বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯

কারা থাকছেন নতুন মন্ত্রিসভায় ?

প্রতিবেদক, ঢাকা

প্রকাশিত: ০২ জানুয়ারি ২০১৯ বুধবার, ০৯:০০ এএম

কারা থাকছেন নতুন মন্ত্রিসভায় ?

একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর এখন চলছে নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনা। বৃহস্পতিবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান হবে। এরপর ১০ জানুয়ারির মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।

কেমন হবে মন্ত্রিসভার আকার, কারা থাকছেন, কারা বাদ যাচ্ছেন বা নতুন কারা আসছেন— সচিবালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্যের অঙ্গনে এটিই এখন মুখ্য আলোচনার বিষয়। আকার যাই হোক নির্বাচনী জোটের শরিকদের প্রতিনিধি রেখেই নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, কারা মন্ত্রিসভায় থাকবেন তা একান্তই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখতিয়ার।

সবকিছু ঠিক থাকলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যদের শপথ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ সচিবালয় সূত্র এবং তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গতকাল মঙ্গলবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে বিএনপির এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তাদের এমপি পদে বিজয়ীরা শপথ নেবেন না। এছাড়া আগামী ৫ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য সময় ধরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে শপথের দিনক্ষণ দু-একদিন হেরফের হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের  সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী ১০ জানুয়ারির আগেই নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হবে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি (জাপা), ১৪ দলীয় জোট, যুক্তফ্রন্ট মহাজোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়। পক্ষান্তরে প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ঐক্যফ্রন্ট নামে নির্বাচনে অংশ নেয়। মহাজোট ২৮৮ আসনে এবং ঐক্যফ্রন্ট ৭ আসনে জয়লাভ করে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৯, জাপা ২২, আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতীয় পার্টি-জেপিসহ ১৪ দলের অন্য শরীকরা ৯টি আসনে বিজয়ী হয়। জাপা নিজস্ব প্রতীক লাঙ্গল এবং জেপি নিজস্ব প্রতীক বাই সাইকেল নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। অন্যরা নৌকা প্রতীক নিয়েই ভোট করে।

এদিকে নতুন মন্ত্রিসভার আকার কেমন হবে সেই প্রশ্নে যে আভাস মিলছে তাতে গতবারের তুলনায় নতুন মন্ত্রিসভার আকার কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। ২২টি আসনে নির্বাচিত জাপার কাউকে মন্ত্রিসভায় নেয়া হবে কি হবে না সে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয় জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভায় মহাজোটের অন্য শরিকদের প্রতিনিধি থাকছে। নির্বাচনে অংশ না নেয়া ১৪ দলীয় জোটের শরীক কোনো কোনো দলের প্রতিনিধিকেও মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হতে পারে। মন্ত্রিসভায় গতবারের তুলনায় নারীর সংখ্যাও বাড়ানো হতে পারে এমন আলোচনাও রয়েছে। তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মতো মেধাবী ও দক্ষদের বিষয়টি এবার মন্ত্রিসভায় গুরুত্ব পেতে পারে। স্বচ্ছভাবমূর্তির ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

নিয়মানুযায়ী নির্বাচিত সদস্যদের নাম নির্বাচন কমিশন কর্তৃক গেজেট আকারে প্রকাশের পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে তাদের শপথ অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব মো. হেলালুদ্দীন আহমেদ মঙ্গলবার রাতে জানান, বুধবার গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা আছে। এ লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন।

গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। তফসিল ঘোষণার পর একজন প্রার্থী মৃত্যুবরণ করায় এবং নির্বাচনের দিন আরেকটি আসনে নির্বাচন স্থগিত করায় সরকারিভাবে ২৯৮ জন সংসদ সদস্যকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এই ২৯৮ জনের নামের তালিকা এখন গেজেট আকারে প্রকাশ হবে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, অর্থ, আইন, কৃষি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পুরোনোরাই বহাল থাকতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী এবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কোনো দক্ষ রাজনীতিককে দিতে চান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়েও তিনি নানা চিন্তাভাবনা করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জ্যেষ্ঠ কোনো নেতাকে দেওয়া হতে পারে। এ ছাড়া আবুল মাল আবদুল মুহিত, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওবায়দুল কাদের, নুরুল ইসলাম নাহিদ, শফিক আহমেদ, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জাতীয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জাসদের হাসানুল হক ইনু নতুন মন্ত্রিসভায় থাকছেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।

