সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০

বেতন কমানো সমাধান নয়

ফখরুল আবেদীন মিলন

প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০২০ শুক্রবার, ০৩:৩৯ পিএম

বেতন কমানো সমাধান নয়

ব্যাংকগুলো কর্মীদের বেতন কমাচ্ছে ব্যাংকের আয় কমে গেছে এই যুক্তিতে..যে কোন আর্থিক দুর্যোগে কর্মী ছাঁটাই করা বা বেতন কমিয়ে দেয়া খুবই অর্ডিনারী এবং পুরানো একটা ধ্যান ধারনা বা সিস্টেম..

অথচ আমার কাছে মনে হয় এই দুর্যোগটা অনেক বিরাট একটা সুযোগ ব্যাংকের জন্য..কিভাবে?

ধরুন একটা ব্যাংক তার কর্মীদের মাসে বেতন দেয় ১০ কোটি টাকা..সেই হিসেবে বছরে ১২০ কোটি টাকা..এখন ১৫% বেতন কমিয়ে দিলে মাসে খরচ কমছে ১.৫০ কোটি টাকা..সেই হিসেবে বছরে খরচ কমছে ১৮ কোটি টাকা..

এই ১৮ কোটি টাকা বাঁচানোতে কি হচ্ছে? কর্মীরা মানসিক ভাবে ভেংগে পরবে..তাদের জীবনের চলমান খরচ কমাতে গিয়ে তাদের অনেক কিছু সেক্রিফাইস করতে হবে..কাউকে হয়ত ভাল এলাকার বাসা ছেড়ে কম ভাড়ার এলাকায় যেতে হবে..কাউকে হয়ত ভাল স্কুল ছেড়ে সন্তানদের অন্য স্কুলে দিতে হবে..এমনি বহু কিছু এডজাস্ট করতে হবে তাদের..অনেকেই তা হয়ত করবে..উপায় তো নেই..

তবে একটা বিষয় কখনোই মন থেকে যাবে না যে তার এত দিনের প্রতিষ্ঠান তার বিপদের দিনে তার পাশে ছিল না..এই করোনা কালে জীবনের মায়া না করে দিনের পর দিন ব্যাংকিং সেবা দেয়ার এই প্রতিদান..

এই হতাশা থেকে কেউ কেউ চাকরী ছেড়ে অন্য কোন ব্যাংকে চলে যাবে..একথা তো সত্যি যে ব্যাংকের অপেক্ষাকৃত ভাল কর্মীরাই চলে যাবে..বাকী যারা থেকে যাবে তারা কি আর পারবে আগের মত প্রতিষ্ঠানটাকে ভালবেসে নিরলস পরিশ্রম করতে? পারবে না..ক্ষতি যা হবার তা কিন্তু ব্যাংকটারই হল..

আরো একটা বড় ক্ষতি যা হবে তা হল রেপুটেশন লস..

পেপার পত্রিকায় আসবে, সোস্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হবে, টিভি নিউজে আসবে "অমুক ব্যাংক এত পার্সেন্ট বেতন কমিয়েছে"..এতে ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে একটা ভাবনা ঢুকবে যে ব্যাংকের অবস্থা নিশ্চই খারাপ, নয়ত বেতন কমাবে কেন? তারা তাদের ডিপোজিট তোলা শুরু করবে..ব্যাংক দুর্বল হবে..শেয়ারের দাম কমে যাবে..ব্যাংক যতই তার কর্মীদের তাগাদা দিক না কেন, তারা আর আগের স্পিরিট নিয়ে ডিপোজিটের জন্য ঘুরবে না..ব্যাংকের জন্য ডেডিকেটেড হবে না..

অন্যদিনে ভাবুন, এই সময়ে যদি কোন ব্যাংক তাদের কর্মীদের আশ্বস্ত করে বলে যে তাদের বেতন ভাতা কমবে না, তাহলে তারা আজীবন কৃতজ্ঞচিত্তে মনে রাখবে এই পাশে থাকার কথা..

আর ধরেন যদি কোন ব্যাংক এই অবস্থায় তাদের কর্মীদের বেতন বাড়িয়ে দেয়, ধরুন ৫% ই বাড়ায়, তাহলে প্রতি মাসে বেতন বাবদ ব্যাংকের খরচ বাড়ছে মাত্র ৫০ লক্ষ টাকা..সেই হিসেবে বছরে ৬ কোটি টাকা..ভাল সময়ে ২০% বেতন বাড়িয়েও যে কাজ হবে না, এই সময়ে ৫% বাড়িয়েও তার বহুগুন হবে..

এই খবর ছড়িয়ে পড়বে পত্রিকায়, টিভি নিউজে আর সোস্যাল মিডিয়ায়..সারা দেশে সেই ব্যাংক নিয়ে আলোচনা হবে..সারা বছর বিজ্ঞাপন দিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও এত পাবলিসিটি পাবে না..ব্যাংকের শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটবে এতে করে..সাধারন গ্রাহকরা তাদের সঞ্চয়ের জন্য সেই ব্যাংকটাকেই বেছে নিবে..স্টক মার্কেটে শেয়ারের দাম বেড়ে যাবে..এতে লাভবান হবে শেয়ার হোল্ডাররা..বেতন কমিয়ে শেয়ার হোল্ডারদের যেই ডিভিডেন্ড দিত, তার চেয়ে তারা বেশি পাবেন শেয়ার মার্কেট থেকে..

আর এতে ব্যাংকের কর্মীরা কি পরিমান মোটিভেটেড হবে তার কথা আর নাই বা বললাম..

আমার ধারনা বেশিরভাগ ব্যাংকই বেতন কমানোর মত বা ছাঁটাই করার মত পুরানো পদ্ধতিতে যাবে না..আর যে সমস্ত ব্যাংক ডায়নামিক, তারা এই দুর্যোগেও বেতন বৃদ্ধি করবে, হোক তা অল্প..
আর কে না জানে, যুগে যুগে ডায়নামিকরাই জয়ী হয়..তারাই নতুন পথ খুঁজে বের করে..তারাই বাকীদের নতুন সেই পথ দেখায়..

ফখরুল আবেদীন মিলন-লেখক ও ব্যাংকার