখে। পোনে এগারোটা বাজে। ক্লাবের দিকে গাড়ি ঘোরায়। কিছুক্ষণ পরই বার বন্ধ হয়ে যাবে। তবুও যায় ফিদা।

সকালে উঠে কিছুই মনে করতে পারে না ক্লাবে গিয়েছিল কি যায়নি। গেলে কার সাথে বসেছিল। কোন রাস্তা দিয়ে ফেরত এসেছে। গাড়িটা পার্কিং এ পার্ক করেছে কিনা ঠিকমত। কিছুই না। এরকম আজকাল প্রায়ই হচ্ছে। আর ভাল লাগে না এই তামাশা। শরীরটাও খুব খারাপ লাগে। অফিস যাবে না ঠিক করে। অফিসে জানিয়ে দেয়। নীতাকে বলে নিজে চলে যেতে ওর কাজে। মনে মনে চিন্তা করে নীচে নেমে গাড়িটা না দেখলে নিশ্চয়ই ফোন দিবে ও। ফোন যখন দেয়নি, তাহলে গাড়িটা ঠিকঠাক মতই আছে। দেরীতে নাস্তা খেতে বসে। এমন সময় নিশাতের ফোন আসে। সবসমইয়ের মত প্রথম একই প্রশ্ন – ‘কই?’
‘বাসায়।’
‘অফিস যান নি?’
‘না যাব না। শরীর ভাল লাগছে না।’
‘দাড়ান একটু ওয়েট করেন। আমি একটু পরে ফোন দিচ্ছি। আমিও ছুটি করি। চলেন লং ড্রাইভে যাই।’
ফিদা একবার বলতে যাচ্ছিল ওর শরীর খারাপ বলেই অফিসে যাচ্ছে না। আর নিশাত একবারো কি হয়েছে না হয়েছে না জিজ্ঞেস করে বললো লং ড্রাইভে যেতে। কিন্তু বলতে পারলো না কিছু। শুধু বললো – ‘আচ্ছা।’
নিশাত ফোন কেটে দিয়ে একটু পর আবার ফোন দিল –
‘কতক্ষনে আসতে পারবেন আমাকে নিতে।’
‘এই আধা ঘন্টা পর রওনা হতে পাড়বো।’
‘আচ্ছা বের হওয়ার আগে ফোন দিয়েন।’
‘আচ্ছা।’
ফিদা যেন শান্তি ফিরে পায়। যতবার নিশাত ভেংগে দেয় সম্পর্ক। ততবার সত্যিই ফিদার মনটা ভেংগে গিয়েছে। প্রচন্ড তোলপাড় করে হৃদয় জুড়ে এতদিনের এত ঘনিষ্ঠ প্রতিটি মূহুর্ত। ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তা, উত্তরার কিছু কফি শপ, পূর্বাচলের বিভিন্ন কোনা কানাচে, বাজার। সব যেন ওর চোখের সামনে ফিল্মের রোলের মত বারবার মনের পর্দায় ভেসে উঠে। আর প্রশ্ন আসে অন্তর থেকে এত কিছুর পর কিভাবে সব খতম করে দিতে পারে এক মূহুর্তে নিশাত! কিভাবে? কেমন করে পারে? নিশাতকে প্রচন্ড দুর্বোধ্য অচেনা একটা মানুষ মনে হয়। ফিদা এক কথার মানুষ। যেটা মনে হয় সেটাই বলে। যা বলে সত্যি করে বলে। তাই অন্যের কথাকেও সত্যিই বলে ধরে নেয়। নিশাতের ক্ষেত্রেও তাই হয়। প্রচন্ড হতাশা আর কষ্ট থেকে একসময় নিজের ভিতরেই স্বয়ংক্রিয় আত্মরক্ষামূলক অনুভূতির জন্ম হয়। মনে হয় নিশাত যদি পারে ভুলতে, ফিদা পারবে না কেন। এভাবে যখন ফিদা নিজেকে শক্ত করে। তখনই আবার নিশাত ফিরে আসে। আরো পলকা হয়ে যায় ফিদার অন্তর।

ফিদা নিশাতের বাড়ির সামনের গলিতেই পেয়ে যায়। গাড়িতে উঠে হাত বাড়িয়ে দেয় ফিদার হাতে। আঙ্গুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চেপে ধরে রাখে। আর চোখ বড় বড় করে গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাঁকিয়ে থাকে ফিদার দু চোখের দিকে। মনে হয় মনের যত আবেগ সব একসাথে করে শ্বাস আটকে কিছু বলার অপেক্ষায় আছে। ফিদা বুঝতে পারে না কি বলবে নিশাত। ওর পক্ষে যে কোন কিছুই বলা সম্ভব না। নিশাত বলে – ‘তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না!’
ফিদা অবাক হয় না। তবে শান্তি পায়। জীবন যখন যেমন। নিশাত যখন ব্রেক আপ করে তখন সম্পর্কের দিন গুলোকে স্বপ্নের মত মনে হয়। নিশাতকে কখনো আর নিজের মনে হয় না। আবার যখন ফিরে আসে তখন মনে হয় নিশাত তো ওরই, মাঝখানে কি সব হয়, ওগুলো কিছু না।
‘বলেছ তো অনেক বারই এরকম। আমিও বিশ্বাস করেছি। আবার খতম করে ফেলো এক নিমেষে!’
‘জানো আজকে কি চিন্তা করে তোমাকে ডেকেছিলাম?’
‘কি?’
‘সম্পর্কের ইতি টানতে। তোমাকে বোঝাতে।’
ফিদা খুউব অবাক হয়ে গাড়ি চালনো অবস্থায়ই নিশাতের দিকে ফিরে তাঁকায়। ও ভাবতেই পারে না নিশাত এরকম ঠান্ডা মাথায় ও অসুস্থ জেনেও ওকে ডেকছিল সম্পর্ক ভেংগে দেওয়াটা পোক্ত করার জন্য, গড়ার জন্য না! কিছু বলতে যাবে তখন নিশাত আবার বলে –
‘কিন্তু যেই তুমি এলে, তোমাকে দেখে বুঝলাম এটা আমার পক্ষে কোন দিনই সম্ভব না!’
‘এরকম তো আগেও বলেছ! এত ফিকল মাইন্ডেড তুমি! তাও আবার এরকম একটা সিরিয়াস রিলেশন নিয়ে! তুমি আমাকে ডেকেছে অসুস্থ জেনেও সম্পর্ক ভেংগে দিতে? সেটাতো কালই বলেছ। আজ আবার নতুন করে ডাকার দরকার ছিল কই?’
‘ওটাতো এমনিই বলেছি।’
‘আশ্চর্য! আমিই খুবই অবাক হই তোমার প্রেম ভালবাসা নিয়ে এরকম ছেলে খেলা দেখে!’
‘আমি অনেক চেষ্টা করেছি তোমাকে ভুলতে। কিন্তু তুমি যতক্ষণ না থাক ততক্ষণ খালি তোমারই কথা মনে পড়ে। প্রতিটি রাস্তা প্রতিটি কফিশপ, যেখানে দিয়ে যাই, সেখানেই তুমি চলে আস! আমি পারবো না তোমাকে ছেড়ে থাকতে।’
‘তাই! আমি তো জানতাম এরকম শুধু আমারই হয়! তোমার শুধু টাইম পাস।’
‘তোমার সাথে যখন ব্রেকআপ হয় তখন যে আমার কি কষ্ট হয়!’
‘বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।’
‘আমি বলি না, আপনি বলেন।’
‘তুমি থেকে আবার আপনি হয়ে গেল কেন?’
নিশাত হেসে দেয়। বলে – ‘একটা বললেই হলো।’
গাড়িতে নিশাতের প্রিয় গানটা চলছিল তখন – ‘খবর দিও হঠাৎ কান্না পেলে’। সেখানে যখন কথা এলো – ‘এক জীবনের বৃষ্টি দিয়ে তুমি, সারা জীবন ভিজিয়ে দিয়ে গেলে ...’
ফিদা তখন বললো – ‘মোরশেদ কি বলে জানো’
‘কি?’
‘তুমি আমাকে পুরো ভিজিয়েছ আর নিজে শুধু হাতটা ভিজিয়েছ আমাকে ভেজানোর জন্য! এই লাইনটা শুনলে খুব খারাপ লাগে যখন তুমি আমার সাথে ব্রেক আপ কর।’
‘একদম ভুল কথা। আমি একদম ভিজে গেছি পুরোপুরি।’
‘সত্যিই কিনা জানি না। তবে শুনতে ভাল লাগছে।’
ওরা আজকে নতুন রাস্তা নিয়েছে। নিশাতের ইচ্ছায়। কাঞ্চন ব্রীজের আগে বাঁয়ে চলে গিয়েছে যেটা গাজীপুরের দিকে গিয়েছে। পথে জিন্দা পার্ক পড়লো। ফিদা নাম শুনেছে যায় নি। নিশাত ও বললো যায় নি। তাই ওরা ঢুকলো। মূল গেটের আগেই একটা বড় গাছের পাশে পার্ক করলো। গাছকে ঘিরে একটু পাকা করা উচু জায়গা বসার জন্য। নিশাত সেখানে বসলো। ফিদা কখনো ওর সামনে মাটিতে বসে অথবা কখনো দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে কথা বলছিল। ওদের কথার শেষ নেই। এক সময় পার্কের ভিতরে ঢোকে। তেমন কিছু নাই দেখে আবার চলে আসে। হাইওয়েতে নামায় গাড়ি আবার। ফিদা জিজ্ঞেস করে – ‘কোথায় যাব এবার?’
‘যেতে থাকেন না! যে দিকে দু চোখ যায়!’
খুব ফুর্তি ফুর্তি ভাব নিশাতের মধ্যে। বলে – ‘দেখেন কেমন স্কুল পালানো পালানো মনে হচ্ছে না?’
‘হ্যা ... একটি দুষ্টু ছেলে আর একটি মিষ্টি মেয়ে ওরা ধরা পড়ে গেল ...এরকম।’
ফিদা যোগ করে হেসে।
নিশাতও হেসে তাঁকায় ফিদার দিকে। বলে –
‘জানেন আমি যখন ছোট ছিলাম, আম্মা কোনদিন আলাদা করে বলেনি যে আমি মেয়ে। আমাকে কি কি করতে হবে। আমার সব বন্ধুরা ছিল ছেলে। ওদের সাথে খেলতাম, ঘুরতাম ...’
ফিদা মনে মনে ভাবে, সেই জন্যই সমস্যা! সমস্যার মূল জানা গেল! কিন্তু মুখে কিছু বলে না। নিশাত বলে যায় –
‘একবার ক্লাশের একটা ছেলে দাওয়াত দিল ওর বাসায়। আমিও গেলাম। যেয়ে দেখি কেউ নাই!’
‘তারপর?’
ফিদার সুরে শংকা যেন!
‘তারপর আর কি। আমি বললাম সবাই কই। ও বললো কেউ নাই। শুধু তোমাকে দাওয়াত দিয়েছি।’
‘তারপর?’
ফিদার সুরে শংকা আরো বেড়ে গেল যেন!
‘আর কি। চলে আসলাম।’
‘ও তোমাকে এমনি ছেড়ে দিল?’
‘আরে তখন তো আমরা ছোট! কিছুই বুঝি না।’
‘ওহ!’
আরো অনেক মেয়েলী ব্যপারে কি ভাবে ওর জানা হলো, মা কিছুই জানায়নি এগুলো বললো। ওর জন্য একটু মায়াই হলো। বেচারীর আসলে সঠিক পরিচর্যা পায় নি বোঝাই যায়। সেটাতো আর বলা যায় না। চুপ করে শোনে ফিদা। নিশাত বলে –
‘অবশ্য আমার ছোট বোনকে আমি সব শিখিয়ে দিয়েছি। আগে ভাগেই ওয়ার্ন করেছি কখন কি করতে হয়। তাই ও আমাকে খুব ভালবাসে। আমার কোন কষ্ট ও সহ্য করতে পারে না।’
‘স্বাভাবিক। তুমি যা করছো তা তো খুবই ভাল। মা বাবাকে দেখছ। আবার বোনকে মায়ের স্নেহে বড় করেছ।’
‘এই জন্য নিজের জন্য কিছু রাখতে পারিনা। যা টাকা পাই সবই শেষ হয়ে যায়। পাই পাই হিসাব করে চলি।’
‘বুঝেছি। তুমি একটা এক্সেপশনাল মেয়ে। বিগ ফাইটারও!’
‘আমাদের কথা কখনো শেষ হয় না! তাই না?’
‘আমাদের সম্পর্কটা একদম টিন এজ প্রেমিক প্রেমিকার মত। কি না করি আমরা!’
হেসে বলে ফিদা। ফিদার হাসিতে নিশাতও যোগ দেয়। বলে – ‘একদম ঠিক।’
‘আমার বন্ধুরা তাই বলে।’
‘আপনি কি সবাইকে বলে বেড়ান নাকি। আপনাকে না মানা করেছি কাউকে আর বলতে?’
‘সবাইকে তো আর বলি না। যারা দেখে সব সময় তাদের একটু একটু বলি।’
‘আমি কাউকেই বলি না আপনার কথা। তবুও আমার বোন একদিন সন্দেহ করেছিল।’
‘কেন? কিভাবে?’
‘আপনি আমাকে নামিয়ে দিয়ে ওয়েট করেন না। আমি বাসা পর্যন্ত যাওয়া পর্যন্ত। ও তখন ফিরছিল। পরে এসে জিজ্ঞেস করেছে আপু ঐ লোকটা কে যে তোমাকে দেখছিল গাড়িতে বসে?’
‘ও কিভাবে টের পেল যে আমি তোমাকেই দেখছিলাম?’
‘আরে ও সবই টের পায়। ও খুব চায় আমার সাথে যাতে বনির সম্পর্ক ঠিক হয়ে যায়।’
‘ভাল। ও তোমার ভাল চায়।’

অনেক দূর যেয়ে একটা ভাল রেস্টুরেন্টে পেয়ে বসে লাঞ্চ করে। পরে ঢাকায় ফেরত আসার জন্য রওনা হয়। তিনশ ফিটে এসে পূর্বাচলে ঢুকে। নিশাত গাড়ি চালায় বেশ কিছুক্ষণ। জোৎস্না ছিল সে রাতে। ওরা কাশবনের মাঝে একটা প্রশস্থ মোড়ে থামে। অনেক্ষণ গল্প করে। এবার যেন নিশাতের আবার অন্য রূপ বের হয়ে আসতে থাকে। কি কথায় একটু অভিমান করে দূরে রাস্তায় শুয়ে থাকে আধ শোয়া ভংগিতে কুনুই এর উপর ভর করে। আশপাশে কেউ নেই। ফিদার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপে। ওকে যেয়ে পাজাকোলা করে তুলে নেয়। একদম হালকা। ফিদাই একটু সন্দেহে ছিল তুলতে পারবে তো এই বয়সে। ঠিকই তুলে ফেলে। নিশাত চেচামেচি শুরু করে। তাই আবার নামিয়ে দেয়। ফিদা খুব হাসে। নিশাত চুপ করে থাকে। ফিদা ঠিক বুঝে না ওর অনুভূতি। কিন্তু ফিদার খুব ভাল লাগে। নিশাত গাড়ি স্টার্ট দেয়। ফিদা বার বার হেসে নিশাতের দিকে তাঁকায়। আর বলে – ‘কেমন লাগল রাইড?’
নিশাত কিচ্ছু বলে না। হাসেও না। পূর্বাচল থেকে তিনশ ফিটে ওঠার পরগাড়ি থামায় নিশাত জায়গা বদল করার জন্য। ফিদা বলে –
‘জায়গা বদল করার দরকার নেই। সাহস করে তুমি চালাও হাইওয়েতে কিছুক্ষণ। বসুন্ধরার কাছে এলে ছেড়ে দিও।’
‘কি বলেন?’
‘তুমি জোড়ে চালাতে পার এখন। খালি রাস্তা। আর আমি তো আছিই। ভয় করলে কিন্তু গাড়ি চালানো শিখতে পারবে না। সবকাজই একদিন না একদিন প্রথম শুরু করতে হয়।’
‘সেটা আজকে কেন?’
‘আজকে না কেন?’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে – ‘আচ্ছা।’

ইউটার্ন নেওয়ার সময় গাইড করে ফিদা। রাস্তার দুদিকে এবং মিররে চোখ রাখতে। নিজেই বলে দেয় কখন নিতে পারবে ইউ টার্ন। নেয় ঠিক ভাবেই। গাড়িও সোজা করতে পারে ঠিকমত। কিছু দূর পর ফিদা বলে –
‘হ্যা এবার স্পীড বাড়াও। যত টুকু মনে হয় তোমার কন্ট্রোলের মধ্যে আছে।’
নিশাত স্পীড বাড়ায় আস্তে আস্তে। সামনে একটা ট্রাক পড়ে। ফিদা গাইড করে কীভাবে ওভারটেক করতে হবে। নিশাত সুন্দর ভাবে করে। ফিদা বলে –
‘মাশা আল্লাহ! খুব ভাল!’
নিশাত বাচ্চা মেয়ের মত করে হাসে। এরপর সামনে যত দূর চোখ যায়, একদম রাস্তা ফাঁকা। ফিদা বলে –
‘স্পীড একটু বাড়াও যতটুকু তোমার কন্ট্রোলের মধ্যে থাকে। কন্ট্রোল হলো আসল।’
নিশাত বাড়ায়। একটু পর আরো বাড়ায়। ফিদার একটু বেশী মনে হলেও আস্থা রাখে নিশাতের উপর। হঠাৎ খালি রাস্তায় পাশের আইল্যান্ডের সাথে ঘষা লেগে গাড়ি ধাক্কা খেয়ে রাস্তার দিকে ফেরত আসে। ফিদা চিৎকার করে বলে –
‘ব্রেক! ব্রেক!’
নিশাত ব্রেক চাপে। গাড়ি রাস্তার উপর বাঁকা হয়ে থামে। পিছনে তাঁকিয়ে দেখে নেয় ফিদা। ওভারটেক করা ট্রাক গুলো এখনো অনেক দূরে। সস্তি পায়। নেমে আসে গাড়ি থেকে। বলে –
‘বিরাট বাঁচা বেঁচে গেছি। ট্রাক গুলো খুব কাছে থাকলে কি হতো আল্লাই জানে!’
নিশাতও নেমে আসে গাড়ি থেকে। খুব ঘাবড়ে যায়। বার বার –
‘সরি, সরি, আমি এটা কি করলাম!’
‘আহা! এত সরি হঅয়ার কিছুই নেই।’
‘দেখেন গাড়ির কত টুকু ক্ষতি হয়েছে।’
‘হ্যা দেখবো অবশ্যই। কিন্তু আমার কাছে বস্তুর চেয়ে মানুষের মূল্য অনেক বেশী। গাড়ির ড্যামেজ হলে ঠিক করা যাবে। আমরা সুস্থ আছি এটাই আসল কথা। একদম সরি হবে না!’
‘একদম ঝকঝকে নতুন গাড়ি! আমি কি করে ফেললাম!’
ওরা নেমে অন্ধকারে কিছুই পায় না। তখন ফিদা দুষ্টুমি করে বলে –
‘কিছুই তো হয়নি। হলেও ঠিক করতাম না।’
‘কেন?’
নিশাত খুউব অবাক হয়ে জানতে চায়। ফিদা মৃদু হেসে বলে –
‘চাঁদের যেমন কলংক আছে, দেবদাসের পার্বতির যেমন কপালে কঞ্চির দাগ! তেমনই আমার গাড়িতেও এমন কলংকের দাগ হিসেবে রেখে দিতাম!’
নিশাত তখনো বিচলিত। তাই একটা ফ্যাকাসে হাসি দিয়ে বলে
– ‘ইশ! প্রেম একদম উপচে পড়ছে যেন। ভাবী জানলে খুন করে ফেলবে আমাকে!’
ফিদা হাসে কিছু বলে না।
ফিদা গাড়ির ড্রাইভিং সীটে বসে। নিশাত আবার বলে – ‘সরি!’
ওর অসস্তি ভাব টা যাচ্ছে না। তা দেখে ফিদা বলে –
‘শোন তুমি তো লার্নার এখনো। ভুল হতেই পারে। আমি তোমাকে বলেছি চালাতে। তোমাকে সাহস দিয়েছি। ভুল হলে আমার জাজমেন্টে ভুল। গাড়ি সোজা রাখা আরো কিছু প্র্যাক্টিস করতে হবে। খামাখা কষ্ট নিয় না। আর আমি তো বলেছি বস্তুর থেকে মানুষের সব কিছুর মূল্য আমার কাছে অনেক বেশী।’
মনে হয় নিশাতকে দেখে কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

নিশাতের বাসার গলির কাছে যখন আসে, নিশাত নিজে নিজেই বিড়বিড় করে বলে – ‘তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। তোমাকে আমি কখনো ভুলতে পারবো না!’
নিশাতের স্বরে এমন জিছু ছিল যাতে ফিদাও খুবই আবেগান্বিত হয়ে যায়। কিছু বলে না। নিশাতকে তাঁকিয়ে দেখে শুধু। নিশাত নেমে যাওয়ার সময় প্রায়ই ফিদা রসিকতা করে বলে – ‘কিছু ফেলে গেলেন কি?’
যেমন্ টি বাসের দরজার উপর লেখা থাকে। নিশাত হেসে বলে হ্যা – ‘শুধু মন টা রেখে গেলাম!’
ফিদা চমকিত পুলকিত দুটোই হয়। কিছু বলে না। শুধু স্মিত হেসে ওর চোখে চোখ রাখে।

ভালই চলে কয়েকদিন এমন। অফিস থেকে সুইমিং এ যাওয়া বা কোন দিন সরাসরি পূর্বাচলে যাওয়া। কখনো লং ড্রাইভে। রোজ টেক্সট ফোন কল তো আছেই। সকালে অফিসে পৌছে একবার নিশাত ফোন করেই। এরকম একদিন ফোন করে গল্প চলছিল। নিশাত এক পর্যায়ে বলে –
‘সেদিন তোমাদেরই এক ইয়াং মেম্বারকে দেখলাম সাঁতার শেখার চেষ্টা করছে। কিন্তু হচ্ছে না। আমি গাঈড করলাম। কিছুটা ধরতে পারলো।’
‘আচ্ছা।’
‘ও ডাব্লিউ এইচ ও তে কাজ করে?’
‘কিভাবে জানলে?’
‘পরে অনেক কথা হলো। তখন কি করে জিজ্ঞেস করলাম!’
ফিদা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বললো –
‘তুমি সবার সাথেই এরকম কর না?’
‘কি রকম?’
‘এই যে যেচে পড়ে কথা বলা, তার সম্বন্ধে নিজে নিজেই ডিটেইল জানা!’
‘কি আশ্চর্য! আমি বলেছিনা কত জনকে সাঁতার শিখিয়েছি! কেউ শিখতে যেয়ে না পারলে আমার খারাপ লাগে। তাই হেল্প করি।’
‘তারপর গল্প শুরু কর রোজ। আবার কবে আসবে জিজ্ঞেস করেছ?’
‘না।’
‘করতা? তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব তারপর প্রেম ...’
‘সবার সাথে তা হবে কেন? কতজনকেই তো শেখালাম। কারো সাথে তো এরকম হয় নি!’
‘আমি সেটাই বলতে চাচ্ছি। তুমি যেমন ভাবে গায়ে পড়ে ছেলেদের সাথে মিশ সেটা আমার পছন্দ না।’
‘তাহলে কি আমাকে বন্দী করে রাখতে চাও। আমার সামনে একটা অদৃশ্য ওয়াল তৈরী করতে চাও? আমি কারও বন্দীত্ব স্বীকার করিনা। বনিরটাই করি নাই!’
‘তুমি যে করবে না তা আমি জানি। আমি কথা শেষ করি নাই। আমি তোমার স্বভাব পাল্টাতে বলি নাই! এরকম স্বভাব জানলে তো আমি প্রেমেই পড়তাম না! আমার কাছে শুধু একটা জিনিষ খারাপ লেগেছে। মনে করেছিলাম তুমি বুঝবে।’
‘জানি না আমি।’
একটু বিরক্তি নিয়ে বলে নিশাত।
‘যেই ভাবে আমাদের পরিচয় হয়েছে, পরে প্রেম। সেটা আমার কাছে খুব মূল্যবান। তোমার কাছে হয়তো না। তুমি কত ছেলেকেই কর। আরও কত ছেলের সাথেই করবে। কিন্তু পার্টির্কুলার এই ঘটনাটা আমাকে না বললেও পারতে। এটা আমার কাছে খুব নিজস্ব একটা মূল্যবান জিনিস। তোমার কাছে না হয়তো। কিন্তু আমাকে এরকম ঘটনা শুনিও না।’
নিশাত চুপ করে থাকে। ফিদা আবার বলে – ‘আমি কি বোঝাতে পেরেছি?’
‘এর মধ্য খারাপ কি জানি না!’
‘খারাপ ভালর কথা বলি নাই। আমি শুধু বলেছি এটা তোমার বোঝা উচিত আমার ঐ গল্প কেন খারাপ লেগেছে। আমি কিছু করতে মানা করি নাই। আমি শুধু আমাকে বলতে মানা করেছি।’
‘আচ্ছা।’
এরপর আর গল্প বেশী আগায় না। এলোমেলো কথার পর হঠাৎ রেখে দেয় নিশাত। পরে ফোন করবে বলে। কিন্তু করে না আর। রাতে সুইমিং এ আসে দেরী করে। তাই আর কোথাও যাওয়া হয় না। স্বাভাবিক কথা বার্তা হলো।
পরদিন ছুটি ছিল। সকালের দিকে টেক্সট পেলো। কেমন দার্শনিক ধরনের। ও নাকি ভোর বেলায় সাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিল। বহুদিন পর সকাল হওয়া দেখলো। নিজেকে আলাদা ভাবে আবিস্কার করলো। যেখানে কেউ নেই। শুধু ও আর প্রকিতি। নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলো। নিজের স্বাধীন ইচ্ছে গুলো জাগ্রত হলো। আরো এরকম অনেক কিছু। ফিদা একটু লেফট আউট অনুভব করছিল। প্রথমে জানতে চাইলো – ‘সকালে বের হলা আমাকে বলনি কেন?’
‘আপনি তো ঘুমান। আর বাসায়ও কি বলতেন?’
‘সেটা তো পরের কথা। যাচ্ছ যে টেক্সট করলেই পারতে?’
‘ওহ! আমি আসলে একাই যেতে চেয়েছিলাম!’
‘ও!’
নিশাত ওর নিজের জগতের বর্ননা দিতে থাকে। আর ফিদা ততবারই লেফট আউট ফিল করে। বারে বারে নিজের কথা বা নিজের অবস্থান ওর মনের কোন খানে আছে জানতে চেষ্টা করে। নিশাত এর কোন উত্তর না দিয়ে ওর স্বাধীন জীবন যাপনের কথাই বলে যায়। এক পর্যায়ে ফিদা বেশ বিরক্ত হয়ে বলে ওকে আর এরকম টেক্সট না করতে। নিশাত আর হোয়াটসএপে টেক্সট করেনা। কিন্তু বিকেলের দিকে ম্যাসেঞ্জারে একটা ছবি পাঠায়। বাচ্চাকে মা দুধ খাওয়াচ্ছে। খোলামেলা চিত্র। কোন কিছুর বিজ্ঞাপন। নিশাত জানতে চায় এ ছবিটা দেখে কি মন্তব্য করবে ফিদা। অশ্লীল নাকি আর্ট। ফিদার এমনি মেজাজ খারাপ ছিল নিশাতের এমন নিজেকে আলাদা করে রাখায়, তারমধ্যে ওর জীবন যাপন নিয়েও অনেক প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে দিনে দিনে। তাই এরকম একটা ছবি পাঠানোতে রেগে যায় ফিদা। উত্তর লেখে –
‘তুমি যতই এটাকে আর্ট হিসেবে দেখাতে চাও পুরুষের প্রধান দৃষ্টি থাকবে সুন্দরী মেয়েটার স্তনে। তুমি যাই বল না বল।‘
পরে টেক্সট করে – ‘আর আমাকে টেক্সট করবে না এরকম!’

নিশাত আর যোগাযোগ করে না। সন্ধ্যায় ফিদা কিছু কেনাকাটার জন্য বের হলে ফোন দেয় নিশাত কে।
‘কোথায় তুমি?’
‘এই তো ক্রিসেন্ট হসপিটালে?’
‘উত্তরায় আসলে আর আমাকে ফোন দিলে না?’
‘আপনি তো যোগাযোগ করতে মানা করলেন!’
‘আমি মানা করিনি। বলেছি ওরকম টেক্সট আর না করতে।’
‘যাই হোক আমি এখানে একটা কাজে এসেছি।’
‘কি কাজ। কেউ অসুস্থ?’
‘হ্যা।’
‘কে?’
‘আপনি চিনবেন না।’
‘কে তা বলা যাবে না?’
‘আমরা একটা সংগঠন করি। যেখানে কারো রক্ত লাগলে আমরা যে পারি দেই। এরকম একজন কে দিতে আসচি রক্ত।’
‘আমি তো মাস্কাট প্লাজার ওখানে আছি। দেখা করতে পারবে না?’
‘আসলে এখানে কতক্ষণ লাগে বলতে পারি না।’
‘খুব জরুরী তোমার জন্য?’
‘হ্যা। আপনাকে বোঝাতে পারবো না।‘
‘তুমি না পারলেও আমি বুঝি যে আমার যত জরুরী নিজের ফ্যামিলি অফিস ক্লোজ ফ্রেন্ড যেই হোক না কেন, তুমি ডাকলে চলে আসতে হয়। আর আমি ডাকলে একটা অচেনা অনাত্মীয় লোকের জন্য তুমি আসতে পার না। ঠিক আছে থাক তোমার সমাজ সেবা নিয়ে।’
কেটে দেয় ফোন ফিদা রাগ করে। একটা শপিং মলে কিছু কেনাকাটা করছিল। একটু পরেই নিশাতের ফোন আসে।
‘কই?’
‘যেখানে বলেছিলাম সেখানেই।’
‘নীচে আসেন’
‘আচ্ছা।’
ফিদার গলা একটু ধরে যায় এটা বলার সময়। আশা করেনি যে চলে আসবে। একটু ভারমুক্ত লাগে। কিছুটা ফুরফুরে মন নিয়ে নেমে আসে নীচে দ্রুত। নিশাতকে দেখতে পায় ওর সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে অমবস্যার ঘনঘটা। খুব শুষ্ক কন্ঠে বলে – ‘কি বলবেন বলেন?’
‘কোন বিশেষ কিছু বলার জন্য তো আসতে বলিনি!’
‘তাহলে কি জন্য বলেন। আমি বেশীক্ষণ থাকতে পারবো না। আসতে বললেন তাই আসলাম।’
‘ও-ও! ......... তোমার আজ কি হয়েছে?’
‘কিছু হয় নি তো!’
‘তো এমন উল্টো পাল্টা টেক্সট পাঠাচ্ছিলে কেন? আমি যতবার বলেছি আমাদের নিয়ে কথা বল, ততবার তুমি কি সব পাঠাচ্ছিলে! কালই আমার খারাপ লেগেছিল বললাম, তুমি তো পাত্তাই দিলে না, আবার আজ ......’
‘আজকে আমি আমার নিজের ভুবনে ছিলাম।’
‘থাকতে আমাকে বিরক্ত করছিলে কেন?’
‘করিনি তো আর আপনি মানা করার পর।’
‘তারপর ম্যসেঞ্জারে ঐ ছবিটা পাঠালে কেন? ... তোমাদের মত নারীবাদীদের আমার মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানো? ......’
কথা শেষ করতে পারে না ফিদা। নিশাত সাইকেল নিয়ে হাঁটা দেয়। খুবই রাগ হয় ফিদার নিশাতের এভাবে চলে যাওয়া দেখে। রেগেমেগে একটা সিগারেট ধরায়। আরকি করবে ভেবে না পেয়ে। একটাই প্রশ্ন কুড়েকুড়ে খায়। এই মেয়েটার কি হয় কিছু দিন পরপর!
আর কোন যোগাযোগ হয় না। পরদিন অফিস থেকেও না। সন্ধ্যায় ক্লাবে যেয়ে সুইমিং করে। আশা ছিল পাবে নিশাতকে পুলে। আসে না বা নিশাতের সাথে দেখা হয় না। সাঁতার শেষ হলে উপরে বারে যায়। একটার পর একটা বিয়ার চলতে থাকে। কোরোনা বিয়ার। বিয়ারের মধ্যে সবচেয়ে মধুর। তেতো ভাবটা কম। ফিদা তো তিন চার চুমুকেই শেষ করে ফেলে। সবাই হাসে ওর বিয়ার খাওয়া দেখে। এক ছোট ভাই ক্লাবমেট বলে – ‘ভাই আমি আপনার সাথে বসবো না আর।’
‘কেন কি সমস্যা ভাই?’
‘আমি আপনার আগে এসে একটা ড্রিংক শেষ করতে পারলাম না আর আপনি তিন নাম্বার বিয়ার চালাচ্ছেন!’
দুজনেই খুব হাসে। আরো কিছু পর পানীয় মটামুটি ভালই ধরে ফিদাকে। তখনই মাথায় ভূত শয়তান চাপে। মনে হয় নিশাতকে ফোন করে দেখে কোথায় সে।
‘আসসালামু অলাইকুম’
‘কোথায় তুমি?’
‘ক্রিসেন্ট হসপিটালে’
‘ঐ সেই কেইস’
‘হুম।’
‘আমি ক্লাবে আছি। তুমি আসবে না ক্লাবে আজ?’
‘না!’
‘তাহলে আমি বের হচ্ছি ক্লাব থেকে একটু পর। তোমাকে হস্পিটাল থেকে তুলে নিব।’
‘নাহ! আমি কোথাও যাব না।’
‘কেন?’
‘এদিকে কাজ আছে আর ইচ্ছেও নেই তাই।’
‘কেন ইচ্ছে নেই?’
‘কোন কারন নাই।’
‘রাগ দেখাচ্ছ? রাগতো দেখাবো আমি! কি শুরু করেছে দুদিন ধরে?’
নিশাত কোন উত্তর দেয়া না। ফিদার রাগ আরো চড়ে যায়। চিৎকার করে বলে –
‘আমি বলেছি তাই আসবে। তুমি যখন ডাক তখনতো নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাও। যখন বল তখনই আসতে হয় আমার সব কিছু ছেড়ে! এখন আমি বলেছি আসতে হবে।’
‘আমি কখন নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরালাম?’
‘আমাকে এখন একটা একটা করে বলতে হবে?’
‘আমি আসবোই না। রাখছি।’
নিশাত রেখে দেয়। ফিদা দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কি করবে বুঝতে পারে না। ফোনে কথা বলার জন্য বারের বাইরে এসেছিল। আবার বারে ঢুকে। আর কিছুক্ষণ ড্রিংক করার পর আবার মাথায় পোকা খোচাতে থাকে। বারান্দায় আসে। ফোন দেয় নিশাতকে। নিশাত ধরে না। আবার ফোন দেয়। কয়েকবার রিং করার পর নিশাত ধরে। ফিদা চিৎকার করে বলে –
‘আমি নামছি। কাছে এসে ফোন দিব। তুমি যেখানেই থাক আমার গাড়িতে উঠবে ...’
কথা বলার সময় দেখে কেউ সিড়ি দিয়ে উঠছে আর অবাক হয়ে ফিদার দিকে তাঁকিয়ে। ফিদা স্বর একটু আস্তে করে। নিশাত খুব শক্ত করে বলে – ‘না!’
ফিদার গলা আবার চড়ে যায়। বলে –
‘তুমি আসবাই। যদি না আস তোমার বাসার সামনে যেয়ে চিতকার করে ডাকবো। আমার কিন্তু কোন হুশ নাই! পুরো টাল! সো চিন্তা করে দেখ। আমি রওনা দিচ্ছি তোমার বাসার দিকে।’
‘আমাকে হসপিটাল থেকে নিয়ে যান। কাছে এসে ফোন দিয়েন।’
‘ওকে গুড গার্ল!’

