ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো চিন্তা

সারাবেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ মে ২০১৮ শনিবার, ১০:০৯ পিএম

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো চিন্তা

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর চিন্তা করছে সরকার। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের পর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় (কমানো) হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কিছুটা বেশি বলে সব পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। এ খাতের সুদের হার বাজেটের পর সমন্বয় করা হবে। সরকার আগামী ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে দুই স্তরের ভ্যাট ব্যবস্থা কার্যকরের পরিকল্পনা নিয়েছে। কর্পোরেট করের হার কমানোর বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা) ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রস্তাব জামা দেওয়ার ৭ মাসের মধ্যে বিনিয়োগ সহায়তা দেওয়া যাবে।’

শনিবার (১২ মে) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের উদ্যোগে প্রাক-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রাক-বাজেট আলোচনা সঞ্চলানা করেন সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার।

উল্লেখ্য, গত বছরের বাজেটের আগেও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী দেশের বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সুষম প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘কমপিটিশন অ্যাক্ট’ জরুরী বলে জানান। ২৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠনের শেয়ার পুঁজিবাজারে না আসতে পারার বিষয়টি অত্যন্ত হতাশার বিষয় বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিতে (এডিআর) কিছু সংশোধন করে গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে এর ব্যবহার বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে।’ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এটা হবে না। কারণ এটা বাস্তবায়ন করা যায় না। এবারও হয়তো ১০০ কোটির টাকার বেশি হবে না। তবে শিল্প কারখানায় ডে-কেয়ার সেন্টার করার সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর না হলেও আগামী বাজেটে বিশেষ করে বড় শিল্প কারখানাগুলোতে ডে-কেয়ার সেন্টার বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।’

আগামী বাজেটে কর্পোরেট কর কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করেছি। তরুণরা কর দিতে আগ্রহী। তাদের ওপর বিশ্বাস রেখে এবার করপোরেট কর হার কমাচ্ছি।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই তা সংষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে সরকারের টাকার অপচয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নতি ব্যাহত হচ্ছে।’

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, ‘১৯৯১ সালে আমরা যখন ভ্যাট আইন করি, তখন ভারতের পরবর্তীতে হওয়া প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দেখতে এসেছিলেন। অর্থাৎ তখনও আমরা কতো এগিয়ে ছিলাম। আর এখন আমরা ভারতের চেয়ে কতো পিছিয়ে আছি। গত ৭ বছরে জিপিডিতে রাজস্বের অবদান আশানুরূপ ভাবে বৃদ্ধি পায়নি, যা উদ্বেগের বিষয়।’

এর আগে বাজেট প্রস্তাবনায় ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি হোসেন খালেদ কর্পোরেট ডিভিডেন্টের আয়ের ওপর বহুস্তর কর প্রত্যাহারের পাশাপাশি কর হার ২০ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেন।

ব্যক্তি শ্রেণিতে আড়াই লাখ টাকার পরিবর্তে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়াও পাট খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত মহাপরিকল্পনা, জুট পেপার এবং পাল্প আইন প্রণয়ন, পাট পণ্যের বহুমূখীকরণ, পাটের মণ্ড এবং কাগজ তৈরি সংক্রান্ত গবেষণায় বাজেটে বরাদ্দ, পাটপণ্য রফতানিতে নগদ সহায়তা এবং এলসির মাধ্যমে পাটপণ্যের রফতানি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। কর ও ভ্যাট নিয়ে আলোচনায় ঢাকা চেম্বারের পক্ষ থেকে ধাপে ধাপে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম বিদ্যুৎ জ্বালানির বিষয়ে স্থানীয় কয়লা ব্যবহারে একটি নীতি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব প্রদান এবং বেসরকারি খাতের সামর্থ্য ও বর্তমান মূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এলএনজির মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব করেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘আগামী বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অবকাঠামোখাতের উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের আমদানি করা এলএনজির সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের সংমিশ্রনের মাধ্যমে তা জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হবে। এলএনজি-এর দাম যেন সহনীয় মাত্রায় থাকে সে বিষয়ে সরকার সচেতন রয়েছে। ’

বুয়েটের পেট্রোলিয়াম এবং খনিজ সম্পদ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম দেশীয় কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন গ্যাস কূপ খননের কার্যক্রম বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করেন।

ডিসিসিআইয়ের পরিচালক হুমায়ুন রশিদ স্থানীয় ও বিদেশি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকিউরমেন্ট কন্সট্রাকশন (ইপিসি) ঠিকাদারদের জন্য কর কাঠামোতে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনের প্রস্তাব করেন।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তারা জমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, সরকার ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ফলে তার নিরসন হবে।’ তিনি প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল সমূহের সঙ্গে স্থল, নৌ ও সামুদ্রিকবন্দরগুলোর যোগাযোগ স্থাপনের ওপর জোরারোপ করেন।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ইকোনোমিস্ট ড. মাশরুর রিয়াজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের হার কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদী কর নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানোর প্রস্তাব করেন।

আইডিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ খান বলেন, ‘সঞ্চয়পত্রের সুদের হার খুবই বেশি, যার কারণে আশানুরূপ হারে বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন হচ্ছে না।’

বিআইডিএস’র সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণের পরিমাণ ২৫ লাখ থেকে বৃদ্ধি করে ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত করা এবং নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশের লক্ষ্যে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষায়িত ফান্ড গঠনের আহ্বান জানান।

গ্রামীণফোন লিমিটেডেরর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল প্যাটরিক ফোলে দেশের মোবাইল প্রযুক্তি খাতে ফোরজির ব্যবহার আরও সম্প্রসারণের জন্য নীতি সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান।

সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দেশের এসএমই উদ্যোক্তারা বৃহৎ শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না।’ এমতাবস্থায় তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘কমপিটিশন অ্যাক্ট’র কার্যকর বস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘গত এক বছরের মধ্যে নিউজপ্রিন্টের দাম দ্বিগুন বৃদ্ধির ফলে সংবাদপত্র খাত হুমকির মুখে পড়েছে। সংবাদপত্রে ব্যবহৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন তিনি।