শনিবার, ৩০ মে ২০২০

করোনা মুক্তির বার্তা বয়ে আনুক শবে বরাত

সারাবেলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০১:০২ পিএম

করোনা মুক্তির বার্তা বয়ে আনুক শবে বরাত

করোনা মুক্তির বার্তা বয়ে আনুক শবে বরাত, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে কার্যত থমকে আছে বিশ্ব। দেশে দেশে মানুষ ঘরবন্দি। জীবন স্থবির হলেও চাঁদের আবর্তনে বছর ঘুরে এসেছে মহিমান্বিত রাত। করোনা ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে চলছে সাধারণ ছুটি। আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এ বছর শবে বরাতের ছুটি পড়ে গেছে করোনার বন্ধে। অন্যদিকে নতুন আবহে এবার পালন করতে হচ্ছে শবে বরাত। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এ রাতে ভাগ্য নির্ধারিত হয়। সে হিসেবে আমরা বলতে পারি, করোনা মুক্তি আর বিশ্ববাসীর জন্য সামগ্রিক কল্যাণের বার্তা নিয়ে এসেছে শবে বরাত। আমাদের প্রত্যাশাও তাই।

২০১৯ সালে কেউ কি ভাবতে পেরেছিল ২০২০ সালের শবে বরাত পালন করতে হবে ঘরে? মসজিদগুলো খালি থাকবে, মৃত আত্মীয়-স্বজনের কবর জিয়ারত করা যাবে না। ইবাদত-বন্দেগির মিশেলে একটা উৎসবের আবহ হারিয়ে যাবে। কিংবা কারও কল্পনায় ছিলো, এমন প্রাণঘাতী এক ভাইরাস অপেক্ষা করছে মানবজাতির জন্য। করোনার কথা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এবার শবে বরাতের নফল ইবাদত-বন্দেগি বাসায় পালন করতে মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। সরকারিভাবে ঘরে থাকার সরকারি নির্দেশনাও রয়েছে। এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ আলেম আল্লামা আহমদ শফীও পৃথক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শবে বরাতের রাতে যে ইবাদত করা হয় তা ফরজ কিংবা সুন্নত নয়, নফল। নফল ইবাদত ঘরে পালন করাই উত্তম।শবে বরাতের ইবাদত সম্পর্কে হাদীসের নির্দেশনা

যে সব মাসে আল্লাহতায়ালা বান্দার জন্য বিশেষ বরকত রেখেছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো- পবিত্র শাবান মাস। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে সবচেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন।

উম্মত জননী হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা.) রমজান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোনো মাসে এতো বেশি রোজা রাখতে দেখিনি। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) বর্ণনা করেন, আমি একদিন হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমতে আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনাকে শাবান মাস ব্যতীত অন্যকোনো মাসে এতো অধিক পরিমাণে রোজা রাখতে দেখিনি। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, এটা ওই মাস যে মাস সম্পর্কে অধিকাংশ লোকই গাফেল থাকে। এটা রজব ও রমজান মাসের মধ্যবর্তী মাস। এটা এমন মাস, যে মাসে মানুষের আমলসমূহ আল্লাহতায়ালার দরবারে পেশ করা হয়। আমার আকাঙ্ক্ষা যে, আমার আমল আল্লাহতায়ালার দরবারে এ অবস্থায় পেশ হোক যে, আমি রোজাদার। -নাসায়ি ও শোয়াবুল ঈমান

>> হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে (শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (ইবনে হিব্বান)

>> হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘জিবরিল আলাইহিস সালাম আমার কাছে এসেছিলেন এবং বললেন, আপনার প্রভু আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন (জান্নাতুল) বাকিতে যাওয়ার জন্য এবং তাদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য।’ (মুসলিম)

>> হজরত আলি ইবনে আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন মধ্য শাবানের রাত আসে তখন তোমরা এ রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড় এবং এর দিনে রোজা রাখ। কেননা এ দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আছো আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছো রিজিকপ্রার্থী আমি তাকে রিজিক দেব। কে আছো রোগমুক্তি প্রার্থনাকারী, আমি তাকে নিরাময় দান করবো। কে আছ এই প্রার্থনাকারী। ফজরের সময় হওয়ার আগ পর্যন্ত (তিনি এভাবে আহবান করেন)।` (ইবনে মাজাহ)

শায়খ আলবানি এ হাদিসকে জইফ জিদ্দান তথা মওজু বলেছেন।

>> হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, এক রাতে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হারিয়ে ফেললাম (বিছানায় পেলাম না)। আমি (তাঁর সন্ধানে) বের হলাম। এসে দেখলাম তিনি (জান্নাতুল) বাকি কবরস্তানে আছেন। তিনি বলেন, তুমি কি ভয় করছ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি কোনো অবিচার করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি অনুমান করলাম আপনি আপনার অন্য কোনো বিবির কাছে গিয়েছেন। তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানে (১৫ তারিখের রাতে) দুনিয়ার কাছের আকাশে অবতীর্ণ হন। তারপর কালব গোত্রের বকরির পালের লোমের চেয়েও বেশী সংখ্যক লোককে তিনি ক্ষমা করে দেন।` (তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ) হাদিসটিকেও জঈফ বলা হয়েছে।

শাবান মাসের ফজিলত সম্পর্কে বিভিন্ন সহিহ হাদিসের কিতাবে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। যার দ্বারা এ মাসের ফজিলত ও গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। সুতরাং এ মাসে রোজা রাখা প্রমাণিত বিষয়।

