বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯

মোরশেদ খান কেন বিএনপি ছাড়লেন

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০১৯ বুধবার, ০৯:০৩ এএম

মোরশেদ খান কেন বিএনপি ছাড়লেন

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান বিএনপি থেকে পদত্যাগ করছেন। মঙ্গলবার (৫ নভেম্বর) তিনি দলের মহাসচিব বরাবর পদত্যাগপত্র দিয়েছেন।

ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে মহাসচিবের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসনের কাছে পদত্যাগের চিঠি লিখেছেন ২৮ বছর রে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত এই নেতা। দলের প্রাথমিক সদস্যপদ প্রত্যাহারের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতি থেকেও অবসরে যাবেন বলে চিঠিতে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের চান্দগাঁও-বোয়ালখালী আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য।

বিএনপির দপ্তর সূত্র জানায়, মোরশেদ খানের ব্যক্তিগত সহকারী আতাউল সন্ধ্যা ৭টার সময় দলীয় কার্যালয়ে পদত্যাগপত্র নিয়ে যান। কিন্তু দপ্তর প্রধান রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ স্কাইপিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। তার বৈঠক শেষ হলে রাত ১০টার দিকে পদত্যাগপত্র দেয়া হয়।

পদত্যাগের কারণ হিসেবে মোরশেদ খান বলেছেন, দেশের রাজনীতি ও দলের অগ্রগতিতে নতুন কিছু সংযোজন করার মতো সঙ্গতি তার নেই। তাই “দুঃখ ও বেদনাক্লান্ত হৃদয়ে কঠিন একটি সিদ্ধান্ত” তাকে নিতে হলো।

৫ নভেম্বর লেখা এই চিঠিতে তিনি বলেছেন, “নেহাত ব্যক্তিগত কারণ হেতু, আমার উপলব্ধি-সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেবার এখনই উপযুক্ত সময়। বহুবিধ বিচার-বিশ্লেষণ শেষে আমি অবিলম্বে অর্থাৎ আজ ৫ নভেম্বর ২০১৯ হতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এর রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দলের প্রাথমিক সদস্যপদ প্রত্যাহারসহ বর্তমানে অলঙ্কৃত ভাইস চেয়ারম্যানের পদ থেকে আমি পদত্যাগ করছি।”

পদত্যাগপত্রে মোরশেদ খান বলেন, মানুষের জীবনের কোনো না কোনো সময় কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমার বিবেচনায় সে ক্ষণটি বর্তমানে উপস্থিত এবং উপযুক্তও বটে।  তিনি বলেন, রাজনীতির অঙ্গনে আমার পদচারণা দীর্ঘকালের। কিন্তু দেশের রাজনীতি এবং দলের অগ্রগতিতে নতুন কিছু সংযোজন করার মতো সঙ্গতি নেই। তাই ব্যক্তিগত কারণ হেতু আমার উপলব্ধি- সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার এখনই সময়। বহুবিধ বিচার-বিশ্লেষণ শেষে আমি বিএনপির রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

চিঠিতে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোরশেদ খান বলেন, বিএনপির সঙ্গে আমার সম্পর্কের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় অসংখ্য নেতাকর্মীর সান্নিধ্য পেয়েছি এবং উপভোগ করেছি। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রয়াত এবং অনেকেই বর্তমানে দলের হাল ধরে আছেন। প্রয়াতদের বিদেহী আত্মার শান্তি যেমন কামনা করি, তেমনি আপনিসহ বর্তমান সব নেতা-কর্মীদের মঙ্গল কামনা করি। অতীত ও বর্তমান সব কর্মীর নিরবচ্ছিন্ন সান্নিধ্য, সখ্য, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ও সাহায্য-সহযোগিতার কথা আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। দলের প্রতিনিধি হয়ে সরকারি দায়িত্ব পালন এবং দলের কর্মী হিসেবে দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিয়ে বিএনপি আমাকে বিরল সম্মানে ভূষিত করেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গত রাতে মোরশেদ খান বলেন, ব্যক্তিগত কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে তার উপলব্ধি হয়েছে, সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

অবশ্য এ জ্যেষ্ঠ নেতার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, ত্যাগী ও জনপ্রিয় এ নেতাকে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। চট্টগ্রামের রাজনীতির এখনকার ‘হর্তাকর্তা’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতার কারণে তিনি মনোনয়ন পাননি। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও মোরশেদ খানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেননি। এ যন্ত্রণা তাকে অনেক ভুগিয়েছে। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তার অনুসারীদেরও কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় তার অনুসারীদের পদ-পদবি নেই, থাকলেও যোগ্যতার তুলনায় তা কিছুই নয়। এসব ক্ষোভ থেকে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

অনেকেই মনে করেন, তারেক রহমানের প্রতি দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, এর মাধ্যমে তা প্রকাশ পেল। এতদিন জ্যেষ্ঠ নেতাদের নানা ক্ষোভের কথা শোনা গেলেও এই প্রথম কেউ পদত্যাগ করলেন।

মোরশেদ খান ১৯৮৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এর পর চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সাল, এর পর জুন ’৯৬ এবং ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ দূত ছিলেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্পেশাল কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যানও ছিলেন। ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত জোট সরকারের আমলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

৭৯ বছর বয়সী এম মোরশেদ খান এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। সিটিসেল, প্যাসিফিক মোটরস, এবি ব্যাংক সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে তার বিনিয়োগ  রয়েছে।

এদিকে টেলিকমিউনিকেশন ব্যবসা সম্প্রসারণে সিটিসেলের নামে ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যুর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ৩৮২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের একটি মামলায় মোরশেদ খানসহ ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। নানামুখি চাপের কারণে দেশের এক সময়কার শীর্ষ এই শিল্পপতির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন সুবিধাজনক অবস্থানে নেই বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে।