রোববার, ২১ জুলাই ২০১৯

নওয়াজের পতন, আড়ালে কে?

দাউদ হায়দার

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই ২০১৭ রবিবার, ১০:৫৭ পিএম

নওয়াজের পতন, আড়ালে কে?

বাইশ গজের ক্রিকেট মাঠে কতজনকে বোল্ড আউট করেছেন- হিসেব জানা নেই। এও অজানা, কত সুন্দরী-তরুণী-যুবতি নারীর হৃদয় ভেঙেছেন ইমরান খান। অবশ্যই লড়াকু তিনি ক্রিকেটে, প্রেমে ও রাজনীতির খেলায়। হাল ছাড়লে চলবে না, লড়েই জিততে হয়। জিতেছেন নওয়াজ শরিফকে কাঠগড়ায় পাঠিয়ে। ইমরান খানের এই বাউন্ডারি ফাঁকা মাঠে নয়, প্রতিপক্ষও ছিল দক্ষ খেলোয়াড়। আম্পায়ার লক্ষ্য রেখেছেন দক্ষতা সত্ত্বেও খেলায় মূল গলদ কোথায়।

আম্পায়ারের সংখ্যা ছয়। অবশ্য, একজনই আসল। নাম আসিফ সাঈদ খান খোসা। তিনিই প্রধান বিচারপতি। পক্ষপাতহীন বিচারক হিসেবে বহুমান্য, সম্মানিত। বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত। ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকেও ছাড়েননি।

আসিফ সাঈদ খান খোসা একজন লেখকও। গোটা চারেক বই লিখেছেন। লাহোরের এক দৈনিকের সাংবাদিক রাবেয়া কুরেশি এখন বার্লিনে, দেখা করতে এসেছিলেন গতকাল বিকেলে। মানবাধিকার নিয়েও সরব, সংগঠনেও। খোসা-বিষয়ে মজার গল্প শোনান, ‘তিনি কেবল প্রধান বিচারক নন, ক্রাইম থ্রিলার-রগরগে উপন্যাসেরও পাঠক। নওয়াজ শরিফের বিচারের রায়ে মারিও পুজোর উপন্যাস ‘গডফাদার’ থেকে বিস্তর কোট করেছেন, হুবহু।’

তা হলে, একজন ক্রিমিনালকে সঠিক শনাক্ত করতে ক্রাইম-উপন্যাসও সহায়ক।

[ফুটনোট: ওই যে বলেছিলাম, আম্পায়ারের সংখ্যা আরও ছয়, জানা দরকার কার কী অতীত ও বর্তমান। ওয়াজিদ জিয়া (ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির অতিরিক্ত মহাপরিচালক)। আমির আজিজ (এনআইবিএএফ- পাকিস্তানের ব্যাঙ্কার ও আর্থিক বিভাগের প্রশিক্ষণ বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক)। বিলাল রসুল (অর্থনৈতিক সংস্থা- সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক)। ইরফান নঈম মাহির (পাকিস্তানের শীর্ষ দমন বিভাগের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো- বেলুচিস্তান শাখার পরিচালক)। ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ নোমান সাঈদ (পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা- আইএসআই এর অভ্যন্তরীণ-শাখার প্রাক্তন পরিচালক, গত বছরই অবসর নিয়েছেন পরিচালকের পদ থেকে)। ব্রিগেডিয়ার কামরান খুরশিদ (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের মিলিটারি ইনটেলিজেন্সে ‘স্পেশাল অফিসার’। বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে তার ক্ষমতা এতটাই, চিফ থেকে শুরু করে সব জেনারেলই তাকে সমীহ করেন, তার কথায় উঠবস করেন)।

