শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯

সিজারের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন

ইকবাল মাহমুদ

প্রকাশিত: ২৮ জুন ২০১৯ শুক্রবার, ১০:৩১ পিএম

সিজারের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন

দৃশ্যপট-১

২০১২ সালের দিকে নোয়াখালীর এক হাসপাতালে খন্ডকালীন খ্যাপ মারতাম। ভোর ৫ টায় দরজায় ধুমধাম শব্দ,বুঝলাম রোগী আসছে। গিয়ে দেখি খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় এক মা তার ডেলিভারী সমস্যার জন্য এসেছেন। ফ্যাকাসে মুখ, টেনে টেনে শ্বাস নিচ্ছে, ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে আমি কোন পালস্ ব্লাডপ্রেসার পেলাম না। হিস্ট্রি নিলাম। মহিলার তৃতীয় সন্তান পেটে, আগের দুইটা নরমাল।

এক সপ্তাহ আগে ডাক্তার দেখাইছিলেন আল্ট্রাসনোতে বলছে বাচ্চা উল্টো এবং বড় সিজার লাগবে। তারা শুনছে অনেক উল্টা বাচ্চাইতো নরমাল হয়। ডাক্তার খামোখা সিজার করতে বলছে। তারা বাড়িতে চেষ্টা করবেন ডিসিশন নিলেন।  সকাল থেকে একটু একটু ব্যথা সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যথা বাড়ে না দেখে ডাক পড়ল গ্রামের হাতুঁড়ে ডাক্তারের। সে স্যালাইনে ব্যথা বাড়ার ইনজেকশন দিল। গ্রাম্য বদমাইশটাও সাথে ছিল জিঞ্জেস করলাম কি দিছ?

...বলে স্যার ১ লিটার নরমাল স্যালাইনে এই ইনজেকশন ১০ অ্যাম্পুল দিছি,ব্যথা নাই দেখে আরো দুইটা মাংসে দিছিলাম। হাতে দেখি ইনজেকশন Linda S DS। রাগে ইচ্ছে করছিল থাপ্পড় মেরে শুয়োরের গালের দাঁত ফেলে দি। তৃতীয় বাচ্চার মাকে এই ইনজেকশন একটা দিতেই ভয় লাগে। সে ১২টা দিয়ে আসছে। ফলাফল মহিলার জরায়ু ফেটে রক্তক্ষরণ,আর বর্তমানের শক। অনেক কাট খড় পুঁড়িয়ে সে মহিলা বেঁচে ছিলেন কিন্তু বাচ্চাকে বাঁচানো যায় নি।

দৃশ্যপট-২

আজকে চেম্বারের এসিসট্যান্ট বললো স্যার একটা বাচ্চা আপনাকে দেখাবে।নআমি আত্মীয় স্বজন না হলে বাচ্চা রোগী সাধারণত দেখি না। আমি বললাম,আমাকে কেন দেখাবে? বলে হার্টে সমস্যা। বললাম ঠিকাছে আসতে বলো।

দেখলাম আমার বয়সী এক ভাই ছোট একটা পুতুল কোলে নিয়ে চেম্বারে ডুকলেন।হাতে একগাঁধা কাগজপত্র।

বললাম- কি সমস্যা, কেন আসছেন?

হাতের কাগজ দেখিয়ে বললেন, ঢাকায় ডাক্তার দেখাইছি। তারা ওষুধ দিছেন এবং হার্টে সমস্যা থাকতে পারে বলে একজন হার্টের ডাক্তার দেখাতে বললেন। আমি বললাম, আমি তো এতবড় হার্টের ডাক্তার না। এলাকায় টুকটাক আত্মীয় স্বজনকে দেখি সাথে কিছু পরিচিত রোগী আসেন। উনি বললেন,আপনার উপর আস্থা আছে। কি করতে হবে আপনি দেখে বলেন।খোঁজ নিয়ে জানলাম আমার এক পরিচিতের বন্ধু,বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে আছেন। তাই যে যেদিকে বলে সে দিকে ছুটেন।

