রোববার, ২১ এপ্রিল ২০১৯

কমিশনার-সম্মানি দুইশ’ টাকা !

রেহানা বেগম রানু

প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ রবিবার, ১২:২১ এএম

কমিশনার-সম্মানি দুইশ’ টাকা !

প্রতি জিএম-এ আমরা (সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের কমিশনার) কেবল ২শ’ টাকা সম্মানি পেতাম। দক্ষিণ আগ্রাবাদের প্রয়াত কমিশনার শ্রদ্ধেয় জালাল উদ্দিন আহমেদ কখনোই এই ২শ` টাকা নিতেন না। তিনি আমাকে স্নেহ করেন। একদিন বললেন, রানু আমি তো এই ২শ’ টাকা নিই না। তুমি নিয়ে কী করবে। বললাম, এই সম্মানি আমার অধিকার। টাকা কত সেটি বড় কথা নয়। ২শ’ টাকা নিয়ে প্রয়োজনে একজন দরিদ্র মানুষকে দিয়ে দেবো-তাও ভালো। দুর্নীতির আখড়া যে সিটি করপোরেশন সেখানে ২শ’ টাকা রেখে লাভ কী।

২০০০ সালে প্রথমবার কমিশনার হয়েই টের পেলাম মানুষের কত চাহিদা। ভোট নিয়ে নির্বাচিত হওয়ায় মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কোনো গরিবের মেয়ের বিয়ে- নগদ টাকা, অতিথি আপ্যায়ন নতুবা ফার্নিচার দেওয়ার দাবি ছিল কমন ব্যাপার। শীতকাল এলেই এলাকায় পিকনিকের ধুম। নানা ক্লাবের নানা আয়োজন। সেখানে অর্থ-সহায়তার আবদার। হলুদ খামে ধরিয়ে দেওয়া হতো চিঠি। আত্মীয়স্বজনের হরেক দাবি তো আছেই। নানা পূজা-পার্বণ, ঈদ-উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শাড়ি, লুঙ্গি, ইফতার সামগ্রী, শীতে কম্বল ইত্যকার চাহিদা সাধারণ মানুষের। সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, বিশাল আয়তনের তিন ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়ানো, চিকিৎসা সহায়তার আবদারও কম নয়। কমিশনারকে যেন সবই দিতেই হবে। বলে রাখি, আমার তিন ওয়ার্ডে ৭ লক্ষ মানুষের বাস। তাই প্রতিদিন নিত্যনতুন, অদ্ভুত সব আবদার। কিন্তু আমি কোনোভাবেই হিসাব মেলাতে পারি না। আামি সৎও থাকব, আবার এসব আবদারও পূরণ করবো-এ কেমন কথা। কিন্তু তারা অনেকেই আশার ডালা নিয়ে আসেন। কাউকে ফিরিয়ে দিতেও কষ্ট লাগে। সাধ আর সীমাবদ্ধতার সাথে রীতিমতো যুদ্ধ আমার।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জিএম থেকে ২শ’ টাকা সম্মানি ছাড়া আমার মতো একজন জনপ্রতিনিধির আর কোনো প্রাপ্তির সুযোগ নেই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে শুনতাম কমিশনারের অনেক টাকা, আয়-উপার্জন। আমার বুঝতে কষ্ট হতো মানুষের এই ধারণা কেন। আমি ছাড়া নিকটাত্মীয়, স্বজন সবারই বদ্ধমূল ধারণা আমার অনেক টাকা। এ নিয়ে অনেকে ভুলও বুঝতো। কিন্তু আমি অসহায় আমার কাছে, আমার সততার কাছে, নীতির কাছে। কিছু মানুষ ভুল বুঝলেও এলাকার বেশিরভাগ মানুষ আমাকে যারা কাছ থেকে দেখেছে, আমার শালিস দেখেছে, আমার কাছ থেকে ওয়ারিশান সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়েছে তারা আমাকে ঠিকই বুঝতে পেরেছে, আমার নীতি, সততা ও স্পষ্টবাদিতাকে শ্রদ্ধা করেছে। কেউ কখনো বলতে পারবে না এধরনের সেবার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে কোনোধরনের সুবিধা নিয়েছি।

