শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কেমন নেতা চাই

সাবরিনা সুলতানা :

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০১৭ সোমবার, ১০:০৯ পিএম

কেমন নেতা চাই

বিদেশী ফান্ড নাই। প্রজেক্ট নাই। প্রতিবন্ধী মানুষের সেবাদানকারী নেতারাও নাই... কিন্তু প্রশ্নটি ভিন্ন- আমাদের জননেতা কে হবে ? এতদিনকার দোকানদারি ব্যবসায়ি নেতৃত্ব নয়, প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করবে এমন জননেতা কে হবে আমাদের?

বিগত বিশ বছরের এনজিও ফান্ডিং এ প্রকল্প বাস্তবায়ন নির্ভর উন্নয়নের নামে অ-প্রতিবন্ধী নেতারা প্রতিবন্ধী মানুষকে দুশ্চিন্তা, হতাশা ও অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারেন নি। উন্নয়নের নামে শত কোটি টাকা কোথায় উড়ে গেছে তা আমরা জেনেও জানি না! দেখেও দেখি না। কিন্তু বলতেই হয়, আমরা না পেয়েছি সমাজে সম অংশগ্রহণ। না পেয়েছি মর্যাদা, স্বকীয়তা, স্বাধীনতা। তাহলে প্রশ্ন এসেই যায় নেতা কী কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যে? আলিশান বাড়ি, এসি হাকানো গাড়ি- এমন নেতাই কী আমরা চাই? কেমন নেতা চাই আমরা?

গত ৩ জুন প্রতিবন্ধী তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রশিক্ষণ শেষে আমার চট্টগ্রাম ফেরার ঠিক আগ মূহুর্তে জম্পেশ এক আড্ডা পেয়েছিলাম, ‘প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন’ এই স্বপ্নের নেতৃত্বদানকারী পিএনএসপি চত্বরে। পিএনএসপি’র আড্ডাগুলো চেতনাকে শাণিত করে। মানুষের ভেতরের বদ্ধ দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। নতুন করে ভাবতে শেখায়। এবারের ভাবনা যোগ্য নেতৃত্বের অভাব...

যবে থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণে কাজ শুরু হয়েছে, ধরে নেই নব্বই দশক থেকে এদেশে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য দয়া-দাক্ষিণ্যের যুগের শুরু। অতীতে ফিরে গেলে দেখা যাবে সভা সেমিনার – মাঠে ঘাটে সবখানে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষ বুক চিতিয়ে নেতাগিরি করে বেড়াচ্ছেন।

কারণ প্রতিবন্ধী মানুষ তো অসুস্থ!! দুর্বল এই মানুষগুলো নিজের সিদ্ধান্তটা পর্যন্ত নিজে নিতে জানে না! ঘর থেকে একা বের হতে পারেন না! তাই তো এই মানুষগুলোর হয়ে অ-প্রতিবন্ধী মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের চর্চার এভাবেই শুরু। প্রতিবন্ধী মানুষের কল্যাণ আর সেবা করার নামে সারা দেশে প্রজেক্ট করতে নেমেছিলেন সাধারণ মানুষেরা। এর জন্য বিদেশ থেকে কোটি টাকার ফান্ড এনেছিলেন তারা। বছরের পর বছর ধরে আসা এই অর্থ আইএনজিও থেকে এনজিও ভাগ হয়েছে। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত বাড়ি-গাড়ি করতে হয়েছে। নামি দামী জায়গায় সভা সেমিনার করতে হয়েছে। আর প্রতিবন্ধী মানুষদের এক বেলা খাওয়া আর যাওয়া-আসার গাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছে!

যার যতো বেশি অর্থ তার তত বেশি প্রজেক্ট। স্বাভাবিকভাবেই যার প্রজেক্ট বেশি প্রতিবন্ধী মানুষের এই খাতে তাদেরই রাজত্ব। তারাই নেতা। তারাই সিদ্ধান্ত প্রণেতা। সারা দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের ভাগ্য বিধাতা তারাই।

পরনির্ভরশীলতায় সুখের জীবন কাটানো আর ট্রেনিং নির্ভর অর্থ উপার্জনের ভাবনায় মগ্ন প্রতিবন্ধী মানুষকে কিভাবে চিনবে সরকারি মন্ত্রী আমলারা?! সরকারি উর্ধ্বতন মহলে কথা বলে প্রতিবন্ধী মানুষের মুরুব্বী এই নেতারা। ডোনার ফান্ডের জোরে ক্ষমতাশালী এইসব নেতাদের নাম উঠে যায় প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনের ভাগ্য নিয়ন্ত্রক নীতিনির্ধারণী কমিটিগুলোতে। মিটিং সিটিং করেন তারা আমাদের জন্য।

