শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২০

`মধ্যবিত্তদের কথা মাথায় রাখতে হবে‘

প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ০১ জানুয়ারি ২০২০ বুধবার, ১২:০৩ এএম

`মধ্যবিত্তদের কথা মাথায় রাখতে হবে‘

বিদায়ী বছরে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে আবাসন খাতকে। আস্থার সংকট, ক্রেতার অভাব, জমির উচ্চ মূল্য, ব্যাংক ঋণে কড়াকড়ি ও উচ্চ সুদসহ নানা দিক মিলিয়ে বিদায়ী ২০১৯ সাল খুব বেশি ভাল যায়নি এই খাতে।

তারপরও এই খাত নিয়ে মানুষের আগ্রহ প্রচুর। ক্রেতারা চান ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা আর কাজে মিল থাকুক। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ফ্ল্যাট ব্যবসায় নতুন নতুন চিন্তাধারা যোগ হোক। যেখানে থাকবে সব ধরনের আধুনিকতার সংমিশ্রন। পাশাপাশি নির্মাণ আইন মেনে তৈরি হোক ভবনগুলো।

বিদায়ী ২০১৯ সাল কেমন কেটেছে এবং ২০২০ সাল আবাসন খাত কেমন যাবে-এ নিযে সারাবেলা‘র মুখোমুখি হয়েছেন নতুন প্রজন্মের আবাসন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ বাদশা আলম। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার সন্তান এই ব্যবসায়ীর পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে ব্যবসায়িক হাতেখড়ি। আবাসন খাতে যুক্ত হয়ে গত কয়েক বছরে তিনি বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। সেই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও মধ্যবিত্তের নাগালে রাখার মাধ্যমে ব্যবসায়িক সফলতা পেয়েছেন।

আবাসন খাতের জন্য কেমন হবে ২০২০ সাল এ প্রশ্নে বাদশা আলম বলেন, “কয়েক বছর ধরে অবিক্রীত থাকা ফ্ল্যাটের বিক্রি বেড়েছে। গত বছর থেকে ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমে আসায় ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী হয়েছিল ক্রেতারা। কিন্তু গৃহ ঋণে ব্যাংক সুদের হার আবারও বেড়ে যাওয়ায় এখন কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছে ফ্ল্যাট-প্লট বিকিকিনি। তবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ধীরে ধীরে মন্দা কাটিয়ে সুদিন ফিরতে শুরু করেছে আবাসন খাতে। ২০১৩ সালের পর ফ্ল্যাটের দাম খুব একটা বাড়েনি। ২০১৩-১৭ পর্যন্ত ফ্ল্যাট বিক্রি অনেক কমে যায়। ফলে বিপুল সংখ্যক ফ্ল্যাট অবিক্রিত ছিল। তবে দুই বছর ধরে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে পাল্টাচ্ছে।”

তিনি  বলেন, “শুধু চট্টগ্রামে অবিক্রিত আছে প্রায় পাঁচহাজার ফ্ল্যাট। বছরে অন্তত ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের প্রয়োজন হয়। সেখানে রিহ্যাবের সদস্যরা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছে। নিবন্ধন ফি ও স্ট্যাম্প ডিউটি কমানো এবং ঋণ পদ্ধতি আরও সহজ করা হলে খাতটি অনেক বিকশিত হবে। ”

তার মতে, মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমির রেজিট্রেশন ফি কমানো, ব্যাংক ঋণে ছাড়, সরকারি কর্মকর্তাদের হোম লোন ও অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ এ শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন করেছে। এসব কারণে চলতি বছরে ফ্ল্যাট বিক্রি ২০ শতাংশের মতো বাড়বে।

মধ্যবিত্তের জন্য মিডিয়াম টাইপের অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসা করে রেডিক্স ডিজাইন এন্ড ডেভেলপমেন্ট। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার শাহ মোহাম্মদ আখতার উদ্দিন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সফলভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন বাদশা আলম। মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাটের চাহিদা সম্পর্কে তিনি বলেন, মধ্যবিত্তরা সাধ আর সাধ্যের টানাপড়েনে থাকেন। তাদের জন্য খরচ সীমিত রেখে ফ্ল্যাট বানানো গেলে যে কোন প্রকল্পে সফলতা আসবেই। বর্তমানে চট্টগ্রামের প্রাইম লোকেশনগুলোতে জমির দাম বেশি। তারপরও জামালখান, আন্দরকিল্লা, চান্দগাঁও, শমসের পাড়া, হালিশহর এসব এলাকায় মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে ফ্ল্যাট তৈরি করছেন বলে জানান তিনি।

নতুন প্রজন্মের এই উদ্যোক্তা বলেন,  দেশে ৯০ এর দশকের পরই আবাসন ব্যবসা বড় হতে থাকে। ২০১০ সালের পূর্ব পর্যন্ত এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আসে। ওই সময়ই এর বাজার প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে অতি বিনিয়োগ ও শেয়ার বাজারে ধ্বস এবং রাজনৈতিক সমস্যার কারণে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মন্দার কবলে পড়ে খাতটি।

তার মতে, ২০১২ সাল থেকে আবাসন ব্যবসার মন্দার শুরু হয়। ২০১৪ সালের হিসাবে, চট্টগ্রামে রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ১০ হাজার ফ্ল্যাটের মধ্যে অবিক্রিত পড়েছিল প্রায় পাঁচহাজার ফ্ল্যাট। সে সময় অভিজ্ঞ-অনভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল এ বাজার। বিশেষ করে মন্দা শুরু হওয়ার পর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গ্রাহকদের প্লট বা ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে সটকে পড়েন। মন্দার কারণে বেচাকেনা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ আটকে যায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদেরও। তখন থেকে আবাসন খাতে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা কমে আসে। চলমান প্রকল্পগুলোয় গ্রাহকের সাড়া কম থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ শেষ করার সময় পিছিয়ে দেন উদ্যোক্তারা। এসবের ফলে গ্রাহকদের আস্থায় ভাটা পড়ে। সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও ছিল এ অবস্থা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ীরা গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে ঝুঁকে পড়েন। তবে মন্দার ধাক্কায় যেসব প্রতিষ্ঠান বাজারে টিকে ছিল, তারাই এখন গ্রাহকদের আস্থা ধরে রেখেছে। এখন ফ্ল্যাটের দামও যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে এসেছে। নতুন বিনিয়োগের জন্য এখন জমি খুঁজছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রামে বছরে অন্তত ২ লাখ মানুষ যুক্ত হচ্ছে। মানুষ অনুপাতে আবাসনের চাহিদার হিসাব মেলালে বছরে ১০ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের চাহিদা রয়েছে। জমির বেশি দাম, ভূমির রেজিস্ট্রেশন ফিসহ নানা খাতে অত্যধিক ব্যয়ের কারণে কম খরচে ফ্ল্যাট বানানো যাচ্ছে না।   ব্যাংক ঋনে সুদের হার কমানো ছাড়াও ঋণ সহজলভ্য করতে হবে। আবাসন খাতে সুদিন ফিরিয়ে আনতে হলে রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন ব্যয় ১৬ শতাংশ থেকে ৬-৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এটি হলে সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ কমবে, অনেকেই ফ্ল্যাট কিনতে পারবেন।”

২০১২ সালের পর ব্যবসায়িক মন্দায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে সময়মত ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে পারেনি। আস্থার সংকট প্রসঙ্গে বাদশা আলম বলেন,   ব্যবসায় টিকে থাকতে গিয়ে তখন ফ্ল্যাটের মূল্য কমাতে হয়েছিল। আমাদের কোনো হিসাবই মিলছিল না। লোকসান গুনতে গিয়ে অনেকে এ ব্যবসায় থাকতে পারেনি। লাভের কোটা শূন্য মানে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ!

