বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯

মৃত্যুভয়াল এক রাতের স্মৃতি...

শামসুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল ২০১৮ শনিবার, ০৪:৪৩ পিএম

মৃত্যুভয়াল এক রাতের স্মৃতি...

‘৯১ এর ২৯এপ্রিল রাতের বিভীষিকার কথা মনে পড়লে গা শিহরে ওঠে আজো। ভয়াল সেই রাতে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গিয়ে পেয়েছিলাম পুনর্জীবন। সে রাতের প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সম্পূর্ণ লন্ডভন্ড করে দিয়েছিল আমাদের পুরো এলাকাকে। কেড়ে নিয়েছিল হাজারো নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণ।

বলছিলাম ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ জলোচ্ছাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে যাবার কথা। নিজের চোখে দেখা হৃদয় বিদারক দৃশ্য ও মানবতার নীরব কান্নার কথা। বঙ্গোপসাগর উপকূলে সেদিনের ভয়াবহ জলোচ্ছাসের মারনাঘাতকে খুব ঘনিষ্ট ভাবে আলিঙ্গনের পর অলৌকিকভাবে দ্বিতীয় জীবন পাবার অভিজ্ঞতার কথা।

আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। থাকতাম বড় ভাইয়ের সঙ্গে পূর্ব মাদারবাড়ির একটি বাসায়। আগের দিন বিকেলে গিয়েছিলাম চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর এলাকায় আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর আর আড়াই কিলোমিটার দক্ষিন পূর্বে ছিল শংখ নদী। উপকূলীয় ভেঁড়িবাধের অবস্থাও ছিল অত্যন্ত নাজুক। ভাঙ্গনের কারণে অনেক জায়গায় বাঁধের অস্তিত্বই ছিলনা। এক কথায় বলতে গেলে উপকূলীয় রায়পুর ইউনিয়ন পুরোটাই ছিল প্রায় অরক্ষিত।

বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল ক’দিন আগেই। এর ফলে ২৮এপ্রিল রাতেও ছিল ৬ নম্বর বিপদ সংকেত। তবে উপকূলের আবহাওয়া ছিল প্রায় স্বাভাবিক। ২৯ এপ্রিল সকাল থেকেই আবহাওয়ার পরিবর্তন ছিল লক্ষ্যণীয়। আকাশে মেঘের আনাগোনার পাশাপাশি ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। বাতাসও বইছিল হালকাভাবে। দুপুর গড়াতেই বেড়ে ক্রমশ: বাড়ছিল বাতাসের গতিবেগ। কিন্তু ঝড়-জলোচ্ছাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা উপকূলীয় এলাকার লোকজন তেমন একটা পাত্তাই দেয়নি এ পরিস্থিতিকে। সকালের শুরু হওয়া গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি অব্যাহত ছিল বিকেল পর্যন্ত।

এদিন বিকেল ৫টার পর থেকে আরো বেড়ে যায় বাতাসের, একই সঙ্গে বৃষ্টিও। এর ফলে আর ঘর থেকে বের হইনি। আমাদের ঘরে সেদিন ছিলাম বৃদ্ধা আম্মা, আমি ও বড় আপার মেয়ে বিলকিস। সন্ধ্যার আঁধার নেমে আসার পর শুরু হয় ঝড়ো হাওয়ার ঝাপটা। মাঝে মধ্যে দমকা হাওয়া। টিনের চালার আওয়াজ শুনে তা পরিস্কার বুঝতে পারছিলাম । এ অবস্থার মধ্যেই আম্মা রান্নাবান্না শেষ করে ফেলেন। কিন্তু খাইনি কেউই। রাত ৯টার দিকে জেঠাত ভাই আবুল কালাম এসে আম্মাকে বললেন ১০নম্বর বিপদ সংকেতের কথা। অনুরোধ করলেন সাইক্লোন শেল্টার কিংবা দূরে কোথাও চলে যেতে। কিন্তু আম্মা রাজি না হওয়ায় নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে উঠলেন কিছুটা দূরে একটি পাকা বাড়িতে। আমরা সহ বাড়ির ১১টি পরিবারের বাকী সদস্যরা থেকে গেলেন বাড়িতে নিজ নিজ ঘরে। সাড়ে ১০টার দিকে প্রচন্ড গতিতে বইছিল ঝড়। ঝড়ের ঝাপটায় পেরেক খুলে গিয়ে উড়ে যাবার উপক্রম হচ্ছিল টিনের চালা। প্রচন্ড ঝড়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিলনা তখন। মনে মনে ভয় লাগলেও ভরসা দিচ্ছিলেন আম্মা। হারিকেন জালিয়ে একটি রুমে এসে বসে রইলাম আমরা তিনজন। মাঝে মধ্যে মনে হচ্ছিল দমকা হাওয়া আমাদের ঘরটিই হয়ত: উড়িয়ে নিয়ে যাবে।

রাত বারোটার দিকে জানালা ফাঁক করে বাইরে টর্চ লাইটের আলো ফেলতেই দেখি ঘরের দেয়ালের কাছেই পানি। তড়ি ঘড়ি করে আম্মা আর ভাগিনীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘর থেকে। আমার ডাকাডাকিতে ৫বছরের পুত্র বাদশা আর ৩বছরের মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে এলো জেঠাত ভাই ফয়েজ ও তাঁর স্ত্রী। এলেন জেঠাত বোন আয়েশা, তাঁর স্বামী আছদ আলী ও মেয়ে ফাতেমা। বাড়ির উঠোনে তখন কোমর সমান পানি। সবাই মিলে পানি ভেঙ্গে ভিটের উত্তর পূর্ব পাশে থাকা খড়ের গাদায় গিয়ে উঠলাম। শংখের বাঁধ বিলীন হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব থেকে ধেয়ে আসা পানি দ্রুত বাড়ছিল তখন। এ অবস্থায় একে অপরকে ধরে জীবন বাঁচানোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলাম ক’জন।

