শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮

আরেকজন ‘আহছানুল হুদা’র অপেক্ষায়

আজাদ মঈনুদ্দীন

প্রকাশিত: ১৭ নভেম্বর ২০১৮ শনিবার, ১০:২৯ এএম

আরেকজন ‘আহছানুল হুদা’র অপেক্ষায়

সাংবাদিক আহছানুল হুদা। এই চট্টগ্রামের মফস্বল জনপদ আনোয়ারার এক সংবাদকর্মী। মফস্বল সাংবাদিকতায় কাটিয়েছেন দুই যুগেরও বেশি। ২০০৮ সালের এক সকালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান পরপারে। তারপর কেটে গেল আরো এক দশক।

এখনকার কর্পোরেট সাংবাদিকতা বা ডিজিটাল সাংবাদিকতার যে জৌলুস তার কোনটাই ছিল না আহছানুল হুদার। সারাদিন হেঁটে হেঁটে এখান থেকে ওখানে ছুটতেন, কখনও পুরনো মোটর সাইকেলে সওয়ারি হয়ে চলে যেতেন খবরের সন্ধানে। তুলে আনতেন মানুষের সুখ-দু:খের চিত্র, খবর আর পেছনের খবর।

দিনশেষে এনালগ টেলিফোনের ডায়াল ঘুরিয়ে সেই সংবাদ পৌঁছে দিতে শহুরে পত্রিকার ডেস্কে। পরের দিন পত্রিকার কোন এক কোণায় ছাপা হতো সেই খবর। তাতে টনক নড়ত প্রশাসনের। কখনো ছোট্ট সেই লেখায় সুবিচার পেত অসহায়-নির্যাতিত মানুষ। তাতে তার যে কী খুশি তা বলে বুঝানো যাবে না। এভাবে আহছানুল হুদা হয়ে উঠেছিলেন আনোয়ারাবাসীর বিপদের বন্ধু, অসহায় মানুষের কন্ঠস্বর।

আহছানুল হুদা সম্পর্কে আমার চাচা। আমরা থাকতাম শহরে, চাচা গ্রামের বাড়িতে। ছোটবেলায় গ্রামে গেলে ভয়ে থাকতাম চাচার কঠিন শাসনের জন্য। ছোটকাল থেতে দেখেছি চাচার থাকার কাছারি ঘরে সকাল থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আসা-যাওয়া থাকত। বেশিরভাগই আসতেন নিজের বিপদ ও সমস্যা নিয়ে। নিজে গিয়ে, সামাজিক বৈঠকের মাধ্যমে, কখনো প্রশাসনের মাধ্যমে আবার কখনো পত্রিকায় খবর ছাপিয়ে উচ্চমহলের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে তিনি পাশে দাঁড়াতেন।

মানুষ তাকে কতটা ভালবাসত সেটা দেখেছি ২০০৮ সালে। তখন তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত। এলাকার হাজারো মানুষ মসজিদে মসজিদে তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া ও কুরআন খতমের আয়োজন করেন। শত শত মা-বোনেরা তাঁর রোগমুক্তির জন্য রোজা রেখেছেন, মানত করেছেন। প্রার্থনা করেছিলাম, তিনি আবার সুস্থ হয়ে উঠুন। আবার গর্জে উঠুক বিপদগ্রস্থ মানুষের কন্ঠস্বর।  কিন্তু না। তিনি চলে গেলেন লোকান্তরে ১৭ নভেম্বর, ২০০৮ । সেদিন আকাশজুড়ে ছিল শ্রাবণ মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি হয়েছিল অঝোরে।

চাচার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। আমরা চাচাকে ‘বাবু’ বলেই ডাকি। তাই আহছান চাচা ছিলেন আমাদের আহছান বাবু। গ্রামের যেকোন সমস্যায় আহছান বাবুর দ্বারস্থ হতাম। কর্মব্যস্ততাকে আড়াল করে তিনি সবসময় সহজভাবে সমস্যার সমাধান করে দিতেন।  ব্যক্তিগত জীবনে কখনো তাঁকে বিমর্ষ কিংবা বিচলিত দেখিনি। স্থিতধী, সদাপ্রসন্ন তিনি। প্রজ্ঞার সঙ্গে বিনয়ের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। একান্ত আলাপচারিতায় তাঁর তুলনা মেলা ভার।

আমৃত্যু আহছানুল হুদার সাংবাদিকতা ছিল মানুষের কল্যাণে। তিনি আমার কাছে অনেক কিছুর শিক্ষক। সাংবাদিকতা, মানবতা, পরোপকার, ন্যায়নিষ্ঠার হাতে কলমে তালিম পাওয়া যায় তাঁর জীবন থেকে। আনোয়ারার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বিপদের দিনে অকৃত্রিম বন্ধু। যেখানে মানবতার আর্তনাদ শুনেছেন শত রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি পাশে দাঁড়িয়েছেন। মোকাবেলা করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। তারা মৃত্যুতে আনোয়ারা কলেজ মাঠে শোকার্ত মানুষের ঢল সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমাদের মধ্যে বয়সের ব্যবধান অনেক। আমার সাংবাদিকতার সূচনা সময়ে চাচা কখনোই উৎসাহিত করেন নি। সৎ সাংবাদিকতার কঠিন পথ বা তার জীবনে অভাব-অনটনের কঠিন শিক্ষা থেকেই হয়ত তিনি আমাকে আড়াল রাখতে চাইতেন। চাচার মুখে অনেক বাঘা বাঘা সাংবাদিকের অতীত-বর্তমান শুনেছি। যারা এখন শহরের বিশাল অট্টালিকায় থাকেন। ২৪ বছর দাপটের সঙ্গে সাংবাদিকতার পরও তার বেড়ার ঘরে ইটের দেওয়াল তুলতে পারেন নি। পলিথিন মুড়িয়ে ঘরের টিনের ছালার ছিদ্র বন্ধ করতে পেরেছিলেন, তাতে নতুন টিন দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। মারা যাওয়ার সময় দুই শিশু সন্তানের জন্য রেখে যেতে পারেন নি ৫ টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স।