তিনি বলেন, রিয়েল এস্টেট ব্যবসা যখন ভালো হলো, তখন রাতারাতি অনেক ডেভেলপার কোম্পানি চলে আসলো এবং তারা ছোট ছোট করে কাজ শুরু করলো। তাদের হয়তো অভিজ্ঞতা ছিল না, পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। শুধু ভালো সময় দেখে ব্যবসা শুরু করলে আপনি খারাপ সময়ে টিকে থাকতে পারবেন না। যারা দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা মন্দা সময়ে কষ্ট হলেও পরিস্থিতি সামলে নিতে পেরেছেন।

ব্যবসায়ী বেশি থাকলে প্রতিযোগিতা ভালো হয়। এর সুবিধা সবাই পায়। এখন প্রতিযোগিতা নিয়ে কী বলবেন? প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রতিযোগিতা এখনও আছে। ব্যবসায় প্রতিযোগিতাকে সবসময়ই ইতিবাচকভাবে দেখতে হয়। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রজেক্ট করতে হলে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বন্ধন দরকার । যারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না, তারা মূলত ব্যবসা করার মতো মানসিকতা রাখেন না। প্রতিযোগিতায় যদি কাঠামো না থাকে তাহলে সবার জন্যই সমস্যা। ওই সময় ফ্ল্যাটের মূল্য বেড়ে গেলো। বাংলাদেশে অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য কিন্তু অনেক বেশি। কোনোভাবেই বাংলাদেশের আয়, সমাজ বাস্তবতার আলোকে অ্যাপার্টমেন্টের দাম সস্তা বলতে পারবেন না। এখনও অনেক দাম। কিন্তু ২০০৯ অথবা ২০১০ সালের দিকে তাকান, দেখবেন; দাম আরও বেশি ছিল। তখন দ্রব্যমূল্য কিন্তু আজকের তুলনায় সস্তাই ছিল। আবাসন ব্যবসায় এখনও প্রতিযোগিতা আছে, তবে মার্কেট স্থিতাবস্থায় আছে। আমি বলতে পারি, আবাসন শিল্প সঠিক পথে হাঁটছে এখন।

তিনি বলেন, এখন আমরা পরিকল্পনা করছি এক হাজার বা ১২০০ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে। আমাদের এখন অধিক গুরুত্ব দিতে হচ্ছে মধ্যম আয়ের মানুষের দিকে। মধ্যম আয়ের মানুষের আয়, ব্যাংক ঋণ, ডাউন পেমেন্টের কথা বিবেচনা করে আমাদের এমন সাইজের অ্যাপার্টমেন্টের কথা ভাবতে হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরের মধ্যভাগেও এখন এমন অ্যাপার্টমেন্টের চাহিদা বাড়ছে। এ মার্কেট নিয়েই আমাদের কোম্পানির বিশেষত্ব রয়েছে। খুলশি, পাঁচলাইশ, মেহেদিবাগে বিলাসবহুল  অ্যাপার্টমেন্টের ক্রেতা উচ্চবিত্তরা। তবে সেখানে এখন ক্রেতার সংখ্যা কম। কারণ গত ৩০ বছরে উচ্চবিত্তের অনেকেই অ্যাপার্টমেন্ট কিনে ফেলেছেন।

এ কারণে ভবিষ্যতে যারা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারবেন তাদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে আমাদের প্রজেক্ট করতে হচ্ছে। এরপর স্বল্পবিত্ত মানুষের কথা ভেবে অ্যাপার্টমেন্ট করছি। কিন্তু সেটা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

মূলত জমির দামের কারণে আমরা স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য প্রজেক্ট করতে পারছি না। জমির দাম অনেক বেশি। আমরা মনে করি, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রজেক্ট করতে হলে সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বন্ধন দরকার।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ( সিডিএ) অনেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফ্ল্যাট ব্যবসায় আসছে। সিপিডিএলসহ নামী প্রতিষ্ঠানগুলো গতানুগতিক ফ্ল্যাটের বাইরে বিশাল ওপেন স্পেস ও নানা সুযোগ সুবিধা রেখে কনডোমিনিয়াম প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে। এটা মাঝারি কোম্পানিগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ কিনা এ প্রশ্নে বাদশা আলম বলেন, এখন প্রতিযোগিতার বাজার। আগে ঠিক করতে হবে ক্রেতা কারা। কথা আর কাজে মিল থাকতে হবে। সময়মত ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে হবে। কথা ঠিক রাখতে পারলে , নির্মাণ ব্যয় কম রাখা গেলে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব।