রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯

ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যায় আরেকজন গ্রেপ্তার

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৮:৩১ এএম

ছাত্রলীগ নেতা সুদীপ্ত হত্যায় আরেকজন গ্রেপ্তার

নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাস হত্যা মামলায় জিয়াউল হক ফয়সাল (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সোমবার বিকালে দেওয়ানহাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে একইদিন সকালে সুদীপ্তকে হত্যায় আসামিদের ব্যবহৃত একটি সিএনজি অটোরিকশা খুলশি থানার ঢেবারপাড় এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা।

পিবিআই’র এ কর্মকর্তা জানান, সুদীপ্ত হত্যায় গ্রেফতার হওয়া মোক্তার নামে এক আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জিয়াউলের নাম উঠে আসে। সুদীপ্তকে খুন করতে মোক্তার ও জিয়াউল একই মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে গিয়েছিল।

গ্রেপ্তার জিয়াউল হক ফয়সালের বাবার নাম আমিনুল হক, বাড়ি পাঠানটুলি। তিনি সুদীপ্ত হত্যা মামলার আরেক আসামি আইনুল কাদের নীপুর বন্ধু।

মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তা পিবিআই’র পরিদর্শক (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, সুদীপ্ত হত্যার সময় ফয়সাল ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া মোকতার ও পাপ্পুকে মোটর সাইকেলে উঠিয়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়েছিলো। দুই আসামি আদালতে দেয়া জবানবন্দিতেও ঘটনাস্থলে ফয়সালের উপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

২০১৭ সালের ৬ নভেম্বর ভোরে নগরীর নালাপাড়া নিজ ভাড়া বাসা থেকে ডেকে বের করে বাসার সামনেই নির্মমভাবে পিটিয়ে খুন করা হয় সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ পর্যন্ত মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু জামিনে বের হয়ে যায় আটজন। তবে কার নির্দেশে সুদীপ্তকে খুন করা হলো তা প্রায় দেড়বছরেও সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেনি পুলিশ। ফলে সুদীপ্ত বিশ্বাসের বাবা মেঘনাধ বিশ্বাসের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ মামলাটি থানা থেকে গত বছরের ৮ নভেম্বর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) পাঠায়।

পিবিআইতে যাওয়ার প্রায় পাঁচ মাসের মাথায় এই প্রথম সুদীপ্ত হত্যায় অভিযুক্ত একজন আসামি ধরা পড়লো। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১০ জনেরই আস্তানা লালখান বাজার এলাকায়। সুদীপ্ত হত্যা মামলায় ইতিপূর্বে গ্রেপ্তার ফয়সাল আহম্মদ পাপ্পু এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে লালখান বাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম মাসুমের সম্পৃক্ততা তুলে ধরেন আদালতে।

২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে পাপ্পু বলেন, সুদীপ্ত হত্যায় খায়ের, নিপু, মোক্তার, জাহিদ, ফয়সাল, রাজীব, বাবু, রাব্বি, ডিস সালাউদ্দিন, মামুন, মিজান, চশমা রুবেল, টাংকী পাড়ের রুবেলসহ আরো অনেকেই ছিলো। তিনটি মোটর সাইকেল ও ১০টি সিএনজি ট্যাক্সিতে উঠে সবাই নালাপাড়া সুদীপ্তর বাসায় যায়। ফয়সালের মোটর সাইকেলে মোক্তার ও জাহিদ ছিলো। জাহিদের কাছে পিস্তল ছিলো। সুদীপ্তকে মারার সময় আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে চাইলে জাহিদ তার কাছে থাকা পিস্তল পাঁচটি ফাঁকা ফায়ার করে। সুদীপ্ত হত্যায় যারা অংশ নিয়েছিলো তারা সবাই লালখান বাজার আওয়ামীলীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুমের লোক। লালখান বাজার এলাকায় মাসুম ভাইয়ের কথা ছাড়া কোনো কাজ হয় না।

পাপ্পুর আগে গ্রেপ্তার মোখতার আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে বলেন, সুদীপ্ত হত্যার ঘটনার ছয় সাতটি সিএনজি ট্যাক্সি ছাড়াও তিনটি মোটর সাইকেল ছিল। একটি মোটর সাইকেল চালিয়েছিলো ফয়সাল। নিপুর কথা অনুযায়ী মোক্তার ও জাহেদ – ফয়সালের মোটর চড়ে সুদীপ্ত হত্যায় অংশ নিয়েছিলো। পুলিশ তার আইফোন থেকে সুদীপ্তকে হত্যার সময় ধারণ করা একটি ভিডিও উদ্ধার করেছে।
গতকাল রবিবার বিকেলে আলী হোসেন (৩৮) নামের একজন সিএনজি ট্যাক্সি চালকের জবানবন্দি নিয়েছেন আদালত। সুদীপ্তকে খুন করতে যাওয়ার সময় যুবকদের একদল তার গাড়িতে করে ঘটনাস্থলে যান। আলী হোসেনকেও লালখান বাজার থেকে আদালতে নেওয়া হয়।

