সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০

করোনা জিতে আবারও হাসপাতালে ফিরলেন ডা. লক্ষীপদ

মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন, আনোয়ারা প্রতিনিধি, প্রথম আলো

প্রকাশিত: ০৩ জুন ২০২০ বুধবার, ১০:৫১ পিএম

করোনা জিতে আবারও হাসপাতালে ফিরলেন ডা. লক্ষীপদ

কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়ছে পৃথিবী। সবার দিন কাটছে আতঙ্কে। করোনা জয় করে যারা সুস্থ হয়ে ফিরছেন তারা একেকজন সফল ‘যোদ্ধা’। দৃঢ় মনোবল নিয়ে তাদের এই কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। এমনই একজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের রেজিস্টার ডা. লক্ষীপদ দাশ। করোনা সংক্রমনের শুরু থেকে জীবনবাজি রেখে সেবা দিয়ে গেছেন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা শত শত রোগীকে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ। এই কোভিডযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে তাই লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা লিখেছেন প্রথম আলোর আনোয়ারা প্রতিনিধি মোরশেদ হোসেন।

মানবতার ডাকে জীবন বাজি রেখে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের সবাইকে ছেড়ে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়েছিলেন তিনি। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। প্রতিদিনই অনেক রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলছিলেন। হৃদরোগ ওয়ার্ড মানে দুই রকমের লড়াই। রোগীদের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া নজরে রাখা, আবার করোনা উপসর্গের বিষয়ে সতর্কতা। দুটোই জটিল। সেকেন্ড হিসাব করে করেই চলতে হয়। যম আর মানুষের এই লড়াইয়ে একজন চিকিৎসক কী এত কিছু হিসাবে রাখতে পারেন ! ডা. লক্ষীপদও পারেন নি।

একসময় নিজের শরীরে দেখা দেয়  কভিড-১৯ এর নানা উপসর্গ ।  নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয় করোনাভাইরাসের অস্তিত্ব। এরপর আরেক লড়াই। করোনাকে হারানোর লড়াই। তিনি ঠিকই হারিয়েছেন। করোনা জয় করে পাঁচ দিন আগেই আবার হাসপাতালে ফিরেছেন মানবসেবায়। রোগীদের সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন আবারও। রোগীদের প্রতি তার এমন ভালোবাসা নজর কেড়েছে সবার। হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্কসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পরে রোগীদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা দিচ্ছেন । মনোবল বাড়াতে শোনাচ্ছেন করোনাকে জয় করার নিজের অভিজ্ঞতার গল্প। দিচ্ছেন নানা দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ।

সেই দু:সময়ে কেমন কেটেছে ? প্রশ্নের উত্তরে এভাবে শুরু কররেন ডা. লক্ষীপদ দাশ। `ছেলের জন্মদিন কিন্তু আমি করোনায় আক্রান্ত। তাই বাসায় কোন আয়োজন করা হচ্ছিলোনা। তারপরও ছেলে মন খারাপ করবে তাই বাসায় কেক তৈরি করে তা কাটার আয়োজন চলে। পাশের কক্ষে ছেলের জন্মদিনের কেক কাটা হচ্ছিল আর নিজের রুমে বসে অঝোরে কেঁদেছি আমি। কিন্তু কিছুই করার ছিলোনা।`

আনোয়ারা উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ডা. লক্ষ্মীপদ দাশ, ৫ বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। তিনি করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর পর তার ছোট ভাইও করোনায় আক্রান্ত হন। ছোট ভাইয়ের করোনা আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি তাকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দিয়েছে বলে জানান তিনি।

করোনা আক্রান্ত হওয়া সম্পর্কে লক্ষ্মীপদ দাশ বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউ হচ্ছে এতদঅঞ্চলের একমাত্র সরকারি সিসিইউ যেখানে নোয়াখালী, ফেনী, পার্বত্য চট্টগ্রামও কক্সবাজারের হৃদরোগীরা আসেন। একটি হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সেখানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কারো সংস্পর্শে এসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ি।