এলাকার মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছিলেন আহছানুল হুদা। তার সমসাময়িক প্রায় সবাই জাতীয় দৈনিকের ব্যুরো প্রধান কিংবা স্থানীয় দৈনিকে গুরুত্বপূর্ন পদে আসীন হলেও মফস্বল সাংবাদিকই ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। আক্ষেপ করে প্রায় সময় বলতেন , ‘বড় হয়ে অনেকে অতীত ভুলে যায়। দেউলিয়া জীবনে স্বার্থকতা নেই।’

উন্নত বিশ্বে কীর্তিমানদের জীবন আলোচনা সবসময় সামনে রাখা হয় নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য। আজ আনোয়ারাতেই নতুন প্রজন্মের অনেকে ভুলতে বসেছে কীর্তিমান এই সাংবাদিকের নাম। আমরা হাঁটছি পেছন দিকে। সবাই ভুলে গেলেও মানুষের কীর্তি কখনো মরে না। ভুলে যাওয়াটা আমাদের দেউলিয়াপনা।

জীবিত থাকাকালীন আহছানুল হুদার সংগ্রাম ছিল অন্যায়, অসত্য আর অবিচারের বিরুদ্ধে। ইঞ্চিমাপা সততা ধরে রাখতে গিয়ে অভাব আর অনটনের সঙ্গেও লড়তে হয়েছে। যে আনোয়ারাকে এক সময় ‘টাকার খনি’ বলা হতো , সেই জনপদে দুই যুগের সাংবাদিকতার পরও টিনের ছালা ছুঁইয়ে ঘরের ভেতর গড়িয়ে পড়ত বৃষ্টির পানি। বেড়ার ঘর ভেঙ্গে যাচ্ছিল একটু একটু করে। নিজের কষ্ট লুকিয়ে তিনি ছুটতেন মানুষের জন্য।

আহছান চাচার অবর্তমানে তাঁর অসহায় পরিবারকে যারা নানাভাবে শক্তি-সাহস যুগিয়েছে সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। আনোয়ারা উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী, প্রবীণ শিক্ষক আমিরুজ্জামান, আনোয়ারা প্রেসক্লাব সভাপতি আনোয়ারুল হক, লেখক-সংগঠক শহীদুল ইসলাম শহিদ, আজাদী প্রতিনিধি এম নুরুল ইসলাম, প্রথম আলো প্রতিনিধি মোরশেদ হোসেন, প্রবাসী লেখক সংগঠক নূরুন্নবী আলীসহ আরো অনেক শুভাকাঙ্খী নানাভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।

আহছানুল হুদা কখনোই উচ্চকিত স্বভাবের ছিলেন না। নীরবচারিতাই ছিল তাঁর চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্য। তাই শহুরে সাংবাদিকতার নানা চাকচিক্য আর অর্থিক লাভের নানা সুযোগ থাকার পরও  তিনি অনেকটা নিভৃত জীবনযাপনের পথই বেছে নিয়েছিলেন। কারও কাছে তাঁর কোনো প্রত্যাশা ছিল না, ছিল না কোনো অভিমান কিংবা অনুযোগ। তাঁর পাঠরুচির বৈচিত্র্য ছিল লক্ষ করার মতো। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি—এসব বিষয়ে আগ্রহ ও অধ্যয়ন তাঁর অবকাশকে ভরিয়ে তুলত। তাঁর বাসায় যখন গিয়েছি, তিনি তাঁর অনেক পুরোনো ছোট ছোট নোট বই আমাকে দেখিয়েছেন, যেখানে খুব সংক্ষেপে তিনি রেডিওতে বিবিসি আয়োজিত যেসব কথিকা শুনতেন তা সংক্ষেপে লিখে রাখতেন। এ রকম প্রায় ৫০টি ছোট ছোট নোট বই আমি দেখেছি।

সাংবাদিক আহছানুল হুদার চরিত্রের যে দিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত, তা হলো নিজের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে আড়াল করে রাখার রুচি। জ্ঞান, অর্থ আর প্রতিপত্তি মানুষকে যেখানে অহংবোধে আচ্ছন্ন করে ফেলে, সেখানে আহছানুল হুদা  ছিলেন এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। যাঁরা তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছেন তাঁরা জানেন, কীভাবে তিনি তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করতেন। বিশেষত, যারা তরুণ প্রজন্মের। তাদের ভাবনার জট খুলে দিতেন। কাউকে দীক্ষিত করতে চাইতেন না, তবে আলো ছড়াতেন। প্রশ্ন করলে জবাব দিতেন এবং তার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কোনো ঘটনার সূত্র উল্লেখ করতেন, যাতে জিজ্ঞাসু মন আরও তৃপ্ত হয়। তা করতেন অন্যের অনুসন্ধিৎসাকে উদ্রিক্ত করার প্রবল বাসনা থেকেই।

১৭ নভেম্বর, ২০০৮  বাঁধ না মানা চোখের জলে তাঁকে চিরবিদায় জানিয়েছি। এমন পরোপকারী মানুষ আনোয়ারাবাসী আর দ্বিতীয় একজন পাবে কিনা জানি। শেষ বেলায় বলতে হয় ‘তোমার হাতে যেন সে পায় শান্তির অক্ষয় অধিকার।’