মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯

চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতা হত্যায় ধরা আওয়ামীলীগের মাসুম

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০১৯ সোমবার, ০৮:৫৭ এএম

চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ নেতা হত্যায় ধরা আওয়ামীলীগের মাসুম

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। রবিবার রাতে ঢাকার বনানী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় । পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মঈন উদ্দিন গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দিদারুল আলম মাসুম চট্টগ্রাম নগরীর লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। লালখান বাজার এলাকায় বিভিন্ন সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর নাম এসেছে। গণমাধ্যমে অস্ত্র হাতে তাঁর ছবিও ছাপা হয়েছে।

এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মাসুমের দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স বাতিল করে তার অস্ত্র জব্দ করার নির্দেশ পেয়েও খুলশী থানা পুলিশ তার অস্ত্র জব্দ করতে পারেনি। পরে শনিবার (৩ আগস্ট) মাসুম খুলশী থানায় সশরীরে উপস্থিত হয়ে অস্ত্র জমা দেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) লালখান বাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ এফ কবির আহমেদ মানিক ২২ জুলাই দিদারুল আলম মাসুমের নামে বিশেষ বিবেচনায় বরাদ্দ থাকা দুটি অস্ত্রের (শটগান/৫৪৪৪/ডবলমুরিং ও পিস্তল/৩৩/খুলশী) লাইসেন্স বাতিলের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন।

২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকালে নগরীর দক্ষিণ নালাপাড়ার বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ ঘটনায় সুদীপ্তর বাবা মেঘনাথ বিশ্বাস বাবুল বাদী হয়ে সদরঘাট থানায় অজ্ঞাত পরিচয় সাত-আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয়। গত বছরের নভেম্বর মাসে পিবিআই মামলার তদন্ত শুরু করে।

মামলার আসামি ফয়সাল আহমদ পাপ্পু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছিল, হত্যার আগে সুদীপ্তকে বাসা থেকে ডেকে বাইরে আনে চশমা রুবেল ও মুরাদ। তাঁকে হত্যার পর জাহেদ দুই রাউন্ড গুলি চালিয়ে এলাকা ত্যাগ করে। সুদীপ্ত হত্যায় অংশ নেওয়া সবাই লালখান বাজারের যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমের লোক।

জবানবন্দিতে ফয়সাল আরো জানায়, দিদারুল আলম মাসুম তার কাজে দাড়িওয়ালা নিপু, মোটা নিপু ও মোক্তারকেই ব্যবহার করে। তারাই মাসুমের হয়ে নির্দেশ বাস্তবায়ন করে। সুদীপ্তকে হত্যা করার দিন তারা মোটা নিপুর নির্দেশে নালাপাড়ায় যায়।

পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) আবুল কালাম আজাদ বলেন, চট্টগ্রামের টিম এসে ঢাকা থেকে আসামি গ্রেপ্তার করেছে। এ ব্যাপারে তাঁরাই বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

১৯৯৭-৯৮ সালে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন মাসুম। লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক হন ২০০১ সালে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রায় তিন বছর কারাবাসে ছিলেন তিনি। মুক্তি পাওয়ার পর দীর্ঘদিন ছিলেন দেশের বাইরে। দেশে ফেরার পর ২০১৩ সাল থেকে তিনি লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
মাসুম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছিলেন, আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি কাউন্সিলর প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে তার বিরুদ্ধে একটি অংশ উঠেপড়ে লেগেছে।

বিভিন্ন সময়ে লালখান বাজার এলাকায় সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর নাম এসেছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের সময় নগরের লালখান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে সমালোচিত হন তিনি। সেই সময় গণমাধ্যমে অস্ত্র হাতে ছবি ছাপা হয় তাঁর।

মাসুমকে গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর লালখান বাজার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে নগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

নেপথ্য কারন :

সুদীপ্ত হত্যাকাণ্ডের পর মহানগর ছাত্রলীগের একাধিক নেতা বলেছিলেন, বিগত কয়েক দশক ধরে সিটি কলেজ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থকরা থাকলেও গত কয়েক বছরে তার বিপরীতে একটি অংশ দাঁড়িয়েছে, যাদের একাংশের নেতৃত্বে আছেন কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, বর্তমানে নগরীর লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুম।

এই মাসুমের অনুসারীরাই সুদীপ্তকে পিটিয়ে মেরেছে বলে অভিযোগ করে আসছে নগর ছাত্রলীগের একাংশ।

এই হত্যা মামলায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তাররা সবাই মাসুমের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। আর মাসুম সিটি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি থাকার সময় প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সমর্থক হিসেবে পরিচিতি হলেও ২০১৪ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর তিনি মেয়র আ জ ম নাছিরের বলয়ে চলে আসেন।

মাঝে তিনি সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ডা. আফসারুল আমীনের অনুসারী হিসেবে বলেও পরিচয় দিতেন।

নিজেদের মধ্যেকার বিরোধ নিয়ে ফেইসবুকে লেখালেখির কারণে মাসুমের বিরাগভাজন হয়ে সুদীপ্ত খুন হন বলেও তার ঘনিষ্টজনদের ধারণা।

হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আলোচনায় আসা আইনুল কাদের নিপুও চট্টগ্রামে সমালোচিত এই আওয়ামী লীগ নেতার অনুসারী।