বাকি চার আম্পায়ারের ডিসিশন বাহুল্য, দুই ব্রিগেডিয়ার আম্পায়ারকে উপেক্ষা করা কি সহজ খোসার? যতই বলা হোক, খোসার বিচার সিদ্ধান্তই পয়লা, নওয়াজকে গদিচ্যুৎ করার, ভিতরের ঘটনা ভিন্ন। ইমরান খান যতই আস্ফালন করুন, তিনি শিখণ্ডী। যদি মারতে হয় ভীষ্মকে, দরকার পাণ্ডববাহিনী, সর্বাগ্রে কৃষ্ণকে, মন্ত্রণাদাতা।
পাণ্ডব বাহিনীতে পাঁচজন নয়, গুনেগেঁথে ছয়জন, পঞ্চপাণ্ডবের বদলে ষষ্ঠপাণ্ডব, শিরে দুই ব্রিগেডিয়ার। মন্ত্রক পাক মিলিটারি। কৃষ্ণের ভূমিকায়-আমরা নিশ্চয় ভুলিনি, পাকিস্তানের কুরুক্ষেত্র রচনায় মিলিটারির কী ভূমিকা। নেপথ্যে কৃষ্ণ তথা আমেরিকা।

[ফুটনোট: ওবামার আমল থেকেই পাকিস্তান না-পসন্দ। কারণও বহুবিধ। পাকিস্তান একটি অবিশ্বাসী, বদমাইশ, দুষ্ট, হারামি খচ্চর দেশ। জন্ম থেকেই। খচ্চর পিটিয়ে গাধা করার দায় নিয়েছিল আমেরিকা। ওবামা বুঝতে পারেন, খচ্চর গাধা হয় না। তালিবানের সঙ্গ ছাড়বে না। লাদেনকে খতম করতেই হবে। খতম করার পরেও পাকিস্তানের তথা কৌরবের আক্কেল হয় না। নওয়াজ শরিফ চরিত্রে মূলত জাবালি। শায়েস্তা করার জন্য পানামা পেপারসই যথেষ্ট। লক্ষ করুন, পানামা পেপার্সের নথি-তালিকায় দুর্নীতি কত ফাইল ফাঁস হয়েছে! ১৫ মিলিয়ন। পৃথিবীজুড়ে এত মানুষের (ধনী) দুর্নীতি? ১৪৩ জন রাজনীতিক? ১২ জন রাষ্ট্রনেতা? প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী? কতজন সাজাপ্রাপ্ত? ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট আয়াদ আলায়ি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেট্রো পরোসেঙ্কো, মিশরের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মুবারক, আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সিগমুন্ডর, এমনকি ব্রিটিনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বাবা-ও কী?]

- নওয়াজ শরিফ ভুল করেছেন ঘুঁটির চালে। আমেরিকার সঙ্গে বিটলেমি, সেনাবাহিনীর সঙ্গে কানামাছি খেলা সহ্য নয় ‘বিগ বসদের’। কাশ্মির নিয়ে যুদ্ধ চায় সেনাকর্তারা। নওয়াজ অরাজি। কাশ্মির সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে উদ্যোগী, কিন্তু সেনাকর্তাদের নিষেধ।

নওয়াজের ঘাড়ে কি দুটি মাথা?-অন্তত এতদিন তাই জেনেছেন। পাকিস্তানের কোনও প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী একবার কুর্সিচ্যুৎ হলে ফিরে পাননি। নওয়াজ পেয়েছেন, পরপর তিনবার। নেপথ্যে অবশ্য সেনাবাহিনী। এবার পাশা উল্টেছে। পানামা পেপার্স, দুর্নীতি উপলক্ষ। পাকিস্তানে সেনাকর্তারা নাখোশ হলে কী হয়, ঢাউস ইতিহাস।

ঠিক যে, পাকিস্তান আবার ইনস্ট্যাবিলিটি, আগামী বছরে, নির্বাচনে আরও ঘন হবে। নওয়াজের পাকিস্তান মুসলিম লিগ যদি জয়ী হয় নির্বাচনে, সংবিধান ওলোটপালোট করে নওয়াজকেই ফিরিয়ে আনবে, জনমত তোয়াক্কা না করে। পাকিস্তানে সবই সম্ভব। গণতন্ত্র উছিলা মাত্র। যেমন উছিলা পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারি, দুর্নীতির কেচ্ছা। কলকাঠি নাড়ার কর্তা সেনাবাহিনী। বিচারক নন।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক