বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯

হাজারো হৃদয়ে বেঁচে আছেন বাবু

প্রতিনিধি, আনোয়ারা , চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ সোমবার, ০৮:২৯ এএম

হাজারো হৃদয়ে বেঁচে আছেন বাবু

দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিক, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী সোমবার। এ উপলক্ষে আনোয়ারার হাইলধরে মরহুমের গ্রামের বাড়িতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলো।

মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সমাধিতে শ্রদ্ধান্জলি অর্পণের কর্মসূচি রেখেছে আওয়ামীলীগ, মহিলা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, স্বেচ্চাসেবক লীগ, ছাত্রলীগ , আনোয়ারা উপজেলা পরিষদ, বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া খতমে কোরআন, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।

এ উপলক্ষে সোমবার সকাল থেকে আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর সমাধিকে ঘিরে শুরু হয়েছে মানুষের ঢল। প্রথম প্রহর থেকে ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে সমাধিস্থল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়।

মরহুমের পরিবারের সদস্যরা পরিবারের পক্ষ থেকেও খতমে কোরআন, মিলাদ মাহফিল ও পুষ্পমাল্য অর্পন সহ বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেয়া হলেও জেএসসি পরীক্ষার কারণে কর্মসূচীর ব্যাপকতা ছোট করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

রাজনীতিক, শিল্পোদ্যোক্তা, সংগঠকসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল পুরুষ ছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু । দীর্ঘ সময় ধরে ছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছাড়াও জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন চারবার। নবম জাতীয় সংসদে তিনি ছিলেন পাট বস্ত্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

১৯৪৫ সালে আনোয়ারা হাইলধর গ্রামে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। তার পিতার নাম নুরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি আইনজীবী ছিলেন। তাঁর মাতার নাম খোরশেদা বেগম। তিনি বাংলাদেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার মরহুম আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দ্বিতীয় কন্যা নুর নাহান জামান এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ১৯৫৮ সালে পটিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঐ বছরই ঢাকা নটরডেম কলেজে ভর্তি হন। ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে পড়ার সময় তিনি বৃত্তি পেয়ে আমেরিকার ইলিনয় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে ভর্তি হন। পরে তিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশনে পড়াশোনা করেন। ওখান থেকে এসোসিয়েট ডিগ্রি নিয়ে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরেন। তিনি ১৯৬৫ সালে ব্যবসা শুরু করেন।

১৯৫৮ সালে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সদস্য নির্বাচিত হন বাবু । ১৯৬৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আনোয়ারা ও পশ্চিম পটিয়া থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হন। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন আলহাজ্ব আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তার পাথরঘাটাস্থ জুপিটার হাউজ থেকে সংগ্রাম কমিটির কর্মকান্ড পরিচালিত হত। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামের আসার পর জুপিটার হাউস থেকে সাইক্লোস্টাইল করে প্রচার করা হয়। তার বাসা থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রসহ সব জায়গায় পাঠানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আখতারুজ্জামান  চৌধুরী বাবু ভারতে যান এবং সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সদস্য ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। তিনি প্রথম লন্ডনে যান। সেখান থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে আমেরিকায় যান। ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী ১৯৭২ সালে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হন এবং বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। তিনি ৭২সালের সংবিধানের অন্যতম স্বাক্ষরকারী। স্বাধীনতার পর ১৯৮৬, ১৯৯১এবং ২০০৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং পরবর্তীতে দলের পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন।

কেবল রাজনীতিতেই নয়, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু একজন সফল ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা ছিলেন। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি বাটালি রোডে রয়েল ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু আসিফ স্টিল মিল, জাভেদ স্টিল মিল, আসিফ সিনথেটিক, প্যান আম বনস্পতি, আফরোজা অয়েল মিল, বেঙ্গল সিনথেটিক প্রোডাক্ট ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। ভ্যানগার্ড স্টিল মিল, সিনথেটিক রেজিন প্রোডাক্ট ক্রয় করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম দু’দশকে জামান শিল্পগোষ্ঠীর গোড়াপত্তন করেন। তিনি বিদেশি মালিকানাধীন আরামিট মিল ক্রয় করে সেটিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করান। বাংলাদেশ বেসরকারি ব্যাংকিং সেক্টর প্রতিষ্ঠায় তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেন। তিনি দেশে দ্বিতীয় প্রাইভেট ব্যাংক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল) এর উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি দু’দফায় চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ১৯৮৮ সালে তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠক এফবিসিসিআইর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ওআইসিভুক্ত দেশসমূহের চেম্বারের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে তিনি ৭৭ জাতি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি যিনি এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

তিনি ব্যক্তি জীবনে ৩ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর বড় ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি বর্তমানে আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। মেজ ছেলে আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামীরীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এবং বেসরকারি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল বাংকের (ইউসিবি) ইসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ছোট ছেলে আসিফুজ্জামান চৌধুরী জিমিও একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ মালেক বলেন, এবারের মৃত্যুবার্ষিকী জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় রেখে বড় ধরণের কোন কর্মসূচী হাতে নেয়া সম্ভব হয়নি। তবে সোমবার বিকাল ৩ টা থেকে প্রিয় নেতার মরহুম বাবু’র কবর জেয়ারত, পুষ্পমাল্য অর্পন, খতমে কোরআন, মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচীতে মাননীয় ভূমিমন্ত্রী আলহাজ্ব সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এমপি ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্য, উত্তর-দক্ষিণ ও মহানগর আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও আনোয়ারা, কর্ণফুলী উপজেলার আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৪ নভেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ একই আসন থেকে আওয়ামীলীগ প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।