ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামে অনলাইন পত্রিকার চ্যালেঞ্জ

আজাদ মঈনুদ্দীন

প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০১৮ রবিবার, ০১:৩৮ পিএম

চট্টগ্রামে অনলাইন পত্রিকার চ্যালেঞ্জ

দুনিয়াজুড়ে এখন অনলাইনের জয়জয়কার। অনলাইন পত্রিকার দাপটে বিশ্বজুড়ে ছাপানো পত্রিকাগুলো দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেও সেই ঢেউ লেগেছে সত্যি, তবে অনলাইন পত্রিকা এখনও সেভাবে মূল সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। অনলাইন পত্রিকা বলতে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক-কে বুঝেন। ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকার নিউজ শেয়ার হওয়ায় অনেকের ধারণা ফেসবুক থেকে এই খবর এসেছে। ফলে ঢাকা পড়ে যায় পত্রিকার নাম। 

দেশে বিডিনিউজ, বাংলানিউজ, বাংলাট্রিবিউন, জাগোনিউজের বাইরে আর কোন অনলাইন পত্রিকা এখনও সেভাবে স্বকীয় অবস্থানে যেতে পারেনি। প্রিন্ট ভার্সনের কয়েকটি পত্রিকার অনলাইন ভার্সন অবশ্য কিছুটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে।

গত দেড় দশকে ভেতর থেকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকেও বদলে যেতে দেখেছি। একসময় দেশের দুর্গম এলাকায় ঢাকার পত্রিকা যেত বিকেলে বা একদিন পর। এখন পত্রিকার অনেকগুলো এডিশন ছাপা হয়, সারা বাংলাদেশে পত্রিকা পৌঁছায় প্রায় একই সময়ে। সাংবাদিকতা শুরুর সময় আমরা কখনো কখনো অফিসে ঢুকতাম রাত ১০টায়। আর এখন রাত ৮টার মধ্যে রিপোর্টারদের কাজ ফুরিয়ে যায়। অনেক রিপোর্টার রিপোর্ট ই-মেইল করে দিয়ে অফিসে না গিয়েই বাসায় চলে যান। একসময় পত্রিকায় ফ্যাক্সে পাঠানো ঢেউ খেলানো ছবি ছাপা হতো। এখন সবকিছু তাৎক্ষণিক।

শুরুর সময় আমরা নিউজ এজেন্সি বলতে বুঝতাম বাসস আর ইউএনবি। সে দুটিরও গ্রাহক ছিল মূলত পত্রিকাগুলো। সাধারণ মানুষ এ দুটির নামও জানত না। বিডিনিউজ যখন অনলাইনভিত্তিক নিউজ পোর্টাল করলো, আমরা হাসাহাসি করেছি। এই অনলাইন কে পড়বে, কে বিজ্ঞাপন দেবে, কয়দিন টিকবে; এই নিয়ে আমাদের সংশয় ছিল। কিন্তু দেখুন শুধু বিডিনিউজ নয়, অনলাইন নিউজ পোর্টাল আজ বাস্তবতা। দেশে আজ কয়টি অনলাইন আছে, সেটা তথ্যমন্ত্রীও জানেন না বোধহয়। অনলাইন নিউজ পোর্টালের পাশাপাশি সবগুলো পত্রিকাও এখন অনলাইন ভার্সন করেছে।

বাংলাদেশে অনলাইন পত্রিকাগুলো কেন চ্যালেঞ্জের মুখে ? এর কারণ হিসাবে ইন্টারনেটের ধীরগতি ও উচ্চমূল্যই দায়ি বলে আমি মনে করি। জনপ্রিয়তা কঠিন বড় বাজেটের অনলাইন পত্রিকা আসছে কম। কিন্তু নাম সর্বস্ব অনলাইন পত্রিকা ঠিকই বাড়ছে। বর্তমানে সরকারি নিবন্ধনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা অনলাইন পত্রিকার সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ হাজার। যার বেশিরভাগই নামসর্বস্ব। না আছে অফিস, না আছে দক্ষ কর্মী।

বাংলাদেশে এখন ২ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে। সক্রিয় ফেসবুকারের বিবেচনায় ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় শহর। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাশাপাশি বিবেচনায় নিতে হবে অনলাইন পোর্টালের বিশাল জগতকেও। কারণ কোনো একটা ঘটনায় প্রথম নিউজটা আসে একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম থেকে। প্রাথমিক জনমতটা তৈরি হয় সেখানেই।

