শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

উদ্যোক্তাদের জন্য বিশাল প্রণোদনা, সুদ অর্ধেকেরও কম

আজাদ মঈনুদ্দীন

প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২০ রবিবার, ০২:৩৪ পিএম

উদ্যোক্তাদের জন্য বিশাল প্রণোদনা, সুদ অর্ধেকেরও কম

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের কারণে দেশে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবিলায় নতুনটি চারটিসহ মোট পাঁচটি প্যাকেজে প্রায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পাঁচ প্যাকেজে শিল্প উদ্যোক্তারা গড়ে ৩.৫৮% সুদে ঋণ হিসাবে এই টাকা পেতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ ১০০ টাকার ঋণ পেলে সারা বছরে আসলের অতিরিক্ত মাত্র ৩.৫৮ টাকা পরিশোধ করতে হবে। যদিওবা বর্তমানে দেশে সব ধরণের ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশ। আর এক মাস আগে এই হার ছিল ১৪ শতাংশের উপরে।  এ হিসাবে সুদ বাবদ উদোক্তাদের খরচ হবে আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

প্রণোদনায় বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তারা ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাবেন সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ৪ শতাংশে, গার্মেন্টস মালিকরা শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধে ২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিয়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানিকারকদের জন্য ইডিএফ সুবিধার আওতায় ২% সুদে ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, প্রি শিপমেন্ট রিফাইনান্স স্কিমে ৭ % সুদে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

তবে বৃহৎ শিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের ঋণে উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ৯ শতাংশ সুদের বাকী অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিফান্ড পাবেন।

রোববার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে এই কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারের পাশাপাশি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও কেন্দ্রগুলো প্রেস কনফারেন্সটি সরাসরি সম্প্রচার করে।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আর্থিক সহায়তা প্যাকেজগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-

প্যাকেজ-১ : ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের জন্য ৩০ হাজার কোটি ঋণ সুবিধা

ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা দেয়া, ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্পসুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেয়ার লক্ষ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। ব্যাংক-ক্লায়েন্ট রিলেশনসের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সংশ্লিষ্ট শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব তহবিল হতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ঋণ দেয়া।
এ ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে ৯ শতাংশ। প্রদত্ত ঋণের সুদের অর্ধেক অর্থাৎ ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ঋণ গ্রহিতা শিল্প/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

প্যাকেজ-২ : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল সুবিধা প্রদান)

ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্পসুদে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রদানের লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা প্রণয়ন করা হবে। ব্যাংক-ক্লায়েন্ট রিলেশনসের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিজস্ব তহবিল হতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বাবদ ঋণ দেবে।
এ ঋণ সুবিধার সুদের হারও হবে ৯ শতাংশ। ঋণের ৪ শতাংশ সুদ ঋণগ্রহিতা শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করবে এবং অবশিষ্ট ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে দেবে।

প্যাকেজ-৩ : বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবর্তিত এক্সপোর্ট ডেভলপমেন্ট ফান্ডের (ইডিএফ) সুবিধা বাড়ানো

ব্লক টু ব্লক এলসির আওতায় কাঁচামাল আমদানি সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ই রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) বর্তমান আকার ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। ফলে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ইডিএফ তহবিলে যুক্ত হবে। ইডিএফ-এর বর্তমান সুদের হার LIBOR + ১.৫ শতাংশ (যা প্রকৃত পক্ষে ২.৭৩%) হতে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।

প্যাকেজ-৪ : ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা

প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স স্কিম নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন ঋণ সুবিধা চালু করবে। এ ঋণ সুবিধার সুদের হার হবে ৭ শতাংশ।

প্যাকেজ-৫: আগের ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ

ইতিপূর্বে রপ্তানিমুখী কারখানার শ্রমিকদের মজুরি দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল।  শর্ত অনুযায়ী, কমপক্ষে ৮০ শতাংশ রপ্তানি হয়, এমন কারখানা সচল হিসেবে চিহ্নিত হবে। ঋণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সুদ নেবে না, তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল নিতে পারবে।

যেসব কারখানা গত ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন দিয়েছে, তারাই বিবেচিত হবে সচল প্রতিষ্ঠান হিসেবে। ঋণ পেতে পাশাপাশি ওই তিন মাসের রপ্তানি কার্যক্রমও থাকতে হবে তাদের। ২০ এপ্রিলের মধ্যে ঋণের জন্য আবেদন করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক তিন দফায় তিন মাসের বেতনের টাকা দেবে। এটা শুরু হবে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে, চলবে জুন পর্যন্ত।
এ ঋণের টাকা বাংলাদেশ ব্যাংককে ২ বছরের মধ্যে শোধ করবে ব্যাংকগুলো। এ জন্য প্রথম ৬ মাস ঋণ পরিশোধে বিরতি পাবে, পরের ১৮ মাসে ১৮ কিস্তিতে টাকা শোধ দিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপের কিছু ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন,  পোশাক শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন-ভাতার পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিলের সার্কুলার ইতোমধ্যেই জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল থেকে চলতি মাসের বেতন এপ্রিলের ৩০ তারিখেই দেয়া হবে বলে ।

তিনি বলেন, ‘আমরা ১ এপ্রিল থেকে তফসিলি ব্যাংকসমূহের নগদ জমার হার (সিআরআর) হ্রাস করে সাপ্তাহিক গড়ভিত্তিতে ৫ শতাংশ করেছি, ইতোপূর্বে তা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল। দেশে তফসিলি ব্যাংকসমূহে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত জমা থাকবে। যা দিয়ে তারা তারল্য মেটাবে।’

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো সুদহার ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়েছে। যার ফলে ব্যাংকসমূহকে তারল্য যোগান দিতে কম ব্যয় করতে হবে।

সাধারণ ছুটি চলাকালীন জনগণের নগদ অর্থের চাহিদা মেটানোর জন্য সীমিত আকারে ব্যাংক খোলা রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, ক্রেডিক কার্ডে মে পর্যন্ত কোনো ধরনের জরিমানা আরোপ না করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।