অন্য একটি সূত্র জানায়, বিদায়ী মহাজোট ও নির্বাচনকালীন সরকারের হেভিওয়েট মন্ত্রীদের প্রায় সবাই থেকে যাচ্ছেন নতুন এ মন্ত্রিসভায়। চট্টগ্রামের সন্তান, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ূয়াকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদ থেকে সরিয়ে এনে টেকনোক্র্যাট কোটায় আবারও মন্ত্রী করা হতে পারে। আর জাতীয় পার্টি এলে দলটি থেকে সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেওয়া ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, মুজিবুল হক চুন্নু ও অ্যাডভোকেট সালমা ইসলামকে নতুন সরকারেও নেওয়া হতে পারে। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে অর্থমন্ত্রী করা না হলে তার স্থলে নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে টেকনোক্র্যাট কোটায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এবং জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতের নাম তালিকায় রয়েছে।

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো এমপি হওয়া সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনিসুল হককে আইনমন্ত্রী করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আইন উপদেষ্টা ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ উপদেষ্টা হিসেবেই থাকছেন। এর বাইরে বিদায়ী মহাজোট সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে ডা. দীপু মনি, আবুল হাসান মাহমুদ আলী, ড. হাছান মাহমুদ, শাজাহান খান, মুজিবুল হক, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু প্রমুখ আবারও মন্ত্রিসভায় নিয়োগ পেতে পারেন। তাদের সঙ্গে নতুন করে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন সাবের হোসেন চৌধুরী, মাহবুবউল আলম হানিফ ও আসাদুজ্জামান নূর। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শোনা যাচ্ছে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বীর বাহাদুর, আবদুর রহমান ও অ্যাডভোকেট জুনাইদ আহমেদ পলকের নাম।

এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে সাংবাদিকদের  বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী নতুন মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আহ্বান জানালে তিনি সাড়া দিবেন। কেননা তিনি সবসময় প্রধানমন্ত্রীকে মান্য করে চলেন।

চট্টগ্রাম থেকে কারা থাকছেন মন্ত্রিসভায় ? সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রতিবারই স্থান পেয়ে থাকেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন। বর্তমান মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করছেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় ছিলেন নুরুল ইসলাম বিএসসি। নির্বাচনকালীন সরকারে অনির্বাচিত কারও থাকার বিধান না থাকায় সরে দাঁড়াতে হয় নুরুল ইসলাম বিএসসিকে। এর আগে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন ডাঃ আফসারুল আমিন ও ডাঃ হাছান মাহমুদ। এবারের মন্ত্রিসভায় পুরনোদের পাশাপাশি একাধিক নতুন মুখও রয়েছেন আলোচনায়।

প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও আলোচনায় রয়েছেন সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুত্র মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত এই তরুণ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্নেহধন্য। ফলে মন্ত্রিসভায় তার স্থান হতে পারে এমনই আশাবাদ এলাকার ভোটারদের।

এছাড়া চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফ ও রাউজান আসনের বার বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর নামও রয়েছে আলোচনায়। এছাড়া সাম্যবাদী দলের দিলিপ বড়ুয়াকে আবারও মন্ত্রী করা হবে শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে মন্ত্রীর তালিকায় চট্টগ্রাম থেকে রয়েছেন অন্তত ১০ জন।

দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। ৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় গেজেট আকারে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামের তালিকা প্রকাশ করে। ৯ জানুয়ারি এমপিদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। একইদিনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সংসদীয় দলের সভায় শেখ হাসিনাকে সংসদীয় দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগদানের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়। একই সময় সরকার গঠনের সম্মতি জ্ঞাপন ও মন্ত্রিসভা ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হওয়া সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের নিয়োগের অবসান ঘটানো হয়। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে নিয়োগ প্রদান করেন। একই তারিখে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হয়।