সোমবার, ২৭ মে ২০১৯

কোরবানীগঞ্জে বাসায় ঢুকে ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে খুন

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০১ মে ২০১৯ বুধবার, ১০:১৬ এএম

কোরবানীগঞ্জে বাসায় ঢুকে ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে খুন

চট্টগ্রাম নগরীর কোরবানীগঞ্জ এলাকায় বাসায় ঢুকে আবুল কাশেম নামে এক ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে হত্যার পর মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ওই ব্যবসায়ীর ছেলেকেও তারা ছুরিকাঘাত করে।

মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) দুপুর দেড়টার দিকে এই ঘটনা ঘটেছে। নগরীর খাতুনগঞ্জের গম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এম এ কাশেম ট্রেডিংয়ের মালিক আবুল কাশেম আমিন বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় ভাড়া থাকেন।

এ ঘটনায় মো. সোহেল (৩৭) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। । পুলিশের কোতোয়ালী জোনের সহকারী কমিশনার নোবেল চাকমা বলেন, “আমরা ধারণা করছি, হত্যাকারী তাদের পূর্ব পরিচিত। রোকসানার শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন আছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।”

নোবেল চাকমা আরও বলেন, “প্রতিবেশী ও তাদের স্বজনের বক্তব্য পর্যালোচনা করেছে পুলিশ। তাতে মনে হচ্ছে, একজন ব্যক্তিই এই খুনের সঙ্গে জড়িত। সেই ব্যক্তি তাদের পরিবারের পরিচিত কেউ হতে পারে। কেন এই ঘটনা ঘটেছে, কোনো শত্রুতা ছিল কি না সেটা তদন্তে বের হবে। আমরা হত্যাকারীকে ধরতে অভিযান শুরু করেছি।”

নিহত ওই নারীর নাম রোকসানা আক্তার মনি (৪২)। এছাড়া ছুরিকাঘাতে তার ছেলে আহত আবদুল আজিজকে (২১)  ও আবদুস সোবহান (৬২)নামে এক প্রতিবেশী আহত হন। আজিজকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার আঘাত গুরুতর বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর পুলিশ, সিআইডি ও পিবিআই ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলেছে।

পুলিশ জানায়,  ঘরের ভেতর ছুরিকাঘাত, অগ্নিসংযোগসহ নানা ঘটনা ঘটে যাওয়ার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিল ওই বাসার কাজের মেয়ে ইয়াসমিন। সে ওই ভবনের চতুর্থ ও ষষ্ঠ তলার দুটি বাসায় ৫/৬ মাস ধরে কাজ করে আসছিল। এর মধ্যে চতুর্থ তলার বাসাটি হচ্ছে নিহত রোকসানা আক্তারের পরিবারের।

মধ্যবয়স্ক ওই গৃহকর্মী ঘটনাস্থলে বলেন, সকাল ১১টায় রোকসানা আপার বাসায় কাজ শেষ করে উপরের বাসায় যাওয়ার সময় আপাকে বেতনের কথা বলি। উনি তখন বলেন, উপরে কাজ শেষে বেতনের টাকা নিয়ে যেতে। পরে সেখান থেকে আমি চলে আসি।

দুপুর ১২টা ১০ মিনিট হবে। আমি ছয়তলার বাসায় কাজ করছিলাম। এ সময় দরজার বাইরে থেকে কেউ একজন কলিং বেল টিপছিল। দরজা খুললে ওই ব্যক্তি আমাকে দেখে ‘এই বাসা না’ বলে নিচে নেমে যায়। পরে কোথায় গেছে তা জানি না। দরজা বন্ধ করে দিই।

ইয়াসমিন বলেন, উপরের বাসায় কাজ শেষে আমি আবার চারতলার বাসায় আসি। এ সময় দরজা খুলতেই ছুরি নিয়ে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। তখন ওই ছুরি থেকে রক্ত ঝরছিল। লোকটির মুখে দাড়ি ছিল। তাকে আগে কখনো দেখিনি। ওই সময় ভয়ে আমি তার পা ধরে কান্নাকাটি করে বলি, আমাকে কিছু করবেন না। আমি এখানে কাজ করি। আমার কোনো কিছু নেই। পরে আমাকে নিয়ে গিয়ে একটি বাথরুমে ঢুকিয়ে চুপ থাকতে বলা হয়। ভয়ে আমি চুপ থাকি। এ সময় আপাকে যে রুমে মারা হয়েছে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয় লোকটি।