ক্রিসেন্ট হাসপাতালের নীচে থেকে নিশাতকে তুলে নেয় গাড়িতে। নিকুঞ্জের কাছে ফ্লাই ওভারের উঠে উল্টোবাঁক নিয়ে তিনশ ফিটে নামে। গাড়ি চলছে রকেটের গতিতে। সেই সাথে ফিদার মুখ চলে রকেটের পিছিন থেকে বের হওয়া জ্বলন্ত জ্বালানীর মত। দুদিনের পুঞ্জিভুত সমস্ত রাগ ঝারে নিশাতের উপর। নিজেও জানে না কি বলে কেন বলে। ওকে বাজে মেয়ে, সারাক্ষণ ছেলেদের সাথে ঘোরে। ক্যাম্পিং ট্যাম্পিং এ যেয়ে কি করে না করে। নিশ্চয়ই ছেলেদের সাথে সেক্স করে। আরো কত কি। নিশাত ওকে ওর জীবন সম্পর্কে যা যা বলেছিল সব ব্যাক ফায়ার করে নিশাতের উপর। নিশাত খালি বলে – ‘আস্তে চালান গাড়ি, সাবধানে!’
ফিদার গাড়ি কিভাবে চলছে কোন রাস্তা যাচ্ছে কিচ্ছু খেয়াল নেই। সব খেয়াল নিশাতের উপর ক্ষোভ সংবরণ করা। কোন এক সময় বলেছিল ও বিদেশে গেলে একদম খোলা মেলা কাপড় পড়ে। একবার নাকি নুড বীচেও গিয়েছিল। যখন শুনেছিল তখন কেন যেন কিছু মনে হয়নি। খালি জিজ্ঞেস করেছিল নিশাতও নুড ছিল কিনা। নিশাত না বলেছিল। কিন্তু এখনকার রাগে ওর সেটাও চলে আসলো।
‘কত খারাপ মেয়ে তুমি নুড বীচে যাও ... ছেলেদের ইয়ে দেখার খুউব শখ না!’
‘কখনো না!’
‘আবার বলো কে আন্ডার ওয়ার পড়েনি কে পড়েছে বুঝে ফেল। সারাক্ষন ছেলেদের ইয়ের দিকে তাঁকাও না? তোমাদের মত মেয়েরা পুরুষদের সমালোচনা করে কিন্তু হাজার পুরুষদের সাথে মিশে, সেক্স করে। তুমিও তাই। সবাইকে তোমার দিকে আকৃষ্ট করতে চাও। একটা হোর তুমি। আর আমার সাথে যত ভাব দেখাও। তোমাকে এমনি তোমার প্রথম প্রেমিক রেইপ করে নি! আজকে আমি করবো!’
নিশাতের কোন সাড়া শব্দ নেই। ফিদার তো মাথার কিছুই ঠিক নেই। বড় রাস্তার পাশে ছোট রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে থামায়। তারপর নিশাতের দিকে হাত বাঁড়ায়, খোলা রাস্তার উপরেই। ফিদা কি করতে যাচ্ছে তা নিজেই জানে না। কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে নিশাত গাড়ি থেকে নেমে উলটো দৌড় দেয়। মাতাল ফিদা হতভম্ব হয়ে যায়। নিশাত এমন করবেএটা ও ভাবতেই পারেনি। তারপর নিশাত ভাবলো কিভাবে ফিদা এই কাজ করবে! এতদিন মিশে ওকে চিনতে পারলো না! কিছুক্ষণ কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ানোর শক্তি টুকু নেই। কিন্তু এই অবস্থায় ওর নিশাতের জন্য দুশ্চিন্তা হয়। ভাবে এত দূর এই নির্জন এলাকায় এত রাতে কিভাবে ফিরবে বাড়ি নিশাত। তাড়াতাড়ি গাড়ি ঘুরায়। কিছু দূর যাওয়ার পর ওকে দ্রুত হাঠতে দেখে। ওর পাশে গাড়ি থামায়। যতদূর মনে পড়ে গ্লাস নামিয়ে বলে –
‘গাড়িতে ওঠো! আমি তোমাকে সোজা বাসায় নামিয়ে দিব। আর কিছু করবো না বলবোও না। এখানে তুমি সেইফ না।’
নিশাত গাড়িতে উঠে। কিছদূর যাওয়ার পর ফিদার বমি আসে। জানালা দিয়ে মুখ বার করে বমি করে। একটু আগায় গাড়ি। আবার বমি করে। এবার গাড়ি থামায়। এমন সময় পুলিশের একটা পিক আপ ভ্যান দেখে সামনে। একজন সাব ইন্সেপ্টরকে ওদের গাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। ফিদা তখনও ঘোরের মধ্যে। তেমন কিছুই অনুভব করে না। একটু একটু শুনতে পায় পুলিশের কথা –
‘কি অসুস্থ?’
নিশাৎ বলে – ‘জী’
‘ড্রিংক করেছেন বোধহয়!’
নিশাত কি বলে শুনতে পায় না ফিদা। পুলিশটা নিশাতকে বলে –
‘আপনি গাড়ি চালাতে পারেন?’
‘জী’
‘আপনি চালান।’
নিশাত দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। ফিদা গাড়ির ভিতরেই সিট পরিবর্তন করে। এই অবস্থায়ও বোঝে নেহাত পুলিশ অফিসারটা বেশ উদার। চাইলেই একটা ঝামেলায় ফেলতে পারতো। নিশাত কিভাবে কোন দিক দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে বাসায় আসে কিছুই মনে করতে পারে না ফিদা। বাড়ির কাছে গেটে এনে দারোয়ানদের কি বলে। ওরা ওকে ধরাধরি করে নিয়ে যায়। গাড়ি ওরাই পার্ক করবে বলে জানায়।
ওকে ধরাধরি করে গার্ডরা ওর ফ্ল্যাটে পৌছে দেয়। নীতা চিন্তিত মুঝে ওকে নিয়ে যায়। খুব অবাক হয় না। কারন আরো দু তিনবার এরকম হয়েছে। ফিদা সরাসরি বিছানায় শুয়ে পড়ে। সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যায়।
পরদিন সকালে উঠে খুব অনুশূচনা হয়। কারন দোষটা পুরোপুরি ওর হয়েছে। নিশাতের জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করে। ওকে এই বিপদে রাস্তায় ফেলে চলে আসতে পারতো! এত কিছুর পরও ওকে ঠিকই নিরাপদে বাসায় পৌছে দিয়েছে। কাল কি করেছে সে নিশাতের সাথে? কেন করেছে? কিছুই মেলাতে পারে না।
অফিসে যাওয়ার পথে ফোন করে নিশাতকে। আশা ছিল ভুল স্বীকার করে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করলে নিশাত পারবে না ওকে ফেরাতে। তার থেকে বেশী দরকার ওকে ধন্যবাদ জানানো। নিশাতের যান্ত্রিক গলা পায় -
‘হ্যালো, বলেন?’
‘নিশাত আমি খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছি। আই ওয়াজ ফুললি ড্রাংক। আমার খুউব খারাপ লাগছে। মাফ করে দাও প্লিজ।’
‘না পারবো না।’
ফিদা কিছু বলতে পারে না কিছুক্ষন। এরকম কাঠখোট্টা ভাবে না বলে দিবে এমন আশংকা করেনি। তাই কি বলবে বুঝে পায় না। তাই শুধু বলে –
‘আচ্ছা! তাহলে আর কি করা। তবে আমাকে রক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ। অনেক বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছ তুমি!’
‘এটা কোন বিষয় না। আপনার জায়গায় যে কেউ হলে তাই করতাম আমি।’
নিশাতের উত্তরে আবার কিছুক্ষণ কি বলবে বুঝে না ফিদা। তারপর বলে –
‘আচ্ছা রাখি।’
নিশাত কিছু বলে না। ফোন কেটে দেয় ফিদা। একেবারেই দিশেহারা লাগে। কি করে কি হারালো। শেষ পর্যন্ত এমন একটা বাজে অপবাদ নিয়ে সম্পর্কটা ছিন্ন হবে! হালকা হালকা মনে আছে ও খুব বাজে বাজে কথা বলেছে নিশাতকে। যেগুলো সে নিজেই বিশ্বাস করে না। তারপর ওর শারীরিক শোষন বা ধর্ষনের কোন ইচ্ছা বা নিয়ত ছিল না। ও পুরো বেহুশ ছিল। আর প্রচন্ড ক্ষোভ জমেছিল নিশাতের দুদিনের এমন অদ্ভুত আচরণে। যখনই নিশাত একটু দূরে সরে যায় অথবা ওর আচরেণে নিজেকে খুঁজে পায় না। তখনই ওর মনের মধ্যে নৈরাশ্য জন্ম নেয়। মদ্যপান নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তারপর সমস্ত হতাশা ফেটে পড়ে নিশাতের উপর এমন রুঢ়ভাবে। এরকম চক্র চলছে সম্পর্কের শুরু থেকেই। নিশাত সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আবার নিশাতই ফিরে এসেছে পরে। কিন্তু এবারেরটা অন্যরকম। যেই জিনিষিটাকে নিশাত ঘৃণা করে, নিজের জীবনের কষ্টের কথা বলেছে ফিদাকে। তেমন কাজই করতে যাচ্ছিল ফিদা! অন্তত নিশাততো তাই মনে করছে! কি করবে কিছুই ভেবে পায় না। এমন হৃদয়হীন নগ্নভাবে ‘না’ শব্দটি শোনেনি নিশাতের থেকে ফিদা। প্রতিবার সম্পর্ক ছিন্ন হলেও একটা আশার আলো ছিল সুরঙ্গের ওপাশে। এবার কোন আলোর দেখাই পাচ্ছে না। আছে শুধু অন্ধকার।
অফিসে পৌছে বারবার মনে করে এই বুঝি নিশাতের ফোন আসবে। ফোন আসে, কিন্তু তা নিশাতের না। কাজের, অকাজের। হোয়াটসএপে ম্যসেজ পাওয়ার নোটিফিকেশনের আওয়াজ শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকে। কোণ টেক্সটই আসে না। এভাবে দিন যায়। নীচে সিগারেট খেতে যেয়ে মনে হয় এই বুঝি নিশাত ফোন করে বলবে – ‘নীচে নামেন!’ কিন্তু আসেনা সেই আকাংখিত ফোন। অনেকবারই এমন হয়েছে। কিন্তু কোনবারই এত খারাপ লাগে নি। কারন নিশাতকে দোষী মনে হয়েছে আর নিজের মধ্যেও একটা আত্মবিশ্বাস কাজ করেছে যে নিশাতও ওকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। তাই হয়েছেও। কিন্তু এবার যে ফিদাই দোষী। যা করেছে তার থেকে অনেক বেশী অভিযুক্ত করেছে ফিদাকে নিশাত।
সন্ধ্যায় ক্লাবে পুলে নিশাতকে পায় না। সাঁতার কেটে উপরে বারে যায়। নৈরাশ্যে নিমজ্জিত হয়ে প্রতিবারের মত একটার পর একটা বিয়ার শেষ করে। এক পর্যায়ে অস্থির হয়ে অনেক ক্ষমা চেয়ে টেক্সট করে। নিশাতের কোন উত্তর আসেনা। মদ্যপ অবস্থায় বাসায় যেয়ে ঘুম। সকালে যথারীতি অফিস। সকাল দশটার দিকে ফোন পায় নিশাতের। খুব আশা নিয়ে ফোন ধরে। ‘হ্যালো’ বলতেই ওর চিরাচরিত সম্বধন –
‘আসসালামু অলাইকুম’
আর সাথে  যোগ করে – ‘অভ্যাস বশত ফোন দিলাম।’
‘কেমন আছ?’
‘ভাল নেই। আপনার কারনে আমার পা ভেঙ্গে গেছে! এখন অফিস যেতে পারছিনা। কতদিন অফিস কামাই হবে, সাঁতার কাটতে পারবোনা কে জানে!’
‘মানে! কিভাবে?’
‘গাড়ি থেকে দৌড়ে বের হওয়ার সময় কোন উঁচু কিছুতে লেগে পা মচকে যায়। এখন সে জায়গাটা ফুলে আছে। আমি তো অফিস যাইনি!’
‘কি বলো? তুমি দৌড়াতে গেলে কেন? আমি কি কিছু করতাম?’
‘অবশ্যই করতেন? আপনি হাত দিয়েছিলেন আমার গায়ে!’
‘আমার কি কোন বোধ শক্তি বা গায়ের জোড় কিছুই কি ছিল?’
‘চেষ্টা ঠিকই করতেন। আমার এমন চেহারা জানা আছে। আমি দেখেছি আপনাকে। আপনি তো দেখেন নি!’
‘এতদিন আমাকে দেখলে। একা একা কত জায়গায় কাটালে। আমাকে কোনদিন দেখেছ এমন! এমন মনে করলে কিভাবে?’
‘যখন হয় তখন এরকম হঠাতই হয়।’
‘তোমার খারাপ অভিজ্ঞতার কারনে হয়তো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু আমি তো আমাকে চিনি। আমি কোনদিন কাউকে খুন করতে পারবো না, রেইপও করতে পারবো না।’
‘আমি না পালালে কি হত কে জানে?’
‘আমার মনে হয় তুমি অতি রিয়াক্ট করছো। বাদ দেই এই ব্যপার। এখন বল পায়ের কি অবস্থা! ডাক্তার দেখিয়েছ?’
‘এই অবস্থায় যাব কিভাবে, দেখি আজ কোন উবার ডেকে যদি যাওয়া যায়?’
‘কোথায় দেখাবে?’
‘ঐ ক্রিসেন্টে ওখানে এক পরিচিত ডক্টর আছে।’
‘আমাকে যদি আস্থা না পাও আমি কি গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব?’
‘আপনার কিছু করা লাগবে না। জানানোর দরকার ছিল জানিয়েছি। এখন রাখতে হবে। কাজ আছে।’
নতুন উপদ্রপ ঘাড়ে এসে পড়ে যেন ফিদার। এতক্ষণ কেবল ভাবছিল কিভাবে বোঝাবে যে ও মদ্যপ হলেও কিছুই করতো না। শুধুমাত্র মাত্ত্রাতিরিক্ত মাতাল থাকায় ও রাগের কারনে ওকে কষ্ট দিতে চাচ্ছিল মানসিক ভাবে। শারীরিক কোন ইচ্ছাই ছিলনা ফিদার। বোঝাতে তো পারলোই না। উল্টো নতুন এক ভয়ানক অভিযোগে অভিযুক্ত হলো। ওকে অভিযুক্ত করার জন্য না, নিশাতের ক্ষতির কথা চিন্তা করে খুউব খারাপ লাগলো ফিদার। দিনটা এমনি যেত, আরো গেল! কাজের ফঁকে ফাঁকে টেক্সট করে ওকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে গেল। কিভাবে ওকে সাহায্য করতে পারে তাও জানতে চাইলো বা পথ দেখালো। কিন্তু উত্তর এত নেতিবাচক এলো যে ফিদা আরও অস্থির হয়ে পড়লো। ওর তো কিছুই মনে নেই কি কি বলেছে গাড়িতে, সারা রাস্তা। ফিদা নাকি ওর সবচেয়ে প্রিয় কাজ গুলোকে নোংরা করে দিয়েছে ওসব জায়গায় সেক্সের কথা তুলে। যেখানে ও সবচেয়ে পবিত্র অনুভব করতো। যেটা ছিল ওর একান্ত নিজস্ব জগৎ। সেই জায়গাটাও নষ্ট করে দিল ফিদা। নিশাতের প্রতিটি অভিযোগ শেলের মত বিঁধছিল ফিদার অন্তরে। প্রচন্ড অনুতপ্ত বোধ করছিল। শেষে অনুশোচনায় আবেগপ্রবণ একটু বেশী হয়ে লিখলো –
‘আমি তো কোনভাবেই তোমার ক্ষতিপূরণ করতে পারছিনা! এক কাজ কর। তুমি থানায় অভিযোগ কর এটেম্পট টু রেইপের, আমি নিজে যাব ধরা দিতে। তোমার যদি এত ক্ষতি করে থাকি, তাহলে আমার নিজের এবং আমার সম্মান ধুলিস্মাত করে অভিযোগ মেনে নেব। তোমার চিকিতসার দায়িত্ব তো নিতে রাজী আগেই বলেছি। তবুও তুমি একটু শান্তি পাও। কারন তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি স্থির থাকতে পারছিনা। আমি বুঝিই নি যে কি ক্ষতি করেছি।’
সাথে সাথে ফোন আসে নিশাতের –
‘এই কি পাগলামো শুরু করলেন?’
‘পাগলামো না। যা বলেছি মীন করেই বলেছি?’
‘আমি কেন আপনার নামে অভিযোগ করতে যাব?’
‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তোমার মনে হয়েছে আমি তোমাকে রেইপ করতে যাচ্ছিলাম! সুতরাং তোমার বিচার চাওয়ার অধিকার আছে। আর আমি যেহেতু তোমাকে ভালবাসি তাই আমি অভিযোগ এলে নিজেই ধরা দিব। তবুও তুমি শান্তি পাও!’
‘আমি কোন দিন আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবো না। যার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে তার কোন ক্ষতি আমি জীবনে করি না। বন্ধুত্ব থাকুক না থাকুক। .....আর আমি সব টেক্সট ডিলিট করে ফেলি যাতে কোনদিন চোখে পড়ে রাগ না হয়।’
‘তাহলে তোমার চিকিৎসায় সাহায্য করতে দাও। তোমাকে দরকার হলে অফিসে আনা নেওয়া আমি করবো বা কোন রেন্টে কার হায়ার করবো!’
‘আচ্ছা লাগোলে আমি বলবো। মনে হয় না যদিও লাগবে।’
আস্তে আস্তে স্বাভাবিক কথাবার্তায় ফিরে আসে ওরা। কিছুটা স্বস্তি ফিরে পায় ফিদা।

ওর পায়ের অবস্থা জানতে চাইলে তেমন সঠিক কোন তথ্য উদ্ধার করতে পারে না। ডাক্তার নাকি ক্র্যাব ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। স্প্রেইন কিনা তাও পরিস্কার করে বলে না নিশাত। কয়েকদিন স্কুটি চালায় না। কিন্তু সুইমিং করে। যাওয়ার সময় নামিয়ে দেয় ফিদা ওর বাসায়। পরের শনিবারে নিশাতের সেই ট্রেনিং ছিল। যথারীতি নিশাতকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গুলশানে নামিয়ে দিয়ে যায়। নিশাত বলে ওকে পাচটার দিকে তুলে নিতে এখান থেকে। না হলে কিভাবে যাবে ও। তাই পাঁচটার আগে ফিদাকে অফিস থেকে বের হতে বলে উপদেশ দেয় –
‘এত কাজ করে লাভ কি। কেউকি আপনাকে মূল্যায়ন করবে। আগে নিজের টা দেখতে হয়!’
‘হুম।’
ফিদা চলে যায় অফিসে। বেশ কিছুক্ষণ কাজ করার পর নিশাতের অদ্ভুত অদ্ভুত সব টেক্সট আসতে থাকে যা ফিদার খুবই আজব লাগে! এই সকালে নামিয়ে দিয়ে আসলো নিশাতকে। কোন সমস্যা নেই। ওকে ফেরত নিতে আসতেও বললো। এখন বলছে ওদের এই সম্পর্ক রাখা ঠিক হবে না। একটার পর একটা লিখেই যাচ্ছে। ফিদা কি বলছে তার উত্তর না দিয়েই। শেষে ফিদা বলে দিল আর টেক্সট না করতে। নিশাতও ওর চিরাচরিত শব্দ ব্যবহার করে টেক্সট পাঠায় – ‘বাই ফর এভার!’
ফিদা হতবাক হয়ে যায় নিশাতের কোন উপসর্গ ছাড়া এমন পল্টি মারাতে। মাথার ভিতর মগজগুলো যেন একশো ডিগ্রী তাপমাত্রায় ফুটে টগবগ করতে থাকে। হাতের কাজ শেষ করে সোজা বাসায় চলে যায়। মাথা থেকে প্রেমের ভূত পুরোপুরি দূর করে ফেলতে চায়। ইংরেজী একটা শব্দের ভাল বাংলা খুঁজে পায় না। টেন্টেলাইজ – বারে বারে আশা দিয়ে পরে প্রতারণা করা। সেটাই নিশাতের চরিত্র হিসেবে ধরে নেয়। দরকার নাই ওর নিশাতের পিছনে আর নাঁচার।
একটু আগেই অফিস থেকে বেরিয়েছিল। বাসায় এসে একটা ঘুম দেওয়ার চেষ্টা করে। ফোন বেজে উঠে। দেখে নিশাতের ফোন। কেটে দেয়। ভাগ্য ভাল নীতা রুমে ছিল না। থাকলে কার ফোন কার ফোন বলে মাথা খারাপ করে দিত। আবার ফোন দেয় নিশাত। এবারো কেটে দিয়ে টেক্সট পাঠায় –
‘আমি বাসাতে। কেটে দিচ্ছি। তারপরও কেন বার বার ফোন করে বিপদে ফেলছো?’
নিশাতের সাথে সাথে টেক্সট আসে দুঃখ প্রকাশ করে –
‘সরি জানতাম না আপনি বাসায়। জানলে রিং করতাম না।’
একতু পর আবার লিখে –
‘আমাকে না আপনার নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল? এখন আমার পায়ের এই অবস্থায় যাব কিভাবে?’
ফিদা নিশাতের এমন ক্ষণে ক্ষণে উল্টোবাঁক নেওয়া আচরণে হতভম্ব হয়ে যায় ফিদা। সেই সাথে যোগ হয় প্রচন্ড ক্রোধ। দুপুরে বললো সম্পর্ক খতম, এখন বলছে ওকে নিয়ে আসতে। ফিদা কি ওর ড্রাইভার! উত্তর দেয় -
‘আমি এখন আসতে পারবো না। সবকিছু খতম করে এখন আবার নিতে আসতে বলছো কেন? আমাকে ছেলেভোলানো কথা শুনিয়ে তোমার থকে দূরে সরিয়ে দিবে? দরকার নেই। আমি যা বোঝার বুঝেছি। এখন কোন অজুহাতে বাসা থকে বের হতে পারবো না।’
‘আসেন না কথা বলি?’
‘না।’
‘ঠিক আছে আমি ক্লাবের দিকে যাচ্ছি। যদি আসেন দেখা হবে।’
ফিদা কোন উত্তর দেয় না। মাথা ঠান্ডা করে একটু তন্দ্রায় যেতে চায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই নিশাতের টেক্সট আসতে থাকে ওর সর্বশেষ অবস্থান জানাতে থাকে। একসময় জানায় –
‘আমার সাঁতার শেষ। কি করবো? চলে যাব না ওয়েট করবো আপনার জন্য?’
‘চলে যাও। আমি কখন যাব বা আদৌ যাব জানি না। আর টেক্সট করনা আমার পাশে নীতা আছে। কেন বারে বারে ঝামেলায় ফেলছো?’
‘সরি!’
আর কোন টেক্সট করে না নিশাত। কিছুক্ষণ কাংখিত তন্দ্রা দিয়ে ক্লাবের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ফিদা। ক্লাবের কাছাকাছি এলে নিশাতের টেক্সট আসে – ‘কই?’
ফিদা লিখে – ‘ড্রাইভিং। ফোন কর।‘
সাথে সাথে নিশাতের কল আসে। ফিদা বেশ রেগেই উত্তর দেয় –
‘তুমি কেন আমাকে বিপদে ফেলছিলা বলতো? আমি বাসায় আছি শুনেও ফোন আর টেক্সট করেই যাচ্ছ?’
‘সরি আমি খেয়াল করিনি।’
‘বনির সাথে থাকলে আমি যদি এমন করি তখন তোমার কেমন লাগবে?
‘বললাম তো ভুল হয়ে গেছে। খেয়াল করিনি।’
‘কি চাও বলতো?’
‘আমার কিছু সমস্যা হচ্ছে। তাআই নিয়ে আলাপ করতে চাচ্ছিলাম।’
‘তুমি তো খতম বলে বাই ফর এভার বললে! আর কি কথা? আমি আর বান্দর নাচ নাচতে রাজী না। আসলে যা কথা দিয়েছিলে গার্ল ফ্রেন্ড বয় ফ্রেন্ড সেইভাব আস না হয় তোমার ভাষায়ই খতম!’
‘আমি তো খতম করিনি এমনি বলেছিলাম!’
‘তোমার কাছে তো এটা একটা ছেলে খেলা। আজকে আছে কালকে নেই। আমি তো বারবার তোমাকে বলেছি ফিরে আর না আসতে। আমি কোন দিন কল বা টেক্সট করেছি তুমি খতম বলার পর? তুমিই করেছ বারবার। তোমাকে সোজা সাপ্টা কথা বলি।’
‘বলেন।’
‘এবার আসলে নো হাংকি পাংকি। স্রেইট গার্ল ফ্রেন্ড। এবং আমার সাথে বেডে যাবে। এই সব ভমিতা আর বারবার ইউ টার্ন নেওয়া আমি আর দেখতে চাই না।’
খুব রাগ থেকেই বলে ফিদা। নিশাতকে পরীক্ষা করতে চায়। নিশাত শীতল স্বরে বলে – ‘নাহ! সেটা আমি পারবো না।’
‘পারলে সোজা এখন বেডে যাবে, না হলে ফুটো।’
আরও বিরক্তি আর অবজ্ঞা করে বলে ইচ্ছে করেই। নিশাতের অতি নাটকীয় সব আচরনে ক্ষুব্ধ ফিদা।
নিশাত চিৎকার করে বলে – ‘না! কখন না।’
বলে লাইন কেটে দেয়। ফিদার রাগ মনে হয় কিছুটা শান্ত হয়। নিশাতের মত খেলা ও খেলতে পারে না বা জানে না। কিন্তু ওর এরকম ফিদাকে বারেবারে নাচানোর জন্য নিশাতকে অপমান করে কিছুটা যেন ওর ক্রোধ লাঘব হয়। ক্লাবে যায়। সুইমিং করে। যথারীতি বারে উঠে সাঁতার কাটার পর এবং নিয়ন্ত্রনহীন পান করে। যাঁদের সাথে বসে তাদের কে কিছু কথা বলেও ফেলে। ওরা নিশাতের সম্বন্ধে আরো খারাপ খারাপ কথা বলে। একজন বলে –
‘আরে আপনাকে পাইসে মালদার পার্টি। দেখে ইচ্ছে মত খরচ করেন। তাই কয়েকদিন টাইম পাস আর পকেট মানির খরচটা তুলে নিচ্ছে আরকি। জীবনে সে আপনাকে ভালবাসবে না। খালি ঘুরাবে!’
ফিদার ঠিক ওদের কথা বিশ্বাস না হলেও খারাপ লাগে না শুনতে নিশাত সম্বন্ধে নেতিবাচক কিছু শুনতে। আসলে নিজের সাথেই নিজের ফাঁকি দেওয়া। জোড় করে নিশাতকে মন থেকে সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু ভয় আছে যে কোন মূহুর্তে ওর ছায়া ফিরে আসতে পারে নিজে নিজেই। তাই ওর সম্বন্ধে বিরূপ মন্তব্য ফিদাকে শক্ত থাকায় সাহায্য করবে।
শক্ত থাকতে পারে। আর একটা আত্মবিশ্বাসও আছে যে নিশাতই ফিরে আসবে যে কোন দিন। দেখতে দেখতে পুরো সপ্তাহ টা পার হয়ে যায়। প্রথম দিকে মন কে আটসাট ভাবে বেঁধে রাখলেও শেষের দিকে একটু মনটা দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু তবুও যেহেতু বলেছে সে নিজে যে কখনো ফিদা ফেরত আসে না। নিশাতই আসে। নিজের কথাকে সম্মান দেখাতে ও কোন যোগাযোগ করে না। তবে বৃহস্পতিবারে রাতে এসে দেখে হোয়াটসএপে নিশাতের একটা মিস কল। রাতে কিছু করে না। একটা ছুতো যেহেতু পেয়েছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে একটা টেক্সট পাঠায় শুক্রবার ছুটির দিনে জুম্মার নামাজে যাওয়ার আগে।
‘তোমার একটা মিস কল দেখলাম কাল রাতে। তুমি করেছিলে নাকি ভুল করে চাপ পড়ে গেছে?’
ফোন গাড়িতে রেখে যায় মসজিদে গেলে। নামাজ শেষ করে গাড়িতে উঠেই ফোন চেক করে। দেখে নিশাতের উত্তর –
‘আমি ফোন করি নি।’
‘তাহলে হয়তো ভুল করে চাপ পড়ে গেছে।’
‘হয়তো।’
‘আচ্ছা। ঠিক আছে এটাই জানতে চাচ্ছিলাম।’
‘কই?’
ফিদা বুঝে যায় বরফ গলেছে। বলে – ‘নামায থেকে ফিরছি বাসায়।’
‘বাহ! নামায শুরু করেছেন? ফোন দিচ্ছি।’
ফোন দেয় নিশাত। ফিদা উত্তরে বলে -
‘জুমমা টা শুরু করেছি কেবল।’
‘তাও তো ভাল। জানেন কাল সন্ধ্যায় আপনার কথা খুব মনে হচ্ছিল।’
‘তাই। আমার তো সব সময়ই মনে হয়।’
‘কাল প্রথম উইকএন্ডে আপনার সাথে কোথাও যাইনি বা দেখা হয়নি।’
‘হ্যা আমারও তাই মনে হয়েছে।’
‘আপনার তো টাইম পাস করার অসুবিধা নেই। কোন একটা উছিলা পেলেই ড্রিংক করেন। কালও নিশ্চয়ই অনেক ড্রিংক করেছেন?’
‘হ্যা। তুমি আমাকে পুরো মদ্যপ বানিয়ে ছেড়েছ।’
‘হ্যা সব দোষ আমার। আগে খেতেন তখন কে আপনাকে মদ্যপ বানিয়েছে?’
‘আগে এত খেতাম না।’
‘ওই বললাম তো সব দোষে আমার।’
‘আচ্ছা বাসায় চলে আসচি। রাখতে হবে।’
‘আচ্ছা কাল কথা হবে। ক্লাবে যাব। অফিস আছে কাল?’
‘আছে।’
‘আচ্ছা দিনেই ফোন দিব।’

হৃদয়ে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে বাসায় ফিরে। ভুলে যায় সাতদিন নিশাতের সাথে কোন যোগাযোগই ছিল না। মনে হয় সবসময়ই ছিল ওর সাথে। আর গত সাতদিন মনে হয়েছে কত দূরের একটা মানুষ নিশাত! ওর সাথে সময় গুলো মনে হচ্ছিল স্বপ্ন!

