ঢাকা, সোমবার, ২০ আগস্ট ২০১৮

পটিয়াবাসীর দিনবদলের রাজকুমার

রবিউল হোসেন, চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার, ০৮:৪৮ পিএম

পটিয়াবাসীর দিনবদলের রাজকুমার

এক জনপদে জন্মেছিলেন এক রাজকুমার। ছোটবেলা থেকে জীবন নিয়ে সংগ্রাম করে যিনি নিজের ভাগ্য বদলেছেন। এক সময় গড়ে তোলেন শিল্পগ্রুপ। যেন আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া এক সোনার গল্প। তারপর সবকিছুই যেন রূপকথা। একজন মানুষই বদলে দিলেন পুরো জনপদের দু:খ। চাকরি দিয়ে ঘুচালেন বেকারত্ব। হাসি ফুটালেন হাজার হাজার পরিবারের মুখে। বেকার যুবক, নারী, পুরুষ তাঁর সামনে দাঁড়ালেই সমস্যার সমাধান। তাই তো পটিয়াবাসীর কাছে তিনি গর্বের ধন। তিনি সাইফুল আলম মাসুদ, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান। এস আলম নামেই যিনি সারাদেশে বিশেষ পরিচিত।

মানুষের হৃদয়ে তিনি এতটাই মিশে গেছেন যে পটিয়ার ঘরে ঘরে এখন মিলাদ পড়িয়ে তাঁর সুস্ততা ও দীর্ঘায়ুর জন্য দোয়া করা হয়। তিনি এলাকায় আসবেন শুনলে এক নজর দেখতে ভিড় করেন শত শত মানুষ।

শুধুু একটি শিল্পগ্রুপ নয় , অন্তত ৭ বেসরকারি ব্যাংকসহ প্রায় ডজনখানেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রন রযেছে তাঁর হাতে। পটিয়ার সন্তানেরা যখনই তাঁর কাছে ধর্ণা দিয়েছেন চাকরি পেয়েছেন। এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর, সবার যোগ্যতা অনুযাযী চাকরি হয়েছে এস আলমের বিভিন্ন ব্যাংক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে। ফলে এস আলমের নিজ উপজেলা চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা হয়ে উঠেছে একটি ব্যাংকপাড়া। একটি উপজেলায় এত বেশি ব্যাংকার দেশের আর কোথাও নেই বলে মনে করছেন ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথমে ব্যাংক জগতে আসেন মাসুদ। এরপর একে একে যুক্ত হন আল আরাফা ইসলামী ব্যাংক, ইউনিযন ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে। গুঞ্জন রয়েছে শিগগিরই আরো কয়েকটি তাঁর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন পটিয়ার অন্তত এক হাজার লোক।

জানা যায়, প্রায় আড়াইশ’ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের পটিয়া উপজেলায় একটি পৌরসভা ও ১২৪টি গ্রাম রয়েছে। হিসাব করলে দেখা যাবে প্রতি গ্রামে কম করে হলেও ১০ জন লোক পাওয়া যাবে যারা এস আলমের আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা শিল্প কারখানায় চাকরি করছেন। । যাদের সবাই গত ৮ বছরে চাকরি পেয়েছেন সাইফুল আলম মাসুদ নিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্ঠানে। এতে পাল্টে গেছে পুরো পটিয়ার অর্থনৈতিক চিত্র। আর এস আলম হয়ে উঠেছেন দিন বদলের রাজকুমার।

সাইফুল আলম মাসুদের জন্ম চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া পৌরসদরে । দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখার পাশাপাশি এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবার এখন স্বাবলম্বী। বর্তমানে শুধু পটিয়া নয়, দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানে তিনি ভ’মিকা রাখছেন। শুধু ব্যাংক খাত নয়, এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠিত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫০ হাজারের অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জীবিকা নির্বাহ করছেন।

স্থানীয় পিঙ্গলা গ্রামের দিদারুল আনোয়ার খান বলেন, সবার পক্ষে-বিপক্ষে মত থাকে। কিন্তু এলাকাবাসীর কাছে এস আলম এখন অবিসংবাদিত। তিনিই তো দিনবদলের রাজকুমার। তার মতো চাকরি দিয়ে জীবন পাল্টে দেওয়ার মানুষ ক’জনই বা আছে !

সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ইসলামী বাংকের ১২ ভাগেরও বেশি শেয়ার বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে কিনে নেয় এস আলম গ্রুপ। এ নিয়ে গণমাধ্যমে বিভিন্ন খবর প্রকাশ পায়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এস আলম গ্রুপ তাদের প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করেনি। বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, নতুন কোম্পানি সৃষ্টি করে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেনে এস আলম গ্রুপ। এসব কোম্পানির মধ্যে প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল ২.০০৯, প্লাটিনাম এনডোর্স ২.০০৫, ব্লু ইন্টারন্যাশনাল ২.০০৯, এবিসি ভেঞ্চার ২.০০৬, গ্রান্ড বিজনেস ২.০২ এবং এক্সেল ডায়িং কেনে ৩.৪০ শতাংশ শেয়ার। এরপর এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান আরাস্তু খান। এর আগে তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।

ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শহিদুল আলম। তিনি সাইফুল আলম মাসুদের ভাই। এই ব্যাংকের পরিচালক পদে আছেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম। এ ছাড়া ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডার হিসেবে রয়েছেন সাইফুল আলমের ছেলে আহসানুল আলম ও স্ত্রী ফারজানা পারভীন।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকেরও মালিকানা এস আলম গ্রুপের হাতে। ব্যাংকটির ৪০ শতাংশ শেয়ারের মালিক চট্টগ্রামের এই ব্যবসায়ী গ্রুপ। ব্যাংকটির পরিচালক পদে আছেন এ এ এম জাকারিয়া। এর আগে তিনি এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ৮ বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করেন।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪ ভাগের বেশি শেয়ার আছেছ এই গ্রুপটির হাতে। এই ব্যাংকে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাইফুল আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ। ২.০৬ শতাংশ করে এ ব্যাংকে রয়েছে প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল এবং প্লাটিনাম এনডোসের শেয়ার। ইসলামী ব্যাংকেও রয়েছে এই প্রতিষ্ঠান দুটির শেয়ার। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন পোর্টম্যান সিমেন্টের শেয়ার ২.৬ শতাংশ, প্রসাদ প্যারাডাইস রিসোর্টের শেয়ার ২.০৬, শাহ আমানত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২.০৩, গ্লোবাল ট্রেডিংয়ের ২.৫ এবং লায়ন সিকিউরিটিজের ২.০৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

এগুলো ছাড়াও আল আরাফা ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ভাই আবদুস সামাদ। সেই সঙ্গে এই ব্যাংকের স্পন্সর শেয়ার হোল্ডার হিসেবে রয়েছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকও রয়েছে এস আলম পরিবারের হাতে। সাইফুল আলমের বড় ভাই মোরশেদুল আলম এই ব্যাংকের পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন।

গ্রুপটির সূত্রমতে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ প্রায় ৩০ বছর আগে দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পণ্য বেচাকেনা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে ব্যবসায়ের পরিসর বাড়তে থাকে। তারপর একে একে পরিবহন, হোটেল, ঢেউটিন, সয়াবিন তেল, সিমেন্ট, চিনি, সিআর কয়েলসহ বেশ কয়েকটি শিল্প-কারখানা গড়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা পায় এস আলম গ্রুপ। এস আলম গ্রুপ কয়েক বছরে আগেও তেল, গম, চিনি আমদানিতে শীর্ষে অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা থেকে সরে এসে জ্বালানি, সিমেন্ট, ইস্পাত, ঢেউটিন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। বেসরকারি টেলিভিশন ইটিভির মালিকও এস আলম।

এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেড (আইএলএফএসএল) , বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিআইএফসি) এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডে এস আলম গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে। এসব ব্যাংক ছাড়াও নর্দার্ন ইন্স্যুরেন্সসহ অসংখ্য বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এস আলমের মালিকানা রয়েছে।

সাইফুল আলম মাসুদ এর মালিকানাধীন ব্যাংকে কর্মরত বোরহান উদ্দীন নামের এক কর্মকর্তা বলেন, বেকার যুবকদের মাথার উপর ছায়া হয়ে আসেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান। তিনি শুধু বটবৃক্ষ নন, মাথার উপর বিশাল আকাশও। আমাদের মতো অগণিত নিঃস্ব পরিবারকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করছেন।

মো. নুর উদ্দীন নামের আরেক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০১৫ সালে পড়ালেখা শেষ করে দুই বছর বেকার ছিলেন তিনি। ২০১৭ সালে এসে এস আলম গ্র“পের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ এর নিকট ধারস্থ হওয়া মাত্রই তিনি চাকরি পাইয়ে দেন। যার ফলে তাদের ৩ ভাই ও দু বোন এবং বাবা-মাসহ ৭ সদস্যের পরিবারটি স্বাবলম্বী। পরিবারের সবার বড় হওয়ায় বর্তমানে আয় উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনও তিনি।’

একসময় নারীদের পরিবারে বোঝা মনে করতো সবাই। সাইফুল আলম মাসুদের কল্যাণে ব্যাংকে চাকরি পেয়েছেন পটিযা ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের শত শত নারী। তাঁর মালিকানাধীণ ব্যাংকে কর্মরত শীবলী আকতার নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন,‘এমবিএ শেষ করে বসে থাকতে হয়নি। এসআলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে চাকরি দিেেয়ছেন। আরেক মহিলা কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগম। পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কারনে গ্রাজুয়েশন শেষ করে চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরেছেন প্রায় আড়াই বছর। তারপর সরাসরি এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের কাছে গেলে জুটে যায় চাকরি।

সারাবেলা/অারএইচ/এএম