তবে চট্টগ্রামের বাস্তবতায় যদি বলি এখানে অনলাইন পত্রিকাগুলোর অভিজ্ঞতা আরো খারাপ। এখানে আজাদী-পূর্বকোণ-পূর্বদেশ এর মত জনপ্রিয়, সুপ্রভাত বাংলাদেশের মত স্মার্ট-আধুনিক পত্রিকা থাকলেও অনলাইন পত্রিকাগুলো তার ধারে কাছেও নেই। এমন শত অনলাইন পত্রিকা আছে পাঠকের কাছে যেগুলো নামই অজানা।

চট্টগ্রামের চেনাজানা যেসব অনলাইন পত্রিকা রয়েছে তার মধ্যে অ্যালেক্সা র‌্যাংকিংয়ে সবার উপরে আছে দৈনিক পূর্বকোন.নেট। ১৫ এপ্রির, ২০১৮ সালের জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে তাদের অবস্থান ৯১০। দ্বিতীয় অবস্থানে দৈনিক আজাদী.ওআরজি। তাদের অবস্থান ১০৯৫। সুপ্রভাত.কম ৪,৪১৬। তাদের অবস্থান চতুর্থ।

খুব সম্ভবত এ সময়ে চট্টগ্রামের অনলাইন পত্রিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উপরের দিকে আছে সিটিজি টাইমস। দেশে তাদের অবস্থান ১৯৩১।একটি পত্রিকার প্রাণ নিজেদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে খানিকটা পিছিয়ে আছে পত্রিকাটি। তাই সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছতে সংগ্রাম করছে তারা।
এছাড়া পঞ্চম অবস্থানে সাইফুল ইসলাম শিল্পী সম্পাদিত পাঠক.নিউজ, ষষ্ঠ আলমগীর অপু সম্পাদিত সিপ্লাসবিডি.নেট, সপ্তম আজাদ তালুকদারের একুশে পত্রিকা ডট কম, অষ্টম নিউজ বিএনএ ডট কম, নবম গোলাম মওলা মুরাদের দিনবাংলা.কম, দশম এম. নাসিরুল হকের সিভয়েস২৪.কম, একাদশ সিটিজি নিউজ.কম ও দ্বাদশ অবস্থানে আছে হেলাল উদ্দিন চৌধুরী সম্পাদিত সারাবেলা২৪.কম।

‘বিএনএ’ অনেকদিন ধরে চট্টগ্রামভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা হিসাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে তারাও এখন সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি বলে সাধারণ পাঠকের ধারণা।

সিটিজি নিউজ নামের অনলাইন পত্রিকাটি মাঝখানে ঝলক দেখানোর চেষ্টা করেছিল। সালেহ নোমান, মজুমদার নাজিমদের মত পরীক্ষিত কয়েকজন সাংবাদিক এখানে কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত মান ধরে রাখতে পারেনি। কাজের ব্যাপ্তিও কমিয়ে নিয়েছে পত্রিকাটি।

আমার সবসময় মনে হয়েছে চট্টগ্রামে ভাল মানের একটি অনলাইন পত্রিকার শূন্যতা আছে। সেই শূন্যতা থেকে প্রবীণ সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘সারাবেলা’ নামে আরেকটি অনলাইন পত্রিকা আনুষ্ঠানিক যাত্রার অপেক্ষায় রয়েছে। মোমিন রোডের নিজস্ব কার্যালয়ে চলছে তাদের ঘর গুছানোর কাজ।

এর মধ্যে বাজারে এসেছে সিভয়েস২৪ । সিনিয়র সাংবাদিক এম নাসিরুল হক সম্পাদিত পত্রিকাটির এখনও পরিচিতি পর্ব চলছে।

চট্টগ্রামের সাংবাদিকতার নাড়ি নক্ষত্রের খবর যারা রাখেন সবাই একমত চট্টগ্রামে ভাল মানের অনলাইন পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে পাঠকপ্রিয় একটি হাউজ গড়তে যে ধরনের পেশাদারিত্ব, বাজেট আর অভিজ্ঞ সাংবাদিক দরকার তার কোনটিই এখন চট্টগ্রামের অনলাইন পত্রিকাগুলোতে নেই। এ কারণে বন্দরনগরীতে পিছিয়ে পড়ছে গুরুত্বপূর্ন এই সংবাদ মাধ্যম।