সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

করোনা নিয়ে যুদ্ধ

এমডি ফরিদুল আলম

প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২০ রবিবার, ১২:১৪ পিএম

করোনা নিয়ে যুদ্ধ

টাইগার শার্কের চরিত্র অনেকের অজানা। এরা মানুষ খেকো। তাই এরা আদমখোর হিসেবেও মানুষের কাছে পরিচিত। জানা যায় এরা যখন শিকার অন্বেষণে মন স্থির করে তখন লক্ষ্যবস্তুর জন্য দুঃসংবাদ নেমে আসে। এরা জন্ম থেকেই নিষ্ঠুর। এদের ইতিবৃত্ত পড়ে জেনেছি মা শার্কের গর্ভাশয়ে ৫০টির মতো ডিম্বাণু নিষিক্ত থাকে। মায়ের পেটে প্রকৃতির নিয়মে পোনার মতো বড় হতে থাকা বাচ্চা শার্কগুলো মায়ের পেটেই তুলনামূলক দুর্বলগুলোকে খেতে থাকে। অবশেষে টিকে মাত্র একটি। সেটি বেশ বড় হয়ে মায়ের গর্ভাশয় থেকে বের হয়ে সময় ক্ষেপণ না করে ভোঁ দৌঁড়ে পালায়। কারণ নির্বিচার খাদক মা যদি তাকে খেয়ে ফেলে! এদের ক্ষুধা সন্তান চেনে না । নিজের বাচ্চা, মানুষ , অন্যান্য জলজ প্রাণী, কাঁচের বোতল কোনকিছুই বাদ যায় না এদের চোয়ালের আক্রমণ থেকে। তবে এরা এদিকওদিক ছুটে শিকারে অভ্যস্ত নয়। কেবল নিজের নাগালে পেলেই ছাড়ে না।

এতক্ষণ টাইগার শার্ক নিয়ে বলার উদ্দেশ্য কেবল একটি কারণে, তা হলো বৈশ্বিক মহামারি `করোনাভাইরাস`, যেটিকে ঘিরে বিশ্ববাসী আজ আতংকের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। নিমেষেই বিশ্বে দুইশত`র অধিক দেশে মৃতের সংখ্যা অর্ধ লক্ষ ছাড়িয়েছে। এভাবে দ্রুত বাড়তে থাকলে মৃতের সংখ্যা কতো লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে তা সৃষ্টিকর্তা জানেন। বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের কেউ কোয়ারেন্টিন মানছেন, আবার কেউ কোয়ারেন্টিনে থাকার ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ তাঁরা বিদেশে সব নিয়মকানুন মেনে চলেন, দেশে আসলে স্বদেশী মনোভাব চলে আসে। এমন অবস্থায় যাদের সংস্পর্শে যাবেন তাঁদের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। এভাবে পুরো দেশের মানুষ সংক্রমণ ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদ নিজ ও জনগণের স্বার্থ ভেবে হোম কোয়ারেন্টিন বেছে নিয়েছেন। এরকম অনেক বিশ্বনেতা কোয়ারেন্টিন বেছে নিয়েছেন। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বাংলাদেশের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান লন্ডনের একটি হোটেলে স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে থেকে একটি ভিডিও বার্তা বিশ্ববাসীর কাছে শেয়ার করেছেন। লন্ডনে স্ত্রী সন্তানের সাথে দেখা করেননি। এ রকম অহরহ।

টাইগার শার্ক যেমন নিজেই হন্যে হয়ে শিকার অন্বেষণে লিপ্ত হয় না তেমনি বিশেষজ্ঞদের মতে করোনাভাইরাস মানব দেহে উড়ে এসে জুড়ে বসে না। করোনাভাইরাস কি বাছবিচার করে মানুষের দেহে সংক্রমিত হচ্ছে? সংস্পর্শ পেলেইতো ধনী গরীব, আবাল -বৃদ্ধ, উন্নত রাষ্ট্রের প্রধান, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, অভিনেতা কাউকে ছাড়ছে না। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন আমেরিকায় দেড় থেকে দুই লক্ষ মানুষের প্রাণহানির ভয় রয়েছে। তারা ভুল স্বীকার করে বলেছে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সময় পেয়েও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না নেয়ায় আজ দুর্বিষহ জীবন নেমে এসেছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন আগামীর দিন গুনছে তারা।

ফ্রান্সে একদিনে ১৩৫৫ জনের জীবন কেড়েছে করোনাভাইরাস। ইতালী এটিকে মোকাবেলায় ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে হতাশ। স্পেন, কানাডা, ইরানের অবস্থাও নাজুক। চীন কোন রকম পার পেয়ে গেলো মনে হলেও আবারো সংক্রমিতের খবর শুনা যাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সংক্রমিত হয়ে মারা যাচ্ছে। তাহলে এতো উন্নত রাষ্ট্র হয়েও ব্যর্থ হলে বাংলাদেশে এমন অবস্থা হলে কিভাবে সামলানো সম্ভব? এর দায়ভার কার? সাধারণ মানুষ না বুঝলে প্রশাসন নিরুপায় কঠোর না হয়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে নেমেও কতজন বাঙালিকে দমিয়ে রাখা যাচ্ছে?

তিন বৃদ্ধকে মাস্ক না পরার দায়ে কানে ধরে উঠবস দেয়ায় যশোরের মনিরামপুরের এসিল্যন্ড সায়েমা হাসানকে নিয়ে অনেকেই ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। ফলশ্রুতিতে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত গড়ালো। মানুষ যত অদম্য মেধাবী হোন না কেন অনেক সময় মাথা ঠিক মতো কাজ করে না। সায়েমার ব্রেইনে যদি তা ধরতো তবে ছবিগুলো কি নিজেই নিজের ফেসবুকে আপলোড দিতেন? তাঁকে সাবধান করলে কি হতো না? মানুষ ভুলের উর্ধে নয়। কোন কোন সময় দায়িত্ব পালনে কঠোর হতে হয়। আমাদের কি মুখে বুঝিয়ে কি কাজ হয়? একে একে করে কতো কোটি বাঙালিকে মুখে বুঝিয়ে বাসায় ঢুকানো যাবে ?

এই পরিস্থিতিতে সায়েমার মতো যে শিক্ষায় ক্যাডার এবং দায়িত্বেও ক্যাডার এমন কিছু মানুষ হয়তো রাস্তায় প্রয়োজন ছিল । যাঁরা নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। শুধু নামে প্রজাতন্ত্রের চাকুরী করলে চলবে না। এই সময় বৃদ্ধ, যুবক, রিকশাচালক, অন্ধ, ভিক্কুক, ধনী গরীব কাউকে আলাদাভাবে দেখার সময় নয়। তবে বাসায় অবস্থান মুহুর্ত থেকে খেটে খাওয়াদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশ ও দশের কথা ভাবতে হবে । বাহিরে অযথা ঘুরাফেরা করা মানুষগুলোকে ঢিলেঢালাভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে সুফল আসবে মনে হয় না। তাইতো সেনাবাহিনীকে কঠোর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বাচ্চা শার্কটি মায়ের পেটে থাকতে তার চেয়েও কম শক্তিশালী বাচ্চাগুলোকে মায়ের মতোই একেক করে সাবাড় করেছে। `মা কিংবা বাচ্চা` সব শার্কের চরিত্র একই। পৃথিবীর আদি থেকে ভাইরাসের অস্তিত্ব বিদ্যমান। ভাইরাসের চরিত্রও মা ও বাচ্চা শার্কের মতো। কিছু অধিক শক্তিশালী ; কিছু অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী। অদৃশ্য করোনাভাইরাসও শার্কের মতো একেক করে সব মানবকে সাবাড় করতে তৎপর যদি না নিরাপদে অবস্থান করি। এই ভাইরাসের অদৃশ্য চোয়াল দৃশ্যমান টাইগার শার্কের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

তবে কি সমুদ্রে শুধু কি টাইগার শার্ক বাস করবে ? অন্যান্য জলজ প্রাণীরাও কি বেঁচে নেই? মানুষ কি জীবনের তাগিদে মাছ ধরতে সমুদ্রে নামছেন না? এই নশ্বর পৃথিবীতে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে আমাদের বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে হবে। এই যুদ্ধ হচ্ছে ঔষধ কিংবা নিজেকে নিরাপদ অবস্থানে রাখা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। বাংলাদেশ ইউরোপ কান্ট্রিগুলোর মতো মৃত্যুপুরীতে রূপ না নিক । করোনাভাইরাসও টাইগার শার্কের মতো নির্বিচার খাদক। নাগালে পেলেই ক্ষমা নেই। করোনায় মৃত্যুপুরী ইতালীর একজন ডাক্তার কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলেছেন- ` If you know the size of the risk, you will not get your heads out even from the windows`. এটি বিশ্ববাসীর জন্য ভয়ংকর ম্যাসেজ। এই ম্যাসেজ  আমাদের সতর্কতার বার্তা হতে পারে।

এই কঠিন মুহুর্তে  বাসায় অবস্থান, সামাজিক দূরত্ব ও পারিবারিক দূরত্ব বজায় নিজের দায়িত্ববোধের মধ্যে পড়ে। বৈশ্বিক মহামারি  করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত হোক বীর বাঙালী ও  বাংলাদেশ।