বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯

দক্ষিণ চট্টগ্রামে আওয়ামীলীগের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী জাবেদ

আজাদ মঈনুদ্দীন, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০৬ জানুয়ারি ২০১৯ রবিবার, ১১:০৯ পিএম

দক্ষিণ চট্টগ্রামে আওয়ামীলীগের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী জাবেদ মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগের খবরে দুই ভাইয়ের ফুলেল শুভেচ্ছায় জাবেদ । ছবি বোরহান উদ্দিন মুরাদের সৌজন্যে।

স্বাধীনতা পরবর্তী ৪৮ বছরের ইতিহাসে দক্ষিণ চট্টগ্রামে আওয়ামীলীগ সরকারের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পেলেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের সর্ববৃহৎ এই রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ ফোরাম প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসাবে এই অঞ্চল থেকে দুইজন দায়িত্ব পালন করলেও তাদের কেউ মন্ত্রী ছিলেন না। ইতিপূর্বে ১৯৭৩-৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় শিল্প প্রতিমন্ত্রী হিসাবে পটিয়ার সন্তান নুরুল ইসলাম চৌধুরী দায়িত্ব পালন করেন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক, মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুদ্দিন চৌধুরী সারাবেলাকে বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছরের ইতিহাসে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদই আওয়ামীলীগের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী। এর আগে মন্ত্রিসভায় সর্বোচ্চ প্রতিমন্ত্রী ছিল।  

রোববার দুপুরে ভূমিমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার ফোন পাওয়ার পর থেকে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নিজ নির্বাচনী এলাকা আনোয়ারা-কর্ণফুলী জুড়ে চলছে আনন্দের বন্যা। ইতিপূর্বে তিনি এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে জাবেদ ২ লাখ ৪৩ হাজার ৪১৫ ভোট পেযে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পিতা আতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনসহ এই নিয়ে টানা তিন বার সংসদ সদস্য হলেন জাবেদ।

মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার পরপরই সারাবেলার কাছে প্রতিক্রিয়ায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী এলাকা আনোয়ারা-কর্ণফুলীর জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার উপর যে আস্থা রেখেছেন তা অর্জন করতে পেরেছি আনোযারা-কর্ণফুলীবাসীর ভালবাসা ও বাবা প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং মা নুর নাহার জামানের দোয়ায়। তিনি সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

আওয়ামীলীগের গত মেয়াদের সরকারে সাইফুজ্জামান জাবেদকে দেওয়া হয় ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। প্রথমবার প্রতিমন্ত্রী হয়ে যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান হিসাবে জাবেদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। দায়িত্ব পেয়ে ভূমিখাতের নৈরাজ্য অনেকাংশে কমাতে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় তার ‘সারপ্রাইজ ভিজিট’ দুর্নীতিবাজদের মধ্যে আতংক সৃষ্টি করে। তাছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি দারুণ সততার পরিচয় দিয়েছেন। তাই সাধারণ মানুষ মনে করেন মন্ত্রী হিসাবে জাবেদের এই পদোন্নতি সততার পুরস্কার।  

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের জনপদ দক্ষিণ চট্টগ্রাম। সাত উপজেলার এই দক্ষিণ চট্টগ্রাম রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য সর্বক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সুতিকাগার বলা হতো দক্ষিণ চট্টগ্রামকে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, বোয়ালখালীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা জাতির কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এখানে আওয়ামীলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, আতাউর রহমান কাযসারের মতো বর্ষীয়ান রাজনীতিকেরা।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু চার বারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য এবং  বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য ছিলেন। আতাউর রহমান কায়সার ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর অন্যতম প্রতিনিধি। কিন্তু তাদের কেউই মন্ত্রী পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পাননি।

জাবেদের আগে আওয়ামীলীগ সরকারে ১৯৭৩-৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভায় শিল্প প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন পটিয়ার নুরুল ইসলাম চৌধুরী।  তিনি পটিয়া থানার গোবিন্দরখীল গ্রামের সম্ভ্রান্ত হাদু চৌধুরী বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৫ সালের ৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আখতারুজ্জামান চৌধুরী ও মায়ের নাম নুর নাহার জামান। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বাবা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ সদস্য। তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর যুক্তরাষ্ট্রে যান উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে। মূলত সাইফুজ্জামান চৌধুরী তার বাবার মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তার বাবা চট্টগ্রামের আনোয়ারা আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন।

বাবা মারা যাওয়ার পর ওই আসনে উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার নির্বাচিত হন।

তার বাবা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ইউসিবিএলের নির্বাহী কমিটি এবং দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান আরামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তিনবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন।তার ছোট ভোট আনিসুজ্জামান রনি ও আসিফুজ্জামান জেমি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।আনিসুজ্জামান রনি দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের শিল্প-বাণিজ্য সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। স্ত্রী রুখমিলা জামান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাইফুজ্জামান জাবেদের পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার খবরে আবেগাপ্লুত আনোযারা উপজেলা চেয়ারম্যান তৌহিদুল হক চৌধুরী বলেন, এটি সততার পুরস্কার।

কর্ণফুলী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক চৌধুরী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই মন্ত্রীত্বের মাধ্যমে আনোয়ারা কর্ণফুলীর জনগণকে শুধু নয়, দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষকে সম্মানিত করেছেন।

সাবেক সংসদ সদস্য চেমন আরা তৈয়ব বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামে আওয়ামীলগের প্রথম পূর্ণমন্ত্রী হিসাবে জাবেদের নিয়োগ, পুরো অঞ্চলের মানুষের জন্য গর্বের বিষয়।

আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, মানুষের ভালবাসার কারণে এই অনন্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, জনগণের জন্য কাজ করেছেন বলেই প্রধানমন্ত্রী এই স্বীকৃতি দিয়েছেন।

উপজেলা আওয়ামীলীগ এডহক কমিটির সদস্য বোরহান উদ্দিন চৌধুরী মুরাদ বলেন, আজ দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর আনন্দের দিন। কাজের স্বীকৃতি মিলেছে বলে আনন্দের বন্যা চলছে।

ইউপি চেয়ারম্যান এমএ কাইয়ুম শাহ বলেন, সততা, উন্নয়ন ও মানবসেবার স্বীকৃতিই এই পদোন্নতি। আনোয়ারা কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এম নজরুল ইসলাম বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ উন্নয়ন ও সততা দিয়ে প্রমাণ করেছেন এই অঞ্চলে তিনিই সেরা।