আর আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা কথা বলতে জানি না তাই পেপসি খেয়েই আনন্দচিত্তে বাসায় এসে আরাম করি। রাস্তার গরম-জ্যামের শহরে বিষাক্ত বাতাস, পরিশ্রমের জীবন এসব কী আমাদের মতো প্রতিবন্ধী মানুষের শরীরে সয়!!

কিন্তু বাধলো সমস্যা! ২০১৫ সাল থেকে চারিদিকে ফিসফাস, গুজগুজ। প্রজেক্ট কমছে। কর্মী ছাটাই হচ্ছে। আকাশছোয়া সুবিশাল ইমারত ছেড়ে ছোট এলাকার ছোট ছোট বাসায় অফিস স্থানান্তর হচ্ছে।
প্রতিবন্ধী মানুষের খাতের এনজিও আইএনজিওগুলোরও একই অবস্থা। এক নামে পরিচিত এনজিও/আইএনজিওগুলো এখন নামসর্বস্ব হয়ে আছে। তাদের কর্মী ছাটাইয়ের পরিমাণ ২০১৬ সালের তুলনায় চলতি বছরে আরো বেড়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষের খাতে শীর্ষ যে কয়েকটা এনজিও/আইএনজিও (সবাই এক নামে চেনেন, উল্লেখ করা অবান্তর) রয়েছে, সারা দেশে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলেছে তারা। হেড অফিসেও কেউ তাদের বেশিরভাগ নতুবা অর্ধেকের বেশি কর্মী ছাটাই করে ফেলেছেন ইতোমধ্যে। বড় অফিস পরিবর্তন করে ছোট অফিসে যাওয়ার হিড়িক এখনো চলছে। এই বছরের ভেতরেরই আরোও প্রজেক্ট কমবে। বেশিরভাগই মৃতপ্রায়। কিছু হয়তো, ধুকে ধুকে টিকে থাকার চেষ্টা করবে।

এই বছর শেষ হওয়ার আগেই এই সব এনজিওগুলোর টিকে থাকাটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে এখুনি। ইউরোপ/ইউকে/অস্ট্রেলিয়া/আমেরিকা বেইজড ফান্ডগুলো বাংলাদেশে বন্ধ হয়ে গেছে বেশিরভাগই। আগামী দুই তিন বছরেও বৈদেশিক অনুদান জটিলতা মেটার কোন লক্ষণ নেই। সমস্ত বরাদ্দ ইউরোপের রিফিউজি ক্রাইসিসে দিকে যাচ্ছে। রিফিউজি ক্রাইসিস মিটতে না মিটতেই বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে। তাছাড়া আমেরিকা বরাদ্দ কমালে অন্যান্য দেশের বরাদ্দ আফ্রিকার দিকে পা বাড়াবে স্বাভাবিক গতিতেই। অন্যদিকে আমাদের দেশের প্রজেক্ট নির্ভর উপজেলার DPO গুলোর কিছুই করার নাই যেনো। সারা দেশে চাকরি বা প্রজেক্ট হারানো প্রতিবন্ধী মানুষের মুখ শুকিয়ে আছে দুশ্চিন্তা, হতাশা আর অস্থিরতায়।

অনেক তো হলো, আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষের ঘুম কী ভাঙবে এবার?

দেখুন, একদা নারীর দুর্বল হওয়ার দুর্নাম তারাই কাটিয়েছে। দুর্বল নারীর হয়ে পুরুষের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবল প্রবণতাকে অস্বীকার করে নারী প্রমাণ করেছে একতাবদ্ধ নারী পুরুষের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণের স্বাধীনতা পেয়েছে আন্দোলন বাদ প্রতিবাদের মাধ্যমে। এবার আমাদের এ প্রজন্মের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী/তরুণ যারা তাদের পালা। আগামীর এই নেতৃত্ব “প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নের নামে শোষিত করার রাজনীতি” থেকে আমাদের মুক্ত করবে... এমন জননেতার প্রতীক্ষায় আছি ।।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বি-স্ক্যান