শনিবার বিকেলে নিশাত ফোন দিয়ে জানায় সন্ধ্যায় উত্তরা ক্লাবে ওদের রোটারেডদের একটা মিটিং আছে। সেখানে আনুষ্ঠানিক কাপড় পড়ে যেতে হবে। তাই অফিস থেকে বাসায় চলে যাবে। ফিদা যেন ওকে ওর বাসা থেকে নিয়ে যায় উত্তরা ক্লাবে। আবার মিটিং শেষ হলে ওকে উত্তরা ক্লাব থেকে বাসায় পৌছে দেয়। ফিদা তো একপায়ে খাড়া নিশাতের সাথে সময় কাটানোর জন্য।
ওকে তুলতে যেয়ে দেখে পুরো সুটেড বুটেড হয়ে এসেছে নিশাত। কালো সুটের সাথে লাল সার্ট।
‘লুকিং ভেরী গরজিয়াস!’
‘তাই! সবসময় পড়ি না তো। শীতের সময় অবশ্য পড়ি।’
টুকটাক কথা বার্তার পর ফিদা জিজ্ঞেস করে –
‘এতদিন রাগ করে ছিলে কেন? কি হয় তোমার কিছু দিন পরপর?’
‘এরপরে এরকম হলে তিন্ মাস কথা বলবো না!’
বলে খুউব হাসে। ফিদাও ওর হাসিতে যোগ দেয়। মাঝে মাঝে আড় চোখে দেখে নিশাতকে। আসলেই সুন্দর লাগছে। ও তো কখনো সাজে না!
‘কি এমন করেছি আমি। তুমি না দূরে সরে যাচ্ছিলে নিজে থেকে!’
‘না আপনি যে ঐ কথাটা বললেন!’
‘কি কথা?’
‘আপনার বেড পার্টনার হওয়ার জন্য! সেটা আমি কোন্ দিন হতে পারবো না!’
‘কখন বললাম? ... ওহ মনে পড়েছে। আরে আমি কি মিন করে বলেছি এটা! তুমি হঠাৎ হঠাৎ আমাদের সম্পর্ক বিনা কারনে ভেংগে দাও সেই রাগে বলেছি।’
নিশাত কিছু বলে না এই নিয়ে। একটু পর ওর রোটারিয়ান গল্প শুরু করে। বলে এটা পুরো লেডিস পার্টি। ওকে খুব খুশি খুশী মনে হয়। নামিয়ে দেয় উত্তরা ক্লাবে। ফিদা ওদের ক্লাবে চলে যায়। বারে বসে অপেক্ষা করে পানীয় আর ক্লাবমেটদের সাথে আড্ডা দিয়ে। ওর মেজাজাও ফুরফুরে। নিশাত দশটার পরে ফোন করে বলে – ‘এখন আসতে পারেন।’
ফিদা রওনা হয়। ক্লাবের কাছে এসে ফোন দেয়। দেখে শাহরিয়ার ঢুকছে ক্লাবে। কিন্তু কিছু বলে না কারন এতদূর থেকে শুনতে পাবে না। একটু পর নিশাত নেমে এসে বলে–
‘শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে দেখা হলো লিফটের সামনে। বললো এখানে কি করছি। বললাম। বললো আমাকে নাকি গর্জিয়াস লাগছে!’

‘হ্যা লাগছেই তো! আমিও তো বললাম!’
‘যেদিন শাহরিয়ার ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল রাস্তায়। আপনি পুলিশের সাথে কথা বলছিলেন আর আমি আর কিশোর ভাই একসাথে ছিলাম, সেদিন বলে কি – উনি নাকি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল হঠাৎ দেখে চিকন কিন্তু ভুড়ি ওয়ালা একটা লোক খুউব রেগেমেগে চিল্লা চিল্লি করছে। পরে দেখে যে সে আপনি! আমার যা হাসি পেয়েছিল!’
বলে খুব হাসে নিশাত। ফিদা বলে –
‘হ্যা ও খুব মজা করে কথা বলে।’
শাহরিয়ার ওর বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেট। অন্য ডিপার্টমেন্টের। এক সময়ের ছাত্র নেতা। পরে ব্যাবসায়ী। খুবই সুদর্শন, লম্বা। এই বয়সেও একদম একহারা শরীর। রাস্তায় একদিন আরেক গাড়িতে ঠোকাঠুকি লাগাতে ফিদা ঐ গাড়ি থামিয়ে পুলিশ ডাকিয়েছিল। কারন অপর গাড়ির ড্রাইভারের পুরো দোষ ছিল। রাস্তার উপস্থিত জনতাও ছিল ওর পক্ষে। শাহরিয়ার ওকে দেখে থামে। অপর পক্ষ বেশী ক্ষমতা দেখাচ্ছিল বলে কিশোরকে ডেকে এনেছিল ক্লাব থেকে। নিশাতই ওকে জোড় করে ক্লাব থেকে নামিয়ে এনেছিল সেদিন। একসাথে যাচ্ছিল যদিও যার যার আলাদা বাহনে। অনেক্ষণ ফিদাকে না পেয়ে ফোন দিয়েছিল নিশাত। নিশাতকে ঘটনা বলাতে নিশাত খুব অভিমান করে বলেছিল –
‘আমাকে ফোন দেন নাই কেন? আমি কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি আপনার জন্য!’
‘সরি আমি এসলে এত ব্যস্ত ছিলাম ঝগড়া ঝাটিতে তাই ফোন করার কথা মাথায় আসে নি। আর তোমাকেও ঝামেলায় জড়াতে চাই নি!’
‘কি আশ্চর্য! আমি আপনাকে জোড় করে নিয়ে আসলাম আর আমি থাকবো না আপনার পাশে!’
‘তুমি খামাখা ঝামেলায় জড়িও না। আমার দুই জন বন্ধু আছে, পুলিশও আসচে, আর আছে পুরো ক্রাউড আমার পক্ষে।’
‘আমি আসছি।’
এভাবে নিশাতের শাহরিয়ারে সাথে পরিচয় হয়।

‘তোমার পার্টি কেমন হলো?’
‘খুব ভাল!’
স্বতর্স্ফুর্ত হাসি নিয়ে বলে নিশাত। ফিদারও খুব ভাল লাগে ওর খুশী দেখে। নিশাত আরো বলে – ‘জানেন আজকে ইচ্ছে মত গান গিয়েছি। সবাই একসাথে। আমি এত গান জানি জেনে সবাই খুব অবাক হচ্ছিল!’
‘তাই!’
হাসি মুখেই উত্তর দেয়। কিন্তু মনে মনে ভাবে ওর গলায় তো সুর নেই একদম। ও বোঝেনা সেটা? পরে ওর জন্য একটু মমতা বোধ করে। মনে হয় আহা সবাইতো আর গাইতে পারেনা। তাই বলে গান গাওয়ার ইচ্ছে থাকবে না। আর কোরাস গাইলে দু’ একজনের বেসুর ধরাও পড়ে না।
একটু পর নিশাত বলে –
‘জানেন গত বৃহস্পতিবার আপনাকে কি যে মিস করেছি?’
‘তো ফোন দিলেই পারতে?’
‘দিব দিব না করে আর দেই নি। আমার বোন আর কয়েকজন ছোট ভাই মিলে মিরপুরে চলে গিয়েছিলাম। একেক হুন্ডায় তিনজন করে। আমার হুন্ডায় আমার সাথে ছোট বোন আর ছোট ভাই ছিল।’
‘তোমার আপন ছোট ভাই?’
‘না-আ!’
‘কাজিন?’
‘না আত্মীয় না, এমনি ছোট ভাই। নাম রিপন’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু একই বাইকে তিনজন গাদাগাদি করে গায়ে গা লেগে যায় না?’
‘কেন লাগবে। আর আমার পিছনে আমার বোন ছিল।’
জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলেও করেনা বোনের পিছনে তো ছিল! কিন্তু আর কিছু বলে না। মনে মনে ভাবে ফিদা, আর ব্রেক আপ করা যাবে না। নিশাত কবে কার সাথে কোথায় চলে যাবে!
‘আমরা ওখানে একটা কাবাবের দোকানে খেলাম।’
‘হ্যা মিরপুর কাবাবের জন্য বিখ্যাত।’
‘আমাদের যে ওয়েটারটা সার্ভ করছিল ওর ...’
বলে খিলখিল করে হেসে দেয় নিশাত। ফিদা জানতে চায় – ‘কি?’
‘ওর বুক গুলো একদম মেয়েদের মত! আর পড়েছে বড় গলার গেঞ্জি, অর্ধেক বেরিয়েছিল ......’
‘ওহ!’
‘আমার খুব হাসি পায়। আমি রিপনের দিকে তাঁকাই। দেখি রিপনও খেয়াল করছে। আমি তাঁকাতেই আমরা দুজনেই ফিক করে হেসে দেই।’
এর আগ পর্যন্ত সহ্য করেছিল ফিদা। যদিও অনাত্মীয় একছেলেকে নিয়ে তিনজন মিলে বাইকে চড়ে যাওয়া ওর পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেই ছেলেকে যতই ভাই বলুক সে তো আর ভাই না। কিছু দিন আগেই ও বলেছিল বাইশ বছরের একটা ছেলেকে ও টেনিং দিত বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালন করে সেটার উপর। ও নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিল নিশাতের জন্য। অনেক কষ্টে তাকে সরিয়েছে। নিশাত যেটাকে স্বাভাবিক আচরণ মনে করে সেটাতো ফ্লার্ট করা সেটা ফিদার থেকে কে ভাল বুঝবে! আর এরকম নোংরা বিষয় নিয়ে একটা ছেলের সাথে রসিকতা করার মত মেয়েকে নিজের প্রেমিকা ভাবতে খুব কষ্ট হয় ফিদার। আবার ছাড়তে পারেনা কি এক মায়ময় যাদুর কারনে। তাই বলে ফেলে নিশাতের ক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়ার আশংকাকে উপেক্ষা করে –
‘এটা নিয়ে তোমার কোন ছেলের সাথে ফান করা ঠিক হয় নাই। সব কিছুরই একটা লিমিট আছে!’
‘এত ফানি একটা জিনিষ! ও আর আমি একসাথে খেয়াল করেছি আর তাঁকিয়েছি তাই আর হাসি আটকাতে পারিনি। আর ওতো অনেক ছোট!’
‘হোক ছোট। সেই বাইশ বছরের ছেলেও তো অনেক ছোট ছিল!’
‘ওটা অন্য ব্যপার।’
‘যেই ব্যাপারই হোক তুমি যতই ফ্রী হও কোন অপজিট সেক্সের কারো সাথে ছেলে মেয়ের শরীরের বিশেষ অংগ নিয়ে রসিকতা বা আলোচনা মোটেও ভদ্রচিত না। এতে মানুষ তোমার ভাষায় মিসরিড করতে পারে। আমি তো কোন মেয়ের সাথে এরকম জোক করবো না!’
নিশাত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে –
‘আসলে আমার ভুল হয়েছে। এরকম জোক শেয়ার করা ঠিক হয়নি ছেলেটার সাথে।’
ফিদা খুব অবাক হয় নিশাতের আন্তরিকভাবে মেনে নেওয়াতে। সাধারনতো এমন ছেলে সংক্রান্ত কোন কথা হলে নিশাত খুবই রেগে যায়। আর বলে ফিদা নাকি ওর সামনে অদৃশ্য ওয়াল তুলে দিচ্ছে। হয়তো মুড ভাল ছিল। খুব খুশী ছিল পার্টির আনন্দে। ফিদার সাথেও অনেকদিন পর বেরাতে বের হয়েছে।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। ফিদার তখন খারাপ লাগে নিশাতের জন্য। বেচারীর মুডটাই নষ্ট করে দিয়েছে ও। না বললেই হত। পরে একসময় বলতো। কিন্তু ফিদার ওর প্রেমিকাকে এত অরক্ষিত, অনির্ভরযোগ্য লাগছিল যে আপত্তি না করে পারেনি। এটা যদি অতিরিক্ত অধিকার বোধ হয় বোঝেনা ফিদা। কারন সম্পর্কের শুরুতে নীতাও এমন অভিযোগ করতো ফিদার সম্বন্ধে। অথচ নীতা একদম সত্যিকারের রক্ষণশীল কিন্তু আধুনিক মেয়ে। নীতার মত ওকে বানাতে চায় ফিদা অবচেতনভাবে সে নিয়েও নিজের মনে সংশয় হয়। তবুও এই ব্যপারটা সত্যই ভাল লাগেনি। তবুও নিশাতের স্বত্স্ফুর্ত খোশ মেজাজটা কে হত্যা করে অনুশূচনা হওয়া থেকে বলে –
‘সরি, আমি তোমার এত ভাল মুডটা একেবারে নষ্ট করে দিলাম!’
নিশাতের চোখ মনে হয় ছলছল হয়ে যায়। তাতে আরো খারাপ লাগে ফিদার। কি বলবে ভেবে পায় না। নিশাতই বলে –
‘না বলে ভাল করেছেন। ওটা আমার ভুল ছিল।’
ওকে বাসায় নামায় দিয়ে ফিরে যায় নিজের বাসায় ফিদা।

পরদিন সন্ধ্যায় নিশাতকে নিয়ে পূর্বাচলের দিকে যাচ্ছিল ফিদা। এমন সময় শাহরিয়ার ফোন করে। ফিদা নিশাতকে দেখায় কার কল। নিশাত ইশারায় বলে ফিদা যেন না বলে যে ও ফিদার সাথে আছে।
‘হ্যালো দোস্ত।’
‘কিরে কেমন আছিস দোস্ত?’
‘ভাল আছিরে দোস্ত।’
‘তোর কথা হঠাৎ মনে পড়লো!’
‘জানি তো দোস্ত!’
‘কি জানিস?’
‘কালকে তোরে উত্তরা ক্লাবে দেখেছিলাম। পরে তোর কারো সাথে দেখা হয়েছে।’
নিশাত আবার ইশারায় মানা করছিল ভুরু কুচকে।
‘ওহ! হ্যা তোর গার্ল ফ্রেন্ডের দেখলাম। হেভী লাগছিল। তোরে বলেছে?’
‘আমি তো ওকে নামিয়ে দিলাম আবার ফেরত আনলাম।’
নিশাত এবার আরো অবাক হয়ে শুনলো ফিদার ওর মানা অগ্রাহ্য করার কথা।
‘তাই নাকি। ভালই আছিস দেখি। আমার বাসা খালি। একদিন ওরে নিয়ে আসিস।’
‘আচ্ছা দেখা যাবে।’
‘রাখি দোস্ত, কি কারনে যে ফোন করেছিলাম ভুলেই গেলাম।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, বয়সতো হয়েছে আমাদের ... হা হা ...’

ফোন রাখার পরই নিশাত বললো – ‘বলতে গেলেন কেন এসব?’
‘প্রবলেম কি?’
‘আমি চাই না মানুষ জানুক।’
‘ও আমার বন্ধু, দূরের। জানলে ক্ষতি কি? বরঞ্চ না জানলেই সমস্যা।’
‘কি সমস্যা?’
‘তোমার যে প্রসংসা করলো?’
‘ওহ! আপনার ফ্রেন্ড থেকে আমাকে বাঁচান।’
‘কেন আমাকে বাঁচাতে হবে। তুমি ধরা না দিলেই হয়!’
নিশাত কিছু বলে না।  

প্রতিদিনের মত আবারো পূর্বাচলের কাশবনের আলো আধারিতে থেমে কিছু রোমান্টিক সময় কাটায়। অনেক্ষণ গল্প করে গাড়িতে হেলান দিয়ে পাশাপাশি। বাজার এলাকায় যায়। চা খায়, শাক সব্জি নেয় নিশাত। পরে লং ড্রাইভে যায়। তারপর বাসায় ফিরে যায়। ওদের প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে ফেরৎ আসতে পেরে ফিদা সস্তি বোধ করে।

পরদিন অফিসে ফোন করে নিশাত রোজকার মত। কথায় কথায় বলে –
‘আমার না আইফোন টা পড়ে ভেংগে গেছে!’
‘আহা!’
‘ওই ফোনটায় এমন কিছু নাম্বার আছে, যাঁদের সাথে অনেক দিন যোগাযোগ নাই কিন্তু আমার কাজের প্রয়োজনে কখনো আমাকে ফোন করতে পারে। তাছাড়া আইফোনে এত ইউজড টু হয়ে গেছিলাম যে আইফোন ছাড়া খুব সমস্যা হচ্ছে।’
‘তাহলে তো সমস্যা হওয়ারই কথা!’
‘এখানে এত দাম! বিদেশ থেকে আনতে পারলে খুব ভাল হত। বিদেশে নিশ্চয়ই অনেক কম হবে?’
‘হ্যা ঠিক। আমার এক বন্ধু এনেছিল আইফোন সেভেন। যেটা এখানে তখন একলাখ টাকা পরতো, সেটা এমেরিকা থেকে আমাদের টাকায় আটষট্টি হাজার টাকায় এনেছে।’
‘আপনি আনিয়ে দিতে পারবেন?’
‘পারবো না কেন? তবে একটা শর্ত আছে।’
‘আবার শর্ত কি?’
‘আমি ওটা তোমাকে গিফট দিব।’
‘নাহ! আমি গিফট নিব কেন?’
‘আমি আমার গার্ল ফ্রেন্ডকে গিফট দিতে পারি না?’
‘পারেন কিন্তু এত দামী জিনিষ কেন দিবেন? আমি দাম দিয়ে দিব। কমে আনলাম এটাই তো গিফট!’
‘তাহলে এখান থেকেই কিনে দি?’
‘না।’
‘আমি দিব এখান থেকেই।’
‘মাথা খারাপ! আচ্ছা বাদ দেন। আগে মার্কেট যাচাই করে দেখি। কোনটা নিতে চাই সেটা এখানে কি দাম আর এমেরিকা থেকে কত পড়বে।’
‘হ্যা তবে আমার ফ্রেন্ড একমাস পর আসবে। তোমার এতদিন ওয়েট করতে অসুবিধা নাই?’
‘না কমে পেলে কেন অসুবিধা হবে। চলেন আমরা ফোন দেখতে বের হব যেদিন সময় পাবো।’
‘আচ্ছা।’

আজ যাবে কাল যাবে করে টাইমিং মিলে না কারো। সুইমিং করে আটটা বেজে যায়। তখনতো সব শপ বন্ধ হয়ে যায়। তখন পূর্বাচল বা কফিশপ ঘোরাফেরা করে কদিন পার করে। এই কদিন অনেক বাক বিতন্ডা চলে ফোনটা গিফট হিসেবে নিবে নিশাত না দাম দিয়ে নিবে। ফিদা পরিস্কার বলে দেয় গিফট হিসেবে না নিলে ও এখান থেকেই আরো বেশী দাম দিয়ে কিনে দিবে অথবা এর মধ্যে ফিদা থাকবে না। শেষে নিশাত নিমরাজি হয়ে একদিন বের হলো অফিসের পরপরই আইফোনের শোরুমে। গুলশান দুই থেকে বারিধারা যাওয়ার পথে একটা দেখেছিল ফিদা। সেখানেই গেল। উপরে একটা রেস্টরেন্টও আছে। দুজনেরই খিদা ছিল। আগে আইফোনের শোরুমে ঢুকলো। নিশাতই দেখছে। ফিদা সংগ দিচ্ছে। আইফোন কেন যে কোন দামী গ্যাজেট এর উপর সামান্যতম আকর্ষণ নাই ফিদার। মানুষ দুদিন পর পর কেন এত টাকা খরচ করে এগুলোর পিছনে বুঝে না ফিদা!
একটা মডেল পছন্দ হলো নিশাতের। সেটার কনফিগারেশন, কালার সব পছন্দ করলো। সেটার এখানে টাকায় দাম পড়বে প্রায় দেড় লাখ। ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে দেখলো সেটা প্রায় কম বেশী এক্ লাখের কাছাকাছি হয়। তখনকার ডলার রেট অনুযায়ী। নিশাতের খুব পছন্দ হয়। কিন্তু নিশাতকে খুব চিন্তিত মনে হয়। ফিদা জানতে চায় – ‘কি সমস্যা? কি নিয়ে এত চিন্তা করছো?’
‘দামটা একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই কনফিগারেশনই আমার চাই।’
তারপর বিড়বিড় করে বলে – ‘পারবো হয়তো ম্যানেজ করতে এই টাকা।’
‘তাহলে কিন্তু আমি নাই এরমধ্যে!’
‘আপনি জিজ্ঞসে করেন আগে আপনার বন্ধুকে, উনি কততে আনতে পারবেন।’
‘হ্যা সব লিখে নিয়েছি। এখনই ম্যাসেঞ্জারে দিয়ে দিচ্ছি টেক্সট।’
‘আচ্ছা।’
আইফোনের শোরূমের উপরে একটাই রেস্টরেন্ট নাম আর চেহার দেখে বেশ হাইফাই মনে হয় দুজনেরি। আর গাড়ি পার্ক করেছে নীচে বেইজমেন্টে। আবার গাড়ি বার করে এদিক ওদিক যাবে? তাই এখানেই ঢুকে। ঢুকেও আপ্যায়ন, সাজ সজ্জা দেখে দুজনেই পছন্দ করে। ফুডের মেনু আসে।
এর মধ্য কিছুক্ষণ পরপরই নিশাত ফোনে কথা বলা শুরু করে। সবই ছেলে। আর কথা বলে খুব সহজভাবে। নিজের আপন মানুষের সাথেযে ভাবে বলে সেভাবে। প্রতিবারই ফিদা জিজ্ঞেস করে কার ফোন ছিল? নিশাত পরিস্কার করে কিছু বলে না। এতে ফিদার আরো সন্দেহ হয়, মনও খারাপ হয়। আসচে ওর সাথে সময় কাটাতে। ও তো সময় দিচ্ছেই না। উল্টো কার না কার সাথে এত আন্তরিকভাবে কথা বলছে। কত জনের সাথে ওর এরকম সম্পর্ক আছে? এরকম মনে হয়। তাই যতবারই ফোন রেখে নিশাত তাঁকায়। মুখের ভংগিতে প্রশ্নবোধক চিহ্ন আনে, ততবারই ফিদার মুখটা আরো অন্ধকার হয়ে যায়। এদিকে মেনু দেখেও কিছু তাল পায় না দুজনেই। নিশাত হালকা কিছু নিতে চায়। ফিদা বলে ডিনার মেনু নিতে। কিন্তু নিশাত হালকা কিছুই ওর্ডার করে। এতেও নিশাতকে কেমন অন্য কেউ মনে হয়। যার ওর ইচ্ছার উপর খারাপ লাগা ভাল লাগার প্রতি কোন খেয়ালই নেই! ফিদাও হালকা কিছু নেয়। খাবার আসতে দেরী হয়। এরমধ্যে আরো ফোন কলে ব্যস্ত থাকে লম্বা। শেষে ফিদার দিকে তাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করে –
‘কি হয়েছে? এত গম্ভীর কেন?’
‘হালকা হওয়ার তো কারন নেই, তাই।’
‘কেন? কি হয়েছে?’
‘এত সব ফোন আসছে তোমার। জিজ্ঞেস করলে ঠিকমত বলছোও না! সবই তো ছেলেদের ফোন। কোন মেয়েকে তো ফোন করতে দেখলাম না তোমাকে কোনদিন!’
‘ও এই ব্যপার!’
এবার নিশাত মুখ অন্ধকার করে ফেলে। ফিদা জানতো তাই হবে। কিন্তু নিজের কষ্টটাও এত বেশী ছিল যে সেটা চেপে রাখতে পারলো না।
‘আসলে আপনাকে পরপর তিন্ দিন সময় দেওয়াতে খুব ভুল হয়েছে।’
নিশাতের কথাটা শুনে ফিদার মাথায় আগুন জ্বলে উঠে। ভাবে, বলে কি মেয়েটা! যার মানে হয় বেশী পাত্তা দিয়ে ফেলেছে ফিদাকে? আর না বললেও বুঝে ফেলে আরো বলতে চাচ্ছে যে ওর সামনে একটা অদৃশ্য ওয়াল তৈরী করছে ফিদা! রেগে উপহাস করে বলে –
‘ও! তুমি তো ভিআইপি পারসন। আমার অনেক কৃতজ্ঞ থাকা উচিত ছিল তোমার কাছ থেকে এত সময় পেয়ে।’
নিশাত চিৎকরে উঠে চিকন স্বরে। জোড়ে কথা বললে ওর গলাটা বেশ চিকন হয়ে যায়।
‘আমি অনেক ব্যস্ত মানুষ! অনেক কাজ করি। অনেক মানুষের সাথে পরিচয়। কাজের কারনে। একটা কলও ওরা এখন করেনি। সব জমা ছিল। আমি একটা একটা করে কল ব্যাক করলাম।’
ফিদা নীরবে খেয়ে যায়। কিছু বলে না। মুডটা সত্যিই তেতো হয়ে গিয়েছে। সহজে ঠিক করতে পারে না। নিশাতও চুপচাপ খেয়ে যায়। খুবই বিস্বাদ লাগে সব কিছু। খুব কষ্ট করে খায়। শেষে বিল চাইলে দামী রেস্টরেন্টের ওয়েটাররা যেমন করে বলে, তেমন করে জিজ্ঞেস করলো ওয়েটারটা – ‘স্যার খাবার ঠিক ছিল?’
‘হ্যা একদম ঠিক! খুব ভাল!’
ফিদা উত্তর দেয়। নিজের রাগ লাগলে নিশাতের জন্য ঠিকই খারাপ লাগে। বেচারী চুপচাপ মুখ কালো করে বসে আছে আস্বস্তি নিয়ে।  তাই ওর দিকে না তাঁকিয়েই বলে – ‘বললাম তো খুব ভাল! এত পচা খাবার জীবনে খাই নি!’
নিশাত সাথে সাথে হো হো করে হেসে দেয়। দুজনেই একটু সহজ হয়। বের হয়ে আসে রেস্টরেন্ট থেকে। নিশাত বলে গুলশান দুই নাম্বারে মার্কেটে যাবে। ওর নাকি সুইম সুট লাগবে। ফিদা ওখানে নিয়ে যায়। গাড়ি অনেক ঝামেলা করে পার্ক করে দুজন মিলেই ঢুকে নামে একসাথে। ঢুকে দোকানে। অনেক কিছুই দেখে। ফিদাও ওর জন্য দেখে, কিন্তু নিশাত বলে সব গুলোর দাম নাকি অনেক বেশী। ও গুলিস্তান থেকে কিনে নেবে। ফিদা বলে – ‘আমি দেই?’
‘না। আপনি কেন দিবেন। আমি কারো কাছ থেকে গিফট নেই না! আর আমি নিজে রোজগার করি। নিজের পয়সায় চলি। হাজবেন্ড থেকেও কোন পয়াসা নিতাম না।’
‘সেটা তোমাদের নিজস্ব ব্যপার, কিন্তু অস্বাভাবিক। আমার জিএফকে আমি কিছু দিতেই পারি। তাও সামান্য কিছু!’
ফিদা একটা সুট তুলে কাউন্টারে দিতে চায়। নিশাত হাত থেকে কেড়ে নিয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে আসে। ফিদা দোকান থেকে বের হয়ে আসে। খুব বিরক্ত লাগে। একটু অদ্ভুতও লাগে নিশাতের দ্বৈত আচরণ! প্রথম প্রথম পূর্বাচলে বাজার করে টাকা কম পড়লে নিশাত ধার চাইতো। ফিদা দিয়ে দিত। ফেরত দিতে পরে চেয়েছে কিনা ফিদার মনে পড়ে না। সেটা কোন ব্যপারই না। বরঞ্চ পরে সবসময় ফিদা জোড় করে ও যা নিয়েছে, সব দাম দিয়ে দিত। নিশাতও এই নিয়ে আর তেমন জোড়াজুড়ি করতো না। মাঝে মাঝে ওর টাকা তোলার দুরকার পড়লে এটিএম দূরে বলে ফিদা বলতো – ‘কত লাগবে তোমার? আমি দিয়ে দিচ্ছি।’
সেটা এক দু হাজার এর বেশী হত না। ফিদা এই সামান্য খরচ নিজের মেয়ে বন্ধুর জন্য করতে পেরে ভালই বোধ করতো। একদিন তো নিজেই চেয়ে নিল। হাসপাতালে ছিল ফিদার মা। সেখানে নীতাও ছিল। ও কোন মিটিং আছে বলে ওর সাথে একটু দেখা করবে বলে আসে। ওর সাজ গোজ দেখে ভড়কে যায় ফিদা। খুব খুশী হয়ে জানতে চায় –
‘আই, তুমি কি আমাকে দেখাতে এসেছো এই সাজ গোজ?’
নিশাত নির্বিকারভাবে বলে – ‘না তো। ভাবলাম আজ আর দেখে হবে না। তাই দেখা করে গেলাম।’
তারপর বিড়বিড় করে বলে
‘একটা উবার দরকার। আবার টাকাও তুলতে হবে।’
‘কত লাগবে তোমার?’
‘দু হাজার হলেই চলবে।’
ফিদা দিয়ে দেয়। নিশাত নিয়ে চলে যায়। ফিদা এগুলো মাথাই নিত না। কিন্তু ফিদা যখন সামান্য কিছু গিফট হিসেবে দিতে চায় আগ্রহ করে, সেটা সে এমন দুর্বিনীতভাবে ফিরিয়ে দেয়! তখন ঠিক হিসাব মেলাতে পারে না। আর প্রায়ই বলে দেখেন আমি সবসময় চেষ্টা করি গার্ল ফ্রেন্ড হিসেবে আপনার খরচ কম করাতে। তখনও একটু খচখচ করে ফিদার মনে। ওকে সোনারগায়ে নিয়ে একেক দিন দশ বারো হাজার টাকা খরচ করেছে। প্রথমবার ছাড়া পরের বার ওই ওখানে যাওয়ার ইংগিত করেছে। কফি সপ গুলোতে খরচ নেহাত কম না। কতবার গিয়েছে সেগুলোতে। আর ড্রাইভিং শিখাতে আর লং ড্রাইভে একেক দিন বা রাতে দেড় দুই হাজার টাকার অকটেন তো পুড়েছেই! কোন কিছুই হিসাব করার মত মানুষ ফিদা না। কিন্তু যখন নিশাত বলে ও কারো কাছ থেকে কোন গিফট নেয় না। ফিদার কাছে থেকে সস্তায় ডেট করে, তখন মনে হয় মেয়েটা অবুঝ না বোকা। তবুও ওকে খারাপ ভাবে না। যাকে ভালবাসে তাকে বরঞ্চ সরল মনে করে বরঞ্চ মায়া লাগে।
তবে আজকে সুইম সুটটা না নেওয়ায়। রেস্টরেন্টে বারবার হেভী কিছু খেতে বলার পরও হালকা কিছু নেওয়ায় মনে হয় নিশাত আসলে ওর মন বোঝার কোন আগ্রহই দেখায় না কখনো। দোকান থেকে বের হয়েও ফিদার পাশে আসতে যেয়ে ফিদাকে গম্ভীর দেখে ও অন্য দিকে হাটা দিল। ফিদার মনে হলো মেয়েটি কি আসলে? ও হেটে ফিদাকে না বলে বাসায় চলে গেলেও অবাক হবে না ফিদা।
গাড়ির কাছে আসে ফিদা। তখন দেখে নিশাতও চলে আসে গাড়িতে। নিশাতকে ওর বাসায় নামিয়ে চলে যায় ফিদা ক্লাবে। মাথা গরম হলেই তাই করে ফিদা এখন। মাথাটা ঘনঘনই গরম হয় আজকাল।