এবার আসি শবে বরাত প্রসঙ্গে। মুমিন মাত্রই এ বিশেষ রাতের নামের সঙ্গে পরিচিত। তবে হাদিস শরিফে এ রাতকে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ তথা ‘শাবানের পনেরতম রজনী’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। শবে বরাত শব্দটি ফারসি। শব শব্দের অর্থ রাত আর ‘বরাত’ অর্থ নাজাত, মুক্তি রক্ষা ইত্যাদি।

তবে মুফাসসিরে কেরাম এ রাতের আরও কয়েকটি নামের কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন লাইলাতুল মোবারাকা, লাইলাতুল বারাআ, লাইলাতুস সাক ইত্যাদি। -তাফসিরে কুরতুবি

এ রাতে যেহেতু গোনাহগারের গোনাহ মাফ হয় এবং অসংখ্য অপরাধীর অপরাধ ক্ষমা করা হয়, সেহেতু এ রাত মুসলমানদের মাঝে ‘শবে বরাত’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে।

পবিত্র শবে বরাত সম্পর্কে কোরআনে কারিমে নির্দেশনা আছে কিনা এর ব্যাখ্যায় সুরা দুখানের ৩ নম্বর আয়াতের ভাবার্থে এ আয়াতের (লাইলাতুল মোবারাকা) শব্দের ব্যাখ্যায় ‘শবে বরাত’ বুঝাতে চেয়েছেন এবং স্বপক্ষে হাদিসও পেশ করেছেন । তাছাড়া পরবর্তীতে অধিকাংশ মুফাসসির যেমন, ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি (রহ.) তার তাফসিরে কাবিরে, ইমাম তাবারি (রহ.) তার তাফসিরে তাবারিতে, আল্লামা জামাখশারি (রহ.) তার তাফসিরে কাশশাফে, আল্লামা আলুসি (রহ.) তার তাফসিরে রুহুল মায়ানিতে, ইবনু কাসির তার তাফসিরে ইবনে কাসিরে, শায়খ ইসমাইল হাক্কি (রহ.) তার তাফসিরে রুহুল বয়ানে, ইমাম কুরতুবি তার তাফসিরে কুরতুবিতে, হজরত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) তার তাফসির বায়ানুল কোরআনে, মুফতি শফি (রহ.) তার তাফসিরে মাআরেফুল কোরআনে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় শবে বরাতের আলোচনা করেছেন।

হাদিসের আলোকে এবং ফেকাহের বর্ণিত তথ্য অনুযায়ী শবে বরাত উপলক্ষে পাঁচটি আমলের কথা প্রমাণিত হয়। (১) এই রাত্রে এবাদত বন্দেগী জিকির আজগার তেলাওয়াত এবং নফল নামাজে মশগুল থাকা; (২) পিতা মাতা আত্মীয় স্বজনদের কবর জিয়ারত করা, তবে রাসুল সা. একা একা কবরস্থানে গিয়েছেন, আমরাও একাকি যাবো। নতুবা বাড়িতে বসে কবর যিয়ারতের নিয়তে, কবর জিয়ারত করব; (৩) দান সদকা করা অথবা গরিবদের জন্য কিছু আহারের ব্যবস্থা করে মৃত ব্যক্তিদের জন্য সওয়াব পৌঁছে দেয়া যেতে পারে, তবে এই রাত্রে হালুয়া রুটি করা একটি বদ রছমে পরিণত হয়েছে, এর থেকে বিরত থাকার জরুরি। আমাদের সমাজে এক শ্রেণির মানুষের কাছে শবে বরাতে ইবাদত বন্দেগি এত গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা গুরুত্বপূর্ণ এই হালুয়া-রুটি তৈরি করা। এইজন্য উলামায়ে কেরামের মতে এই দিন উপলক্ষে হালুয়া রুটি তৈরি করা বেদায়াত; (৪) পরদিন অর্থাৎ ১৫ শাবান নফল রোজা রাখা উত্তম; এবং (৫) শবে বরাত রাত্রে গোসল করা মুস্তাহাব, মাগরিবের নামাজ পড়েই ইবাদতের নিয়তে গোসল করা। উপরোক্ত আমল ছাড়া মানুষের মনগড়া আমল, যেমন পটকা ফোটানো, আতর বাজি, মোমবাতি জ্বালানো মসজিদে আলোকসজ্জা করা এগুলো নাজায়েজ।

শবেবরাতের নফল নামাজ নিজ নিজ বাড়িতে পড়া উত্তম কেননা রাসুল সা. বলেন, তোমাদের বাসস্থানকে কবরস্থান বানিও না। তাছাড়া বর্তমান করোনা ভাইরাস ছোবলে থমকে গেছে গোটা বিশ্ব, অধিকাংশ দেশ লকডাউনে আছে। মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সেখানে আমরা নফল ইবাদাত জন্য মসজিদে অবস্থান করা, এটা এই মুহুর্তে কারোর জন্য সমীচীন হবে না। আল্লাহ শবে বরাতের বরকতে করোনা মহামারি নামক গজব, আমাদের থেকে উঠিয়ে নিন এবং আমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করে দিন।

পরিশেষে বলবো শবে বরাতে রাত জেগে ইবাদত করা, রোজা রাখা, সদকা করা, তওবা করার বিষয়টি নফল ইবাদতের মধ্যে পড়ে। যেহেতু মসজিদে জুমা ও পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজও সীমিত রাখা হয়েছে বিধায় শবে বরাতের ইবাদতের দিনটিও আমরা ঘরোয়াভাবে আদায় করবো ইনশাআল্লাহ। বুখারি শরিফের ৫৭৩৪ নাম্বার হাদিসেও বলা হয়েছে, এরকম মহামারির সময়ে ঘরে বসে ফরজ ইবাদত করা শ্রেষ্ঠতম। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই সংকট মোকাবিলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার তৌফিক এনায়েত করুন।