বাচ্চার ডিটেইলস্ শোনা শুরু করলাম, বাচ্চাটি তাদের প্রথম সন্তান। সময়মত ব্যথা উঠছিল, গ্রামের বিখ্যাত ধাইমা এসছিলেন। সব ঠিক ছিল রাত গড়িয়ে সকাল হয় শুধু বাচ্চার দেখা নাই। প্রচন্ড কষ্টে মহিলার যখন যায় যায় অবস্থা তখন হাসপাতালে আসছেন। ততক্ষণে অনেক দেরী।অবস্ট্রাকটেড লেবার।

শেষ পর্যন্ত সিজার করতে হল। কিন্তু এর আগের টানাটানি তে সময় বাচ্চার ব্রেনে অক্সিজেনের ঘাটতি হওয়াতে পুতুলটি প্রতিবন্ধী। আহ্,কি ফুটফুটে একটা বাচ্চা !!

জন্মের পর থেকে খিঁচুনি। তারপর শুরু হল তাদের এক অবিরাম সংগ্রাম।নোয়াখালী-ঢাকা নোয়াখালী। বাসা-হাসপাতাল-আইসিইউ-বাসা।

গত ৪ বছর ধরে একজন চাইল্ড নিউরোলজিস্ট দেখছেন, এখন খিঁচুনী নাই কিন্তু বাচ্চাটা এখনো কথা বলতে পারে না। নিজে খেতে পারে না। প্রসাব পায়খানা আসলে বলতে পারে না। খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। আর মানুষটাকে দেখে খুব মায়া লাগছিল। কি পরম মমতায় তারা বাচ্চাটাকে নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। উপরের দুটো বাচ্চাই সঠিক সময়ে সিজার করলে সুস্থ হতে পারতো। ইদানিং সিজার নিয়ে রিট,এবং ফেসবুকের কল্যাণে পুরো ব্যাপারটাই হিট।

কারণ এই অবিশ্বাসের সমাজে আমরা যেমন বিশ্বাস নিয়ে খেলা করি, তেমনি কেউ কাউকে বিশ্বাসও করতে চাই না।

সারাবিশ্বে সবচেয়ে বেশি সিজার হয় ডোমিনিকা প্রজাতন্ত্রে (৫৮%), তারপর ব্রাজিল(৫৫.৫%), মিশর(৫৫%), তুরস্ক(৫৩%), আমেরিকায় (৩২%), ইংল্যান্ডে(২৫%), বাংলাদেশে (২৩%)।

বিশ্বব্যাপী দিনদিন সিজারের হার বেড়ে চলছে। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী সিজারের ছিল ১৯%, যা ২০১৫ সালে এসে দাঁড়ায় ২৫% এ। দিন দিন সিজারের হার বাড়ার কারণও আছে। আমরা পরিসংখ্যান না জেনে হায় বাংলাদেশ, হায় সিজার করছি।

কথা হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় সিজার যে একেবারেই হয় না তা নয়। কিন্তু যেভাবে সিজার ইস্যু নিয়ে মানুষের মাঝে ভুল ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে তার ভবিষ্যৎ পরিণাম হবে ভয়াবহ।

চিকিৎসকগণ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও সিজার করার সাহস, ইচ্ছা হারাবেন। ফলাফল প্রতিবন্ধী শিশু। এখানে আরেকটা ব্যাপার বলা দরকার যে, মেডিকেল সায়েন্স দাঁড়িয়ে আছে প্রমাণিত চিকিৎসা পদ্ধতির উপর। ব্যাপারটা কেমন?