পরদিন ছুটি ছিল। নিশাত টেক্সট করে ফিদাকে বের হওয়ার জন্য, অল্প সময় হলেও। ছুটির দিনে কোথাও বের হলে নীতা হাজারটা প্রশ্ন করবে। আবার নিশাতের ডাকে সাড়া না দিয়েও পারেনা। ওষুধ কিনার নাম করে বের হয়। ফিদা তুলে নেয় নিশাতকে ওষুধের দোকানের সামনে থেকে। নিশাত বলে –
‘আমার কাছে আধা ঘন্টা আছে আপনার সাথে থাকার।’
ফিদা কিছুক্ষণ চিন্তা করে কি বলবে নীতাকে ওষুধ কিনতে এতক্ষণ লাগছে কেন জিজ্ঞেস করলে। তখন মাথায় আসে একটা কাজ। নিশাতকে বলে –
‘আমি যদি পেট্রল নিতে যাই, তোমার অসুবিধা আছে। তাহলে কিছু সময় কাটবে আর দেরী করার এক যুক্তিও খূঁজে পাব।’
‘অসুবিধা থাকবে কেন? চলেন!’
অকটেন আসলেই কম ছিল। ফিদা পেট্রল পাম্পে পুরো ট্যাংক ভরতে বলে। চার হাজার টাকার মত আসে। নিশাত জিজ্ঞেস করে –
‘এই টাকায় কতদিন চলবে?’
‘আগে সাট দিন চলতো, এখন দুই তিন দিন যায়।’
নিশাত একটু চুপ থেকে তারপর বলে –
‘এখন মানে আমি গাড়ি চালানো শিখার পর থেকে?’
‘হ্যা। কোন সমস্যা নেই। আমি কিন্তু বলতে চাইনি। গাড়ি চালানো শেখার জন্য শুধু না, একেক দিন লং ড্রাইভেই হয়তো পনের বিশ লিটার চলে যায়।’
‘না ঠিক আছে। তার মানে আগে যদি আপনার মাসে ষোল হাজার টাকার অকটেন লাগতো এখন জাস্ট ডাবল?’
‘হ্যা এরকমই হচ্ছে লাস্ট তিন মাস ধরে।’
‘আশ্চর্য!’
‘কি?’
‘আমার কোন ধারনাই ছিল না। এত টাকা আপনি আমার জন্য খরচ করছেন? আমি তো এত টাকা শোধ দিতে পারবো না?’
‘কি আশ্চর্য! আমি কি চেয়েছি তোমার কাছে। না তোমাকে শুনিয়েছি নিজ থেকে!’
‘না তা করেন নি। কিন্তু আমি তো জানলাম। আমি আর আপনার গাড়ি ধরবো না।’
ফিদা হেসে ফেলে। বলে –
‘তুমি এতদিন আমার সাথে মিশে বোঝোনি যে আমি টাকা খরচ করার ব্যপারে কখনো হিসেব করি না! আর তোমার জন্য হলে তো কথাই নেই! তোমাকে এটলিস্ট গাড়ি নিয়ে একা রাস্তায় নামিয়ে তারপর তোমার লেসন শেষ হবে!’
‘না আমি আর পারবো না এটা করতে। আমার জন্য এত টাকা আপনি খরচ করবেন কেন?’
‘আমি তো এরকমই।’
‘আপনি বড়লোক মানুষ! আপনি পারেন। আমি গরীব মানুষ, তাই বলে যা দিতে পারবো না তা নিব কেন?’
‘আমি মোটেও বড়লোক মানুষ না! জাস্ট বেহিসাবী!’
ফিদা আর কিছু বলে না। নিশাতকে আসলেই ও বুঝতে পারে না। নিশাতকে ও ভালবাসে। ওর জন্য খরচ করতে কখনো চিন্তাই করে না। কিন্তু কখনো কখনো অল্প কিছু খরচ নিয়ে এমন আপত্তি তুলে যে ও কারো কাছ থেকে কিছুই নেয় না। অথচ বড় বড় জায়গায় নিজেই যেতে বলে। ফিদা খরচও করে দেদারসে। তখন ওর মনে আসে না! ছোট খাট খরচে হঠাৎ তীব্র আত্মসম্মান বোধ জেগে ওঠে।
ওরা ফেরৎ আসে উত্তরায়। এমন সময় নীতার ফোন আসে। যা সন্দেহ করেছিল তাই। নীতা জেরা শুরু করে ফিদা কিছু বলার আগেই –
‘ওষুধ আনতে গিয়ে এতক্ষণ লাগছে কেন। আর ওষুধ কিনতে যেয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছ কেন? সাথে কি ঐ কুত্তি টা আছে?’
ফিদা গম্ভীর হয়ে বলে – ‘কেউ নেই আমার সাথে। আমি পেট্রল নিতে হবে বলে গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলাম।’
‘সত্যি করে বল? কখন ফিরবে?’
‘এই পাঁচ মিনিট।’
নীতা ফোন কেটে দেয়। ফিদা হেসে নিশাতের দিকে তাঁকায়। নিশাতের মুখ থমথমে। ফিদা বলতে যাচ্ছিল কিছু। কিন্তু নিশাত আস্তে আস্তে বলে –
‘আমি শুনেছি, ভাবী কি বলেছে।’
ফিদা লজ্জা পেয়ে যায়। দুঃখিত বোধ করে নিশাতের জন্য। আর রাগ হয় আজকালকার ফোন গুলোর উপর। অপর পাশের কথা পাশে বসে যে কেউ শুনে ফেলতে পারে। ওর এক কলিগ মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরার পথে ওর সাথে আসতো। পথে ওর স্ত্রী ওকে ফোন করতো। যা বলতো সব শুনতো ফিদা আর হাসতো। ওর কলিগ খুব লজ্জা পেয়ে যেত। কিন্তু এবার তো শুধু লজ্জা না। নিশাতকে আন্তরিক ভাবে বলে –
‘আমি সরি নিশাত। তোমাকে শুনতে হলো এমন কথা আমার জন্য!’
‘না ঠিক আছে। ভাবীর দিক থেকে উনি ঠিক আছেন।’
তারপর একটু পর একটু জেদ নিয়ে বলে –
‘তবে পাবলিকলি যদি কখনো আমাকে অপমান করে আমি কিন্তু যা খুশী তাই বলবো!’
ফিদা নিশাতের দিকে তাঁকায়। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলে –
‘তখন কিন্তু আমি তোমার সাইড নিব না। আমিও তোমাকে যা খুশী তাই বলবো। আমি আমার বউ এর সম্মান রক্ষা করবো। কারন দোষী আমি, তুমিও এর পার্ট। ওর কোনই দোষ নাই। ও বলতেই পারে এমন।’
নিশাতের উত্তরে ফিদা একটু অবাকই হয়। নিশাত বলে –
‘আই রেস্পেক্ট ইউ। আপনি ভাবীকে অনেক ভালবাসেন। উনি আপনার বিয়ে করা বউ!’
‘হ্যা তাতো বাসিই। আমার যে কজন বন্ধু জানে আমাদের কথা ওরা খুব অবাক হয়। কারন ওরা জানতো আমি নীতাকে কত ভালবাসি। তারপরো কিভাবে তোমার সাথে জড়ালাম!’
‘আমাকে সবাই খারাপ বলে নিশ্চয়ই?’
‘মোটেই না। আমি যা বলি সত্যিই বলি। আমি যে তোমার প্রেমে পড়েছি সেটাই বলি। ওরা বলে তুমি আমাকে কখনই ভালবাসনি, বাসবেও না।’
‘ভুল!’
‘তোমাকে ছেড়ে দিতে বলে।’
‘সবাই যা বলে তাই শুনেন না কেন?’
‘আমি যে ধরা খেয়ে গেছি তোমার কাছে। পারলে অবশ্যই ছেড়ে দিতাম। কিন্তু দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা তুমি আমার সাথে থাক। বাস্তবে না হলে কল্পনায়।’
‘আমারো তাই হয়। কতবার ভাবি এতো আমি অন্যায় করছি। কিন্তু কিছুতেই আপনাকে ছাড়া একটা দিনও চিন্তা করতে পারি না।’
ফিদা মুগ্ধ দৃষ্টিতে নিশাতের দিকে তাঁকায়। নিশাতের চোখে মুখে যা দেখতে চায় তাই পায়।

পরদিন সাতার শেষে ওরা কই যাবে কই যাবে করতে করতে পূর্বাচলে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই যেখানে ওরা জায়গা বদল করে একটা ফুল বাগানের পাশে, সেখানে গাড়ি থামায় ফিদা। নিশাতের দিকে তাঁকায়। নিশাত বলে –
‘না। আমি আর গাড়ি চালাবো না। আপনি চালান।’
‘পেট্রল খরচ হবে তাই?’
‘হ্যা।’
‘আমি চালালে খরচ হবে না?’
‘আমি তো আস্তে চালাই। বেশী তেল পোড়ে এতে। কাল এক কলিগ যার গাড়ি আছে নিজের, তার সাথে কথায় কথায় আলাপ করে জানলাম আসলেই কত খরচ হয়। তাই পন করেছি আমি আর আপনার গাড়ি ধরবো না।’
‘তুমি এখন আর লার্নার পর্যায়ে নাই। জোড়ে চালাতে পারো। তুমি যদি না চালাও। তাহলে খামাখা এখানে ঢুকে লাভ কি। পেট্রল খরচ হল ঠিকই। অথচ যে জন্য আসলাম তা আর হল না। ফিরে যাই তাহলে।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিশাত বলে – ‘আচ্ছা দেন আমাকে।’

যথারীতি ওরা পুরো এলাকা ‘ছান’ মারে। কখনো একদম নিরিবিলি কোথাও থামে। ফিদা সিগারেট খায়। আর নিশাতের সাথে গল্প করে। ওদের কথা কখনো শেষ হয় না। এক ঘন্টা হোক আর সাত আট ঘন্টা হোক। তারপর শেষে বাজার এলাকায় আসে খাঁটি গরুর দুধের মালাই চা খেতে। মুখোমুখি বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছিল দুজন। হঠাৎ মনে হলো নিশাতের চোখ দুটো বড় করে ওর পিছনে কারো দিকে তাঁকিয়ে আছে। পিছনে কে না দেখেই ফিদা বুঝতে পারলো নিশাত কারো দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে। একটু পর লোকটা যখন ফিদাকেও পার হয়ে যাচ্ছিল তখন পিছন ফিরে ফিদাকে দেখলো। ভদ্রলোক লম্বা, বেশ সুদর্শন, একটু বয়স্ক যদিও। সাথে তার পরিবার আছে। স্ত্রী, ছেলে মেয়ে। ফিদা যখন চায়ের বিল দিতে গেল, তখনও ফিদাকে আলাদা ভাবে ভদ্রলোক দেখলো। তখন মনে হলো ফিদার নিশাত ভদ্রলোককে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিল দেখে তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন এই মেয়েটার কোন বলদকে নিয়ে এসে টাংকি মারছে ওঁর সাথে!
যাই হোক না কেন নিশাতের এই যে কোন পুরুষকে আকর্ষণ করার চেষ্টা মোটেও ভাল লাগে না ফিদার। মনটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। কেমন একটা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কিন্তু কিছু আর বলে না। জানে এর ফলাফল কি হবে। নিশাত এধরনের অভিযোগ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এটা ওর ‘বর্ন ফ্রী’ ধরনের স্বভাব হিসেবে নেয়। আরো খারাপ লাগে এই ভেবে যে ওর সামনেই এই অবস্থা আড়ালে কি করে কে জানে! অথচ ওর সাথে এমনভাবে মেশে তখন মনে হয় ওকে সত্যিই নিশাত খুউব ভালবাসে। এমনকি মাঝে মাঝে এমনও বলে যে বনির সাথেও এত আনন্দ বা রোমান্টিকতা ওর হয় নাই। ফিদার সাথে যা হচ্ছে। এই দুয়ে মিলে দ্বন্দে থেকে চলে দিন। কিন্তু কখনো পূর্ণ স্বস্তি পায় না নিশাতের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে।

পরদিন আবার আসে সন্ধ্যায় পূর্বাচলে। যে জায়গায় সিট বদল করে ফুল বাগানের পাশে, সেখানে থামায় ফিদা গাড়ি। শাহরিয়ারের সাথে দেখা হয়েছিল ফিদার আজ। তাই শাহ্অরিয়ারকে নিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল ফিদা। এমন সময় নিশাত ফিদাকে থামিয়ে খুব উৎসাহের সাথে জানতে চাইলো –
‘শাহরিয়ার ভাই কি বললো আমার সম্বন্ধে?’
ফিদার খুবই রাগ হলো। শাহরিয়ার একটা প্লে বয়। নিশাতকেও বলেছেও। তারপরও নিশাতের এত আগ্রহ শাহরিয়ারকে নিয়ে। মেয়েটা কি সব সুদর্শন পুরুষ দেখলেই এরকম হেংলামো করে? তাও আবার ফিদার সামনে। ফিদার বেশ রাগ হয়। বলেই ফেলে –
‘শাহরিয়ার সম্বন্ধে এত ইন্টারেস্ট তোমার? আমি তো অন্য কথা বলতে যাচ্ছিলাম। তুমি নিজেই বলেছিলে ওর থেকে তোমাকে রক্ষা করতে। কারন তুমি নিজেই ওর প্রতি দুর্বল। হ্যান্ডসাম যে কাউকে দেখলেই তোমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। যেই বয়সেরই হোক!’
ফিদা ধরেই নিয়েছিল নিশাত খুব উত্তপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখাবে। রাগ ঠিকই দেখায়। কিন্তু সেটা ইতিবাচকই হয়। নিশাত রেগেই বলে –
‘শাহরিয়ার ভাইকে আমার প্রথম দিক থেকেই পছন্দ হয় নি। উনার প্রতি আমার কোন ইন্টারেস্ট নাই। আমি অন্য কারনে জানতে চাচ্ছিলাম।’

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। ফিদা হৃদয়ের দহন কিছুটা কমে। গাড়ি থেকে নেমে সিগারেট ধরায় আর বলে নিশাতকেও নামতে বলে জায়গা বদল করার জন্য। নিশাত নামে।

তারপর রোজকার মত একই ভাবে ঘুরে ফিরে শেষেবাজারে চায়ের দোকানে বসে। নিশাত দিনের বেলায় বনির সাথে ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে একটা কাজে গিয়েছিল। সারাদিন বনির সাথেই ছিল। বনির গল্প করতে থাকে –
‘জানেন যখন ওই রেজিস্ট্রি অফিসের নীচে আমরা বসে চা খাচ্ছিলাম। তখন আমাদের সামনে একটা খুব লম্বা, ফর্সা, খুবই হ্যান্ডসাম এক ইয়াং ভদ্রলোককে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে দেখি। ওনাকে খুব চেনা চেনা মনে হয়। মনে হলো আমি টিভিতে দেখেছি। তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে থাকি। কখন তাঁকাবে আমার দিকে। তাঁকায় তো নাইই। আর সিগারেট খাওয়াও শেষ হয় না। আমার এত কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল! দেখি বনি আমার দিকে তাঁকিয়ে হাসছে। আর ওর চোখ ইশারায় বুঝলাম ও বলছে- যতই তোমার ভাল লাগুক, তুমি তো আমার কাছেই ফিরে আসবে!’
নিশাত কথা বলার সময় ও পরে হাসতে হাসতে শেষ। যেন এমন মজার ঘটনা ঘটেছে। ফিদা হতভম্ব হয়ে যায়। পুরো ব্যপারটা ওর অসুস্থ ও বেহায়া মেয়ের আচরণ বলে মনে হয়। এমনিতেই এই বেঞ্চিতে বসে গতকাল এক সুদর্শন লম্বা বয়স্ক ভদ্রলোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। আজ আবার সরাসরি নিজেই বলছে এমন একজনের সাথে একটু কথা বলার জন্য কত খানি বেহায়ার মত অপেক্ষা করছিল! ফিদা কিছুক্ষণ ঝিম মেরে যায়। নিশাত নিজের কথায় আর সুখ স্মৃতি রোমন্থনে হাসতেই থাকে। কিছুক্ষণ পর ফিদা যথা সম্ভব ঠান্ডা স্বরে বলে –
‘দেখো তোমার সাথে বনির কি রকম আন্ডারস্ট্যান্ডিং তোমারা জান সেটা। তুমি যে কোন সুপুরুষ দেখলেই পাগল হয়ে যাও। তোমার ভাল লেগেছে। তার সাথে কথা বলার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলে। সেটা আমাকে না বললেও পারতে। আমি এটা কোনভাবেই সহ্য করতে পারিনা। কাল বলিনি। কাল তুমি এই বেঞ্চে বসে এরকম এক হ্যান্ডসাম লোককে চমকে তাঁকিয়ে দেখছিলে আর এট্রাক্ট করার চেষ্টা করছিলে। আর ঐ লোকটা ঘুরে ঘুরে পরে আমাকে দেখছিল। কোন মেয়ের সাথে বসে আছে এই বলদটা!’
‘কখন কালকে এরকম হয়েছে। আমি তো জানি না!’
প্রায় চিৎকার করে বলে নিশাত।
‘তোমার মনেই নাই। কারন এটা তোমার স্বভাব। আমার অনুরোধ আমার সাথে যতক্ষণ থাক, আমাকে নিয়ে থাক। তোমার সব পুরুষের প্রতি মোহের গল্প বল না। আমাই তোমাকে একান্ত ভাবে ভালবাসি সেটা তুমি জান।’
কিছুটা অনুনয়ের সাথে বলে ফিদা।
নিশাত ঝট করে উঠে যায়। চায়ের কাপ বেঞ্চে রেখে গাড়ির দিকে চলে যায়। ফিদা তাড়াতাড়ি চায়ের বিল মিটিয়ে গাড়িতে যেয়ে বসে। ভয় হয় যদি নিশাত গাড়ি নিয়ে একাই চলে যায়, ওকে এই বিরান ভূমে ফেলে রেখে! তবে ওর জন্য অন্য রকম বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। নিশাত গাড়ি স্টার্ট দেয়। ভোঁ করে জোড়ে টান দেয়। ফিদা চেক করে সিট বেল্ট বেঁধেছে সে। খালি রাস্তায় প্রচন্ড গতিতে চালাতে থাকে গাড়ি নিশাত। তারপর হঠাৎ হার্ড ব্রেক করে। সিটবেল্ট থাকায় রক্ষা। আবার স্পীড দেয় ইচ্ছে মত। আবার ব্রেক। এরকম চারবার করে। ফিদা চুপ করে বসে থাকে। গাড়ী ওর। ওকে শেখাতে এনেছে। আর ওর গাড়ি নিয়েই ওর সাথে মাস্তানি দেখাচ্ছে নিশাত। কিছু বললে অভদ্রতা হয়ে যায় বলে চুপ থাকলো। একসময় গাড়ি থেকে নেমে সীট বদল করে নিশাত। যাওয়ার পথে কেউ কোন কথা বলে না। ফিদা ওকে নামিয়ে আবার ক্লাবে যায়। মাথাটা পুরোই আওলা ঝাওলা করে দিয়েছে নিশাত।মাথাকে ঠান্ডা করার একটাই ওষুধ আছে ওর।
দুই তিন্ কথা বন্ধ না হলেও বলতে গেলে যোগাযোগ তেমন থেকে না। ফিদা নিজে থেকে কল করেনা। সাঁতারে পেলেও নিশাত চলে যায় ওর সাঁতার শেষ হলে। একদিন পুলের এক প্রান্তে ফিদা আর নিশাত একা ছিল। ফিদা তখন বলে –
‘তুমি দাঁড়াবে সুইমিং শেষ করে। তোমার সাথে আমি কোথাও বসবো তারপর।’
নিশাত জবাব দেয় না। একবার ফিদার দিকে তাঁকিয়ে সাথে সাথে মুখ সরিয়ে নেয়। সামনের দিকে তাঁকিয়ে মুখ শক্ত করে রাখে। ফিদা বুঝতে পারে না নিশাত এর প্রতিক্রিয়া। নিশাতের আগেই সাঁতার শেষ করে ফিদা। যাতে নিশাতকে মিস না করে। ওর গোসল সেড়ে রেডি হতে সময় লাগে না। কিন্তু নিশাত তো সাঁতার শেষ করে ব্যায়াম করে আর গোসলে অনেক সময় নেয়। ফিদা বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। হঠাৎ দেখে নিশাত হনহন করে বের হয়ে গেল ক্লাব থেকে। ফিদা জোড়ে হেটে পিছু নেয়। নিশাত ওর স্কুটিতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ফিদা যেয়ে বলে –
‘কি ব্যপার? বললাম কথা বলবো! একসাথে যাব কোথাও! তুমি আমাকে না জানিয়ে চলে যাচ্ছ?’
নিশাতের চেহার এখন শক্ত আর অচেনা। ও একবার ক্লাবের গার্ডদের দিকে তাঁকায়। বলে – ‘আমাকে হাস্পাতালে যেতে হবে।’
আবার গার্ডদের দিকে তাঁকিয়ে বলে – ‘ওরা দেখছে।’
বলেই স্কুটি নিয়ে চলে যায়! ফিদার মাথা পুরো খারাপ হয়ে যায়। বারে যেয়ে বসে। চলে বিয়ার একটার পর একটা। সাথে চলে টেক্সট। ওর পুরো মনে হয় হাসপাতাল টাতাল কিছু না। ও ফিদাকে এড়ানোর জন্য একটা উছিলা দিল। তানা হলে তো পরিস্কার করে বলতোই যে হাসপাতালে কেন যাচ্ছে। কে রূগী। কত সিরিয়াস। কিচ্ছু না! আর সুইমিং পুলে যখন জিজ্ঞেস করেছিল তখন বলে নি কেন যে ওর হাসপাতালে যেতে হবে? কোন উত্তরই দিল না। ফিদা কিছুই বুঝতে পারলো না। মনে হলো ইচ্ছে করে মিথ্যা বা কোন জনসেবা করতে যেয়ে ফিদাকে পরিহার করলো। সমস্ত রাগ আর রক্তের এলকোহল মস্তিস্কে যেয়ে যে সব ভাষা লেখা হলো নিশাতের হোয়াটসএপের টেক্সট বক্সে তা লিখা সম্ভব না। শুরু করেছিল এই ভাবে যে –
‘হাউ ডেয়ার ইউ, আমাকে এভাবে কিছু না বলে চলে যাও। কিসের হাসপাতাল, কে তোমার রুগী? সব ভাওতা বাজি, গেছ নিশ্চয়ই ডাক্তারদের ......... সবাই তো তোমার ভাইয়া ... ছেলেদের ইয়ে দেখতে খুব মজা লাগে ... একটা হোর ... ’
ফিদা যে কত টেক্সট করে নিজেও জানে না। কি লিখে তাও জানে না। বাসায় এসে বাড়িতে ঢোকার আগে সব টেক্সট ডিলিট করে দেয়। ফিদাকে ক্লাবে বারে সারাক্ষণ টেক্সট করতে দেখে এক বড় ভাই ফিদা উঠে যাওয়ার সময় বলেছিল –
‘এই শুনে যাও! বাসায় যাওয়ার আগে সব টেক্সট ডিলিট করে যাও। নাহলে ধরা খাবা!’
‘জী ভাই আমি তাই করি।’
পাছে নীতা দেখে ফেলে এই ভয়ে। কারন রাতের বেলা হঠাৎ খুব ভেংগে গেলে দেখে যে নীতা ওর ফোন নিয়ে গবেষণা করছে। ফিদা নিশ্চিন্তে আবার ঘুমিয়ে যায় এই ভেবে যে সব তো মুছে ফেলেছে। কিন্তু তবুও কিভাবে যেন কোন না কোন খেই পেয়েই যায় নীতা।
সকালে উঠে রাতে কখন কীভাবে বাসায় এসেছে। রাতে বাসায় এসে খেয়েছে কি খায় নি। কিছুই মনে করতে পারে না ফিদা। অফিসে যাওয়ার পথে নিশাতের টেক্সট দেখে মাথাটা খারাপ হয়ে গেল। লেখা –
‘আমি যখন আমার কাজিনের ডেথ বেডের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তখন আপনার একটার পর একটা বাজে টেক্সট পড়ে আমার যে কি খারাপ লাগছিল! ওখানে বনিও ছিল।’

অফিসে পৌছে ফোন করার চেষ্টা করে। দেখে ফোন যাচ্ছে না। তারমানে বোঝে নিশাত ব্লক করেছে ওকে। এরকম প্রায়ই করে। সম্পর্ক যখন ভাল থাকে তখনো। ফিদা বলাতে নিশাত অস্বীকার করে। ফিদা টেক্সট করে বলতে চায় যে ও তো জানতোই না। আর রাতে মাতাল হয়ে কি লিখেছে কিছুই মনে নেই। ওকে কেন বলে গেল না এই ঘটনা। ওকে এড়িয়ে যাওয়াতেই না ওর এত রাগ হয়েছে।
কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলো যে টেক্সট ও ব্লক করা। কারণ টেক্সট ওর বক্সে পৌছানোর কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কেবল একটা টিক চিহ্ন তাই বোঝায়।
বেশ কদিন এরকম ব্লক অবস্থায়ই থাকলো। ফিদারো দিন একেবারেই ওলট পালট হয়ে গেল। বাসায় ছোট খাট বিষয় নিয়ে তুমুল ঝগড়া। অফিসে আনমনে বা রাতের ঘুম পুর্ন না হওয়ায় নিদ্রালু সময় কাটানো। আর রাতে ক্লাবে তো রীতিমত মারামারি পর্যায়ে চলে গেল একদিন। অথচ সেই রাতে কি হয়েছিল কিছুই মনে করতে পারে না। ওর বন্ধু নওশাদও ওকে এড়িয়ে চলছে দেখলো। একদিন নওশাদকে ও জোড় করে ধরলো। ওকে বাড়ি ফেরার পথে নিজের গাড়িতে তুললো। গাড়ি চালানো শুরু করেই প্রশ্ন করলো –
‘তুই আমাকে এভয়েড করছিস কেন?’
‘কই তোকে এভয়েড করছি। এই যে আসলাম তোর গাড়িতে!’
‘দেখ। তুই আমার সাথে চাপাবাজি করিস না! আমার খুব খারাপ সময় পার করছি। এখন কাছের বন্ধুর সাপোর্ট দরকার। আর এখন তুই আমার থেকে দূরে সরে যচ্ছিস!’
‘তোর যা অবস্থা সবাই তোর থেকে দূরে সরে যাবে। তোর জন্য আমার গালি খেতে হয়!’
‘আমার জন্য তোকে গালি খেতে হবে কেন?’
‘আমি তোর সাথে সারাক্ষণ থাকি। ঐ মাইয়ার লগে মিশতে বাঁধা দেই না কেন। ক্লাবে তোরে মদ খাইতে আটকাই না কেন?’
‘আমি কি বাচ্চা ছেলে যে কেউ আমাকে আটকায়ে রাখবে।’
‘কথা তো সেটাই। তোরে কেউ কিছু বলতে পারে। বললেই খেইপা যাস। তার থেকে দূরে থাকাই ভাল না?’
‘ও আচ্ছা। তো সেদিন বড় ভাইয়ের সাথে যা হলো সেটা কি আমার দোষ?’
‘কেমনে বলবো কার দোষ, তুই যেই বাজে গালির কথা বলছিস সেই বাজে গালি নাকি তুই আগে দিসিস?’
ফিদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে –
‘আমার তো আসলে কিছুই মনে নাই। এইখান থেকে মনে আছে বড়ভাই আমাকে গালি দিল। আমি ওঁকে মারতে যাচ্ছিলাম!’
‘এই নিয়ে এক পিকনিকে বিরাট ঝগড়া ঝাটি হয়েছে। বড়ভাইকে আমরা বুঝিয়েছি যে তোর কোন পাস্ট রেকর্ড নাই। ওনার আছে। আর ও তুই যা বলসোস তার কিছুই তোর মনে নাই। মানে কোন কন্ট্রোল ছিল না। বড় ভাইও বলসে এটা তুই বলে মেনে নিল। অন্য কেউ হলে মানতো না!’
‘তাই!’
‘হ্যা। এখন তোরে নিয়া বড় ভাইয়ের লগে বসায় দিমু। তুই সোজা সরি বলবি। বাস শেষ। আমাদেরকে তো এদের নিয়েই চলতে হবে তাই না।’
‘ছি ছি ... আমি আসলে কি করেছি।’
‘তুই একেকদিন যা করিস! আগে তুই না আসলে সবাই জিজ্ঞেস করতো ফিদা ভাই কই। ফিদা ভাই না থাকলে জমে না! আর এখন সবাই তোরে এভয়েড করে।’
‘ঠিক। এই একজন আমার শান্তশিষ্ট জীবনটাকে একদম তচনচ করে দিল! আমার বউ এর ও একটা শান্তি ছিল আর যাই করি কোন মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াবো না। আর এখন যা করি নাই। তাও ভেবে বসে আছে!’
‘ঐ মেয়েকে ছাড়!’
‘ঐ ছেড়ে দিসে। আমাকে ব্লক করে রাখসে!’
‘তুই ও ব্লক করে রাখ!’
এর উত্তরে মিনমিন করে কি বলে ফিদা, বোঝা যায় না!
‘আর ড্রিংক একদম কম। খালি উইক এন্ডে আর চারটার বেশী না। এরপরই তুই উল্টাপালটা শুরু করিস!’
‘আচ্ছা। এগ্রিড।’
‘আমি কিন্তু লেগে থাকবো তোর পিছে।’
‘ঠিক আছে। ভাল হয়ে যাওয়ার চেষ্টা অন্তত করি!’

পরে বড় ভাইয়ের সাথে বসে সব ঠিক হয়ে যায়। বড় ভাই যা বলে শুনে খুবই লজ্জা পেয়ে যায়। বড় ভাইকে নাকি কি সব থ্রেট টেট দিয়েছে। ফিদা জিহবায় কামড় দেয়। বড় ভাই বলেছে –
‘আমি জানি তুমি কন্ট্রোলে ছিলা না। কিন্তু কন্ট্রোল তোমাকেই করতে হবে!’
‘ঠিক আছে ভাই করবো। কিন্তু এরপর বাড়াবাড়ি করতে গেলে আপনি গলা ধাক্কা দিয়েন। আমি কিছু মনে করবো না।’
‘তুমি ঐ পর্যায়ে যাবা কেন?’
‘ঠিক।’

নিজেকে সামলাতে সামলাতে কিছু দিন পার হয়ে গেল। নিশাতকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ভুলে থাকার জন্য নিয়মিত ভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেল ভাল জীবন যাপন করতে। সাঁতার শেষ করে দু’ বন্ধু মিলে হালকা স্ন্যাক্স খেয়ে একসাথে বাসায় চলে যাওয়া। যেতে যেতে দুজন দুজনের পছন্দের গান শোনা। নওশাদ ফিদাকে সত্যিকারের উপকার করলো বন্ধু হয়ে। তবে একটা জিনিস ফিদার খুব অবাক লেগেছিল, যেই গান গুলো নিশাত আর ফিদা শুনতো সেগুলো কিছু না জেনেই নওশাদও বিরক্ত হত, নীতাও। এর কোন কারন খুঁজে পায় নি ফিদা।

এক রকম ভালই চলছিল ফিদার। যেমন গাড়ি আছে চকচকে। ইঞ্জিনও ভাল। সামনের গাড়ির বডির এক পাশে একটা লম্বা আঁচড়ের দাগ। ওদিকে চোখ না দিলেই হয়। গাড়িতো ভালই চলে!

চার পাচ দিন পর নিশাতের টেক্সট পেল। সেই অতি ব্যবহৃত প্রশ্ন – ‘কই?’
যেন কিছুই হয় নি। ফিদাও তেমন উওর দিল ছোট্ট করে – ‘অফিসে।’
আর কোন টেক্সট চালাচালি হলো না। বিকেলে আবার নিশাত জানতে চাইলো –
‘সন্ধ্যায় ক্লাবে আসছেন?’
‘হ্যা’
‘আমার আসতে দেরী হবে। মানে নটার পর করতে হবে।’
‘আচ্ছা।’
ফিদার মনে হলো দেখা হওয়ার একটা ইংগিত দিল নিশাত। ফিদা নিজে ধরা দিল না। কেন জানি ওর একটা আত্মবিশ্বাস জন্মেছে মেয়েটা ওকে ছেড়ে আসলেই ভাল থাকতে পারবে না। রাতে নিশাত টেক্সট করলো – ‘কই?’
‘ক্লাবে উপরে।’
‘আমার সুইমিং শেষ। চলে যাব?’
‘আচ্ছা আমি নামছি।’
‘আমি কফি শপে বসছি। আপনি ওখানে আসেন।’

ফিদা তাই করে। খুঁজে ঠিকই বের করে কোথায় নিশাত বসেছে। নিশাত জিজ্ঞেস করে – ‘কীভাবে আমাকে খুঁজে পেলেন?’
‘আমি জানি তুমি খোলা জায়গায় বস যাতে আমি সিগারেট খেতে পারি।’
‘আজকেও খেয়ে এসেছেন!’
‘এতদিন কিন্তু খাই নি। আজ তোমার সাথে কথা হলো তাই সেলিব্রেট করতে খেলাম।’
‘তাহলে তো আবার চলে যাই। আপনি ভাল থাকবেন। ড্রিংক করবেন না।’
‘ব্যপারটা অত সহজ ছিল না।’
‘কি রকম?’
‘আমি অনেক কান্ড কীর্তি করেছি, এক সিনিয়ার ভাইকে ... এই গালি দিয়েছি? ব্যপারটা হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল ...’
‘ছি ছি ছি ... এত বাজে গালি ... আমার মাথাটা একদম ...’
‘আমি জীবনে কখনো মাতাল হয়েও কাউকে এমন কথা বলিনি! কীভাবে বললাম কেন বললাম কিচ্ছু মনে নেই!’
বাকিটা বিস্তারিত বলে নিশাতকে। তারপর বলে বাধ্য হয়ে কিভবে নিজেকে শৃংখলিত করেছে।
‘তাহলে তো শেষ পর্যন্ত ভালই ছিলেন আমাকে ছাড়া!’
‘তুমি ভাল ছিলে?’
‘ভাল ছিলাম না। তবে আপনার কারনে আমার বনির সাথে সন্ধি করতে হয়েছে।’
‘কিরকম?’
‘আগে ও যে সব শর্ত দিয়েছিল। এটা করা যাবে না ওটা করা যাবে না। সব আমি মেনে নিয়েছি। যা আমি কখনো মানতে পারতাম না।’
‘কেন মানলে, আমি এখানে কি করলাম?’
‘আপনি আমাকে সেদিন যা যা বলেছেন! ... তখন নিজেকে আমার কি যে মনে হচ্ছিল! ... আমার তখন একটা আশ্রয়, পরিচয় দরকার মনে হয়েছিল।’
‘তুমি বনির সাথে মিল ঠিক আছে। কিন্তু যে কারন দেখাচ্ছ সেটা ঠিক না। তুমি ভাল করেই জান আমার থেকে সরে গেল আমি অস্থির হয়ে যাই। তখন ড্রিংক করি লিমিটলেস ... এক সময় কি বলি না বলি কোন কন্ট্রোল থাকে না ...’
‘ড্রিংক করলে নাকি মানুষ সত্যি কথা বলে! তারমানে আপনি যা বলেছেন তাই মনে করেন আমাকে!’
‘মোটেও না। এটা একটা বহুল প্রচলিত ভুল ধারনা। কোন কোন ক্ষত্রে হয়তো সত্যি বলে। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই যা বলে তা মীন তো করেই না, নিজেও জানে না কেন বলছে এসব!’
‘আমার তা মনে হয় না।’
‘আমি তোমাকে একটা উদাহরণ দি। আমি নীতাকে নাকি এমন এমন কথা বলেছি অন্য কারো সাথে সম্পর্কের ব্যপারে যা মোটেও সত্যিই না, ঘটেনি। কিন্তু ও এরকম সত্যই ভেবে বসে আছে। অথচ আমি জানি এরকম কিছু আমি করিনি। চিন্তায়ও ছিল না কখনো! অথচ কেন বলেছি ড্রাংক হয়ে আমি নিজেও জানি না!’
নিশাত চুপ করে শুনে। ফিদা আরো বলে –
‘আর এটা শুনে খুশী হওয়ার কিছু নাই তবুও বলি তোমাকে যা বলেছি এর থেকে খারাপ কথা, গালি আমি নীতাকে দিয়েছি, রেগে ... কিন্তু তুমি তো জান নীতা কেমন রিজার্ভ একটা মেয়ে। ওকি মনে করেছে আমি ওকে এরকম মনে করি? কষ্ট পেয়েছে, চিল্লাচিল্লি করেছে, কিন্তু আমাকে ছেড়ে তো যায়নি!’
‘কারন ভাবী জানে আপনি ভাবীকে কত ভালবাসেন! ভাবীও আপনাকে বাসে।’
‘একদম ঠিক। কিন্তু আমি তো তোমাকেও ভালবাসি এখন, তুমি বাসনা বলেই এরকম দূরে সরে যাও ... আর এত নাটক কর ... এগুলো না করলে তো এরকম ঝগড়া হওয়ার কোন কারন নাই! ... আমার তোমার তো চাওয়া পাওয়ার কিছু নাই। শর্তহীণ ভালবাসা ছাড়া!’
নিশাত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে –
‘যাই হোক না কেন এখন আমি আর আগের মত আপনার সাথে দেখা বা সম্পর্ক রাখতে পারবো না।’
‘কেন?’
‘বনির কাছে ফিরে যাব বলেছি।’
‘যাও ভাল কথা। আমি কি আমার বউ এর সাথে নেই! আমি কি সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসি নাই যখন ডেকেছ?’
‘ছেলেরা পারলেও মেয়েরা পারে না। আর বনির আমার ফোন চেক করার অভ্যাস আছে।’
‘সেটাতো নীতারও আছে। সব ডিলিট করে দিবা!’
‘আমার নিজেরো সমস্যা হচ্ছে। বনির সাথে এডজাস্ট করতে। আপনি চলে আসছেন মাঝখানে।’
‘ওকে। তুমি যদি আমাকে ছাড়া ভাল থাক তবে থাক আমাকে ছেড়ে। এটা তোমার কথা দেওয়ার বরখেলাপ হবে। আমি আমার মত তোমাকে মনে রাখবো, ভালবাসবো, আমি সহজে প্রেমে পরি না, পড়লে কখনই ভুলি নি। সেটা একটা পরকীয়া করে ফেললেও নীতাকে ওর জায়গা থেকে একটুকুও সরাই নি। তুমি পারলে ভুলে থাক আমাকে। ...তবে মাঝে মাঝে এসে খোঁচা দিয়ে আমাকে এলোমেলো করে দিও না।’
‘আমি তো এখনই বলছি না। বনির কাছে থেকে সময় চেয়েছি তিন মাস। আমার ট্রেনিং কোর্স করবো বাইরে যাওয়ার জন্য।’
‘বলতে চাচ্ছ এই তিন মাস তোমাকে পাব?’
‘না তাও না। আমি এই তিন মাস সত্যিই ব্যস্ত থাকবো এইএলটিএস এর ট্রেনিং নিয়ে।’
‘সেটাকি রোজ হবে নাকি?’
‘হ্যা রোজ। ছুটির দিনে তো আপনিও ঘরে থাকেন, আমি এখন বনির সাথে কাটাবো।’
‘ভাল ......... খালি এই বোকা কত ছুটির দিনে আমার বউকে কষ্ট দিয়ে তোমার ডাকে ছুটে এসেছি।’
‘দেখা তো হবে। রেগুলার না। আমিও আপনাকে ভুলতে পারবো না কখনো!’
ফিদা নিশাতের দিকে তাঁকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। কিছু বলে না। তারপর বলে –
‘আমার সাথে যদি ব্রেক আপ হয়ে যায়, বনির সাথে না বনে তাহলে অন্য কারো প্রেমে পড়বে আবার?’
‘কক্ষনো না। আপনাকে আমি কোন্ দিনই ভুলতে পারবো না। আপনি শুধু আপনার কষ্টের কথা বলেন। আমার যে কি কষ্ট হয় সেটা আমি তো বলি না!’
একটু থেমে বলে –
‘জানেন সুইমিং এর ড্রেসিং রুমে আপনার ব্যাগটা যেখানে রাখেন আমি ঠিক পাশে রাখি। ক্লাবে আছেন কিনা আপনার গাড়ি যেখানেই থাকুক আমি টের পাই।’
বাচ্চাদের মত খুশী খুশী ভাব নিয়ে বলে নিশাত। ফিদা খুব অবাক হয়। ভালও লাগে। নিশাতের প্রতি আস্থা বিশ্বাস সবই পুনর্মজন্ম লাভ করে। ওর দিকে তাঁকিয়ে বোঝে কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছে মেয়েটার উপর। একটু অবাকই হয়।
যদিও জানে পৃথিবীতে সবচেয়ে কার জন্য মায়া টান ভালবাসা যদি বলা হয়, নিজের সন্তান তো আছেই। তবে সন্তান থেকে কোন অংশ কম না নীতার প্রতি এই টান। যেটা কখনই মরে যাবে না। নিশাতের প্রতি এত রোমান্টিক হয়েও।

ফিদা হঠাৎ বলে –
‘আচ্ছা তোমাকে নিয়ে আমি অনেক কথা বলি কারো সাথে মেশা সম্বন্ধে। আমি জানি তুমি এগুলো পছন্দ কর না। তোমার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হলে তুমি স্বামী পর্যন্ত ছেড়ে দাও, আর আমি তো পরকীয়া প্রেমিক। কিন্তু আমার জানা দরকার আমার সাথে যে রকম সম্পর্ক হয়েছে সেরকম তোমার কারো সাথে আগে ছিল?’
‘ন। বনির সাথে আমার বিয়ের পরে প্রেম হয়েছে।’
‘ভবিষ্যতে পড়বে’
‘না। কখনো না।’
‘আমিও না।’
‘ইশ! জানলে একদম খুন করে ফেলবো!’
ফিদার খুব ভাল লাগে নিশাতের জানে মেরে ফেলার হুমকি!
‘তুমি এরকম কারো সাথে একাকী রেস্তোরাতে সময় কাটিয়েছ?’
‘না। কিন্তু আমার কাজের কারনে অনেক সময় কার সাথে রিকশায়ও যেতে হয়।’
‘রিকশায়? গায়ে গা লেগে?’
‘গায়ে গা লাগবে কেন? ওভাবে কেন বসবো?’
‘আচ্ছা। কিন্তু বাইকে যে তিনজন চড়। সেখানে?’
‘আমার পিছনে সব সময় ব্যাগ থাকে। আমি কখনো এক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পড়ে গেলেও কাউকে ধরতে দি না। নিজে নিজে আস্তে আস্তে উঠে আসি।’
‘খুব ভাল। দেখেছি। পুলে একদিন দেখছিলাম এমন।’
‘আপনার সাথে আমার প্রেম বলতে যা বোঝায় সেটা হয়েছে। আর কার সাথে হয় নি হবেও না।’
‘বাস এতটুকুই যথেষ্ঠ আমার জন্য।’
ফিদা অনেকটা প্রশান্তি ফিরে পায় মনে।

দুজন নিজেদের বাহনে আগের মত নিশাতকে ফলো করতে করতে কিছু পথ পরে আলাদা হয়ে যায় যার যার বাসার দিকে।
এভাবে চলে কিছু দিন। রোজ দেখা না হলেও মাঝে মধ্যে ওরা বসে কোথাও। তবে মাঝে মাঝে আবার ওদের সম্পর্ক নিয়ে এলোমেলো টেক্সট করে।
ফোনে রাগারাগি। নিশাত বিভিন্ন কাজের উছিলায় এড়িয়ে যায় ফিদাকে। সাঁতারে আসলেও। একদিন সাঁতারের পর ফিদার সাথে নীচে ক্লাবের খোলা জায়গায় বসতে রাজী হয়। ওখানে ব্যাডমিন্টন খেলা চলছিল। দুজনে যেয়ে বসে একটা টেবিলে। কর্ন সুপ, ছোলা সিদ্ধ, লেমন জুস এগুলোই অর্ডার দেয় রোজকার মত। ফিদা অনেকদিন থেকে অপেক্ষা করছিল নিশাতের সাথে একসাথে সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু ফিদা দেখে নিশাত ব্যাডমিন্টন খেলা দেখতে ব্যস্ত। ফিদা একবার বলে –
‘কি মুশকিল! তুমি খেলা দেখতে আসচো না আমার সাথে গল্প করতে আসচো?’
‘আরে ব্যাডমিন্টন খেলা আমার প্রাণ! আমি তো ন্যাশনাল লেভেলে খেলতাম!’
ফিদার অনুযোগকে পাত্তা তো দিলই না। তারপর আরও দেখে নিশাত সম্পুর্ন অপরিচিত চারটা ছেলের সাথে কথা বলা শুরু করে! ফিদার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। নিজের চেহারা না দেখতে পেলেও পরিস্কার বুঝতে পারে ওর সারা মুখের চামড়ার নীচে তীব্রগতিতে রক্ত সঞ্চালনের কারনে মুখটা লালাভ হয়ে আছে! ফুড আসে। দুজনে খাওয়া শুরু করে। ফিদা মাথা নীচু করে খেয়ে যায়। নিশাত মাঝে মাঝে ওর দিকে তাঁকিয়ে ঈশারায় জানতে চায় যেন – ‘কি হয়েছে?’ যেন কিছুই বুঝছেনা ফিদার রাগের কারন। ফিদা কিছুই বলে না। নিশাত প্রবল আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে ওদের সাথে খেলার দর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ করে। যদিও ব্যপারটা একপক্ষীয়ই ছিল। ছেলে গুলো খেলা নিয়েই ব্যস্ত ছিল। হয়তো নিশাত প্রশ্ন করলে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিচ্ছিল। একসময় ওদের খাওয়া শেষ হয়। নিশাত বলে চলেন। ফিদা বিল মিটিয়ে বের হয়ে আসে ক্লাব থেকে নিশাত সহ। গাড়ি আসে। দুজনে উঠে। কিছু দূর যাবার পর নিশাত জিজ্ঞেস করে – ‘কি হয়েছে? এত রাগ কেন?’
‘আমি তো কারন প্রথমেই বলেছি।’
‘হ্যা দেখলাম এত রাগ যে আপনার ঠোট হাত থরথর করে কাঁপছিল!’
শুনে ফিদাও অবাক হলো। সে নিজেই জানতো না। তারপর আরো রাগ হলো। বললো – ‘তাও তুমি থামলে না খেলা দেখা! আমি তোমার সাথে সময় কাটানোর জন্য বসচিলাম অনেক দিন পর।’
‘ছিলাম তো আমরা একসাথেই!’
‘চিন না জান না ঐ অচেনা ছেলেদের সাথে গল্প জুড়ে দিলে কেন? তোমার এই স্বভাবটা আমার একদম পছন্দ হয় না!’
নিশাতের চেহার গলা একদম পাগলের মত হয়ে গেল। চিৎকার চেচামেচি শুরু করলো। ফিদার কানে এলোমেলো ভাবে এলো – ‘ব্যাডমিন্টন আমার প্রাণ, খেলাধুলা আমার প্রাণ! আর কারো সাথে কথা বলা যাবে না মানে? আপনি খালি আমার সামনে অদৃশ্য ওয়াল তুলে দিচ্ছেন!’
ফিদা কিছু বলতে যাচ্ছিল যে ব্যপারটা এমন না। আজ অনেকদিন বাদে বসেছিল তাই একান্তে ওকে চাচ্ছিল। সেই সুযোগ আর হলো না। এয়ারপোর্টের কাছে আসার আগেই নিশাত চিতকার করে বললো গাড়ি থামান। আমি এখনেই নেমে যাব। ফিদা গাড়ি থামালো। নিশাত গটগট করে হেটে চলে গেল। ফিদাও কোন দিকে না তাঁকিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে গেল।
দুদিন কোন রকম যোগাযোগই রাখেনা। তারপর তৃতীয় দিনে সকাল বেলা ফোন করে অফিসে। বলে –
‘আসসালামু অলাইকুম’
‘অলাইকুম সালাম’
‘রোজকার অভ্যাস বশত ফোন করা।‘
‘আচ্ছা।’
‘কই?’
এভাবে আবার শুরু হয়একই ভাবে চক্রাকারে আবর্তনশীল ওদের কথাবার্তা, সম্পর্ক। রাতে সাঁতারের পর নীচে রেস্তোরাতে নিয়ে যায় ফিদা। নিশাত বলে –
‘আবার একই জায়গায়? আপনার তো সমস্যা হবে?’
‘হবে না। জানি তোমার খেলার প্রতি কত আগ্রহ। সেদিন তোমাকে আমার অনেক দিন পরে পেয়েও না পাওয়ায় অভিমান হয়েছিল। আর ওখনে ওরা যারা খেলে ওরা সব বাচ্চা ছেলে। হয় মেম্বারদের ছেলে অথবা একদম জুনিয়ার মেম্বার।’
‘তবুও নিশাত একটু দূরের দিকে টেবিলে। পিছন ফিরে, যাতে খেলা না দেখা যায়। ফিদার কোন আপত্তি ছিল না ওর খেলা দেখায়। বা কারো সাথে কথা বলায়। আত্মবিশ্বাস নিয়েই বসেছে এবার। তবে ভাল লাগে ওর ইচ্ছেটাকে মূল্য দেওয়ায়।আরো মনে আসে যতবারই কোন কফি শপে নিশাত অপেক্ষা করতো। ওকে যেয়ে পেত একদম মাথা গুজে সেল ফোন নিয়ে ব্যস্ত, কারো দিকে চোখ নেই। খুব ভাল লাগতো ওকে হঠাৎ যেয়ে চমকে দিতে।
আজ বেশ খোশ মেজাজে ফিদা গল্প করছিল। নিশাতকে খুব খোশ মেজাজ না হলেও স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ ফিদা দেখতে পায় ওর স্কুলের এক বন্ধু ফিরোজকে। সে আবার এমপি ছিল এক সময়। ওর সাথে স্কুলে তেমন পরিচয় ছিল না। অন্য সেকশনে ছিল। পুরোন বন্ধুদের আড্ডায় কিছু দিন আগে পরিচয় হয়েছে। তাই সবার মত তুই তুই করেই বলে ওকে। ফিদা ডাক দেয় – ‘কিরে ফিরোজ কি করিস?’
ফিরোজ ওর দিকে তাঁকায়। তারপর নিশাতের দিকে। তারপর দু চার কথা বলে নিশাতের দিকে তাঁকিয়ে থাকে। ফিদা বাধ্য হয়ে পরিচয় করিয়ে দেয় ওর বন্ধু হিসেবে। বলে সত্য কথা, ক্লাবে পরিচয়। জিয়া বসে যায়। আর দু চার কথা বলে নিশাতের সাথে গল্প জুড়ে দেয়। নিশাততো ওরকমই, নিশাতও ওর সাথে নিজে নিজে অনেক প্রশ্ন শুরু করে। নিশাত আবার ফিদার কথা উল্লেখ করে প্রসংগ নিয়ে আসে কথা বলার। এরমধ্যে ফিরোজের সাথে এক লোক ছিল। সে এসে ডাকে ফিরোজকে। ফিরোজ তাকে বলে ওর নাকি বাল্য বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গিয়েছে। তাই এখানেই বসবে। ফিদা খুবই অবাক হয় ফিরোজের লুইচ্চামি দেখে। একটু পর নিশাত বলে আমকে যেতে হবে। ফিদাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যে উপরে বিল দিতে হবে। ওরা দুজন একা থাকবে। ফিরোজকে তো বিশ্বাসই করে না। নিশাতের কথা বলার স্টাইলেও মনে হয় ও যে কোন কথায় রাজী হয়ে ফোন নামাবার টাম্বার দিয়ে দিতে পারে। আত্মবিশ্বাসে আবার চির ধরে। তাই আগ বাড়িয়ে বলে –
‘চল নিশাত তোমাকে আগিয়ে দিয়ে আসি।’
ফিরোজ খুব সরলভাব নিয়ে বলে – ‘তুই ও উঠে যাচ্ছিস?’
‘আমি একটু আগিয়ে দিয়ে আসি।’
দুজন গম্ভীর হয়ে আস্তে আস্তে বের হয়ে আসে ক্লাব থেকে নিশাতের স্কুটি পর্যন্ত। এততুকু পথ পার হতে ফিদার মাথায় টর্ণেডো গতিতে প্রশ্ন ঘুরতে থাকে কীভাবে নিশাতকে বলবে ওর খারাপ লাগাটা। আবারো নিশাত রেগেমেগে চলে যায়? শেষে বলে – ‘একটা কথা বলি মাইন্ড করো না, তোমার কোন দোষ না। ফিরোজ কিন্তু আমার কোন ক্লোজ ফ্রেন্ডই না। কয়েক মাসের পরিচয়। কেমন লুইচ্চার মত এসে বসে গেল। যদিও বুঝেছে আমরা আলাদা গল্প করছি। তুমি হয়তো সবার সাথে স্বাভাবিকভাবেই মিশ। আমার এতে কিছু বলার নাই। তবে আমার বন্ধু বান্ধব বা আমার মাধ্যমে পরিচিত হলে তাদের সাথে এত পাত্তা দিও না। কতজনকেই তো আমি চিনি। সবাইতো একরকম না। কিশোর না নওশাদকে নিয়ে আমার কোন চিন্তা নাই। ওরাও তোমার সাথে কখনো এমন করেনি করবে না। বোঝাতে পেরেছি?’
নিশাত একটু চুপ থেকে বলে –
‘হ্যা ঠিক আছে। আমি বুঝেছি। মাইন্ড করিনি। ভাল হয়েছে বলে দিয়েছেন।’
কিন্তু মুখ থেকে ঝরেরআভাসের কালো মেঘের নঘটাটা সরে না। তারপর ফিদা ঝামেলা কেটেছে ভাবে। মণটাও পরিস্কার হয়। স্বাভাবিক কথা বার্তা বলার চেষ্টা করে বলে –
‘আজে যে ব্যাডমিন্টন খেলা দেখলেই না?’
‘না –আ-আ   ...’
পরিস্কার কিছু বলে না নিশাত। মুখটা থেকে কালোমেঘ সরে না।
‘তুমি চাইলে চেষ্টা করে দেখতে পারি তোমাকে এখানে খেলার ব্যবস্থা করে দিতে পারি কিনা।’
‘আর এখানে কিচ্ছু না। সুইমিং করি এটাই কতদিন পারি!’
একটু থেমে আবার বলে সদম্ভে – ‘চাইলে আমি নিজেই ব্যবস্থা করতে পারি আপনার হেল্প ছাড়াই। আমার সেই ক্ষমতা আছে। আমি আর এখানে কিছুই করবো না। ...যাই।’
মুখটাকে আরো শক্ত করে বলে।
‘তুমি পার জানি। কিন্তু এভাবে বললা কেন? আমিতো তোমাকেই হেল্প করতেই চাচ্ছিলাম!’
‘সরি! এভাবে বলা ঠিক হয় নি।’

বলে স্কুটি স্টার্ট দেয়। ফিদা বেশ ভালই বুঝতে পারে ফিরোজের ব্যপারটা নিয়ে বেশ রাগ করেছে। সেই রাগ এভাবে ঝারলো! তবে সব রাগ এসে পড়ে ফিরোজের উপর। ফিদা দোতালায় বারে চলে যায়। বসে থাকুক ফিরোজ একা নীচে।

নিশাতের পছন্দ করা আইফোন এর খবর আসে ইউএস প্রবাসী বন্ধু আসাদের থেকে ফিদার কাছে। ও জানতে চায় অর্ডার দিবে কিনে? ফিদা নিশাতকে টেক্সট করে। নিশাত উত্তরে ফোন করে।
‘কততে পরবে?’
‘এই বারোশ ডলারের কিছু বেশী, টাকায় এক লাখের কিছু বেশী হবে।’
‘হ্যা তাহলে তো অনেক লাভ হয়। প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা সেইভ হয়!’
‘হ্যা। এখন আমি যদি বলি নিতে। আর না করা যাবে না। সুতরাং তুমি কনফার্ম কর। তোমার তো ঠিক নাই। আজ আছ কাল নাই। আমাদের যেই অবস্থায়ই থাকুক আমি আনালে তোমাকে নিতে হবে, ফোন টা!’
‘নিব তো! কিন্তু আমি টাকা আপনাকে দিয়ে দিব।’
‘না’
‘আমি হাফ দেই?’
‘না। তাহলে তুমি কাউকে দিয়ে আনাও। আমাকে শুধু কনফার্ম কর তুমি যে কোন অবস্থায়ই ফোন টা নিবে। কারন আমি আমার বন্ধুকে একবার বলে পরে আবার না আবার হ্যা এরকম করতে পারবো না। আর অনেক টাকার ব্যপার।’
‘সেই তো! আপনি এত টাকা কেন খরচ করবেন। ফোন আমি নিব, কিন্তু টাকা দিব প্লিজ!’
‘এই কথা আর বলো না’
‘কেন দিবেন? আমি এর যোগ্য না!’
‘তুমি আমার গার্ল ফ্রেন্ড। তোমাকে আমি দিতেই পারি। বস্তু বা মূল্য দিয়ে যোগ্যতা মাপা যায়। তুমি অমূল্য আমার কাছে।’

আরো কিছুক্ষণ ধানাই পানাই করে রাজী হয় নিশাত ফোন আনতে বলতে। ফিদা আসাদকে জানিয়ে দেয়। আসাদ বলে দেশে এসে ডলারে পেমেন্ট নিবে ও। ফিদাও হ্যা বলে।
যায় যায় দিন এমন করেই। টক ঝাল মিষ্টি মিলিয়ে ঝিলিয়ে। নিশাত একদিন ওকে জোড় করে নিয়ে যায় যমুনা ফিউচার পার্কের শপিং মলে। কেন নিচ্ছে তা বলে না। ওকে নিয়ে যায় ইলেক্ট্রনিক্স মার্কেটের ফ্লোরে। সেখান থেকে স্মার্ট ওয়াচ খুঁজতে থাকে। স্যামসং এর একটা স্মার্ট ওয়াচ ওর পছন্দ হয়। দাম চব্বিশ হাজার টাকা। ফিদা জিজ্ঞেস করে -  ‘কার জন্য নিচ্ছ?’
‘আপনার জন্য?’
‘আশ্চর্য। আমি এইসব অত্যধুনিক গ্যাজেট ফ্যাজেটে কোন আগ্রহ নাই! আমি নিব না’
‘আপনার দরকার। আপনি যেই ঘড়ি পড়েন তা আপনার স্ট্যাটাসের সাথে যায় না!’
‘আমার কোন স্ট্যাটাস নেই। আমি আনস্মার্ট মানুষ এইসব স্মার্ট জিনিষ নিয়ে বিপাকে পড়বো! এমনি স্মার্ট ফোন নিয়েই যথেষ্ট বিপাকে আছি।’
‘না আপনার দরকার আপনি নেন।’
‘আরে তুমি আমাকে জোড় করে দিবে নাকি?’
‘হ্যা দরকার হলে তাই দিব।’
এর মধ্যে সেলসম্যান জানতে চায় – ‘ম্যাডাম দিব?’
ফিদা সরাসরি না বলে বের হয়ে আসে দোকান থেকে। পিছু পিছু নিশাতও আসে। ‘আপনি কেন নিবেন না। নিলে এর ইউজ বুঝবেন। অনেক কিছু করা যায়!’
‘আমার দরকার নাই যেটা সেটা আমি করতে যাব কেন?’
‘আমার আপনার ঘড়ির চামড়ার বেল্ট দুদিন পর পর ছিড়ে যায় দেখতে ভাল লাগে না।’
‘ওহ! আচ্ছা ভাল চামড়ার বেল্ট কিনে নেব। আমার ঠিক এই রকম ঘড়ি পছন্দ।’
‘আপনাকে অনেক স্মার্ট লাগবে!’
‘আসলে তুমি তোমার আইফোনের জন্য রিটার্ন গিফট দিতে চাচ্ছ।’
‘মোটেও তা না। আপনাকে আমার দেখতে ভাল লাগবে!’
ফিদা একটু অবাক হয়েই লক্ষ্য করে নিশাতের চোখ ছলছল করছে। তখন ওর খুব মায়া লাগে। বলে –
‘আচ্ছা নিব কিন্তু আমি দাম দিব।’
‘তা কেন হবে?’
‘তোমার এমনিই টানাটানি। এটা যদি পছন্দের জিনিষ হত আমি না হয় তোমার কাছ থেকে নিতাম। কিন্তু এটা আমার মোটেও পছন্দের জিনিষ না। তোমার চোখ ছল চল করছে দেখে কেবল মাত্র তোমাকে খুশী করার জন্য আমি কিনবো এই ঘড়ি।’
‘চলেন আগে।’
ওরা যায় সেলসম্যানকে ঘড়িটা দিতে বলে। ব্যবহার বিধি দেখাতে যায়। নিশাত বলে ও দেখিয়ে দিবে। ফিদা এতদিন খেয়াল করেনি যে ও স্মার্ট ওয়াচ পড়ে। স্মার্ট ওয়াচ বলে যে একটা বস্তু পয়দা হয়েছে সেটাই সে জানতো না!
বিল দিতে গিয়ে রীতিমত হাতাহাতি হয় দোকানদারদের সামনে। নিশাত জোড় করে ওর কার্ড দিয়ে দেয়। ওখানে ইন্সটা বাই এ কি সমস্যা হয়। এই সুযোগে ফিদা ওর কার্ড দেয়। সেলসম্যান জিজ্ঞেস করে ইনস্টাবাই করবে কিনা। ফিদা না বলে। -‘সরাসরি চার্জ করেন।‘
বিল হয়ে যায়। ওরা দোকান থেকে বের হয়ে আসে। ফিদা বলে – ‘এবার খুশী?’
‘আমাকে তো গিফট করতে দিলেন না! অথচ আমাকে জোড় করে আইফোন কিনে দিচ্ছেন।’
‘দেখো আমি আইফোন দেওয়ার সময় এমন কোন শর্ত তোমার সাথে করিনি তোমার থেকে নিব। আর আইফোন যত দামই হোক তোমার খুব প্রিয় জিনিষ। সেখানে খরচ করে শান্তি পাব। কিন্তু যেটা আমি পছন্দই করিনা সেটার জন্য তুমি খামাখা এত টাকা খরচ করবে কেন?’
‘আইফোন অবশ্য আমার নেসেসিটি’
‘একজ্যাক্টলি।’
‘দেখেন আপনাকে কত স্মার্ট লাগছে!’
‘আমি তো দেখতে পাচ্ছি না’
দুজনেই হাসে। নিশাত হাসতে হাসতে বলে – ‘পরে আয়নায় দেখে নিয়েন।’
‘আচ্ছা।’
আবারো কিছু দিন যায় এমন করেই। টক ঝাল মিষ্টি মিলিয়ে ঝিলিয়ে। কিন্তু ফিদা লক্ষ্য করে নিশাত যেন একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। দেখা করার কথা বললে বিভিন্ন কাজের উছিলা দেয়। ফিদা ওকে মনে করিয়ে দেয় যে ওরা অনেকদিনই পূর্বাচল যায় না। যায় না লং ড্রাইভে। নিশাতের কাছে কোন না যাওয়ার পিছনে সদুত্তর বা যাওয়ার আগ্রহ কিছুই দেখে না। অথচ ওদের মাঝে নতুন কোন সমস্যা ঘটেনি ফিদার জানা মতে। একদিন সুইমিং এর পর একসাথে বের হতে চেয়েছিল ফিদা। নিশাত বললো – ‘না পারবো না। বনানিতে একটা মিটিং আছে।’
‘কাদেরর সাথে?’
‘ঐ যে বলেছিলাম না ব্যাডমিন্টন কোচ, ওনার সাথে।’
‘বনানিতে কি ওনার?’
‘উনি ওখানে কোচিং করায়। এরপর ওনার সাথে কথা বলবো।’
‘ওনার অফিসে?’
‘না বাইরে কোথাও। অফিস তো বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘কোন রেস্টরেন্টে বা কফি শপে?’
‘হ্যা তাই হবে হয়তো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তো আর কথা বলা যায় না!’
‘একটা লোকের সাথে রাতের বেলায় একা একা রেস্টরেন্টে বসবে? এটা কি ভাল বলো?’
‘কি আশ্চর্য। এই ভাইয়া থাকে মিরপুরে। ওনাকে পেতে হলে মিরপুর যেতে হবে। ওনাকে আমার খুব দরকার। ওনার চ্যানেল ধরে আমি ফেডারেশনে ঢুকতে চাচ্ছি! এখানে দোষের কি হলো?’
‘দোষের কি হলো জানি না। কিন্তু এটা তোমার একটা এক্সট্রা কারিকুলার একটিভিটি, এমন জরুরী কিছু না। সেটার জন্য একজনকে পটানোর জন্য তুমি তারসাথে রেস্টরেন্টে বসবে, এটা কি তুমি তোমার নারীত্বকে জাহির করছো না?’
‘আমার যা খুশী আমি তাই করবো। এগুলো আপনাকে বলাই ভুল হয়েছে!’
‘তুমি যত মিটিং এর কথা বল, সবই এরকম ওয়ান টু ওয়ান ডেটের মত। আর তুমি সব ছেলেদের সাথে এমন করে কথা বল যে ওরা তোমার প্রেমে পড়ে যায়। সে ছোড়া হোক আর বুড়ো হোক। তুমি নিজেই তো বলেছ।’
‘হ্যা এখন বুঝতে পারছি আপনার সাথে এগুলো বলাই ভুল ছিল।’
‘আমিও বুঝতে পারছি তোমাকে আমি আগে চিনতে পারিনি। আমি কোন মতেই মেনে নিতে পারছি না যে তুমি একটা লোকের সাথে একা রাতে কোন রেস্টরেন্টে বলে গল্প গুজব করবা, আর বলবা মিটিং! আসলে ওঁকে প্লিজ করার চেষ্টা করবা।’
‘আমার যা খুশী তাই করবো। আপনাকে তার জবাব দিতে হবে?’
ফিদা কিছু বলে না। নিশাত চলে যায়। ফিদা যথারীতি ক্লাবের উপর তালায় উঠে যায় আর শুরু করে অবধারিত যা করার।