সুদীপ্তকে খুন করতে যাওয়া দুর্বৃত্তদের বহনকারী সিএনজি ট্যাক্সির চালক আলী হোসেনের সাক্ষ্যকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন পিবিআই কর্মকর্তারা। পিবিআই’র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মঈন উদ্দিন বলেন, অনেক সময় সাক্ষীর অভাবে মামলা ঝুলে যায়। তাই আমরা আলী হোসেনকে আদালতে হাজির করেছি। আদালত তার জবানবন্দি নিয়েছেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলি হোসেন বলেন, ঘটনার দিন চারজন ছেলে লালখাঁন বাজার কর্নেল হোটেল এর মোড় থেকে তার গাড়িতে উঠে সদরঘাটের নালাপাড়া যেতে বলে। চারজন ছেলের মধ্যে দুইজনকে তিনি চেনেন। তাদের একজনের নাম বাবর, বয়স ২০/২২ হবে। বাসা লালখান বাজার টাংকির পাহাড়ে, তার বাবা রাজমিস্ত্রী। অন্যজনের বয়স ২৫/২৬ হবে, শ্যামলা, লম্বা। নাম জানে না। বর্তমানে তাকে আর এলাকায় দেখা যাচ্ছে না। দুজনকে তিনি দেখলে চিনবেন। এসময় আরো অনেকগুলো সিএনজিও ছিলো। এরমধ্যে ছিল দুলাল ও মনিরের সিএনজি ট্যাক্সি। গাড়ি মনির চালিয়েছেন কিনা তা আলী হোসেন জানেন না। পরে শুনেছেন, মনির গাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছেন। খোঁজ-খবর নিলে হয়ত আরো গাড়ির সন্ধান জানা যাবে।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আলী হোসেন বলেন, নালাপাড়ার কাছাকাছি সদরঘাট কালী বাড়ির পরে সিনেমা হলের সামনে এলে সিএনজি ট্যাক্সির ক্লাস এর তার ছিড়ে যায়। তখন যুবকরা তাকে ১০০ টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে নালা পাড়ার গলির ভিতর চলে যান। গলির ভিতরে সম্ভবত আরো ৩/৪ টি সিএনজি ঢুকে এবং গলির বাইরে ৫/৬ টি অবস্থান করে। তিনি গাড়ির তার ঠিক করার সময় হঠাৎ নালাপাড়ার গলির ভিতর থেকে গুলির আওয়াজ শুনতে পান। কিছুক্ষণ পর হৈ-হুল্লোড় করে সিএনজি ও মোটর সাইকেলে করে নালাপাড়ার গলির ভিতর থেকে ওই যুবকেরা বের হয়ে নিউমার্কেটের দিকে চলে যায়।
সুদীপ্ত হত্যা মামলার সব আসামি জামিনে বেরিয়ে যাওয়ায় জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলাচিঠি দিয়েছেন সুদীপ্তর বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মেঘনাথ বিশ্বাস।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর সকালে দড়্গিণ নালাপাড়ার নিজ বাসা থেকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে খুন করা হয় নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সুদীপ্ত বিশ্বাসকে। এ ঘটনায় সুদীপ্তর বাবা সদরঘাট থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ৭-৮ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

মামলাটি প্রথমে সদরঘাট থানা পুলিশ তদন্ত করে। কয়েকমাস পর মামলার তদনেত্মর দায়িত্ব পায় পিবিআই। সমপ্রতি ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি লেখেন বাবা মেঘনাদ বিশ্বাস। খোলা চিঠি দেয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সুদীপ্ত হত্যা মামলায় জিয়াউল গ্রেফতার করা হলো। এর আগে এ মামলায় ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে দেওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে লালখান বাজার এলাকার এক ‘বড় ভাই’ এর নাম উঠে আসে। তবে ওই বড় ভাই কে তা আজ পর্যন্ত  খুঁজে বের করতে পারেনি আইনশৃ্ঙ্খলা বাহিনী।