ওই গৃহকর্মী আরো বলেন, একসময় সেখানে আজিজ ভাই আসে। পরে ঘরের ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে আপাকে যে রুমে মেরে ফেলা হয়েছে ওই রুমটি খুলতে যায়, পেছন থেকে ওই সময় লোকটি আজিজ ভাইয়ের পেটে ছুরি মারে। এতে সে নিচে পড়ে যায়। পরে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হবে বলে ওই রুমটির ভেতর আমাদের দুজনকে ঢোকায়।

এক পর্যায়ে আজিজ ওই ঘাতকের কাছে পানি খেতে চাইলে সে পানি আনতে যায়। এ সময় আজিজ দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। পরে ঘাতক সাথে সাথে দুটি ব্যাগ হাতে নিয়ে ও এক হাতে ছুরি ধরে আজিজের পেছন পেছন বেরিয়ে যায় বলে জানান গৃহকর্মী ইয়াসমিন।

ঘাতকের দৌড়ে যাওয়া পাশের একটি ভবন থেকে দেখেন মীর মোজাম্মেল নামে এক ব্যক্তি।

তিনি বলেন, লোকটির মুখে দাড়ি ছিল। এ সময় এক হাতে রক্তমাখা ছুরি ও কাঁধে ছিল দুটি ব্যাগ। সে মূল সড়কে উঠে আরেকটি গলি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় তাকে ২০/৩০ জন লোক ধাওয়া করেছিল। যারা তার সামনে আসছে ছুরি এপাশ-ওপাশ করে ভয় দেখাচ্ছিল। পরে গলি দিয়ে পালানোর সময় এক ব্যক্তি তাকে ধরে ফেলে। এ সময় তাকে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় বলে শুনেছি।

একই ভবনের নিচতলায় শাহানাজ নামে এক বাসিন্দার কাছে আবুল কাসেমের বাসার খোঁজ করেন ওই ঘাতক। এ সময় তাকে ইশারায় উপরে দেখিয়ে দেন। পরে চারতলায় গিয়ে লোকটি কলিং বেল টিপে।

কোতোয়ালী থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, পরিচিত কেউ এ খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে, যে ওই বাসাটি চেনে। তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

নিহতের স্বামী খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী আবুল কাসেম বলেন, সকাল ৯টার দিকে আমি বাসা থেকে বের হয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাই। পরে ঘটনা শুনে বাসায় ছুটে আসি। তিনি বলেন, আমার কোনো শত্রু নেই। কারো সাথে ঝগড়াও ছিল না। জীবনে কারো ক্ষতি করিনি। এসব আমার সাথে কীভাবে হয়েছে বুঝতে পারছি না।

আবুল কাসেম বলেন, কোরবানীগঞ্জে একটি জায়গা ছিল। তবে সেটা অনেক আগে বিক্রি করে দিয়েছি। এটা নিয়ে কোনো ঝামেলা হওয়ার কথা না। কারো সাথে কোনো পাওনা রাখিনি। এমনকি ব্যাংকের লোন পরিশোধ করতে গিয়ে জায়গা বিক্রি করেছি।

তিনি জানান, বছর দুয়েক আগে ভাগ্নে লোকমানের বিয়ে সংক্রান্ত একটি ঝামেলা হয়েছিল। ওই বিয়ে ঠিক করার পরে ভেঙে গিয়েছিল। এটা নিয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে মামলাও চলেছিল বলে জানান তিনি। এসব ঘটনা ছাড়া কারো সাথে কোনো শত্রুতা নেই বলে জানান তিনি।

নিহতের ছোট ছেলে আবদুল তারেক বলেন, সকাল ৯টায় বাবা বাসা থেকে বের হয়েছিল। আজিজও পরে বের হয়। সকাল ১১টায় আমি বের হই। বাসায় তখন মা একা ছিল। খবর পেয়ে বাসায় এসে মায়ের লাশ নিচে পড়ে থাকতে দেখি।

পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের নিজ বাড়ি চাক্তাই এলাকায়। চাক্তাইয়ে বাড়ির নির্মাণ কাজ চলায় কোরবানীগঞ্জে তারা ভাড়া বাসায় থাকছেন। ওই ফ্ল্যাটে নিহত রোকসানা, তার স্বামী ও দুই ছেলে থাকেন।