দুই তিনদিন কোনো খোঁজ থাকেনা নিশাতের। ফিদাও চেষ্টা করেনা ওর সাথে যোগাযোগের। পুলে দেখাও হয় না। হয়তো ফিদার আগে বা পরে চলে গেছে। ফিদার চলে বেসামাল জীবন সবখানে। রেগেও থেকে অনেক নিশাতের উপর। একদিন আবারো প্রথমে শুভ সকালের টেক্সট পাঠায়। ফিদাও সংক্ষিপ্তভাবে একই উত্তর দেয়। পরে অফিসে গেলে ফোন করে নিশাত। ঐ একই কথা –
‘আসসালামু অলাইকুম। অভ্যাস বশতঃ ফোন করলাম!’
‘ওহ!’
‘কেমন আছেন?’
‘ভাল না।’
‘কেন কি হয়েছে?’
‘তোমার সাথে পরিচয়ের পর থেকে যা হয়! তাই। আর নতুন কিছু না’
‘সব দোষ আমার!’
এটাও গদবাঁধা কথা নিশাতের।
‘আমি তো কাউকে দোষ দেই নি। কারন জিজ্ঞেস করলে তাই বললাম।’
‘এখানেও আমার দোষ!’
‘তুমি গায়ে পড়ে দোষ নিতে চাইলে কিছু করার নেই।’
তারপর কিছুক্ষণ পর স্বাভা্বিক কথাবার্তায় চলে আসে। নিশাত জানতে চায় –
‘আপনি আপনার ফ্রেন্ডকে না  করেননি তো?’
‘না করবো কেন? আমি বলেছি যে কোন পরিস্থিতিতেই নিতে হবে তোমাকে। না নিলে আর কি করবো। হয়তো কারো কাছে বিক্রী করে দেব।‘
‘নিব না কেন? কিন্তু আমি দাম দিব।’
‘এই কথা আর বলবে না। তাহলে অন্য কারো কাছে বিক্রী করে দিব।’
‘তাহলে আমাকেই বিক্রী করেন!’
বলে খুব হাসে নিশাত। ওর স্বভাবসুলভ বাচ্চাদের মত হাসি। যেটা ফিদার ভাল লাগে। কিন্তু ফিদা গম্ভীর থেকেই বলে –
‘তাহলে তুমি অন্য কাউকে দিয়ে আনিয়ে নাও। একই কথা আমার বারবার বলতে ভাল লাগে না।’
‘আপনি বুঝছেন না কেন? আপনি যে এনে দিচ্ছেন এটাতেই তো আমার প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা বেঁচে যাচ্ছে। এটাই তো আমার জ্ন্য গিফট!’
‘অন্য কথা বল।’
ফিদার গুরুগম্ভীর স্বরের জবাবে লঘু স্বরে হেসে দেয় নিশাত।
এরকম টেক্সট ফোনালাপ চলে কিছু দিন। সুইমিং মাঝে মাঝে দেখা হয় কথা বা দৃষ্টি বিনিময় হয় কিন্তু একসাথে বসা হয় না। সবসময়ই কোন না কোন ব্যস্ততা থাকে নিশাতের। এক বৃহস্পতি বারে নিশাত বলেছিল বনির সাথে সময় কাটাবে। সকালে ফোন করেছিল। সেদিন ফিদার খুব মন খারাপ ছিল অফিসের ব্যপারে। নিশাত যখন জানতে চায় কেমন আছে ফিদা তখন নিশাতকে বলে কারন টা। ওর একটা বিদেশে ট্যুর পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওর সরাসরি বস ওরটা বাতিল করে নিজে চলে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের একটা প্রস্তুতি ছিল ফিদার। কাজও করেছিল। কিন্তু আজ জানলো যে ওর নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিশাত শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করলো। বললো – ‘এটাতো খুব খারাপ লাগারই কথা। আমার হলেও খুব খারাপ লাগতো।’
‘আমি যেহেতু নিজে এর জন্য কাজ করেছি। সেমিনারের জন্য সব ডকুমেন্ট তৈরী করেছি। তাই বেশী খারাপ লাগছে। অনেকদিন পর আমার ক্যারিয়ারে এসে একটা ধাক্কা খেলাম।’
‘আপনার অনেক জানাশোনা আছে অনেক উপরের লেভেলে। কাউকে দিয়ে পুশ করান?’
‘নাহ! এতে নিজের কাছেই নিজেকে ছোট মনে হয়। এর জন্য তো আমি মরে যাচ্ছি না! জাস্ট একটা অন্যায়ের স্বীকার হওয়া।’

নিশাত বলে পরে কথা বলবে। বৃহস্পতিবার ছিল। রাতে নাকি বনির সাথে দেখা করবে। তাই আজ দেখা হবে না।
সারাদিন আর নিশাত যোগাযোগ করে না। দিনটা খুব খারাপ কাটে। ওর কলিগরাও ওকে সহমর্মিতা জানায়। ওর একটু আশা ছিল হয়তো নিশাত খোঁজ নিবে একবার হলেও। নেয় না। অফিস থেকে ক্লাবে যায়। মন এত খারাপ ছিল যে সুইমিং ও করে না। সোজা বারে চলে যায়। অনেক রাতে বাসায় ফিরে। নীতাকে বলে। কিছুটা সহানুভূতি পায়। খুব বেশী না। জানে ফিদা, নীতা ওর থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। ফিদার কারনেই। ফোন চেক করতে যেয়ে দেখে নিশাতের টেক্সট রাত বারোটার পরে করা – ‘কি? আপনার কি অবস্থা?’
বাস এই। ফিদা কোন উত্তর না দিয়ে মুছে ফেলে। একটু খারাপ লাগে ভেবে নিশাতের সব খারাপ সময় যতবার বলেছে ছুটে গিয়েছে নিশাতের কাছে। টেক্সট করেছে, ফোন করে ওকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আর নিশাত! ঘুমিয়ে যায় ফিদা।
ঘুমিয়ে আলসেমিতে শুক্রবার কাটায়। শুধু জুম্মার নামাজটা পড়ার জন্য বাইরে যায়। বাকি সময় শুয়ে বসে টিভি দেখেই কাটায়। শনিবার দিন অফিসে যায় না। সন্ধ্যায় ক্লাবে সাঁতারে যায়। নিশাত ফোন করে ক্লাবে যাওয়ার সময়। একই প্রশ্ন – ‘কই?’
ফিদা বলে ক্লাবে যাচ্ছে। নিশাত বলে ও সুইমিং করে চলে যাচ্ছে। ফিদা বলে –
‘কোথায় আই, এল, টি এসের কোচিং এ?’
‘না আজকে কোচিং এ যাব না।’
‘তাহলে থাক। আমি আসছি তো! এতদিন কোচিং বলে এভয়েড করেছ। এখন কোচিং এ ও যাচ্ছ না! কি এমন জরুরী কাজ।’
‘আছে দুই তিনটা জায়গায় যেতে হবে, উত্তরায় একটা গ্রুপ আছে ওদের সাথে কাজ করি। তার আগে বনানিতে যেতে হবে ...আরো কিছু দরকারী কাজ আছে।’
‘ঠিক আছে রাখছি।’
রেখে দেয় ফিদা। নিশাতের কথা বা কাজের বর্ননা গুলো কেমন অসংলগ্ন লাগে। সন্দেহ হয় নিশাত ওর থেকে পালিয়ে বেরাচ্ছে। কিন্তু কেন তা ঠিক মাথায় আসে না।
পরদিন সকালে ফোন করে নিশাতই। বলে ওর নাকি বাসায় যেতে যেতে সাড়ে বারটা বেজে গিয়েছে। ফিদা জানতে চায় –
‘কোথায় বনানীতে?’
‘না বনানী যাইনি তো!’
‘তাহলে কোন গ্রুপের সাথে যাবে বলেছিলে ওদের সাথে এত রাত পর্যন্ত ছিলে! আর আমার সাথে একবার দেখা করতে পারলে না? আমি তো একটা পর্যন্ত ক্লাবেই ছিলাম!’
‘না ঐ গ্রুপের সাথে না। অন্য একটা কাজ ছিল।’
ফিদার ওর অসংলগ্ন কথা পুরোই বানানো মনে হয়। বলে – ‘আসলে কোথায় ছিলে বলো তো? কাল বললে বনানী যাবে পরে উত্তরা, আজ বলছো অন্য কোন কাজ?’
‘আমাকে কি সব কিছুর কৈফিয়ত দিতে হব আপনাকে?’
‘আশ্চর্য! কৈফিয়ত কেন হবে। এত একটা সম্পর্কের সচ্ছতার ব্যপার। আমাকে তুমি তো প্রথম প্রশ্ন কর ‘কই’?’
‘সেটাতো আমি করি আপনি বাসায় না বাইরে সেই জন্য। গোয়েন্দাগিরি করার জন্য না।’
‘কৈফিয়ত, গোয়েন্দাগিরি কত কিছু বানাচ্ছ। তুমি এত অসচ্ছ কেন? আমাকে জিজ্ঞেস কর আমি সারাদিন কোথায় কতটুকু সময় কাটিয়েছি, কার সাথে। তুমি পার না কেন? তোমার কাছে কৈফিয়ত মনে হয় কেন?’
‘আমি আমার ফ্যামিলির সাথে ছিলাম। হয়েছে এবার?’
চিৎকার করে ক্রোধের সাথে বলে নিশাত। ফিদা একটু অবাক হয়ে যায়। এত রাগলো কেন? আর ফ্যামিলিতে তো আছে বাবা মা আর বোন। ওদের নিয়ে এত রাতে কোথায় ছিল। তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে -
‘ফ্যামিলির সাথে বাইরে এত রাতে?’
‘আমি আমার হাজবেন্ডের সাথে ছিলাম! রাবিশ! এখন আমাকে বলতে হবে হাজবেন্ডের সাথে কি কি করেছি? আপনাকে কি আমি জিজ্ঞেস করেছি কোন্ দিন আপনি ভাবীর সাথে কি কি করেন? সব রাবিশ কথা বার্তা!’
ফিদা এবার বুঝতে পারে নিশাতের লুকোচুরি খেলা এবং খুবই অবাক হয় ওর এরকম মিথ্যাচার করে আবার অভদ্রের মত ব্যবহার করা। মেজাজ প্রচন্ড গরম হলেও মাথাটা ঠান্ডা করে। শান্তভাবে কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বলে –
‘তুমি তো আমাকে একবারো বলনি যে তুমি বনির সাথে ছিলে? তাহলে তো আমি কোন সন্দেহ বা মন খারাপ কোন কিছুই করতাম না! খামাখা মিথ্যা কথা কেন বলেছ? আর আমার ওয়াইফের সথে তুলনা কর? তোমার হাজবেন্ডের সাথে সেপারেটেড, সে তোমার একটা কানাকড়িও খরচ করে না তোমার জন্য। তুমিই বলেছে। দুদিন একটু কাছাকাছি হে আমার সাথে এমন লুকোচুরি খেলছো কেন?’
ফিদা সত্যিই খুব অবাক হয়। তারমানে বহুদিন থেকেই বনির সাথে যোগাযোগ করছে। সে তো ভাল কথা। ফিদা আরকে উৎসাহ দিত। সেখানে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কেন এমন অদ্ভুত আচরণ করছে ফিদার মাথায় আসে না। নিশাত আরো চিতৎকার আর উদ্ধত ভংগিতে বলে – ‘আপনার এই সব রাবিশ কথা আমি শুনবো না। রাখি।’
বলে লাইন কেটে দেয়।
ফিদার এবার সত্যিই মাথায় আগুন ধরে যায়। সাথে সাথে কল ব্যাক করে। নিশাত ধরে না। আবার করে। এবার ধরে। কর্কশ স্বরে বলে –‘হ্যালো।’
ফিদা বলে – ‘তুমি এভাবে ফোন রাখতে পার না বেয়াদপের মত। আর এরকম বাজে শব্দ ‘রাবিশ’ আমাকে কোন সাহসে বলো। নিজে মিথ্যা কথা বলো আর আমাকে বলো রাবিশ। আমি কোন্ দিন বনির কথা বললে কিচ্ছু বলতাম না। বেশী বাড়াবাড়ি করো না।’
‘আমি আপনাকে অনেক সম্মান করি।’
‘এই তার নমুনা। বুঝেছি বাস আর আমার কোন কথা নেই।’
রেখে দেয় ফিদা। ঝিম মেরে যায় একদম। এক অফিসের ঝামালা বা কষ্ট ওদিকে নিশাতের এমন মিথ্যাচার আর দুর্ব্যবহার! অনেক সিগারেট খেয়েছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে বলতে। আবার এই মূহুর্তে ডেস্কে বসতে ইচ্ছে হয় না। নীচে চলে যায়। একটু ফ্রেশ হাওয়া লাগাতে। অফিসে চা এর ব্যবস্থা আছে। তবুও বাইরে টং এর দোকানের চা খায় কন্ডেন্সড মিল্ক দেওয়া। পরে যেয়ে একটা ঠান্ডা কোকের ক্যান নিয়ে হাটতে হাটতে ফিরে আসে অফিসে। এত বিরক্ত আর কষ্ট লাগে মানুষের অসাধুতায়, মাথা থেকে সব ঝেরে ফেলে। কাজে মন দেয়। কখন বিকেল পাঁচটা বাজে খেয়ালই করে না। কোন তাড়া নেই আস্তে ধীরে অফিস থেকে বের হয়। ক্লাবে যায়। সাঁতার কাটে নওশাদের সাথে। পরে উপরে যায় দুজনেই। নওশাদ ইদানিং ড্রিংক করা ছেড়ে দিয়ছে। জুস বা ডাবের পানি খায়। আড্ডা দেয় সয়াব্র সাথে। ফিদা তো অবধারিত কোরোনা বীয়ারের একেকটা বোতল শেষ করতে থাকে। কেউ জিজ্ঞেস করলে – ‘কিরে কয়টা খাইসস?’
ফিদার প্রাত্যহিক উত্তর – ‘ওয়েটারকে জিগা। আমি জানি না!’
সবাই হাসে। ফিদাও হাসে। দশটার দিকে নিশাতের ফোন আসে –
‘আমি সুইমিং শেষ করে একটু পর বের হব। আপনি কি একটু নীচে নামবেন?’
ফিদা খুব অবাক হয়। অবে ওর গলার স্বরে খুব আকুতি ছিল। তাই খারাপ কিছু বলবে মনে হয় না। একটু পর নেমে বাইরে না দেখে পুলের ভিতরে চলে যায়। তখন দেখতে পায় নিশাত বেরিয়ে আসছে। ফিদা বলে – ‘কই তুমি না আমাকে ফোন করার কথা ছিল বের হওয়ার আগে?’
‘এখনই করতে যাচ্ছিলাম। চলেন বাইরে যেয়ে কথা বলি।’
নিশাতকে কেমন যেন ভাবপ্রবণ কিন্তু ভীত মনে হয়। হ্যামিলনের বাঁশি ওয়ালার পিছে পিছে যাওয়ার মত ফিদাও ওর পিছনে পিছনে ক্লাব থেকে বের হয়। নিশাত কেমন করে যেন তাঁকায় ফিদার দিকে। সেটা ভয় না আবেগ না অস্থিরতা নাকি সব একসাথে এরকম কিছু মনে হয় ফিদার। মাথা কাজ করে না ফিদার। অপেক্ষা করে কি বলে নিশাততা শোনার জন্য। নিশাত বলে –
‘আপনি আমাকে খুউব ভালবাসেন?’
‘হ্যা। কোন সন্দেহ আছে?’
‘নাই। আর আমি?’
ফিদা নিশাতের দিকে তাঁকায়। দেখে নিশাতও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ফিদা কি বলে। অথচ উত্তরটা তো নিশাতের দেওয়ার কথা। তবুও ফিদা বলে –
‘হ্যা। আমার বিশ্বাস তুমিও আমাকে খুউব ভালবাস। আমাদের দুজনের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরী হয়েছে সেটা কারো পক্ষে উপেক্ষা করা সম্ভব না।’
নিশাত ফিদার দিকে তাঁকিয়েই ছিল, ফিদার উত্তরে মনে হয় খুব শান্তির একটা ভাব আসে আগের অস্থির ভাবটা সরিয়ে। ওরা হেটে হেটে আগাতে থাকে। আরো কি সব কথা হয়। সবই আবেগঘন। ফিদা মনে করতে পারে না। কিন্তু নিশাতকে আবারো ভীত মনে হয়। ফিদাকে আস্তে কথা বলতে বলে। মাতাল অবস্থায় ফিদাকে সবাই তাই বলে। আসলেই জোড়ে কথা বলে। কিন্তু নিশাত যেই পাশ দিয়ে যাচ্ছে সবার দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাঁকায়। তারপর একসময় ‘যাই বলে হঠাৎই চলে যায় সোজা হেটে। কোথায় ওর স্কুটি কিসে যাবে কিছুই মাথায় আসে না ফিদার। তবুও একডালা প্রশান্তি নিয়ে আবার ওঠে বারে। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়। ড্রইং রুমে বসে ফোন নিয়ে দেখে নিশাতের টেক্সট। আগ্রহ নিয়ে পড়তে যায়। দেখে ও লিখেছে –
‘প্লিজ আমাকে ব্লক করে দেন আমি পারছিনা আপনাকে বাদ দিতে!’
ফিদা হতভম্ব হয়ে যায়। কি খেলা করে এই মেয়ের মাথায়। দু ঘন্টা আগে কি আবেগ দেখিয়ে গেল। আর এখন বলছে সম্পর্ক ছিন্ন করতে। তাও ফিদাকে! ও সাথে সাথে টেক্সট করলো – ‘দেখ, আমি খুব শান্তি নিয়ে বসায় এসেছি। সেটা নিয়েই থাকতে চাই। দয়া করে আজ রাতে আর কোন টেক্সট করো না। যা বলার কালকে বলো!’
নিশাত কি শোনে কখনো ফিদার এরকম কথা। মদ খায় ফিদা। আর রাতে সব উল্টো পাল্টা টেক্সট করে সম্পর্ক খারাপ করে নিশাত। ওর পরবর্তি টেক্সট পেয়ে বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলে। নিশাত লেখে –
‘আমি গিয়েছিলাম আমাদের সম্পর্ক ফাইনাল ব্রেকআপ করতে। কিন্তু আপনাকে দেখে কি যে হলো আমি আর পারলাম না।’
ফিদা আবারো বলে – ‘প্লিজ আজ থাক কাল কথা বলি?’
নিশাত থামে না। ও বনির সাথে এক হতে চাচ্ছে। কিন্তু ফিদা ওর মনেরমধ্যে এমনভাবে বসে আছে যে, ফিদা একটা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওদের মাঝে। নিশাত যেহেতু পারবে না। তাই ফিদা যেন ওকে ব্লক করে দেয়। ফিদাই যেন সরে যায়।
ফিদার তখন সত্যি রাগ আর অভিমান হয়। মনে আসে নীতার সাথে ওর কোন সমস্যাই ছিল না। এত কিছু ধরা পড়ার পরেও নীতা ওকে বাদ দেয়নি। কত কিছু ছেড়ে কতজনকে বঞ্চিত করে ও নিশাতের সাথে সময় কাটিয়েছে। নিশাতের সাথে অলিখিত চুক্তি হয়েছে যে ওরা কেউ কারো স্পাউস নিয়ে কথা বলবে না। ফিদা তো বলে নি কিছু। তাহলে কেন এই স্বার্থপরের মত আচরণ নিশাতের! নিশাতের জন্য কি না করেছে ফিদা। ফিদার সাবধান বানী যখন উপেক্ষা করে নিশাত একটার পর একটা নেতিবাচক টেক্সট করতে থাকে। তখন ফিদা লিখে –
‘দেখ এরপর যা লিখবো তার দায় দায়িত্ব আমি নিব না’
এরপর ফিদা নিশাতের জন্য কি না করেছে সব একের পর এক লিখে যায় মাতাল অবস্থায়। পরে মুছেও ফেলে ঘুমানোর আগে। মনেও থাকে না কি লিখেছে। শুধু মনে ছিল ইচ্ছে মত রাগ ঝেরেছে আর নিশাতের জন্য কিকি করেছে, কত টাকা সব কিছু বলেছে। কেন বলেছে কি প্রসংগে বলেছে, তা মনে নেই।

পরদিন সকালে যেয়ে নিশাতের আবার নেতিবাচক টেক্সট আসতে থাকে। এবং একটার সাথে আরেকটার কোন মিল নেই। একবার মনে হয় ইতিবাচক কিছু বলছে। ফিদা সমর্থন করলেই নিশাত আরো নেতিবাচক কিছু বলে সেটাকে ‘নাল এন্ড ভয়েড’ করে দিচ্ছে। ফিদা রীতিমত উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে ফিদার অফিসে আসতে বলে নিশাতকে। নিশাত রাজী হয় না। ফিদা খুব রাগ করে বলে –
‘তোমাকে আসতেই হবে। তুমি আমাকে ভালবাস কিনা তার প্রমাণ আমি দেখতে চাই। তুমি একেক সময় একেক কথা বল। আর কয়েকদিন থেকে একেবারে পালিয়ে বেড়াচ্ছ। আমাদের যদি সত্যিই কোন সম্পর্ক থাকে তাহলে তোমাকে আসতেই হবে এখন। অনেক ভুগিয়েছ।’

একবার ফোন একবার টেক্সট এরকম বাক্যালাপের মাঝে হঠাৎ নিশাত ফিদাকে বলে নীচে নামতে। ফিদা বুঝে যায় নিশাত এসেছে। ওর কথা রেখেছে। কিছুটা সস্তি ও প্রত্যাশা নিয়ে নীচে নামে। সাধারনত নিশাত আগে এসে পৌছে পরে ফোন দেয়। নিশাতকে নীচে পায় না। ফোন দেয়। নিশাত বলে আসছে, কাছেই আছে। কিছুক্ষণ পর ওকে হেটে হেটে আসতে দেখে। আশান্বিত হয়ে এগোয় ফিদা কিন্তু নিশাতের মুখ দেখে প্রত্যাশায় ভাটা পড়ে। ওর মুখে অমবস্যার অন্ধকার ছেয়ে আছে। এসে দাঁড়ায় ফিদার সামনে। ফিদা জানতে চায় –
‘তোমার স্কুটি কই?’
‘স্কুটিতে আসিনি, পাঠাও এ এসেছি।’
গাম্ভীর্য রেখেই শুষ্ক কন্ঠে উত্তর দেয়।
ফিদা তবু কাষ্ট হাসি মুখে এনে বলে – ‘ধন্যবাদ আসার জন্য।’
নিশাত ফিদার ধন্যবাদ গ্রহণ না করে মুখে আরো বেশী তিক্ততা এনে। বলে –
‘আমি বেশীক্ষণ থাকতে পারবো না। অফিসে কাউকে বলে আসিনি। আপনি জোড় করলেন তাই আসচি।’
এর মধ্যে অফিসের পিয়ন আসে যাকে ডলার আনতে দিয়েছিল আইফোনের দাম দেওয়ার জন্য ওর বন্ধু আসাদকে। ফিদাকে রাস্তায় দেখে ওর কাছে আসে। ডলার দেয়। এক লাখ দশ হাজার পড়ে। ডলারের দাম এখন খুব বেশী। নিশাতের দিকে তাঁকিয়ে বলে –
‘আমার কপাল যে খারাপ! ডলার কিনতে গেলাম তখন ডলারের দাম বেড়ে গেল!’
নিশাত ওদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই করে না। ফিদা একটু অবাক হয়। ওর আইফোনের জন্য ডলার কিনছে নিশাততো জানে সেটা। প্রসংগ পাল্টে বলে -
‘আমি খুশী হয়েছি তুমি আসচো। কিন্তু তুমি এত গম্ভীর হয়ে আছ কেন?’
নিশাত কোন উত্তর দেয় না। ফিদা আবার বলে –
‘আমি জানতে চেয়েছিলাম তুমি আমাকে যা বলেছিলে আগে তা কি এখনও ঠিক আছে? রাতে বল ভালবাসি, সকালে বল ভুলে যান! পরিস্কার করে বলো।’
নিশাত এর উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে –
‘আচ্ছা আমি আপনার কাছ থেকে কখনো পকেটমানি নিয়েছি?’
ফিদা খুব অবাক হয়ে যায় এমন প্রশ্নে। ফিদা এক ফ্রেন্ডকে বউকে ওদের সম্পর্কের টানা পোড়নের কথা বলেছে, ও ঠিক এই কথাটা বলেছে যে –
‘মেয়েটা আপনার সাথে টাইম পাস করে আর পকেট মানি চালিয়ে নেয়।’
তাই প্রথমে একটু চমকে যায় নিশাতের প্রশ্নে। আর রাগ হয় নিশাতের উপর ওর প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে পালটা এমন বিরক্তিকর প্রশ্ন করায়। ওর মনেই হয় না রাতে কি সব টেক্সট করেছে। নিশাতের পিছনে টাকা খরচের ফিরিস্ত দিয়েছে। নিশাতের স্পর্শ কাতরঅনুভূতি বুঝতে পারে না। উল্টো রাগ দেখিয়ে বলে –
‘হ্যা নিয়েছ তো।’
নিশাত চমকে আহত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফিদার দিকে। ফিদা রাগের অসংযত পর্যায়ে চলে যায়। নিশাত যখন জানতে চায় – ‘কখন, কিভাব?’
ফিদা বলে – ‘কতবার তুমি এটিএম থেকে টাকা তুলবে বলেছ, আমি দিয়ে দিয়েছি।’
‘সেগুলো আমি ফেরত দিতে চেয়েছি, আপনি নেন নি!’
এবার বেশ কাঁদ কাঁদ গলায় চিৎকার করে বলে নিশাত।
‘একবার দু বার দিতে চেয়েছ। পরে আর কোন দিন তুমি বলনি। আমিও চাই নি। আমি এখনো চাই না। তুমি জিজ্ঞেস করলা বলে বললাম।’
‘আর কি নিয়েছি?’
একই রকম স্বরে জানতে চায় নিশাত। ফিদা বলেই যায় -
‘পূর্বাচলে বাজার করতা। আমি পয়সা দিয়ে দিতাম। সামান্য যদিও। আমি তো এটাতে কিছুই মনে করিনি! বলেছ দিয়ে দিবে। পরে তুমি আর কিছু বলনি। আমিও ফেরত নেওয়ার জন্য দেইনি। আবারো বলছি তোমার এই বিরক্তি কর প্রশ্নের কারনে আমি বলছি এসব। না হলে এটা কোন বিষয়ই না। আমি আমার গার্ল ফ্রেন্ডের জন্য এই সামান্য খরচ করতেই পারি।’
নিশাত প্রায় কেঁদে বলে –
‘আমি কতবার ফেরৎ দিতে চেয়েছি। আপনি রাগ করেছেন। তাই আর চেষ্টা করিনি।’
‘আমি তো আস্বীকার করিনি যা তুমি দিতে চাওনি। কিন্তু তুমি যখন বললা আমি পকেট মানি দিয়েছি কিনা, তাই বললাম।’
নিশাত মুখটা আরো অন্ধকার করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হাটা দেয়। ফিদা বলে –
‘কি চলে যাচ্ছ?’
‘আমার আর সময় নাই। বললাম তো কাউকে বলে আসিনি।’
‘আমার প্রশ্নের উত্তর তো দিলে না!’
‘আসলাম যে এটাই উত্তর।’
‘রাতে দেখা হবে?’
‘না। কোচিং আছে।’

ফিদা দাঁড়িয়ে যায়। না পারে নিশাতের মন বুঝতে না পারে নিজের অবস্থা বুঝতে। নিশাতের সাথে ওর সম্পর্ক কি আগালো না পেছালো। ‘আসলাম যে’ মানে ইতিবাচক না নেতিবাচক। তাও এসেছে নিশাত এত টুকু সন্তুষ্টি নিয়ে মন ভাল করতে চায়। যদিও আশা ছিল নিশাত এলে ওদের সম্পর্কটা পুরো পরিস্কার কারে ঝালাই করে নেবে নিশাতের মুখ থেকে আশ্বাস পেয়ে। তার কিছুই হলো না যদিও। অফিসে চলে যায়।  