তিনি আরও বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে মার্চের শেষের দিকে পিপিইসহ বিভিন্ন সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার শুরু করি। কিন্তু করোনার হাত থেকে বাঁচতে পারিনি। তিনি বলেন, গত ৫ মে বিকেলেও ওয়ার্ডে গিয়েছিলাম। ৬ মে দুপুরে শরীরে জ্বর অনুভব করি, হাঁচিও ছিল। সন্ধ্যায় জ্বর বেড়ে গেলে বিভাগীয় প্রধান স্যারকে বিষয়টি জানাই। তিনি বাসায় থাকতে বলেন। সন্ধ্যার দিকে জ্বরের মাত্রা কিছুটা বাড়তে থাকে। এরমধ্যে রাতের দিকে একবার বমিও হয়েছিল। তার পরের দিন অর্থাৎ ৭ মে জ্বরের মাত্রা কিছুটা বাড়ে কমে। তারপরদিনও জ্বর ছিল। পরে ৯ মে চমেক হাসপাতালের ফ্লূ কর্নারে নমুনা দিয়ে আসার পর ১৩ মে জানলাম আমার করোনা পজেটিভ। করোনা পজেটিভ হওয়ার খবর পাওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। বিভাগীয় প্রধানকে যখন জানালাম তখন কোনভাবেই কান্না ধরে রাখতে ধরতে পারছিলাম না। স্ত্রীকে এ খবর জানাতেই সে বললো চিন্তা করোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে।

এরপর আমি বাসায় আইসোলেট হয়ে গেলাম। শুরু হলো ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিন। শুরু হলো যুদ্ধ। এর দ্বিতীয় পরীক্ষায় পুনরায় পজেটিভ আসে। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছি-আমার শত্রুকেও যেন এই রোগ না দেয়। এর মধ্যে গত ২৩ মে তৃতীয় স্যাম্পল জমা দিই। তারপরের দিন ২৪ মে রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। মুক্ত হলাম করোনা ও দীর্ঘ বন্দি জীবন থেকে।

তিনি আরও বলেন, আইসোলেশনের পুরোটা সময় ঈশ্বরের কাছে পরিবারের সবার সুস্থতার জন্য কেঁদেছি। সব সময় ভয়ে থাকতাম, এই বুঝি কারো জ্বর হলো। এই আশঙ্কা সত্যিতে পরিণহত হয়ে এরমধ্যে গত ১৩ মে আমার ছোট ভাই উত্তম কুমার দাশের জ্বর হয়। ১৭ মে আমি দ্বিতীয় সেম্পল দিতে যায়। সাথে যায় আমার ছোট ভাইও। ১৯ মে আমার ছোট ভাইয়েরও করোনা পজিটিভ আসে। তখন আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। আমার করোনা পজিটিভ শোনার পরেও আমি এতটা ভেঙে পড়েনি।

হোম কোয়ারেন্টিনে দিনগুলোতে কি করতেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইসোলেসনে থেকে টিভি দেখা, বন্ধুদের সাথে ফেসবুক ভিডিওতে আড্ডা দেওয়া আর লেখালেখি করতাম। মাঝেমধ্যে প্রচন্ড হতাশা বিরাজ করতো। কিন্তু চেষ্টা করেছি কষ্টগুলো লুকিয়ে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে। আইসোলেশনের দিনগুলোতে ফোনে বহু মানুষকে চিকিৎসাজনিত পরামর্শও দিয়েছি।

লক্ষ্মীপদ দাশ আরও বলেন, `লকডাউনের শুরুতেই একদিন বাবা বলছিলেন হাসপাতাল থেকে কিছুদিন ছুটি নেয়া যায়না? তখন আমি বললাম, `বাবা এখন এসব চিন্তা করাও । এ যুদ্ধে আমরা প্রথম সারির যোদ্ধা, পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। আমার জবাব শুনে বাবা ঘাবড়ে গেলেন। কিন্তু করার কিছুই ছিলোনা। বাবা শুধু বললেন সাবধানে থাকিস।

করোনা আক্রান্ত রোগী হোম কোয়ারেন্টিনে কি কি করলে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবার আগে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এরকম সুষম খাবার খাওয়ার পাশাপাশি হালকা ব্যায়াম করলে আরও ভালো।

কবে আবার হাসপাতালে যোগ দিলেন জানতে চাইলে বলেন, এখন বসে থাকার সময় নয়। শরীর একটু সুস্থ অনুভব করার পর আবার হাসপাতালে চলে আসি। ৫দিন হয়, রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

তাঁর মতে, করোনায় আক্রান্ত হলে মনোবল হারালে চলবে না। ভয় পেলে ক্ষতি আরও বেশি। ভিটামিন সি, ই-জাতীয় খাবার ও ফলমূল খেলে এবং বাসায় ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো যায়।