শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

একটি চাকরি চাই

চকরিয়া প্রতিনিধি :

প্রকাশিত: ৩১ মে ২০১৭ বুধবার, ১১:২৩ পিএম

একটি চাকরি চাই

জন্মের ছয় মাসের মাথায় হঠাত্ গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। এর পর ‘রিকেট্স’ রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটু। পরবর্তীতে শরীরে স্থূলতা দেখা দেয়, বেঁকে যেতে থাকে দুই পা। এই অবস্থায় অনেক ডাক্তারের পেছনে ছোটাছুটি করলেও তেমন কোনো ফল আসেনি। চিরজীবনের জন্য প্রতিবন্ধিতা বরণ করলেন সাজ্জাদ। অবশ্য তিনি প্রতিবন্ধিতাকে জয় করতে পড়ালেখার হাল ছাড়েননি। একে একে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হন তিনি। ভবিষ্যতে আরো পড়ালেখার ইচ্ছে রয়েছে তাঁর। বর্তমানে সাজ্জাদ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করে অল্প-স্বল্প আয় করছেন। এতে বিবাহিত সাজ্জাদের ছোট সংসার চলছে কোনোভাবে। তবে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ অবস্থা সংসারের। স্কেচারে ভর করে চলাফেরা করেন সাজ্জাদ।

তাঁর আক্ষেপ, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য এখনো একটি চাকরির সন্ধান তিনি পাননি। এর ওপর সংসারের ভরণ-পোষণ নিজেকে নির্বাহ করতে হচ্ছে। যদি কারো পক্ষ থেকে ডাক পড়ে একটি চাকরির, এই আশায় দিন কাটছে সাজ্জাদের।

সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটুর বাড়ি কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের খয়রাতিপাড়ায়। তিনি ওই গ্রামের কৃষক হাজি ফরিদুল মোস্তফার ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সাজ্জাদ সবার বড়। ছোট ভাই সাদমান মোস্তফা নয়ন বিমান বাহিনীতে চাকরি করেন। দুই বোন সারজিনাতুল মোস্তফা নূরী উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। আরেক বোন উম্মে নাদিরাতুল মোস্তফা ইফতি পড়ছে নবম শ্রেণিতে।

সাজ্জাদের বাবা কৃষক হাজি ফরিদুল মোস্তফা বলেন, ‘অনেক বড় আশা ছিল, বড় ছেলে সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটুকে নিয়ে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় জন্মের ছয় মাসের মাথায় প্রচণ্ড জ্বর দেখা দেয় সাজ্জাদের। একপর্যায়ে শরীরে স্থূলতা বিরাজ করে, বেঁকে যেতে থাকে দুই পা। এই অবস্থায় তাকে নিয়ে অনেক বড় বড় ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেও তেমন কোনো ফল আসেনি। এর পর আর কি করা! আল্লাহর ইচ্ছে যখন ছিল, ছেলের এমন অবস্থা হবে তাই এভাবেই কাটছে তার দিনকাল।’
ফরিদুল মোস্তফা আরো বলেন, ‘ছেলে যখন বয়সের দিক দিয়ে বড় হয়ে গেছে, সেজন্য তাকে বিয়েও করিয়ে দিই।’

সাজ্জাদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার প্রথম সন্তান সাজ্জাদ যখন জন্ম নেয়, তখন দেখতে ফুটফুটে ছিল। আমাদের সংসার আলোকিত করেছিল সে। তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু না, সেই সাজ্জাদকে নিয়ে মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। এই কথা কেউ জিজ্ঞেস করলেই কান্না আসে। তবে শোকরিয়া আল্লাহর কাছে সাজ্জাদ প্রতিবন্ধী হলেও জীবিত রয়েছে। আল্লাহ আমার সাজ্জাদকে বেশি আয়ু দান করুক। মা হিসেবে এটাই চাওয়া।’

সাজ্জাদের পরিবার সূত্র জানায়, স্থানীয় বরইতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর উত্তর বরইতলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন সাজ্জাদ। এর পর কক্সবাজার সরকারি কলেজে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসিতে ভর্তি হয়ে পাস করেন তিনি।

বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা মুন্সি শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটু ভালোমানের একজন কম্পিউটার অপারেটর। তাই সাজ্জাদ যাতে একেবারে বেকার না থাকেন সেজন্য আমার তত্ত্বাবধানে রেখে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরে দেন-দরবার করে কম্পিউটার অপারেটিংয়ের কাজ পাইয়ে দিচ্ছি। এতে অল্প-স্বল্প আয় করে কোনোভাবেই সংসারের জীবিকা নির্বাহ করছে সে।’

বর্তমানে গত একমাস যাবত চুক্তি ভিত্তিতে কম্পিউটার অপারেটিংয়ের কাজ করছেন চকরিয়া থানায়। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  থানার কয়েকজন অফিসারের দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করে দিচ্ছেন তিনি।

থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সাজ্জাদ প্রতিবন্ধী হলেও তার যথেষ্ট মেধা রয়েছে। বিষয়টি মুন্সী শহীদুল ইসলামের কাছ থেকে জানার পর আমিও অনেক কাজ তাকে দিয়েছি। বিনিময়ে তাকে পারিশ্রমিকও দেওয়া হচ্ছে।’

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এ টি এম জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জিয়া বলেন, ‘আমি যখন বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলাম তখন খয়রাতিপাড়ার প্রতিবন্ধী সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটুকে ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্র থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিই। যাতে প্রতিবন্ধী হলেও সে কোনো প্রতিষ্ঠানে অন্ততপক্ষে কম্পিউটার অপারেটিং করে সংসার চালাতে পারে। পাশাপাশি তার নামটি তালিকাভুক্ত করে দিই উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরে। এতে সে এখন প্রতিমাসে প্রতিবন্ধী ভাতাও পাচ্ছে।’

চকরিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘বরইতলী ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটু যাতে নিয়মিত ভাতা পায় সেজন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি সচেষ্ট। আগে যেখানে ৫০০ টাকা পেত, সেখানে এখন ৬০০ টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন সাজ্জাদ।’

সাজ্জাদের স্ত্রী শাবনূর আক্তার বলেন, ‘স্বামীর একটা স্থায়ী চাকরি যদি জোটতো তাহলে সংসারে অভাব-অনটন থাকত না।’