বিকেলে যথারীতি সাঁতার শেষ করে বারে উঠে যায়। তখন বাজে প্রায় সাড়ে দশটা। বারে উঠেছিল সাতটার একটু পরে। এতক্ষণে বেশ ভালই গিলে ফেলেছে। খোশ মেজাজে আড্ডা দিচ্ছিল। ভুলেই গিয়েছিল নিশাতের কথা। ও আসবে না বলেছে। অন্তত ওর সাথে দেখা করতে এসেছিল অফিসে। তাই কোন রকম সংশয় ছিল না মনে নিশাতকে নিয়ে। হঠাৎ একটা ফোন পায় নিশাতের কাছে থেকে। বলে –
‘আমি আপনার ক্লাবের কাছে আসছি। আপনি আসতে পারবেন একটু? আমি একটা কাগজ দিব। আপনি বাসায় যেয়ে দেখবেন।’
ফিদা একটু সন্দেহ নিয়ে বলে – ‘কি চেক দিবে?’
‘না শুধু একটা কাগজ।’
‘আচ্ছা আমি নামছি।’
ফিদা নেমে আসে গাড়ি নেয়। এর মধ্যে টেক্সট পায় আবার –
‘আমি দশ মিনিট ওয়েট করতে পারবো।’
ফিদা একটু বিরক্তই হয়। যদিও জানে তার আগেই পৌছাবে। উত্তর দেয় না। দিতেও পারতো না। গাড়ি চালাচ্ছিল। গাড়িটা গলির মাথায় রেখে কফি শপের সামনে যায়। দেখে নিশাত স্কুটির উপর বসে আছে। হাসি মুখে তাঁকায় ফিদা নিশাতের দিকে। নিশাত খুব বিরক্ত ও চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করে –
‘আপনার গাড়ি কই?’   
‘এইতো পিছনে!’
‘চাবি দেন।’
ফিদা দিয়ে দেয়। আর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে নিশাত কি করবে চাবি নিয়ে। কত কিছুই না করে চমকে দেয় ফিদাকে প্রায়ই। ফিদা দেখে নিশাত ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটের দরজা খুলে গাড়ির ড্যাশ বোর্ডের ভিতরে কাগজে মোড়া কিছু একটা রেখে দ্রুত ওর স্কুটির দিকে চলে যায়। ফিদার মনে হয় কাগজের ভিতর কিছু টাকা হতে পারে। ফিদা এরকম কোন কিছুর জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। একটা রোমান্টিক কিছু আশা করে এসেছিল। ওর গাড়ির চাবি চাওয়াতে খুশী হয়েছিল হয়তো নিশাতই গাড়ি চালাতে চাবে। আর ফিদা অতিরিক্ত মাতাল অবস্থায় ছিল ঘন্টা তিনেক পান করে বিভিন্ন টেবিলে আড্ডা দিয়ে। ফিদার মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ও দ্রুত ড্যাশ বোর্ড খুলে দেখে কাগজে মোড়া কিছু এক হাজার টাকার নোট। দ্রুত নিশাতের কাছে যায়। ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে ওর গাড়ির কাছে। নিশাত কিছুদিন আগে একটা এক্সিডেন্টে আংগুলে ব্যথা পেয়েছিল। ফিদার সেই হাত সজোড়ে ধরে টান দিলে নিশাত কান্নার ভংগিতে ‘উফ শব্দ করে তাঁকায় ফিদার দিকে। চোখের দৃষ্টিতে যেন বলে –‘তুমি জান না আমার এই আঙ্গুলে ব্যথা?’ ফিদার তো কণ হুশ জ্ঞান নেই। মাথাই নেয় না কিছু। নিশাতকে টেনে হিচড়ে ওর গাড়ির দরজায় এনে হুংকার দিয়ে বলে – ‘বের কর কি এনেছে?’
নিশাত কাঁদ কাঁদ স্বরেই বলে –
‘না। আপনি কাগজটা বাসায় যেয়ে পড়বেন।’
ফিদা আরো ক্ষেপে যায়। বলে – ‘নাও তোমার টাকা!’
‘না।’
ফিদা টাকা গুলো মাটিতে ছুড়ে ফেলে। তারপর নিশাতকে ধমক দিয়ে বলে –
‘তুমি পড়ে শোনাও। আমার পড়তে বয়েই গেছে। তোমার ... লেখা!’
নিশাত কোন মতে হাত ছুটিয়ে দৌড় দিয়ে যায় ওর স্কুটির কাছে। ফিদাও ছুটে যায় ওর স্কুটির কাছে। নিশাত তাড়াতাড়ি ওর হেলমেট পড়ে ফেলে। খুব ভয় পাওয়া অবয়ব। ফিদা কাছে এলে  ভয়ার্ত স্বরে  বলে –
‘আমার টাকা দিতে আসা ভুল হয়েছে।’
বেগুশ ফিদার কোন কিছুতেই যায় আসে না। নিশাতের ভুল স্বীকার ভয়ার্ত চেহারা কিছুই ওকে স্পর্শ করে না। যা তা গালি গালাজ শুরু করে। নিশাত জিহবা বের করে আশে পাশে মানুষদের ফিদাকে দেখাতে চেষ্টা করে। ফিদা যেন আরো উৎসাহ পায়। বলে যায় – ‘ব্লাডি হোর ... আমার কত টাকা খরচ করিয়েছিস তুই জানিস না! আবার কয়টা টাকা শোধ দিতে আসচিস কোন সাহসে। তোর জন্য আমি কিনা করেছি। তোর কাছে আমি টাকা চেয়েছি। মাগী কোথাকার ...’
নিশাত অনেক অনুনয় করে তাঁকায় ওর দিকে। জিভে কামড় দিয়ে বোঝাতে চায় ফিদা ঠিক করছে না। ফিদা এতে যেন আরও উৎসাহ পায়। রাগের জ্বলন্ত আগুনে যেন মুক্ত অক্সিজেন পেয়ে ঝলসে উঠে! ফিদার মুখের কোন লাগাম থাকে না। আরো কি কি সব বলতে থাকে। আশে পাশের লোক জন কিছু জড় হতে থেকে। কিন্তু ফিদার জ্বলন্ত মূর্তি দেখে নাকি নিশাতের চুপ করে সহ্য করা দেখে কেউ আগায় না। নিশাত স্কুটি টান দেয়। ফিদাও দ্রুত গাড়িতে এসে গাড়ি ওর পিছু নেয়। ফিদা দেখে নিশাত ওর বাসার দিকে না যেয়ে ক্লাবের রাস্তায় ঢোকে। ফিদাও তাই করে। একটু সামনে যেয়ে নিশাত রাস্তার পাশে পার্ক করে। ফিদাও রাস্তার পাশে পার্ক করে নেমে এসে ধমকে জিজ্ঞেস করে নিশাতকে – ‘এখানে কোথায় যাচ্ছিলে।’
‘কোথাও না ওখান থেকে চলে এসেছি এখানে এসে কথা বলার জন্য।’
নিশাত খুব শান্ত স্বরে ফিদাকে জানায়। কিন্তু ফিদা আসলে নিজের মধ্যে নেই। ওজানেই না কি বলছে, কেন বলছে। কি করছে, কেন করছে। বলে -
‘তুই এক্ষুণি চল আমার সাথে। তোকে নিয়ে হোটেলে যাব!’
‘না।’
‘হাত ধরে টান দেয়।’
ভয়ে নিশাত প্রায় কেঁদে বলে – ‘কালকে যাব!’
সম্পুর্ন মাতাল হয়েও ফিদা বুঝতে পারে নিশাত ভয়ে বলছে। তাই বলে –
‘আমি তোকে বিশ্বাস করি না। এখনই চল!’
‘না’
‘আবার বলে ভালবাসে! এই তোর ভালবাসা? তুই একটা বেশ্যা! চল আমার সাথে!’
‘আমি কখনই ভালবাসি নাই! সব মিথ্যা!’
চিৎকার করে বলে নিশাত। ফিদার তখন পাগলেকে পোল নাড়াতে মানা করার মত অবস্থা! কি করবে ভেবে না পেয়ে নিশাতের মুখের সামনে নাক ঢেকে রাখা কাপড় টান দিয়ে ফেলে দেয় মাটিতে। ওর হেলমেটও মাথা থেকে টেনে বের করে আছাড় দেয় মাটিতে। নিশাত নেমে তুলে মাথায় দিয়ে স্কুটিতে বসে। ফিদা আবার একই কাজ করে। নিশাত এবার হেলমেট তুলে প্রচন্ড রাগের সাথে ফিদার মাথায় মারতে যেয়ে থেমে যায়। ফিদা এই পাড় মাতাল অবস্থায়ও বুঝতে পারে এখনও ফিদার জন্য মমতা আছে নিশাতের, এতে যেন আরও উদ্দিপনা পায় নিশাতকে অপমান করতে। বলে –‘কত টাকা খরচ করেছি তোর পিছে জানিস। দুই টাকা ফেরত দিতে আসচিস! সোনারগাও হোটেলেই বিল দিয়েছি কত টাকা। তুই যেতে বলেছিস! লং ড্রাইভে আরেকটু যান আরেকটু যান করে কত টাকার পেট্রল পুড়িয়েছি জানিস? আমার সাথে যত স্বতী সাদ্ধী সাজা। দুনিয়া জোড়া তোর ভাইয়া ভরা। রাত বিরাতে সবাইকে দিয়ে বেড়াস। আমাকে দিবি না কেন? চল!’
‘আমি আমার সাথে একটা খুব বড় ভুল করেছি! বনির থেকেও অনেক বেশী কষ্ট আপনি আমাকে দিয়েছেন!’
খুবধীর স্বরে আস্তে আস্তে বলে নিশাত।
‘ভুল তুই না আমি করেছি। একটা মাগীর সাথে প্রেম করে!’
নিশাত আহত চোখে মাথা নীচু করে নীচের দিকে তাঁকিয়ে থাকে। এটাও সহ্য হয় না ফিদার। মনে হয় কিছু একটা বাকী আছে। হঠাৎ করে একটা চড় বসিয়ে দেয় নিশাতের গালে! দিয়ে নিজেই অবাক হয়ে যায় কেন চড় মারলো?
নিশাত এবার সত্যিই চমকে যায়। ওর চোখ ছল ছল করে উঠে। তারপর আবারো খুব ধীরস্বরে বলে –
‘আপনি আজ আমার সাথে খুব অন্যায় করলেন।’
ফিদার তখন একটু খারাপ খারাপ লাগলেও ওর নেশা ওকে ভদ্র জগতে ফিরে আসতে বাঁধা দেয়। নিশাত হঠাৎ ওর স্কুটি টান দেয়। ফিদা দৌড়ে গাড়ির কাছে যায়। যেতে যেতে বলে –
‘কই যাবি? আমি তোর বাসার সামনে যেয়ে চিৎকার করে তোকে ডাকবো!’
নিশাত চলন্ত স্কুটি থেকেই বলে –
‘আমি বাসায় যাব না!’
ফিদা গাড়ি স্টার্ট দেওয়াই ছিল। গাড়িতে উঠে দ্রুত নিশাতের স্কুটির পিছু নেয়। ভাবে ও যাব কোথায়। রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ির গতির সাথে পারবে না পালাতে। ঠিক তখনই মোড়ের সামনে একটা ট্রাক আসে। প্রচন্ড হতাশায় ফিদার মুখ দিয়ে বের হয় – ‘ও শীট!’
নিশাতকে খুঁজে পায় না আর। নেশায়া চূড় হওয়া ওর মস্তিষ্ক ওর গাড়িকে নিয়ে যায় নিশাতের বাসার সামনের রাস্তায়। বেশ কিছুক্ষন বসে থেকে নির্জন রাস্তায়। ভাবে যাবে কই? ওকে তো ঘরে ফিরতেই হবে। বসে বসে আজে বাজে টেক্সট করতে থাকে। ‘কই গেলা এত রাতে। আমি তোমার বাড়ির সামনে। কার সাথে রাত কাটাবে? কোন ভাইয়ার সাথে ...’ এরকম সব টেক্সট। কিছুক্ষণ বুঝতে পরে ওর টেক্সট আর যাচ্ছে না। এক সময় ওখান থেকে চলে যায়। বাসায় ফিরে আসে। এসেই সরাসরি বিছানায়।
সকালে উঠেও মেজাজ গরম থাকে। ওকি কি করেছে স্পষ্ট মনে না থাকলেও কিছুটা মনে আসে। কিন্তু কোন মতেই বুঝতে পারে না কেন করেছে এমন উন্মাদের মত নিষ্ঠুর আচরণ! সারাদিন অফিসে নিশাতের অতি নাটকীয়তার ফলে এই ভয়ংকর ফলাফলের জন্য রাগ হতে থাকে। আর সত্যিকারের ব্রেক আপ মেনে নিতে কোন কষ্ট হয় না। এমন ক্রোধ রয়ে গিয়েছিল তখনও অন্তরে। কিন্তু বিকেল হতে হতে অফিস থেকে বের হওয়ার সময়ই মন উল্টো বাঁক নিয়ে সঠিক পথে ফেরৎ আসে। মনটা হাহাকার করে উঠে – ‘হায় হায় একি করলাম আমি! কেন করলাম এমন!’
নিশাত যাই করুক না কেন ফিদা রেগে যাওয়ায় নিশাত তো প্রথমেই স্বীকার করে নিয়েছিল ও ভুল করেছে এভাবে টাকা ফেরৎ দিতে এসে। তখনই তো মিটমাট হয়ে নিশাতের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কে ফিরে যেত প্রতিবারের মত! কেন সে এত পশুর মত আচরণ করলো বিনা উস্কানিতে। নিশাত তো সব নীরবে সহ্য করলো। একটা প্রতিবাদও করলো না! ওকে হেল্মেট দিয়ে মারতে এসেও থেমে গেল। এটা কি ওর ভালবাসা ছিল না? ও যদি ওর ভালবাসার মানুষের কোন ক্ষতি না করতে পারে ফিদা কীভাবে পারলো একটামেয়েকে রাস্তায় সবার সামনে আজেবাজে কথা বলে আবার মারধোর করতে। ফিদা তো নিশাতকে জান দিয়ে ভালবাসে! কেন করলো এরকম। কিসের এত রাগ হয়েছিল ওর তখন এমন পশুর মত ব্যবহার করতে! বারবার মনে আসে ওর শেষ কথাটা – ‘আপনি আমার সাথে আজ খুব অন্যায় করলেন!’
আরো মনে আসে আরেকটা কথা। ওকে বাজে ভাষায় গালাগালি করলে ও বলতো– ‘আপনি চিন্তা করেন আপনার যদি মেয়ে থাকতো তাকে কেউ এই ভাষায় কথা বলতো আপনার কেমন লাগতো!’
তখন একথা শুনে ফিদার কাছে অদ্ভুত লাগতো, রাগ হত। কিসের মধ্যে কি? কিন্তু এখন ও পরিস্কার অনুভব করতে পারছে ওর কষ্ট টা। কিন্তু এটা কি ওকে কোন্ দিন আর জানাতে পারবে?
দিনের প্রতিটা প্রহর ওর কাটে ওর অসহ্য আস্থিরতায়। গত তিন মাসও ওর ছিল অস্থিরতা, যতদিন ওর সাথে সম্পর্ক ছিল। ব্রেকআপ হলেও ওর দৃঢ় প্রত্যয় ছিল নিশাত ফিরে আসবেই। কারন ফিদার কোন দোষ ছিল না। আর ফিদার বিশ্বাস নিশাতও ওকে মিস করতো ওর মতই। কিন্তু এবার যা হয়েছে সেজন্য নিজেকে নিজেই ক্ষমা করতে পারছে না। নিশাতের কাছে বলার সুযোগ পেলেও কি বলবে?
এর মধ্য ওর ইউএসের প্রবাসী বন্ধু আসাদ চলে আসে আর ওকে আইফোন ইলেভেন প্রো দেয়। ফিদাও ওকে ডলার দিয়ে দেয়। কি করবে ফোন নিয়ে বুঝতে পারে না। অবশেষে একটা বুদ্ধি বের করে। নিশাতের কলিগের নাম্বার তো ওর কাছে আছে। নিশাত তো ওকে সব কিছু থেকে ব্লক করে রেখেছে। ও অনেক টেক্সট হোয়াটসএপ, ম্যসেঞ্জার, ভাইবার, ফোনের ম্যাসেজ সব গুলোতেই পাঠিয়েছে। উত্তর আশা করেনি। কিন্তু বুঝেছে যে ওর কাছে পৌছায়ই নি। তাই রাইসাকে একদিন ফোন করে। কুশলাদি বিনিময়ের পর একটু বুদ্ধি করে বলে –
‘নিশাতের সাথে তো আমার মোটামুটি পরিচয় ছিল। ওর জন্য আমি একটা আইফোন আনিয়েছি এমেরিকা থেকে। ঐ চেয়েছিল। কিন্তু হয়েছে কি একটা ভুল বুঝাবুঝিতে আমি ওর সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি। এখন ফোনটা নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম। যদিও আমি গিফট করতে চেয়ছিলাম, ওর যদি গিফট নিতে ইচ্ছে না হয় চাইলে দাম দিয়ে নিতে পারে। আমার সাথে কোন কন্টাক্ট না করেই। কারন আমি এই ফোন দিয়ে এখন কি করবো?’
রাইসা রাজী হয় বলতে। ফিদাও আশা করে এত দামী একটা জিনিষ ফিদা ওর কথায় এনেছে। নিশাতের গিফট নিতে আত্মসম্মানে লাগলেও দাম দিয়ে হলেও নিবে। এরকমই কথা ছিল। কিন্তু রাইসা কিছু না জানালে ফিদা আবার ফোন করে পরের দিন। রাইসা বলে – ‘আরে ও তো আপনার উপর ভীষণ ক্ষেপে আছে। আপনার কোন কথাই শুনতে চায় না। আর আপনার থেকে আর কিছুই নিবে না।’
ফিদা হতাশ হয়। এক বন্ধু বলে রেখেছিল চাইলে ওর কাছে বিক্রী করতে পারে। পরে বাধ্য হয়ে তাই করে। কিন্তু কষ্টটা রয়ে যায়। নিশাত এটা বুঝলো না ফিদা কত ঝামেলা করে এত টাকা খরচ করে ওকে একটু খুশী করতে চেয়েছিল। একরাতের ঝড়ে এক চুটকিতে অবহেলায় ফিরিয়ে দিল ফিদার উপহার।
গত তিন মাসে দুদিন পরপরই সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরলেও ওর বিরহ ছিল কিন্তু কোন অপরাধ বোধ ছিল না। আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারতো এই ভেবে যে ওর যদি কোন টান না থাকে তাহলে ফিদার থাকবে কেন? কিন্তু এবার ওর সারাক্ষণই মনে হচ্ছিল একটা পবিত্র নিঃস্বার্থ ভালবাসার সম্পর্ককে ও নিজে টুটি চেপে হত্যা করলো। নিশাতকে কত না কষ্ট দিল। নিশাতকে ফিরে পাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও ওর মূল কষ্ট হচ্ছিল ওর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া। ওকে বোঝানো সেরাতে যা যা বলেছে একটাও ওর মনের কথা না। নিশাতকে শুধু ভালই বাসে না শ্রদ্ধাও করে। ও যাতে ভুল বুঝে কষ্ট না পায় যে ফিদা নিশাতকে ওরকম মনে করে। এই বানী ওকে না পৌছানো পর্যন্ত ফিদার শান্তি আসছিল না। দিন রাত জীবন যখন অসহ্য হয়ে যাচ্ছিল, তখন আবার রাইসার সাহায্য নেওয়ার চিন্তা করলো। ফোন করলো ওকে। এবার রাইসা যা বললো ফিদা খুবই আশ্চর্য ও বিরক্তও হলো। ফিদা বলেছিল ওর সাথে একবার দেখা করার ব্যবস্থা করতে। ফিদা শুধু দুঃখ প্রকাশ করবে । আর কিছু চায় না সে। সেখানে রাইসা বললো –
‘শুনেন আপনি নাকি ওকে রাস্তায় মারধোর করেছেন, গালাগালি করেছেন! ও আপনার সাথে আর কোন যোগাযোগ করতে চায় না। কতজনকে সাঁতার শিখিয়েছে কারো সাথে কিছু হয় নি আর আপনি নাকি ওর প্রেমে পড়ে গেছেন?’
‘এগুলো বলেছে নিশাত?’
‘আরো বলেছে, আমি নাকি আপনার পিছনে লেগেছি। আশ্চর্য সামান্য টেক্সট করা বা ফোন করাকে আপনি এত খারাপ ভাবে নেন? আমাকেও খারাপ বানিয়ে ফেললেন?’
ফিদা খুবই অবাক হয় নিশাতের এইসব কথা রাইসাকে বলায়। নিশাত ওকে সবসময় বলতো ওদের যাই হোক ও কোন্ দিন ফিদার গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দিবে না। ফিদা যেখানে সব কিছু গোপন করে নিজেকে দোষী করে রাইসার মাধ্যমে নিশাতের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। সেখানে অর্ধেক সত্য বলে মিথ্যে অভিযোগ বানিয়ে রাইসাকে ওর উপর ক্ষেপিয়ে দিল। তাহলে এতদিন নিজের সম্পর্কে যা বলতো সব মিথ্যে? অন্যদের সম্বন্ধে যা বলেছে সেগুলোও অর্ধেক সত্য অর্ধেক বানানো, নিজের অংশ বা ভূমিকা পুরোপুরি গায়েব করে দিতে জানে এই মেয়ে। খুবই অসহায় বোধ করে ফিদা। এধরনের মানুষকে খুব ভয় করে ও। নিশাত এরকম ভেবে খুব কষ্ট হয়। তবুও ঠান্ডা মাথায় বলে –
‘আপনার সম্বন্ধে কি বলেছি কেন বলেছি, আপনাকে পরিস্কার করে আরেকদিন বলবো। আমি কিন্তু আপনাকে আমাদের সম্পর্কের সম্বন্ধে কিছুই বলিনি। কিন্তু ও বললো, অর্ধ সত্য। আমার সাথে ও পুরোপুরি ইনভল্ভড ছিল।’
‘কত টুকু ইনভল্ভড, আপনাদের কি ফিজিকাল রিলেশন হয়েছে?’
‘যদি বলি হ্যা, তাহলে কি মনে হবে রিলেশন ঠিক ছিল। আমি এই বিষয়ে কিছুই বলবো না। শুধু বলি এটা পরিপূর্ণ একটা রিলেশন ছিল।’
‘আরে ও যখন ওর হাজবেন্ডের সাথে ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছে। আপনি খামাখা ওর পিছনে লেগে আছেন কে? আপনি তো ম্যারিড!’
‘ওকে শুধু বলবেন আমি চাইলে ওর যে কোন জায়গায় যেয়ে উপস্থিত হতে পারি। আমি তা চাচ্ছি না। আমি প্যাচ আপ করার জন্য না। শুধু মাত্র ড্রাংক হয়ে যা করেছি আমার খুব খারাপ লাগছে। সেটা ওকে বোঝনোর জন্য।’
‘আচ্ছা আমি ওকে বলবো, ওকি বলে সেটা তো আর আমি জানি না। ও তো আপনাকে ব্লক করে দিতে বলেছিল। আমি বলেছি আমি কেন ব্লক করবো!’
‘আচ্ছা ধন্যবাদ, জানিয়েন ও কি বললো।’
আরো অবাক হলো নিশাতের আচরণে। তাহলে নিশাত এত তাড়াতাড়ি রঙ বদলাতে পারে! কিন্তু তবুও নিশাতকে মন থেকে সরাতে পারে না। রাইসার কাছে কোন উত্তর না পেয়ে একদিন ফোন করে। রাইসা ফোন কল রিসিভ করে না। আরো কয়েকদিন অস্থির সময় পার করার পর একটা লেখা লিখে ওর অনুভূতি নিয়ে। যেটা রাইসা কে টেক্সট করে অনুরোধ করে নিশাতকে ফরোয়ার্ড করে দিতে। নিশাতকেও ওর হোয়াটসএপ, ম্যসেঞ্জার, ভাইবার, ফোনের ম্যাসেজ সব গুলোতেই পাঠায়। যদি কখনো খুলে দেখে। ও লিখেছিল –

‘সে যেন আমার পাশে আজও বসে আছে
চলে গেছে দিন তবু আলো রয়ে গেছে ...’
সে চলে গেছে বহুদিন হয়ে গেল। কিন্তু ওর আলোটা, ছায়াটা রয়েই গেছে। চাইলেও সরাতে পারিনা যে! আসলে যে চাইই না! সকালে ওর বাড়ির সামনে দিয়ে যাই। জানি দেখা হবে না। সময় মিলবেনা। ও যে রাস্তা দিয়ে হেটে যায়, সেই রাস্তার সাথে প্রেম করি রোজ সকালে। শনিবার সকালে কষ্টটা বেশী হয় কারন প্রায় শনিবারে ওকে ওর বাসার সামনে থেকে তুলে নিতাম। পৌছে দিতাম ওর গন্তব্যে। নামিয়ে দেওয়ার আগ কখনো চমকপ্রদ চুমু আমার গালে। পাশের গেটে দাঁড়ানো বুয়ার দেখে ফেলা আর আমাদের বালক বালিকার মত লজ্জা মনে আসলে নিজের অজান্তেই মুচকি হেসে ফেলি। কিন্তু হাসিটা দীর্ঘায়িত হতে পারে না। সত্য চেপে ধরে। এমন ঘটনা আর হবে না। বুকের মাঝে কোথায় যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। গাড়ির এসি ইচ্ছে মত ঠান্ডা করি। আরাম পাই। কিন্তু মনের মধ্যে বসে থাকা আমার শত্রুটা আমাকে কখনই শান্তি দেয়না। মনে করিয়ে দেয়। কেউ একজন ছিল গাড়িতে উঠেই টেম্পারেচার ২৬ এ নিয়ে আসতো আর মুচকি মুচকি হাসতো। আমার গরমে শারীরিক কষ্ট হলেও ওর আমার উপর অধিকার ফলানোতে অমূল্য সুখ দিত। কোক পেপ্সির ক্যান বোতল খালি রাস্তা পেলেই ফেলে দিতাম। প্রচন্ড আপত্তি জানাতো। আমি বলতাম এখানে ফালাতে না দিলে তোমার বাসার সামনে ফেলে যাব। অথবা তোমার ব্যাগে ভরে দিব। ও কৃত্রিম রাগ দেখাতো। ফেলতে গেলে ধস্তাধস্তি করত। মাঝে মাজে মারও দিত। এখন ফেলে দেই নির্দ্বিধায়। কেউ কিছু বলে না। কিন্তু বুকটা শুণ্য হয়ে যায়। ছোটখাট একটা দীর্ঘ শ্বাসই ফেলতে পারি। আর কি বা করার আছে।
সেদিন হঠাৎ হাতির ঝিলে ঢুকে গাড়ি চালানো থেকে মনযোগ ছিল ধাবমান মটরবাইক গুলোর মাঝে কোন স্কুটি চোখে পড়ে নাকি! রাস্তার বাকে বাকে কল্পনায় ভেসে আসে সেই কাংখিত স্কুটি থেমে আছে আমার জন্য। আমি কাছে এলেই আবার চলা শুরু করবে। কিন্তু কোন স্কুটি থাকনা আমার অপেক্ষায় আমি একা একাই স্পীডে গাড়ি চালাই হাতির ঝিলের বাকে বাকে।পর্বত সম ব্যথা নিয়ে। আশকোনা সামনে দিয়ে এয়ারপোর্ট রোড ধরি। মনে হয় এখনই ফোন আসবে যে ও আমার পিছনেই আছে। সামনে যেয়ে যেন থামি। এখন আর এমন কোন ফোন আসে না শতবার আশকোনা পার হলেও। যখন ফোন দিত তখন ওইই দেখতো। আমি দেখতে পাইনি কখনো। তাই মনে হয় এখন কি দেখে আমাকে? এমন কল্পনায় একটু হলেও শান্তি আসে। আমি না দেখতে পাই। ও দেখলেই অনেক সুখ। কিন্তু সে সুখও অনিশ্চিত। নিজের মনের ইচ্ছার প্রতিফলন।
গাড়িতে উঠেই দুই সিটের মাঝে আমার বা হাতটা ধরতো পাঁচ আংগুল দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে। কোনদিন আবার আমি আগে হাত না ধরলে অনুযোগ করতো। অভিমান দেখাতো। এখন বা হাতটা প্রায়ই চলে যায় ওখানে। সাথে সাথে মনে আসে ও তো নেই, আসবেনাও কখনো আমার বাঁহাতের পাঁচ আংগুল সযতনে ধরবেনা যক্ষের ধনের মত। যত সুখ ছিল ততই ব্যথা দিয়ে যায় নিউটনের সুত্র অনুসরন করে।
অফিস থেকে নামি নীচে সিগারেট খেতে। অভ্যাস বশত খুজি ওর স্কুটি। নিশ্চয়ই একদিন আবার অবাক করে দিতে চলে আসবে নাতো? আসে না আর। আসবেনা। কিন্তু আমার ধূমপানের পুরো সময়টা আমার পাশে ওর ছায়া থাকে। কোথাও ওর ছায়া থেকে মুক্তি নেই! কতদিন! অনেক দিন তো হলো। দিন সপ্তাহ পেরিয়ে হিসেব এখন মাসে এসেছে। ওর অভাব বোধটা কমেনি একটুকুও! গত রবিবার গাজীপুর গেলাম আসলাম ড্রাইভ করে সাথে বন্ধু ছিল। আমরা দুজন দুজনের পছন্দ মত গান শুনছিলাম। গাজীপুরে বন্ধুর আপায়ায়নে মুগ্ধ আর হাস্যরসে পূর্ণ আড্ডায় পুলকিত অবস্থায় হাইওয়ে দিয়ে ফিরছিলাম। কিন্তু মনের ভিতরের শুণ্যতা ঠিকই জানান দিচ্ছিল। বলছিল তুমি সারাক্ষণ হাসছো, গান শুনছো, গলা মিলাচ্ছ, ব্যস্ত থাকতে চাইছো প্রতি মূহুর্ত, কেন? তুমি কি ওকে ভুলে থাকার বৃথা চেষ্টা করছো না? রাতের হাইওয়ের আলো আধারি আরা নিরালায় মন কেমন কেমন হবেই। সাথে যদি থাকে হৃদয় হারানোর ব্যথা। বেহালার করুন সুর থেকে মুক্তি মিলবে না কোন মতেই। আজ টাঙ্গাইল যাওয়া আসার পথে আশুলিয়ার পর বেশ কিছু ফ্লাই ওভার সহ মোড় পরলো। বিশেষ করে গভীর রাতে ফেরার সময়। আমরা প্রায়ই তিনশ ফিট ধরে অজানার উদ্দেশ্যে লং ড্রাইভে যেতাম। প্রায়ই পথ হারিয়ে ফেলতাম। একে ওকে জিজ্ঞেস করে আবার পূর্বাচল, তিনশ ফিটে ফিরে আসতাম। রোজকার ঘটনা ছিল আমাদের। লং ড্রাইভ আমার সবসময় পছন্দের। ওর ও ছিল তাই। তাই সেইরকম সুখ পেতাম ওর সাথে লং ড্রাইভে। অথচ আজ প্রতিটি মোড়, হাইওয়ে আমাকে তীব্র যন্ত্রণা দিল। সঙ্গি বন্ধুকেও বলতে পারলাম না। ওর নাম নিলেই ধমক খেতে হয় বন্ধুদের কাছে। এই একক কষ্ট কতদিন নিয়ে বেড়াবো? লং ড্রাইভ আমাকে কাঁদিয়েই যাবে সারাজীবন?
রেনেসা হোটেলে একটা লাক্সারী রুমে আমরা কয় বন্ধু ড্রিংক করছিলাম। এক বন্ধু বললো বিছানায় গা এলিয়ে দে। বললাম না। এখন শুলে উঠতে পারবো না। ও আমাকে পর্যবেক্ষণ করছিল জানতাম না। একটু পরে বললো – তুই এত রেস্টলেস কেন? সারাক্ষণই দেখছি কিছু না কিছু করছিস। এত অস্থির কিসের জন্য?
আমি স্বীকার করি যে আমি অস্থির। অস্থিরতার কারনও ওর জানা। আমি প্রতি মূহুর্ত একটা ছায়া, একটা স্মৃতি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু পালিয়ে কোথায় যাচ্ছি? ফ্রায়িং প্যান থেকে সোজা চুলার আগুনে। দোজখের আজাব যেন পার্থিব জীবনেই পেয়ে যাচ্ছি। অসহ্য কষ্ট। কিন্তু আমি এর থেকে মুক্তিও চাই না। কি অদ্ভুত আমার মন!
আর পূর্বাচলের কাশবন, প্রতিটি রাস্তা, রাস্তার বাঁক আমার জন্য বিভিষীকাময় হয়ে গেল। যেখানে আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতাম। ড্রাইভিং শেখানো, খাটি গরুর দুধের মালাই চা, খাটি শাক সবজি কেনা। সবাই আমাদের যুগল ভাবতো। এক অনুষ্ঠানে পূর্বাচল গিয়ে বুকটা খা খা করছিল। আমরা বলতাম একদিন পূর্বাচল ঘন বসতি হবে। তখনকি একবারো ভেবেছিলাম এত তাড়াতাড়ি সেই সুখ স্মৃতি বেদনা বিধূর স্মৃতিতে পরিণত হবে?
মাঝে মাঝে দ্রুত স্টিয়ারিং ঘোরাতে যেয়ে হেসে ফেলি ওর কথা মনে করে। ও এমন করলে আমার ওকে বাচ্চা মেয়ে মনে হত আর হাসতাম। ও কৃত্রিম রাগ দেখাতো। এখন হাসিটা এসেই মিলিয়ে যায়। হাসিটা অদৃশ্য কান্নার জন্ম দেয়। আমার দৈনন্দিন চলাফেরার প্রতিটা রাস্তা, কফি শপ, শপিং মল যেখানে যাই, ওর ছায়া আমার সাথে ঘুরে। আমাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। সস্তি কেড়ে নেয় নির্দিয়ভাবে। কিভাবে চলবো আমি বাকি জীবন?
‘বাইরে তখন হাওয়া ঝড়ো
সময় ছিল আমাদেরও’
ও আমার সাথে থাকা অবস্থাতেই এই লাইন দুটো আমাকে খুব কষ্ট দিত। ওকে হারানোর ভয় হত। আজ গানটা আমার জন্য কঠিন সত্য হয়ে গেল।
‘ধর যদি হঠাৎ সন্ধ্যে
তোমার দেখা আমার সংগে
মুখোমুখি আমরা দুজন
মাঝখানে অনেক বারণ’
গানটা আর বাজাই না। অদৃশ্য, নিঃশব্দ কান্না সশব্দে দৃশ্যমান হতে চায়।

আমার অনেক অন্যায় আচরণ আছে। অধিকাংশই মাতাল অবস্থায়। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করেছেকি ও একবারো, যা খারাপ কথা বলেছি, সব শুধু ও আমার থেকে অজ্ঞাত কারনে দূরে সরে গেছে বলে। আমার সাথে অদ্ভুত ব্যবহার করেছে। আমার সামনে এসে ডেকে বলেছে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। সেই রাতেই টেক্সট করে বলেছে ওকে ব্লক করে দিতে। আমি নাকি ওর স্বামীর সাথে সম্পর্কে বাঁধা হয়ে আছি। পরদিন আবার টেক্সট ও সামনে এসে অন্য কথা। আমাকে নাকি এভয়েড করছে না। অনেক ব্যস্ত। আমি তো কখন ওর স্বামীর সাথে সম্পর্কে বাঁধা হই নি। এটাই আমাদের জেন্টেল্মেন্ট এগ্রিমেন্ট ছিল। কিন্তু ও প্রতি দিন প্রতি বেলায় ব্রেক আপ করে আবার ফিরে এসেছে। কিন্তু আমি এক সেকেন্ডের জন্য ওকে ত্যাগ করিনি। আমার সব থাকা সত্ত্বেও। আমি আমার প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে ওকে ভালবাসি। ও এটা কি বোঝে না। আমার তো আর কিছু চাওয়া পাওয়া ছিল না! তবুও কেন এত নাটক করলো? যত খারাপ আচরণ করেছি, মাতাল হয়ে হলেও আমি নিজেকে মাফ করতে পারিনি। কিন্তু ক্ষণিকের একটা ঘটনা এতদিনের প্রতিটা মূহুর্তে গড়ে ওঠা শিশুর মত ভালবাসা কি করে মিথ্যে হয়ে যায়!
আমি জানি ও অনেক জেদী। নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবে। কথায় কথায় সম্পর্ক খতম বলে। যা আমি বিশ্বাস করে অনেক কষ্ট ও ওকে হারানোর শংকা নিয়ে ৩ মাস কাটিয়েছি। অনেক পরে বলেছে যে এটা ওর খেলা। অথচ আমি সত্যিই মনে করে রাগারাগি, গালাগালি করেছি এই ভেবে যে এত তুচ্ছ কারনে এত গভীর সম্পর্ককে এক চুটকিতে উড়িয়ে দেয়। সেজন্য খারাপ ভাবতাম। আমার সাথে গভীর সম্পর্ক করার জন্য মোটেও না। সেটাকে খুবই স্বাভাবিক মানবিক প্রেমই মনে করি আর ওকে শ্রদ্ধা করি।
জানি এই লেখা ও পড়লেও ওর কিছু আসে যাবে না। আমার আসে যাবে সারাজীবন এটা অন্তত জানুক। আমার গভীর প্রেমকে অস্বীকার না করুক।


কিন্তু কোন খান থেকেই কোন সাড়া শব্দ পায় না। অধীর অস্থিরতায় মাস পার হয়। এর আগে সর্বোচ্চ সাতদিন ওরা যোগাযোগ বিহীন ছিল। একদিন যখন কোনভাবেই মন মানছিল না। ফিদা ওর অফিসে চলে গেল। ফিদার পরিচিত লোকের অভাব নেই। তাই সহজেই বের করে ফেললো ও কোথায় কোন ফ্লোরে বসে। পাচটার একটু আগে দিয়ে হাজির হলো ওর রুমে। আধা আধি সম্ভাবনা ওকে সিটে পাওয়া না পাওয়া। ওর কাছ থেকে সব সময়ই শুনতো যে প্রায়ই বিভিন্ন বসের রুমে ডাক পড়ে। দুরু দুরু বুকে ওর রুমের দরজা দিয়ে ঢুকেই দেখতে পেল ওর টেবিলে ও বসে আছে। পাশে দুই টেবিলে আরও দুজন আছে, মুরুব্বী ধরেনের। স্বভাবতই কেউ আসাতে নিশাত তাঁকালো। ভূত দেখার মত চমকে গেল। স্থির দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। শীতল দৃষ্টি, সেখানে রাগ আছে কিনা বলতে পারবে না, ঘৃণা থাকলেও থাকতে পারে কিন্তু ভালবাসার লেশ মাত্র নেই। আর নিজের চোখ না দেখেই বুঝতে পারলো সেখানে গভীর শুন্যতা ছাড়া আর কোন অভিব্যক্তি ছিল না।
ফিদা মনে মনে অনেক রকম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা চিন্তা করেই এসেছিল। হয় রুম খুঁজেই পাবে না। বা সিকিউরিটির কেউ থাকলে আগে নাম জিজ্ঞেস করে এসে পরে না বলবে। অথাবা নিশাত প্রচন্ড রাগারাগি করে হুলুস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে ফিদাকে অপমান করে তাঁড়িয়ে দিবে। যাই হোক সব মেনে নিয়েই এসেছে ফিদা। যদি তবুও ওকে একবার নিজ মুখে সরি বলতে পারে।
প্রথম দর্শনে ইতিবাচক কিছু না পেলেও খারাপ কিছু ঘটেনি। ফিদা এগিয়ে গেল ওর টেবিলের দিকে। নিশাত অত্যন্ত রাশভারী আমলার মত ওকে বসতে বললো। যেহেতু আরও দুজন সহকর্মী আছে নিশাতের সাথে তাই চিন্তা করলো সাধারন কথাবার্তা চালিয়ে যাবে। জানতে চাইলো ব্যস্ত নাকি? নিশাত অন্য দিকে তাঁকিয়ে বললো –
‘হ্যা প্রচন্ড ব্যস্ত!’
‘তাহলে কি আমি বাইরে ওয়েট করবো?’
নিশাত মুখ তুলে তাঁকালো ফিদার দিকে। তারপর একটু ঠেস দিয়ে বললো –
‘না না, বাইরে দাঁড়াবেন কেন? এতদূর যখন চলে এসছেন, বসেন, আমিও কাজ শেষ হলে উঠে যাব।’
ব্যাগ থেকে একটা কমলা বের করে দিল। ফিদার কোন ইচ্ছেই ছিল না। তবুও মন্দের ভাল ওকে কিছু একটা দিয়েছে, আগে যেমন কিছু না কিছু ওর জন্য নিয়ে আসতো, সেই ভেবে না করলো না। একটু আশার আলো দেখলো। অনেক্ষণ কম্পিউটারে খুটুর মুটুর করলো। অনেকের সাথে ফোনে কথা বললো। আসলেই ব্যস্ত দাপ্তরিক কাজে। নেট ওয়ার্ক স্লো বার বার বলছিল। ফিদা সুবোধ বালকের মত বসেছিল। অনেক দিন পর কারো সামনে এমন গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে। একসময় নিশাত উঠলো। বললো – ‘চলেন।’
ফিদা কমলাটা নিবে কি নিবে না বুঝতে পারছিল না। নিশাত ইশারা করলো কমলাটা নিতে। ফিদার জন্য তখন ফরজ হয়ে গেল কমলাটা নেয়া। দুজনে লিফটে চড়লো। ওরা একাই। কিন্তু ফিদা কিছু বললো না। ভাবলো বাইরে যেয়ে একবারেই যা বলার বলবে। অফিসে কোন বিব্রতকর পরিস্থিতে ওকে না ফেলাই ভাল। লিফট থেকে নেমে আসলো। নিশাত হাটা দিল। ওর সাথে সাথে ফিদাও। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর ফিদা বললো – ‘কোথায় কথা বলবো?’
নিশাত সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর ফিদার দিকে তাঁকিয়ে বললো – ‘এখানেই!’
ফিদা একটু আমতা আমতা করে বললো – ‘কোন রেস্টরেন্টে বসি?’
‘না।’
‘আমার গাড়িতে?’
অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। যেন নিকৃষ্টতম কোন কথা শুনছে। তারপর সরাসরি ফিদার দিকে তাঁকিয়ে একদম বস যেভাবে কথা বলে সেই ঢং এ বললো –
‘আপনাকে আড়াই মিনিট সময় দেওয়া হলো! এর মধ্যে যা বলবেন সামারী করে বলেন!’
ফিদা চমকে গেল নিশাতের কথা ও কথা বলার ঢং এ। কত কিছু চিন্তা করে এসেছিল বলার জন্য। লিখেও এনেছিল যদি না পায় নিশাতকে, তো ওর ডেস্কে রেখে আসবে খামে ভরা চিঠি।
প্রথমে কিছুই বলতে পারলো না। তারপর দ্রুতই বলার চেষ্টা করলো – ‘আসলে আমি সেদিন যে আমানবিক পাষন্ডের মত ...’
নিশাত ফিদাকে আরো চমকে দিয়ে সোজা হাটা দিল। ফিদা সহজ সরল বালকের মতই প্রথম মাথায় এলো আড়াই মিনিট তো হয়নি। এটা তো চিটিং বাজি। ফিদা বাচ্চা ছেলেদের মতই ওর পিছন পিছন হাটা শুরু করলো। হঠাৎ মনে পড়লো ও তোসুন্দর করে লিখে নিয়ে এসেছে। সেটা বের করে দিতে গেল। নিশাত হাত সরিয়ে নিল। ফিদা তখন শেষ অস্ত্র ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল এর মত করে বললো –
‘এতদিনের এত সুন্দর সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে। ভুলে গেলে সব কিছু?’
নিশাত চিৎকার করে সেই পরিচিত চিকন গলায় বললো –
‘আপনি পারলে আমি পারবো না কেন?’
‘আমি কোথায় ভুলেছি? ভুললে এত সাহস করে এখানে আসতাম!’
‘আমাকে আর কখনো বিরক্ত করবেন না!’
ধমকের সুরে বলে নিশাত রীতিমত দৌড় দিল। ফিদা কিছু দূর জোড়ে হাটতে যাচ্ছিল। পড়ে বাদ দিল। ওর এমন অদ্ভুত পাগলের মত দৌড়ে রাস্তার লোক রীতিমত অবাক হয়ে তাঁকাচ্ছিল, কেউ আবার মন্তব্যও করছিল। ফিদা ও পুরো কালো সুট পরা ছিল। এরকম সুটেড বুটেড হয়ে তো একটা মেয়ের পিছনে দৌড়ানো যায় না। থেমে গেল। নিশাতকে দেখলো মাথা নীচু করে পিছন ফিরে দেখলো যে ফিদা আছে কিনা পিছে। তারপর ফিদার দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল। ফিদা অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো সেই জায়গায়ই। অনেক খারাপ কিছু অনেক বিব্রতকর অবস্থার পড়তে পারে এমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রতিবারের মত নিশাত এবারো ফিদাকে একটা বিশাল চমক দিয়ে গেল। অনেকদিন পর এমন একটা মনের অবস্থায় পড়লো যা কারো সাথেই ভাগাভাগি করা যাবে না। একাই সইতে হবে। ফিদা বুঝতে পারলো ওর দুচোখে থেকেকিছু তরল বের হয়ে আস্তে চাচ্ছে। বাঁধা দিল না। অনেক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে নিজের গাড়ির দিকে গেল। মাথাটা একদম শুন্য হয়ে আছে। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। কিছু করতেও ইচ্ছে হচ্ছে না। গাড়ি চালাতে চালাতে একসময় আবিস্কার করলো ক্লাবের সামনে এসে পড়েছে। হঠাৎ মনে পড়লো ও ফোন করে জিজ্ঞেস করতো – ‘কই?’
ও একদিন বলেছিল – ‘কই আর থাকবো। মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত আর আমার দৌড় অফিস ...’
‘না হলে ক্লাব!’
বাকিটা নিশাত বলে দিয়েছিল। ঠোটের কোনে একটু যেন হাসির ছোঁয়া লাগতে গিয়ে মিলিয়ে গেল। বাস্তব হচ্ছে এগুলো সব অতীত হয়ে ভূত হয়ে গিয়েছে। গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো মোরশেদকে ফোন দিবে। মোরশেদ লন্ডনে থাকে। ওদের এখন সকাল। অফিস টাইমে হলেও ফিদার জন্য ওর ফোনের দরজা চব্বিশ ঘন্টা খোলা। জানে মোরশেদ গালাগালি করবে অনেক, তবুও। এছাড়া আর কোন কিছু করার কোন প্রবৃত্তি হলোনা। মোরশেদকে পেল। সব বললো।
কথার শেষের দিকে মোরশেদ পুনারাবৃত্তি করলো একটা প্রশ্নের – ‘ও দৌড় দিল? ...ও দৌড় দিল? ...’
‘হ্যা’
‘পাবলিক প্লেইসে?’
‘সবাই তাঁকাচ্ছিল, কেউ কেউ কমেন্টো করছিল!’
‘আচ্ছা এবার শোন তোকে আমি বলি এটাকে পশ্চিমা দেশে কেন যে কোন জায়গায় বলে স্টকিং! সেলিব্রিটিদের পিছনে যেমন করে ফ্যানরা সেরকম! নো ম্যাটার আগে কি হয়েছে। তোকে বুঝতে হবে সে এখন তোকে চায় না। তোকে দেখে দৌড়ে পালিয়েছে! আগেই তোকে বলেছি যে তোকে সে কোনদিনই ভালবাসে নি!’
‘ও তো অনেকবার বলেছে আমাকে ছাড়া বাঁচবেনা। আমাকে কোন দিনই ভুলবে না!’
‘হ্যা তখন হয়তো মনে হয়েছে তাই বলেছে। এখন আর ঐ জিনিষ নাই। তুই ওর ধারে কাছেও যাবি না! খবরদার! আমি তোকে রিয়েলী ওয়ার্ন করছি। ইটস এ ক্রাইম! যে কোন আইনেই!’
‘ও যখন চলে গেল, আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম, আমার আশে পাশে শত সৎ ব্যস্ত লোক হেটে যাচ্ছে আর আমার চোখ দিয়ে কয়েক ফোটা পানি ......’
‘আরে রাখ তোর চোখের পানি। এর কোন দাম কোথাও নেই!’
‘জানি। তবুও কষ্ট ...’
কেউ একতরফা কোন কিছু কে মূল্য দিবে না। কখনো দেয়ই না! তোর ভুলতে ওকে অনেক কষ্ট হবে, সেটা কতদিন লাগবে জানিনা, মাস বছর, কিন্তু এক সময় না এক সময় ইউ উইল ওভার কাম। কিন্তু ততদিন তোকে প্রচন্ড কষ্টের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে!’
‘তবে যতই বলিস যাওয়া আমার যাওয়া ভুল হয়েছে। আমার একটা লাভ হয়েছে।’
‘কোন লাভ নেই!’
‘শোন! আমি এর আগে কোনভাবে বুঝতে পারছিলাম না ওর মনের রিয়েল অবস্থা। রাগ, ক্রোধ খুব বেশী এমনই মনে করেছিলাম। আগেও কত রাগারাগি হয়েছে। নিজেই ফিরে এসেছে। কিন্তু এরকম চোখ কখনই দেখিনি। ওর চোখে আজকে আমি কোন ভালবাসার চিহ্ন পাই নি। যা আমাকে ওর জন্য কষ্ট না পেতে সাহায্য করবে। আমার ভালবাসা আমার কাছে লুকিয়ে থাকবে। কিন্তু তীব্র কষ্টটা থেকে মনে হয় পরিত্রান পাব!’
‘ও তোকে কখনই ভালবাসে নি, দোস্ত।’
‘জানি না। তবে আমি কিন্তু ওর সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি এই জন্য যে ও আমাকে এত ভালবাসা দিয়েছিল। আমি সেটা কি বিশ্রী ভাবে নষ্ট করে দিলাম! সেই অপরাধ বোধ থেকে আমি দৌড়ে যেতে চাইতাম, গিয়েছিও!’
‘আরে না। শোন মনযোগ দিয়ে।’
‘শুনছি’
‘তুই মারিস গালি দিস, প্রস্টিটিউট বলিস যা বলিস, তুই তাকে তা মনে করিস না’
‘হ্যা আমি তো আমার বউকেও কখনো রাগ করে বলেছি! আমার বউ কেমন সেটা তো তোরা সবাই জানিস!’
‘হ্যা শোন! তুই যেটা করেছিস ওকে পুর্ণ ভাবে পাওয়ার জন্য হতাশা থেকে করেছিস। এটা ছিল তোর অনেস্ট লাভ! আর ওর ছিল ক্যাজুয়াল লাভ। হয়তো কখনো মনে হয়েছে বলেছে। কিন্তু ও কখনই তোকে অনেস্টলি তোর মত লাভ করে নি।’
‘তাই!’
‘হ্যা। আর একটা কথা বলি। তোকে বলেছে তোর সাথে আর ওর হাজবেন্ড ছাড়া আর কারো সাথে সে কিছু করেনি। হয়তো করেনি। সেটার কারন তোরা দুজন নাছোড়বান্দা হয়েছিস। অন্যরা ওর পিছনে লেগে থাকেনি তোদের মতন। লেগে থাকলে আরো অনেক কিছু পেতো। ও সবাইকেই টোপ দিয়ে বেরায়। কেউ হয়তো ইন্টারেস্ট দেখায় না তোদের মত!’
‘একদম ঠিক! এইভাবে তো কখনো চিন্তা করে দেখিনি। তাই তো ওর এত বিপরীত মুখী চরিত্র! কখনো মনে হয় সুপার ফাস্ট, যেভাবে ছেলেদের সাথে মিশে কথা বলে, অনেক পশ্চিমা দেশের সাধারন মেয়েও এরকম করবে না। আবার ধরা যাবে না ছোয়া যাবে না। যাবে সবই খালি লেগে থাকতে হবে। কেউ লাগেনি। আমি বোকা লেগেছিলাম। তুই কেন, সবাই মানা করেছে আমাকে।’
‘ওরা তো সামনে থেকে দেখছে। আমি তো খালি তোর কাছে থেকে শুনে বললাম’
‘যাক একটা বড় কষ্ট আমার গেল। যে আমি একটা সুন্দর সম্পর্ক্কে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। আমি এত বোকা না, যে আমাকে ভালবাসেই না তার প্রতি আমি কেন এত কষ্ট পাব।’
‘সরি তোকে অনেক কঠিন কঠিন কথা বলেছি। তোর খারাপ লেগেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু আমার মনে হয়েছে এটা তোকে বোঝানো আমার দায়িত্ব।’
‘না দোস্ত, বরঞ্চ আমি একটা অন্তহীন কষ্ট থেকে অনেক খানি মুক্ত হলাম। ওর প্রতি আমার ভালবাসাটা থাকবে, গোপনে, সব সুখের মূহুর্ত গুলো লুকিয়ে থাকবে মনের এলবামে। মাঝে মাঝে হয়তো ইচ্ছে হবে দেখতে। বাস, এই পর্যন্তই। যেই বিরামহীন কষ্ট আর অপরাধ বোধে ছিলাম, সেটা থেকে তো মুক্তি পাব!’

অনেক খানি নিরুদ্বেগ লাগে। হালকা লাগে। জীবনকে আবারো সুন্দর মনে হয়। সব কিছুর মধ্যে আনন্দ খুঁজে পায়, আবারো। তিন চার মাস আগে যেমন ছিল ওর জীবন। তবে নিশাতের ভূত মাঝে মাঝে যে আসর করে না তা না। এক্ষেত্রে সর্ব শক্তিমানের কাছে মুক্তি চেয়ে কিছুটা নিজের আবেগকে বাগে আনতে পারে। মদ্যপান অনেক কমিয়ে দেয়। নওশাদের সাথে ভালই সময় কাটে সন্ধ্যা রাত। আর অন্যান্য বন্ধু বান্ধব তো আছেই। আছে ফেইস বুক। চলে যায় আরো মাস খানেক এমন। একদিন ওর স্কুলের এক প্রবাসী বন্ধু ডাকে গ্রীন রোডে। সেখানে মোটামুটি পান করে আসে। অনেকদিন পর দেখা তাই।
ক্লাবে এসে গেটের কাছে দেখে নিশাত দ্রুত হেটে চলে গেল ওর পাশ দিয়ে। ও ওর দিকে তাঁকাতে না তঁকাতেই চোখ সরিয়ে নিল। গাড়িটা ক্লাবের ড্রাইভারের কাছে দিয়ে। হ্যামিলনের বাঁশী ওয়ালার পিছনে ছুটলো ফিদা। নিশাত ওর বাঁশী ওয়ালা। মেয়েটা অনেক জোড়ে হাটে। ওর কাছে যেতে বেশ সময় লাগলো। এর মধ্যে এক মুরুব্বী ফোন করেছেন। ঐ অবস্থাতেই ওর পিছু নিয়েছিল। ওর একটু সামনে এসে ইশারা করতে চাইলো। যেহেতু ফোনে কথা বলছিল। নিশাত মাথা নীচু করে হাটছিল। হঠাৎ ওকে দেখে চমকে বিকট চিৎকার দিল। ওর এরকম হঠাৎ চমকে যাওয়া আগেও দেখেছে। কিন্তু আজকেরটা একটু বেশী মনে হলো। আশপাশের লোকজন ও থেমে তাঁকাচ্ছে মনে হলো। মনে হলো নিশাতকে দেখে ও চাচ্ছে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। ফিদা ওগুলো পাত্তাই দিল না। কাঁধ ঝাকিয়ে ইশারায় বললো – কি? এত চমকানোর কি আছে?
ও এদিক ওদিক তাঁকাচ্ছে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ফিদা খুব শক্ত ভাবে বললো –‘খবরদার! আমার কথা শেষ না হলে যাবা না।’
নিশাতেকে দেখে মনে হলো একটু ভয় পেয়েছে। এদিক ওদিক তাঁকিয়ে থেমে গেল। বুঝতে পারলো হয়তো ফিদার শান্ত কিন্তু দৃঢ় অভিব্যক্তি দেখে কেউ আগাবে না। সেই রাতেও এরকম হয়েছিল। সবাই দেখছিল কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। একজন থেমেছিল। ওকে নিশাতই বলে যে - ‘এটা আমাদের ব্যপার আপনি যান।’ তখন কিছু অনুভূতি ছিল ওর ফিদার জন্য। এখন তো কিছুই নেই। তাই হয়তো আশা ছিল নাটকীয় কিছু করে ফিদাকে বিপদে ফেলবে। কিন্তু ফিদা সেদিকে গেলই না। বললো -
‘সেদিন যাই হোক না কেন তুমি আমাকে কখনই ভালবাসনি। তোমার টা ছিল ক্যাজুয়াল লাভ। আমারটা ছিল অনেস্ট লাভ। তাই তুমি এত সহজে বের হয়ে যেতে পেরেছ। সেটা যখন দেখলাম তখন আমারো আর সেই কষ্ট টা নেই। আমার ভালবাসা আমার কাছেই থাকবে। তোমার কাছে কিছু চাইতে আসি নাই। শুধু বলতে চেয়েছিলাম সেদিন যা করেছি সেটা আমি ছিলাম না, আমি টোটালী ড্রাংক ছিলাম!’
‘আপনি আজকেও তো ড্রাংক!’  
মেজাজটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে যায়। আর মনেও ছিল না যে ও আসলেই ড্রিংক করে এসেছে। নিশাত ভাব দেখিয়ে বললো –‘আমি খুব জরুরী কাজে যাচ্ছি!’
ফিদার আবার স্বমূর্তিতে ফিরে যায়। প্রচন্ড রাগ হয়। বলে –
‘তোমার কাজের খ্যাতাপুরি, যাও যেখানে খুশী!’
বলে উল্টো ঘুরে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামতে চায়। মনে হয় কিছু একটা বিশাল কিছু ওর ঠিক সামনে গায়ের উপর পড়বে। আর কিছু জানতে পারে না ফিদা।

রাস্তায় হুলুস্থুল লেগে যায়। একটা দ্রুত আসতে থাকা কাভার্ড ভ্যানের সাথে মাথায় বাড়ি খেয়ে ফুটপাথের উপর পড়ে যায় একটা নিথর দেহ। কাভার্ড ভ্যান ব্রেক করে। কিন্তু ফুটপাথের উপর নিথর দেহ দেখে আবার দ্রুত চম্পট দেয়। চারপাশে যারা ছিল হৈ হৈ করে দৌড়ে যায় কাভার্ড ভ্যানের পিছে। কেউ নামাবার নোটও করে। কেউ দৌড়ে আসে পড়ে থাকা দেহটার কাছে। সবাই মনে করে মরেই গিয়েছে। কেউ পুলিশে ফোন করে।
নিশাত একেবারে হতভম্ব হয়ে যায়। যেই মূহুর্তে ভাবছিল বা মেনে নিচ্ছিল আরো কিছুক্ষণ কথা বলবে ফিদার সাথে। সেই মূহুর্তে ফিদা চলে গেল এক ঝটকায়। কিন্তু একই সাথে উল্টো ঘুরে বারি খেল কাভার্ড ভ্যানের সাথে। ফিদার সাথে এত উত্তপ্ত ছিল ওর মাথা, নিশাতও খেয়াল করেনি এত জোড়ে ভ্যানটা আসছে। ফিদার তো পিছনে ছিল। তার মধ্যে মাতাল। রাগ দেখাতে গিয়ে আশপাশের কিছুই খেয়াল করেনি। ওর সারা জীবনের ট্রেনিং ওর মাথা ঠান্ডা করতে সাহায্য করলো। দেখলো ফিদার শ্বাস প্রশ্বাস চলছে। এম্বুলেন্স কল করলো। পুলিশ আসার আগে এম্বুলেন্স চলে আসলো। রাস্তার লোকরা জানতে চাইলো কেউ যাবে কিনা। নিশাত দায়িত্ব নিল। বললো আমি ওনাকে চিনি। যারা এর আগে ওদের নাটক দেখছিল। ওরা বিড়বিড় করে কি সব বলছিল। নিশাত ওদিকে মাথা ঘামালো না। নিকটবর্তী বড় হাসপাতালে নিয়ে গেল। ইমার্জেন্সিতে সক্রিয় থেকে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নেওয়ার চেষ্টা করলো। ওকে সাথে সাথে ওটিতে নিয়ে গেল। এক্সিডেন্ট পুলিশ কেইস। এগুলো নিয়েও যতটুকু সম্ভব তথ্য দিল। হাস্পাতালের লোক দিয়ে ফিদার মোবাইল থেকে নাম্বার বের করে বাসায় জানানোর ব্যাবস্থা করলো। এদিকে ফিদার মোবাইলে ফোন আসছিল। হাসপাতালের কাউকে না কাউকে দিয়ে ফিদার অবস্থা জেনে গেল ওর কোন বন্ধু। কয় ঘন্টা বলতে পারবে না। ওটি থেকে আইসি ইউ তে নেওয়া হলো ফিদাকে। এর মধ্যে বেশ কিছু লোকজন চলে এসেছে ফিদাকে দেখতে। পরিবার, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুরা। ডাক্তার বা নার্স সবাই নিশাতের কথা উল্লেখ করছিল যে ওই নিয়ে এসেছে রুগীকে আর ঘটনাস্থলেনিশাতই ছিল। খবরটা জেনে ফিদার স্ত্রী নীতা আর ওর বন্ধুরা কেউই খুব ভাল চোখে তাঁকাচ্ছিল না। বন্ধুদের মধ্যে কেউ ওকে জিজ্ঞেস করেছে কীভাবে কি হলো। কিন্তু অনেকটা জেরার মত। তাই নিশাত একটু দূরেই সরে ছিল। রাত প্রায় একটা বাজে। ওকে যেতে হবে। কি মনে করে পাঠাও না ডেকে উবার ডাকলো। মনে হলো ফিদা ওকে দেখছে। এতক্ষণ জরুরী দায়িত্ব পালনে কোন কিছু অনুভব করার সুযোগ ছিল না। গাড়িতে উঠে ওর কান্না চলে এলো। ফিদা বাঁচে না মরে কেউ কিছুই বলতে পারে নি। যদি না বাঁচে? ওযে আজকে শুনতে চেয়েছিল ফিদা কি বলে। যখন ভাবলো ফিদা বলবে, ঠিক তখনই কেন ফিদা চলে গেল রাগ দেখিয়ে? না গেলে তো এক্সিডেন্টটা হত না! মনে মনে বিড়বিড় করে ফিদার জীবন ভিক্ষা চায়। ও যদি মরে যায়?
ওর খুব রাগ হয়েছিল নিশাতকে এত অপমান করাতে। এর আগেও কথায় কথায় টাকা পয়সার খোটাদিত সেটা একদমই মেনে নিতে পারতোনা নিশাত। ওর ইচ্ছে ছিল অনেক বড় লোক হয়ে ওকে দেখিয়ে দেওয়া। এটাই ওর স্বভাবজাত জেদ। একথা ফিদাকেও অনেক বার বলেছে। আর নিশাত বনির সাথে যত কাছে যেতে চাইতো। নিজের অধিকার নিয়ে দেন দরনার করতো, নিজেকে দুর্বল আর অপরাধী মনে হত। তখনই দূরে সরে যতে চাইতো। আর ফিদাও তখন ওর পিছলে রীতিমত গোয়েন্দার মত জেরা করতো। কারো কাছে বাঁধা পড়া যে ওর স্বভাবই না। জবাবদিহি করতেও রাজী না। বনিও করতো। কিন্তু ফিদা আরো বেশী করতো। তাই আর ওর সাথে সম্পর্ক করার কোন ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু ফিদাকে ঠিকই মিস করতো। রাগের সময় ছাড়া ও অত্যন্ত ভদ্র, রসিক, আবেগময়। আবার সাহসি, আর অকপট ছিল। ওর সাথে যে কোন খানে গেলে অনেক সাহস থাকতো। ফিদার কারনে। মনে হত ও সব ঠিক করে ফেলবে। ছুটে যাওয়া সম্পর্ক আর জোড়া লাগাতে না চাইলেও নিশাত জানতো ওকে একজন মন উজার করে ভালবাসে। ওর চোখ আর মনটা একটা ‘ওপেন বুক’ ছিল। সব পড়া যেত। আর ফিদাকে যা বলতো সব বিশ্বাস করতো।  ওকে ছাড়া যে আসলেই পারবে না থাকতে। আজকে আবার মনে হলো।

সাত দিন হয়ে গিয়েছে ফিদা হাসপাতেলে আছে। কাল নাকি চলে যাবে। খবর নিয়েছে নিশাত। ও খোঁজ খবর নিয়ে দেখা করতে আসে যখন কেউ থাকবে না। এইসব নিশাত ভালই পারে। যে কোন জায়গায় স্টাফদের হাত করে ফেলা।

মিনিট দশেক পরে বের হয়ে আসে নিশাত। চোখের পানি ধরে রাখতে পারছে না। ফিদা কোন ভাবেই চিনে না নিশাতকে। পরে চিন্তা করে প্রথম পরিচয়ের মূহুর্ত গুলো। যখন ফিদা নিজের অজান্তেই ওর প্রতিআকর্ষিত হয়েছিল। এটা করে আরও বেশী কষ্ট পায়। দেখে ফিদা আরো অনাগ্রহের সাথে ভদ্রতা করে কথা বলছে। যা একদম মেনে নিতে পারে না। এই প্রথম ওর মনে হয় সত্যিই ফিদাকে ওর চাইই। ফিদা সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। চলতে ফিরতে দেখা হয়ে যেতে পারে ওদের। কীভাবে সহ্য করবে যে ফিদা ওর কেউ না। একবার মনে হয় ফিদা মরে গেলেও এত কষ্ট হত না। মনে হয় ও যদি একবার ওকে চিনতো তাহলে ওর কথা মত চলতো। যা বলতো তাই মেনে নিত। এমন করে কেউ কি এত নির্স্বার্থভাবে ওকে ভালবেসেছে? এখন বুঝতে পারে ফিদা কেন এত কষ্টের কথা বলতো। ফিদা সত্যি ওকে অনেক ভালবাসতো। শুধু ওর সংগই চাইতো। আর কিছু না।
কল্পনা করতে ইচ্ছে করে ওরা দুজন মিলে হাইওয়েতে। ড্রাইভ করছে নিশাত। পাশে ফিদা। আর গান বাজছে – ‘কিচ্ছু চাই না আমি আজীবন ভালবাসা ছাড়া ......।‘