কিন্তু বেশিক্ষন তা পারিনি। রাত সাড়ে ১২টায় বঙ্গোসাগর থেকে উঠে আসা জলোচ্ছাসের ঢেউ টুকরো টুকরো হয়ে ছিড়ে নিয়ে যাচ্ছিল খড়ের গাদাটি। আমার চোখের সামনেই অল্প খড় সহ বিচ্ছিন্ন হয়ে ভেসে গেলেন আম্মা ও ভাগিনী বিলকিস। তাঁদের ধরে রাখার কোন চেষ্ঠাই কাজে আসল না। একই ভাবে একে একে ভেসে গেলেন আয়েশা ও তাঁর স্বামী আছদ আলী। ছেলে বাদশা আর মেয়ে মুন্নীকে কাঁধে নিয়ে খড় ধরে ভেসে গেলেন জেঠাত ভাই ফয়েজ। বাকী রইলাম আমি, ফয়েজের স্ত্রী ও ফাতেমা। প্রাণের মায়া তখনো ছাড়িনি। হঠাৎ দক্ষিণ দিক থেকে একটি খালি চালা এসে ঠেকল খড়ের গাদা ও গাছের সঙ্গে। আমরা তিনজনই তাতে উঠে পড়লাম। প্রায় দশ মিনিট পর হঠাৎ পানির প্রচন্ড বেগ আমাদের সহ চালাটি ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল পূর্ব দিকে। আধ কিলোমিটার যাবার পর চালা থেকে ছিটকে পড়ে গেলাম আমি। ডুবে গেলাম পানিতে।

মনে হলো এখানেই জীবন শেষ, মৃত্যু থেকে বাঁচার আর কোন সুযোগ নেই। এমন সময় হঠাৎ ভেসে উঠলাম পানির উপরে। ঝড়ে ডাল পালা ভেঙ্গে গিয়ে সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকা একটা কড়ই গাছ পেলাম সামনে। জড়িয়ে ধরলাম গাছটি। এক একটি ঢেউ এসে আমাকে ডুবিয়ে চলে যাচ্ছিল মাথার উপর দিয়ে। গাছটি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঢেউয়ের ধাক্কার মুখে নিজেকে টিকিয়ে রাখছিলাম। ঢেউ যাবার পর মাথাটা কোনভাবে তুলছিলাম পানির উপরে। গাছটির ডালপালা না থাকায় উপরে উঠারও কোন সুযোগ ছিলনা। তাই এভাবেই রাতভর চলে আমার জীবন যুদ্ধ। চারিদিকে তখন শুধু পানি আর পানি।

রাতের আলো-আঁধারিতে পানির উপরে থাকা কিছু গাছের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। বাড়ি ঘরের কোন অস্তিত্বই চোখে পড়ছিলনা । খড়কুটো কিংবা চালা ধরে পাশ দিয়েই ভেসে যেতে দেখলাম অনেক নারী পুরুষকে। এক মহিলাকে দেখলাম ঘোঙাতে ঘোঙাতে এসে ঠেকেছে পাশের আরেকটি গাছের সঙ্গে। কিন্তু এ সময় গাছটি ধরে বাঁচার চেষ্ঠা করার মত শক্তিও সম্ভবত: তার ছিলনা। কিছু ক্ষণ পরে সেখানেই তাকে লাশ হয়ে ভাসতে দেখলাম। এভাবে অনেক নারী পুরুষের লাশ ভেসে যেতে দেখলাম পানির সাথে। এক সময় মনে হচ্ছিল মহাসমুদ্র মাঝে আমি একাই শুধু বেঁচে আছি।

রাত অনুমান তিনটার পর থেকে পানি কমতে শুরু করে। সকাল ৭টার সময় নেমে আসি আমার দ্বিতীয় জীবন পাবার একমাত্র ওসিলা হিসাবে পাওয়া গাছটি থেকে। তখনো বুক সমান পানি। পানি সাতরে কোন ভাবে উঠে এলাম বাড়ির সামনের রাস্তায়। এ সময় রাস্তার দু’পাশে দেখা যাচ্ছিল কেবল লাশ আর লাশ। চিৎ, কাত, উপুড় হয়ে পড়ে থাকা বিবস্ত্র নারী পুরুষের লাশ, সন্তান কোলে মায়ের লাশ।

চোখের সামনে ভেসে যাওয়া আম্মা-ভাগিনী, প্রতিবেশি কারো বেঁচে থাকার আশাই করতে পারছিলাম না তখন। ভিটেতে ফিরে দেখি বাড়ির কোন অস্তিত্ব নেই। শূণ্য ভিটেয় ভেজা কাপড়ে বসে কাঁদছেন আম্মা। তিনি জানালেন, আমার মতই একটি গাছ ধরে রাতভর মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে আল্লাহর অপার রহমতে বেঁচে যান তিনি। একই ভাবে বেঁচে যান ভাগিনী বিলকিসও। কিন্তু চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় জেঠাত ভাই ফয়েজ, তার ছেলে বাদশা ও মেয়ে সহ আমাদের বাড়ির তিনটি পরিবারের ১৬জন সদস্য। এদের অনেকের লাশের সন্ধানও মিলেনি।

স্মৃতির আকাশে আজও নাড়া দেয় ২৭ বছর আগের সেই রাতের ভয়াল দৃশ্যগুলো ...

লেখক : সাংবাদিক