ধরেন, "বি"এবং "সি" নামে জন্ডিসের দুইটা ঔষধ আছে। জন্ডিস হলে "বি"ওষুধ টা ৮০% ক্ষেত্রে কাজ করে আর "সি" করে ৬০% এবং "বি"এর দাম "সি"এর চেয়ে বেশি। আপনি এখন জন্ডিস হলে কোন ওষুধটা খাবেন? অবশ্যই "বি"। তাই না? কিন্তু কেউ যদি "সি" খেয়ে ভালো হয়ে যায়( কারণ ভালো হওয়ার চান্স ৬০%), সে বলতে পারে তাকে খামাখাই দামী "বি"খেতে বলা হয়েছে। আসলে "সি"ই ঠিক ছিল। চিকিৎসকগণ সর্বদা সর্বোচ্চ কার্যকরী চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রায়োরিটি দেন। যে ব্যাপারটা আমরা বুঝতে চাই না।

যেমন জমজ বাচ্চার ক্ষেত্রে নরমালের চেয়ে সিজার করলে মা ও বাচ্চার সুস্থ্যতা, জটিলতা না হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু খুব কমক্ষেত্রে জমজ বাচ্চা নরমাল ও হতে পারে।এখন ডাক্তার জমজ বাচ্চাকে সিজার করতে বললেন,তারা করলেন না। পরে নরমাল হল। তখন তারা বলা শুরু করলো যে ডাক্তার তাদের ভুয়া সিজার করতে বলছেন।আবার সিজার না করার কারণে যদি জমজ বাচ্চার বা মায়ের কোন সমস্যা হয় তা কিন্তু তারা আর বলেন না।সবই নিয়তি বলে চালাই দেন। যেমনটি আজকের বেবিটার ক্ষেত্রে হল।

আমাদের দেশে অপ্রয়োজনীয় সিজারের হার বাড়ার প্রধান কারণ দালালী,এই দালালদের মধ্যে বড় অংশ হচ্ছে পড়াশুনা না করে গজিয়ে উঠা কিছু "হঠাৎ ডাক্তার" যাদের কে কোয়াক বলা হয়।

দেশের ম্যাক্সিমাম ক্লিনিকের অবলম্বন এসব দালালরা।একটা রোগী নিতে পারলেই দালালী। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে একজন বিশেষজ্ঞ একটা অপারেশন করে যে টাকা পান, এসব দালালরা রোগী ধরে তার চেয়ে বেশি পান। আবার এগুলো দেখার ও কেউ নেই!!! অনেক জায়গায় তারাই ডিসিশন দেয় যে রোগীর সিজার লাগবে।

তাছাড়া সিজার বাড়ার অন্য কারণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগনের দীর্ঘক্ষণ নরমাল ডেলিভারী ফলোআপের মত সময়ের অভাব,ম্যান পাওয়ারের অভাব,দেশে ট্রেইন মিডওয়াইফয়ারী সার্ভিসের স্বল্পতা, নরমাল ডেলিভারীতে ব্যথার ভয়,বাচ্চার পজিশন ঠিক না থাকা, মায়ের বয়স,গর্ভকালীন অপুষ্টি, হাইপ্রেসার,ডায়াবেটিসসহ নানাবিধ কারণ রয়েছে।

আসলে পুরো সিস্টেমটাই পরিবর্তন প্রয়োজন, যেখানে চিকিৎসকের দায় খুব বেশি নয়।

ব্যরিস্টার সুমন সাহেব নানারকম সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে জনস্বার্থে কাজ করেন,তাকে সাধুবাদ। কিন্তু আমি মনে করি আদালতে রিট হওয়া জরুরী এসব বিষয়ে...

১/ কেন একজন মা তার গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় প্রসূতি সেবা পাবেন না।
২/ কেন তাকে গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় ঔষুধপত্র ও পরীক্ষা নিরীক্ষা বিনামূল্যে দেয়া হবে না।
৩/ কেন গর্ভবতী মায়ের পুষ্টি চাহিদা পুরণে ঘাটতি থাকবে।
৪/ কোয়াক,দালালদের এসব দৌরাত্ম কেন বন্ধ হবে না।
৫/ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ব্যতীত কেন সিজার করা অবৈধ হবে না।