বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮

আন্ডারগার্মেন্টস পরেই প্রেজেন্টেশন!

সারাবেলা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ অক্টোবর ২০১৮ শুক্রবার, ১০:৫৪ পিএম

আন্ডারগার্মেন্টস পরেই প্রেজেন্টেশন!

নিউইয়র্কের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে কয়েকদিন আগে ঘটে গেছে এক লংকাকাণ্ড। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী লেটিশিয়া শেই। যার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন প্রায় শেষের পথে। এখন ফাইনাল থিসিস জমা দেয়ার সময় হয়ে গেছে। গত ৫ অক্টোবর ছিল লেটিশিয়ার ফাইনাল থিসিসের প্রেজেন্টেশন।

ফাইনাল থিসিস প্রেজেন্টেশন যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা মুহুর্ত, তাই এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রায়াল প্রেজেন্টেশন হয়। লেটিশিয়ার ট্রায়াল প্রেজেন্টেশন ছিল ফাইনালের তিন দিন আগে, দিনটি ছিল ২ অক্টোবর। সেদিন যখন লেটিশিয়া তার ট্রায়াল প্রেজেন্টেশন দিতে স্টেজে উঠে তখন অধ্যাপক কিঞ্চিত অবাক হন। অবাক হওয়ার কারণ, লেটিশিয়ার পোশাক। অধ্যাপক রেবেকা ম্যাগুর লেটিশিয়াকে প্রথম যে প্রশ্নটি করেন সেটি ছিল- “তুমি কি এই পোশাক পরেই তোমার ফাইনাল প্রেজেন্টেশন দিবে? তোমার শর্টসটা সত্যিই অনেক ছোট”।

উল্লেখ্য, সেদিন লেটিশিয়ার পরনে ছিল ফুল হাতা শার্ট ও শর্ট জিন্স। অধ্যাপক রেবেকার মন্তব্যের জবাবে লেটিশিয়া বলে, ‘আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুটা তার প্রেজেন্টেশনে থাকা উচিত। পোশাকে নয়।’ তখন অধ্যাপক রেবেকা ম্যাগুর আবার বলেন, ‘তোমার পোশাক এখানের সকল পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি তোমার প্রেজেন্টেশন থেকে সরিয়ে তোমার শরীরে নিয়ে যাচ্ছে’। এখানে ‘পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শব্দটা চট করে কানে লাগে লেটিশিয়ার। সে বিরক্ত হয়, ক্লাসের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীও প্রফেসরের এমন মন্তব্য অপ্রয়োজনীয় মনে করে। তবে একজন বিদেশী ছাত্র প্রফেসরকে সমর্থন দিয়ে নৈতিকতাবোধের কথা বলে। সে ছাত্র বলে অডিয়েন্সকে সম্মান জানাতে ড্রেস আরো ভদ্রস্থ হওয়া বাঞ্চনীয়।

এইসব নাটকীয়তার মুহুর্তে লেটিশিয়া তখনই প্রেজেন্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে আসে হল থেকে। প্রফেসর ম্যাগুর লেটিশিয়ার পেছন পেছন আসেন। তিনি লেটিশিয়াক জিজ্ঞেস করেন ‘তোমার মা তোমাকে এরকম পোশাকে দেখলে কি ভাববে?’ লেটিশিয়া তার জবাবে বলেছিল, ‘আমার মা কি মনে করবে? আমার মা নারীদের পক্ষে কাজ করেন। তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন মানুষের ক্ষমতায়নের জন্য লড়াই করতে। সুতরাং, আমার মনে হয় আমার মায়ের অন্তত আমার শর্টস নিয়ে সমস্যা হবে না।’
তখন প্রফেসর ম্যাগুর আবার তাকে জিজ্ঞেস করে, “তাহলে এখন তুমি কি করবে। তুমি কি প্রেজেন্টেশন দিতে চাও না?” জবাবে লেটিশিয়া বলেছিল “I’m going to give the best damn speech of my life.”

সেদিন বাসায় ফিরেই লেটিশিয়া ফেসবুকে পুরো ঘটনা নিয়ে স্ট্যাটাস প্রকাশ করে। এই ঘটনায় লেটিশিয়ার পক্ষে বেশিরভাগ মানুষ দাঁড়ায়। লেটিশিয়া স্ট্যাটাসে এটাও বলে সে তার ফাইনাল প্রেজেন্টেশন কী ড্রেস পড়ে দিবে। সবাই যেন তাকে সমর্থন দেয়।

তার ফাইনাল প্রেজেন্টেশন রুমে গিয়ে প্রথমে বলে, “I am more than Asian. I am more than a woman. I am more than Letitia Chai. I am a human being, And I ask you to take this leap of faith, to take this next step, or rather this next strip, in our movement and to join me in revealing to each other and to seeing each other for who we truly are members of the human race.”

এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখার পর লেটিশিয়া ভয়ংকর দুঃসাহসের একটা কাজ করে বসে। সে তার পরনের পোশাক আস্তে আস্তে খুলে ফেলে। শুধু তার পরনে ছিল আন্ডারগার্মেন্টস। পোষাক নিয়ে মন্তব্য করার কারণে লেটিশিয়া প্রতিবাদে এই কাজটি করে, এটার নাম দেয়া হয় স্ট্রিপ মুভমেন্ট। লেটিশিয়া পুরো প্রেজেন্টেশনটাই ব্রা এবং আন্ডাওয়্যার পরে উপস্থাপন করে৷ সেদিন হলরুমে উপস্থিত ছিল ৪৪ জন স্টুডেন্ট৷ যাদের ২৮ জন লেটিশিয়ার সাথে এই স্ট্রিপ মুভমেন্টে যোগ দেয়। এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে।

যদিও প্রফেসরের পক্ষেও কিছু ছাত্রছাত্রী ছিল। ২ অক্টোবর ট্রায়ালরুমে থাকা ১১ জন ছাত্র প্রফেসর ম্যাগুরকে সমর্থন করে। তাদের বক্তব্য হলো, “পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি” শব্দটা যুতসই ছিল না। বলতেই হয় এটা বাজে ওয়ার্ড চয়েস ছিল। এই কারণে প্রফেসর কয়েকবার ক্ষমাও চান। আমরা লেটিশিয়ার “ওম্যান রাইটস” সমর্থনও করি। কিন্তু সেদিন লেটিশিয়া কথাগুলো ভিন্নভাবে নিয়েছে৷ প্রফেসর তার কথাগুলো পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে বলেছিল৷ লেটিশিয়া বুঝতে ভুল করেছে।

প্রফেসরের নিজের বক্তব্য আছে। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। ‘কর্নেল সান’কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে প্রফেসর রেবেকা ম্যাগুর বলেন, “আমি আমার ছাত্রদের বলি না কী পড়া উচিত, এটাও ঠিক করে দেই না কোনটা মানানসই উপযুক্ত ড্রেস। আমি শুধু এটাই জিজ্ঞেস করবো, যে ড্রেস তারা পড়ছে সেটাই তাদের নিজস্বতা প্রতিফলিত করে কি না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার তো তাদের হাতে।”
তবে এমনিতেও কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের ঘটনা বেশ অহরহই ঘটছে। ‘নিউ ইয়র্ক ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন’র তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত নিউইয়র্ক স্টেটে নিউইয়র্ক স্টেটের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যৌন নিপীড়ন হবার অভিযোগ এসেছে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু এ বছরই এখন পর্যন্ত ১৯৯টি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পাওয়া যায়। আর এইরকম একটি অবস্থায় প্রফেসর যখন ছাত্রীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য করেন এবং পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি তার শরীরের দিকে টেনে নেয়া হচ্ছে ধরণের কথা বলেন, তখন এটা ছাত্রীর ইগোতে লাগাটাই স্বাভাবিক।

লেটিশিয়া ব্যক্তিস্বাধীনতার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করে বোঝানোর চেষ্টা করেন, পোশাক কখনো মানুষকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। যদি লেটিশিয়ার পোশাক নিয়ে সমস্যা হয়, সেটা আরেকজনের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা, তার নয়। লেটিশিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষেপেছে পুরুষদের কথা আসায়। পুরুষরা প্রেজেন্টেশন বাদ দিয়ে তার শরীরের দিকে তাকিয়ে আছে এই কথা শুনার পর সে ক্ষীপ্ত হয়।

সে এসেছে প্রেজেন্টেশন দিতে, ফিডব্যাক আসা উচিত প্রেজেন্টেশন নিয়ে, তার শরীর পোশাক এসব নিয়ে মন্তব্য কেন! তাই সে তার মুভমেন্টে বাকি সবাইকে যোগ দিতে বলে। যেন বোঝাতে, পোশাকের নিচে এই শরীরটা সবারই এক। দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক না হলে কোনো পোশাককেই শালীন মনে হবে না…