অনেকের ধারণা ওয়ারিশান সার্টিফিকেট দিয়ে ইনকাম হয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারি না ওয়ারিশান সার্টিফিকেট থেকে ইনকাম হয় কী করে? শহরে জায়গাজমির মূল্য অনেক। এ কারণে জায়গাজমি সংক্রান্ত ঝামেলা নিরসনের জন্য সঠিক ওয়ারিশান সার্টিফিকেট গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাই ওয়ারিশান সনদ প্রদানের বেলায় আমি অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতাম। ওয়ারিশান সনদ চেয়ে কেউ আবেদন করলে আমি নিজেই তদন্ত করতাম, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের কাছে সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিতাম, তারপরেই প্রদান করতাম ওয়ারিশান সনদ। ভূল-বিভ্রান্তিকর সনদ আমার ১৫ বছরের কাউন্সিলর জীবনে কাউকে দেইনি। চট্টগ্রামের আজকের মেয়র আ জ ম নাছির ভাইও আমার কাছে তাঁর পরিচিত একজনের জন্য ওয়ারিশান সার্টিফিকেটের জন্য পাঠিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ননদের ওয়ারিশান সার্টিফিকেটের জন্য জেসমিন পারভীন জেসি (বর্তমান কমিশনার) নিয়ে এসেছিলেন। যেই ওয়ারিশান সার্টিফিকের আবদার নিয়ে এসেছেন, কিংবা পাঠিয়েছেন কাউকে মুখ দেখে কিংবা বলার সাথে সাথে সার্টিফিকেট দিয়ে দেইনি। চুলচেরা বিশ্লেষণ, একাধিকবার তদন্ত, যাচাই-বাছাই শেষে তবেই ওয়ারিশান সনদ প্রদানের চেষ্টা করেছি। যেন কেউ সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

কমিশনারের প্রথম মেয়াদে সরাইপাড়া ওয়ার্ডে জমিলা খাতুন সড়ক (এসআই মাওলা সড়ক) এর কাজ করে দেওয়ার বিনিময়ে খুশি হয়ে ৫০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল এলাকাবাসী। কাজটি হয়ে যাওয়ার পর তারা আমার কাছে যথারীতি ৫০ হাজার টাকা নিয়ে আসে। আমার অর্থকষ্ট আছে, আছে চাহিদা। সেই পরিস্থিতিতেও আমি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছি। বলেছি, আপনারা শুধু আমাকে দোয়া করবেন, যেন কঠিন পরীক্ষার মাঝেও সৎভাবে বাঁচতে পারি।

এখানে বলাবাহুল্য, জেন্ডার ইস্যু, পারিবারিক আইন বিষয়ক নানা ইস্যুতে হাঙ্গার প্রজেক্ট, মমতা, ইয়াং ওয়ানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে ট্রেনিং করাতাম, সেখানে সম্মানি পেতাম। জনপ্রতিনিধির কর্মযজ্ঞের মাঝেও আইনপেশায় সময় দিতাম। সেখানেও সততা ও বিপদাপন্ন মানুষের প্রতি দায়িত্ব অনুভব করতাম। লক্ষ্য ছিলো পেশার ক্ষেত্রেও সৎ হবো। অর্থলোভ সংবরণ করবো।

অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মানসিকভাবে লাভবান হয়েছি। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব, হাজারো অভাব-অভিযোগ, দাবি-দাওয়া, চাহিদা পূরণ করেছি আইনপেশার সৎ উপার্জন ঢেলে, ট্রেনিং থেকে প্রাপ্ত সম্মানি পর্যন্ত বিলিয়ে দিয়ে স্ট্যাটাস সামাল দিয়েছি। একই মানুষ সৎ ও থাকবে, সেবাও দিবে, অর্থসহায়তা দিয়ে মানুষের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করবে, রাজনীতির মাঠে নানা অনুষ্ঠানের খরচ জোগাবে- এই এক কঠিন সমন্বয়। আর সেই সমন্বয়টা আমাকে করতে হয়েছে কাউকে বুঝতে না দিয়ে, অনেক কষ্ট সয়ে, নীরবে নিভৃতে।

দ্রষ্টব্য : অবশ্য দুইশ’ টাকা কমিশনার-সম্মানি বাড়তে বাড়তে এখন ৩৫ হাজার টাকা হয়েছে। স্টেশনারি খরচ, করপোরেশনের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং, জিএম সব মিলিয়ে কমিশনার-সম্মানি এখন ৪০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বলাবাহুল্য, এই লড়াইটাও শুরু করতে হয়েছিল আমাকে। ২০০০ সাল থেকে শুরু করা এই যুদ্ধ সফল পরিণতি পায় ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবালের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে ২শ’ টাকার সম্মানি বাড়িয়ে ৭ হাজার টাকা করার ব্যবস্থা করেছি। ২০১৫ সালে যখন দায়িত্ব ছাড়ছি তখন কমিশনার-সম্মানি ১৫ হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমিশনারদের সম্মানিভাতা একলাফে দ্বিগুন করে দিয়েছিলেন।

লেখক : সাবেক কাউন্সিলর ও নারীনেত্রী